ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

মাননীয় ট্রাইব্যুনাল, ৩৪৪ জনকে হত্যার ঘটনাকে এ জাতি গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করে। ১১ বছরের মেয়েকে ধর্ষণের ঘটনাকে ঘৃণার চোখে দেখে। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল কোন অপরাধকে কিভাবে মাপতোল করে তা নিয়ে বাংলাদেশে আজ দ্বিধান্বিত। ঘৃণ্য অপরাধ ধর্ষণের শাস্তি যাবজ্জীবন! গণহত্যার মত মানবতা বিরোধী অপরাধের শাস্তি যাবজ্জীবন! আর কতগুলো হত্যাযজ্ঞ চালালে রাজাকার কাদের মোল্লার সর্বোচচ শাস্তিদণ্ড হত? ৫০০? ৬০০? লাখ খানেক? কিংবা ততোধিক লাশ ৭১’কে আরো রক্তাক্ত করে তুললে তবেই মানবতা বিরোধী ট্রাইব্যুনালের গোচরে রাজাকার কসাই কাদের মোল্লার অপরাধ অমার্জনীয় হত?

মাননীয় ট্রাইব্যুনাল, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শাস্তি এখনও মৃত্যুদণ্ড। রাজাকার কাদের মোল্লার গুরু অপরাধের তালিকা আর তার সাক্ষী-প্রমাণ বর্ণনা পুরো জাতিকে ধারণা দিয়েছিল এমন পাশবিকতা ক্ষমাহীন। বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির রায় ট্রাইব্যুনালের প্রতি আস্থা তৈরী করেছিল। যে অপরাধে বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসি হতে পারে, সেই অপরাধে কসাই মোল্লার যাবজ্জীবন কী করে হয়? এই স্ববিরোধীতা কিসের আলামত? ট্রাইব্যুনাল কী ভীত? ট্রাইব্যুনাল কী বিব্রত? অথচ জনগণ তো সার্বিকভাবে ট্রাইব্যুনালের দিকে হেলে ছিল তখনও যখন আন্তর্জাতিক চক্রান্ত হয়েছিল ট্রাইব্যুনালকে হেয় প্রতিপন্ন করতে। যখন বিরোধীদল ক্রমাগত তারস্বরে চিৎকার করেছে, একটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ট্রাইব্যুনালের জন্য, স্বচ্ছতার জন্য, তখনও জাতি ট্রাইব্যুনালের পাশে সটান দাঁড়িয়ে ছিল প্রশ্নাতীতভাবে। কিন্তু এই ট্রাইব্যুনাল কী জাতির আশাআকাঙ্খা-দাবির প্রতি দৃষ্টিপাত করেছে? কাদের মোল্লার মত একজন যুদ্ধাপরাধীর অপরাধের মাত্রাকে সঠিকভাবে ধর্তব্যে এনেছে?

মাননীয় ট্রাইব্যুনাল, কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড – একজন যুদ্ধাপরাধীর অপরাধের প্রতি এই নমনীয়তা ট্রাইব্যুনালকে দাঁড় করিয়ে দিল আজ জনতার আদালতে। সরকারের প্রতি জনগণের যে সমর্থন গড়ে উঠছিল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাস্তবায়নে, এক ঝটকায় সেই সম্পর্ক বিভ্রান্ত হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ঘোষিত কাদের মোল্লার জন্য এই রায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অবমূল্যায়ন। স্বজন-হারানোদের সাথে বেঈমানি। জাতি আজ অপমানিত। আর তাই ক্ষোভের সঞ্চারণ স্ফুলিঙ্গের মত ছড়িয়ে পড়েছে গণমাধ্যমে, ওয়েবস্ফিয়ারে, রাজপথে – এ রায় মানি না!

