ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

এখনো অনেক বুদ্ধিজীবী পত্রিকায়, টক শো’তে তাদের আলোচনায় বিএনপি আর জামাতের সখ্যতা-হৃদ্যতাকে কেবল মাত্র রাজনৈতিক স্ট্রাটেজি মনে করেন। শুধুমাত্র ভোটের রাজনীতি মনে করেন। অনেকে এও মনে করে বিএনপি জামাতকে ছাড়তে পারছেনা, আবার সাথে থেকেও নিজেদের বিতর্কিত হচ্ছে। এসব মতে একটা বিষয় স্পষ্ট আজকে বিএনপি রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজি মতে জামাত থেকে আলাদা হওয়া মাত্রই দুধে ধোয়া তুলসী পাতা হয়ে যাবে। অথচ অতীত থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বিএনপি বরাবর জামাতমুখী ছিল। বহুদলীয় রাজনীতির নামে জামাতে ইসলামিকে রাজনীতিতে পুনর্বাসন, বঙ্গবন্ধুর আমলে যুদ্ধাপরাধীদের যে বিচার কার্যক্রম চলছিল, তা ক্রমে অর্থব করে দেয়া, চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীকে দেশে ফিরিয়ে আনা, নাগরিকত্ব দেয়া, যুদ্ধাপরাধী দল জামাতের সাথে গাঁটছড়া বাঁধা, জামাত নেতাদের মন্ত্রীত্ব দেয়া, আটককৃত জামাত নেতাদের মুক্তির দাবিতে প্রকাশ্য ও মৌন সম্মতি দেয়া – এসবের ইতিহাসে বিএনপি’র রাজনৈতিক আদর্শগত অবস্থান বরাবর স্পষ্ট।

বিএনপি’র মহাসমাবেশে জামাত কর্মীদের কর্মতৎপরতা চোখে পড়ে অধিক। যে সমাবেশে বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া ভাষণ দেন, সেই সমাবেশে জামাতের কর্মীরা গোলাম আযম, সাঈদী’র মুক্তি দাবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করে। জামাতের ইফতার পার্টিতে মুজাহিদ কিংবা গোলাম আযমের পাশে বসে বিএনপি নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে মোনাজাতে শরিক হতে দেখা যায়। বিএনপি নেত্রী নিজ মুখে এই সব চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী নেতাদের মুক্তির দাবি উচ্চারণ করেন।

জামায়াত নেতাদের মুক্তির মোনাজাতে খালেদা জিয়া, দৈনিক প্রথম আলো, ০৭-০৮-২০১১

জামায়াতের ইফতারে খালেদা জিয়া, দৈনিক প্রথম আলো, ২৩-০৮-২০১০

উদার বিশ্লেষকরা বলেন, সেই একবার খালেদা জিয়া মুখ ফসকে বলেছেন, এরপর আর বলেননি। উদার পর্যবেক্ষকদের দাবি, বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির রায় ঘোষণার পর বিএনপি তড়িৎ কোন প্রতিক্রিয়া দেয়নি। বিশ্লেষকরা এর অর্থ এই দাঁড় করান, বিএনপি ‘র মত একটি বৃহৎ দল জনমতের আবেগের বাইরে যাবে না। অথচ এই সব উদার বিশ্লেষকদের জল্পনা-কল্পনাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে, বিএনপি’র পক্ষ থেকে দলীয় নেতা জামাতের হরতালে সমর্থন ঘোষনা করেন। এটা তো দিবালোকের মত স্পষ্ট যে, জামাতের এই হরতালের মূল উদ্দেশ্য আটক যুদ্ধাপরাধী জামাতে নেতাদের মুক্তি। এই থেকে কি বিএনপি’র আদর্শের নগ্নতা প্রকাশিত হয়। এবং এও নতুন তো কিছু নয়!