মাননীয় ট্রাইব্যুনাল, জাতি চাইলে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলতে পারত স্বীকৃত যুদ্ধাপরাধীদের। কিন্তু বছরের পর বছর জাতি অশ্রুজল জমিয়েছে। শোককে পুঞ্জিভূত করেছে এই ভেবে একদিন এই নরপিশাচদের সাজা হবে বাংলার মাটিতে। জাহানারা ইমাম প্রতীকী পথে বিচার কার্য দেখিয়ে গিয়েছিলেন। এই ট্রাইব্যুনালকে তারই বাস্তবায়ন ভেবেছিল জাতি। কিন্তু আজ জাহানারা ইমামকে অপমানিত করল এই রায়

মাননীয় ট্রাইব্যুনাল, জল্লাদ কাদের মোল্লা এক দেশদ্রোহীর নাম। এই লোক ৭১ সালে উল্লাস করে বলেছিল-

‘গালি গালি মে শোর হে, শেখ মুজিব পাকিস্তানকা দুশমন হে গাদ্দার হে’ স্লোগান দিতে থাকে। তাদের আর একটি স্লোগান ছিল, কাহা তেরা বাংলাদেশ দেখ এবার ধামাকা দেখ, তামাশা দেখ

সূত্র: মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল হক মামার সাক্ষ্য

এই পৈশাচিক দেশদ্রোহীর শাস্তি মাত্র যাবজ্জীবন কারাদণ্ড?

মাননীয় ট্রাইব্যুনাল, নিয়াজী’র পেছনের ওই লোকটা কিন্তু কাদের মোল্লাই।

মাননীয় ট্রাইব্যুনাল, পৈশাচিকতার নমূনাগুলো যদি গোচরীভূত না হয়ে থাকে, তবে আবারো পড়ে নিন কী করে হত্যা করা হয়েছিল কবি মেহেরুন্নেসাকে, পল্লবকে –

ওরা ভাই ও মাসহ কবি মেহেরুন্নেসাকে টুকরো টুকরো করে কেটে হত্যা করেছে। মিরপুরের নূর ডেকারেটরের ভেতরে এর মালিক নূর হোসেনের পরিবারের সদস্যদেরও একই কায়দায় হত্যা করে। নূর হোসেনের ৮০ বছরের বৃদ্ধা শাশুড়ি, যিনি নড়তে চড়তে পারতেন না, তিনিও এসব নরপশুর নৃশংসতা থেকে রেহাই পাননি। হাতের আঙুল কেটে, নির্মম নির্যাতন চালিয়ে এরা তারপর গুলি করে হত্যা করে কলেজছাত্র পল্লবকে।

২৯ মার্চ ঢাকার ঠাটারিবাজার (কাপ্তান বাজার) থেকে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে আন্দোলন করার অপরাধে পল্লব ওরফে টুনটুনিকে ধরে আনা হয় মিরপুর ১২ নাম্বারের মুসলিমবাজার নামক স্থানে। সেখানে প্রথম তার আঙ্গুল কাটা হয়। পরে তাকে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে নির্মম ও পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয়।

সূত্র: মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল হক মামার সাক্ষ্য [বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম]

মাননীয় ট্রাইব্যুনাল, কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে অন্যতম সাক্ষী মুক্তিযোদ্ধা মামা বাহিনীর প্রধান ও কমান্ডার শহিদুল হক খান মামা আজ অশ্রুসিক্ত। এই অশ্রুর দায় কী ট্রাইব্যুনাল নেবে?

মাননীয় ট্রাইব্যুনাল, যে লোকটি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে নগ্নপায়ে দিনযাপন করেছিল বছরের পর বছর, তারপর প্রত্যাশা পূরণের আভাস পেয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রতি আস্থা রেখে পদযুগলে চপ্পল ধারণ করে দাঁড়িয়েছিল, সে কি পুনরায় অবনত মস্তকে, ঝুঁকে যাওয়া মেরুদণ্ডে খালি পায়ে পথে পথে ঘুরবে? ক্ষতবিক্ষত করবে পায়ের তলাকে আবারো? এই যন্ত্রণার দায় কোন ট্রাইব্যুনাল নেবে? এই ক্ষত কোন ট্রাইব্যুনাল সারাবে?