তত্ত্বাবধায় সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বিএনপি’র প্রাথমিক আন্দোলন কেবল মাত্র একটি আই ওয়াশ ছিল। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল এই এজেন্ডা দিয়ে সাধারণ জনমতে, বুদ্ধিজীবী বিশ্লেষণে বিভক্তি তৈরী করা। এবং সরকারের অবস্থানকে নাজুক করা। তবে উদ্দেশ্যগত অসততায় বিএনপি এই এজেন্ডা নিয়ে বিশেষ সফলতার মুখ দেখেনি। আজকের সকাল-সন্ধ্যা হরতালেও জামাত এই এজেন্ডাকে তালিকায় রেখেছে। কিন্তু সংবাদ চ্যানেলগুলোয় আজকের হরতাল পরিস্থিতি বিশ্লেষণে সকল প্রতিবেদকই জানাচ্ছে, আজকের হরতালে জামাত-শিবিরের মূল তৎপরতা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও রায়কে কেন্দ্র করেই।

বিরোধী দলীয় নেত্রী মিতভাষী বলে প্রচারণা আছে। তবে আমরা এও জানি, তিনি সকল অভিযোগ উত্থাপন করেন, হয় লন্ডনে গিয়ে, নয়তো বিদেশ থেকে কূটনীতিকরা দেশে এলে। এবার তো তিনি পূর্বের নিজেকেও ছাড়িয়ে গিয়ে বিদেশি পত্রিকায় একটি বৃহৎ আর্টিকেল ছাপিয়ে নিলেন, পশ্চিমা প্রভুদের দৃষ্টি আকর্ষণে।

বেগম খালেদা জিয়ার সেই আর্টিকেল –
ZIA: The thankless role in saving democracy in Bangladesh
Corruption and stealing threaten a once-vibrant nation
Wednesday, January 30, 2013, http://www.washingtontimes.com

এই আর্টিকেল নিয়ে ফরহাদ মজহারের আজকের ফেসবুকে স্ট্যাটাসের অংশ বিশেষ –

বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছা, সংকল্প ও শক্তির ওপর বিন্দুমাত্র আস্থা নাই বেগম খালেদা জিয়ার। তিনি বাংলাদেশের ‘গণতন্ত্র’ রক্ষার জন্য এখন আহ্বান জানাচ্ছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের কাছে। তাঁর আবদার, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এসে বাংলাদেশের ‘গণতন্ত্র’ উদ্ধার করে দিয়ে যাক। অর্থাৎ শেখ হাসিনাকে সরিয়ে তাকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিক। হীনমন্যতা ও গণবিচ্ছিন্নতার এই লিখিত দলিল প্রদর্শন করে খালেদা জিয়া তার অবক্ষয়কে আরও ত্বরান্বিত করলেন। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক লড়াই নেতৃত্ব দেবার ন্যূনতম বৈধতাটুকুও তাঁর আর নাই বা থাকতে পারে না। যিনি মার্কিন যুক্ত্রাষ্ট্রের সহায়তায় ক্ষমতায় যেতে চান, জনগণের সমর্থনে নয়, তাঁর বিরোধিতা করা ছাড়া বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বে একটুও যারা বিশ্বাস করেন তাদের সামনে আর কোন গতি রইল না। বিএনপির রাজনীতির দেঊলিয়াপনা এবং বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা ওয়াশিংটন টাইমসের এই লেখা। সর্বোপরী তাঁর নিজের ওপর তাঁর নিজেরই আস্থাহীনতার দলিল এটা।

জামাত পাক বাহিনীকে সহযোগিতা করেছিল বলেই তারা রাজাকার। সেই রাজাকারদের পুনর্বাসনকারী, সমর্থনকারী, মদদদানকারী বিএনপি -ও একইভাবে রাজাকারগোত্রীয়।

যৌক্তিকভাবে-রাষ্ট্রীয়ভাবে-রাজনৈতিকভাবে বিএনপি’র এই আচরণ রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল। জামাতের নেতাদের বিচার, জামাতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি জাতিকে বিএনপি’র বিষয়েও কড়া অবস্থান নিতে হবে।

যুদ্ধাপরাধীদের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা এই রাজনৈতিক সংগঠনটির বিরুদ্ধেও অনুরূপ ঘৃণা প্রকাশ ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী।

টাইম ফর এ্যকশন!