মাননীয় ট্রাইব্যুনাল, পৃথিবীর কোনো দেশে, যেখানে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে, সেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তির সমর্থনে, দলের সমর্থনে কোন ধরণের প্রকাশ্য প্রচারণা চালানোর রেওয়াজ ছিল না। অথচ আমরা গণতন্ত্রের নামে যুদ্ধাপরাধী দলের সকল সুযোগ-সুবিধা বলবত রেখেছি। এ বস্তুত গণতন্ত্রকে খেলো করে দেয়া। গণতন্ত্রকে নিয়ে মস্করা করা। এই ট্রাইব্যুনাল কি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে যুদ্ধাপরাধী দলের সকল প্রকার রাজনৈতিক কার্যক্রম বাতিলের জন্যে একটি নির্দেশ জারি করতে পারত না?

মাননীয় ট্রাইব্যুনাল, বাচ্চু রাজাকার আর জল্লাদ মোল্লার জন্য দু’রকমের রায় ঘোষনার সমীকরণ জনতা বুঝতে অপারগ। কার উপর ট্রাইব্যুনাল বৈরী ছিল? কার উপর ট্রাইব্যুনাল নমনীয় ছিল? এই ব্যাখ্যা কি জনগণ প্রত্যাশা করতে পারে?

মাননীয় ট্রাইব্যুনাল, জামাতের আগ্রাসী মনোভাবে রায় পালটে যাচ্ছে না তো? অথচ তা কেন হবে! জনসমর্থন যার সাথে থাকে তার আর কিসের ভয়? জামাতের হুমকি, জ্বালাও-পোড়াওয়ে জনজীবন সাময়িক বিব্রত হতে পারে, কিন্তু কই, কেউ তো বিচারের দাবি থেকে-সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি থেকে বিচ্যুত হয়নি এতটুকু!

মাননীয় ট্রাইব্যুনাল, তবে কি ভুল হয়েছিল জনতারই এতটা আত্মবিশ্বাস রাখা ট্রাইব্যুনালের উপর? সরকারের উপর? যদি ভুল হয়ে থাকে তবে জনতা সে ভুল শোধরাতেও জানে। ঘরে বসে থাকবে না জনতা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জামাতকে ঠেকাতে পারে না। জনগণ সরকারের আর ট্রাইব্যুনালের হাতে দায়িত্বভার তুলে দিয়ে প্রতিদানে টালমাটাল ব্যবস্থাপনা দেখতে পাচ্ছে। আর তাই, এবার যুদ্ধাপরাধীদের প্রতিহত করবে জনতাই। রাজপথে জামাত-শিবির নয়, দাঁড়াব আমরাই।

মাননীয় ট্রাইব্যুনাল, জনতাই সর্বেসর্বা। তাই জাহানারা ইমামের জনতার আদালত পুন:গঠন হবে প্রয়োজনে। ফাঁসি হবে রাজাকার কাদের মোল্লার। ফাঁসি হবে দেলু রাজাকারের। ফাঁসি হবে গোলাম আযমের। জনতাকে কে রুখবে? ফাঁসির দাবিতে জনতা রাজপথে। যুদ্ধাপরাধীদের মাফ নেই। সর্বোচ্চ শাস্তি হবে.. হতেই হবে।

মাননীয় ট্রাইব্যুনাল, শুনে দেখুন জনতা কী বলছে …

ধর ধর রে ধর রে ধর, রাজাকার রে রাজাকার…!
[https://www.youtube.com/watch?v=HxTvLj1iUBM&list=UU4OnHuX-9-UqVUMutgP_ikw]

রায়ে ক্ষুব্দ সাক্ষীরাও, আপিল চান [বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম]