ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

জিনিয়ার পোস্টে (প্রকাশিত: বুধবার ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, সন্ধ্যা ৬:২৬) ব্লগারদের আহবান এবং সিদ্ধান্ত ছিল খুব স্পষ্ট – চলুন যাই- প্রতিবাদ হবে আলুব্দি গ্রামে, কসাই কাদেরের ফাঁসি চাই। ব্লগার নীলকণ্ঠ জয় যোগাযোগের দায়িত্ব নিয়েছিল। বিশাল প্রস্তুতি নেয়ার সুযোগ কম ছিল, তবু নীলকণ্ঠ জয় মোটা মোটা হরফে লিখে ফেলেছিল অসংখ্য ঝাঁঝালো স্লোগানের পোস্টার। সবাই সবার সাথে যোগাযোগ করে নিয়ে তৈরী হয়ে গেল পল্লবীর আলুব্দি গ্রামবাসীর কাছে ক্ষমা চাইতে।

আলুব্দি গ্রাম হলো পল্লবীর সেই গ্রাম যেখানে হত্যাযজ্ঞ চলেছিল কাদের মোল্লার নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে। এই সেই গ্রাম যা পাকিস্তানি সেনারা ঘিরে ফেলেছিল। তারপর ঘরে ঘরে গিয়ে গুলি করেছিল। সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করেছিল। যে কাদের মোল্লার নেতৃত্বে, উস্কানিতে এই যুদ্ধাপরাধ হলো, তার রায় হল কেবল যাবজ্জীবন! এ যেন আলুব্দিবাসীর চোখের জলের সাথে উপহাস! আর তাই জাতি লজ্জিত আলুব্দিবাসীর কাছে। জাতির সেই লজ্জার কথা জানাতেই আলুব্দিগ্রামে ব্লগারদের প্রতিবাদ সমাবেশ। হল শুক্রবার, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখ।

একটা দীর্ঘ সরু গলি পেরিয়ে একটা মাঠে পৌঁছেছিল ব্লগাররা। কোন একটা কিছু কিনতে দোকানে যেতে হলে আবার সেই গলি দিয়ে বেরুতে হবে। ব্লগারদের অনেকেই জানতো না আলুব্দি গ্রামের ভেতরে গলির ভেতর এত এত ঘর থাকতে পারে! আলুব্দি গ্রাম- এই সেই গ্রাম যেখানে তাণ্ডব চালিয়েছিল রাজাকার-কসাই-জল্লাদ কাদের মোল্লা।

মাঠে পৌঁছে ব্লগারদের ব্যানার-পোস্টার এর খবর ছড়িয়ে পরে দ্রুত। একজন অসুস্থ বৃদ্ধা ছুটে এসেছিলেন, ব্লগারদের জানালেন, পাকবাহিনী এসেছিল। রাজাকাররা আগুন দিয়েছিল। ঘরে ঘরে গিয়ে গুলি করা করেছিল। আর রক্তে মাখা লাশগুলো কূয়ার মধ্যে ফেলে দিত জল্লাদ বাহিনী…!

অসুস্থ এই বৃদ্ধা ব্লগারদের কাছে ছুটে এসেছিলেন এই কথা বলার জন্য যে তিনিও চান কাদের মোল্লার ফাঁসি হোক

কাদের মোল্লার কুশপুত্তলিকা বানানোর জন্য খড় প্রয়োজন ছিল। সামনেই বাড়িগুলোর বেড়া ছিল খড়ের। কিন্তু সেটা নেয়া ঠিক হবে কিনা এটাই ছিল ব্লগারদের অসস্তি। আলুব্দি গ্রামবাসীরা বেড়া থেকে খড় খুলে এনে দিল ব্লগারদের হাতে…। ব্লগার মজিবর খড় মুড়িয়ে তৈরী করে ফেললেন একটি কুশপুত্তলিকা। ফাঁসির জন্য আরো মোটা দড়ি প্রয়োজন পড়ল। গ্রামবাসীকে বলা হল, গরু বাঁধার কোন দড়ি নেই? কিছুক্ষণের মধ্যে মোটা-লম্বা একটা দড়ি চলে এল…রাজাকারকে জুতা মারতে প্রস্তুত তো সবাই? বলা মাত্রই স্যান্ডেল ছোঁড়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল …

কাদের মোল্লার কুশপুত্তলিকা বানানো হচ্ছে

কাজের সহায়তার জন্য এই শাবলটি ব্লগারদের এনে দিয়েছিল গ্রামবাসী

এই বাঁশটিও এনে দিয়েছিল গ্রামবাসী

গ্রামের মাঠে চারিদিকে বিছানো ছিল অসংখ্য পোস্টার। আলুব্দি গ্রামবাসীর ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা স্কুলে যায়, পড়াশোনা করে। আলুব্দির মাটিতে বিছিয়ে রাখা প্রতিটি প্ল্যাকার্ড ওরা জোরে জোরে পড়েছে…গগণ বিদারী চিৎকার করে বলেছে ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই, রাজাকারের ফাঁসি চাই…!সেদিন গ্রামবাসীর সাথে মুষ্টিবদ্ধ হাতে স্লোগান দিয়েছিল ব্লগার জুলফিকার জুবায়ের, ব্লগার বাংলাভুত০০৭, ব্লগার সুকান্ত কুমার সাহা। ব্লগারদের সাথে ওরাও মমতা নিয়ে গেয়েছে আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি…!

আলুব্দি গ্রাম ঘেঁষা মাঠে জাতীয় পতাকা উড়িয়েছি ব্লগাররা

শরীরে এখনো একাত্তরের গুলির আঁচড়..

আলুব্দি গ্রামের সুফিয়া খাতুন মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন। তবে আজ যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে, এই তথ্য তার জানা নেই। সুফিয়ার খাতুন বঙ্গবন্ধুকে মনে করে বলেন,

যখন স্বাধীন হইল.. মজিবর রহমান যে আমাগো নিল গাড়ি ভইরা.. আমাগো গেরামের লোক.. হেই গাড়িটা নিয়া মজিবর রহমান এইভাবে দেইখা তার বাদে কানবার লাগল…বলে, ইশশ! আমার জনগণ কিসু থয় নাই!… এক্কেরে যাগো যাগো ক্ষতি করসে তাগো সবাইরে লইসে গাড়ি ভইরা… হেই সময় মজিবর রহমান কইছে যে, আমি ক্ষতিপূরণ দিয়া পারুম, কিন্তু আমি তো লোকজন দিয়া পারুম না… দুগা-উগা লোক মারসে..!

হে আলুব্দিগ্রামবাসী, আমরা লজ্জিত, আমরা দু:খিত

সুফিয়া খাতুন পুরনো ক্ষোভ চারণ করেন এভাবে,

স্বান্তনা? স্বান্তনা পামু কী দিয়া? ছেলে সন্তান গ্যাছে গা, আবার স্বান্তনা পামু কী দিয়া… বাড়িঘর সব গ্যাছে গা… আবার স্বান্তনা পামু কইত্থিকা.. আইয়া..দেশ স্বাধীন হইল মতন তখন ওই যে ভিটার মধ্যে ছাপড়া তুইল্যা রইলাম, বিন্না দিয়া.. তিরপাল তো লইয়াই গেছিল লুট কইরা…

জ্বলে উঠছে মোমের প্রতিবাদী শিখা

মোমের আলো উজ্জল থেকে উজ্জলতর হচ্ছিল সন্ধ্যা ঘনীভূত হতে হতে। সেই সাথে তীব্র হচ্ছিল গ্রামবাসীদের উত্তেজনা, স্লোগান, ক্ষোভ। ওরা তীব্র উত্তেজতায়, তীব্র ঘৃণায় কুশপুত্তলিকাকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করেছিল…এই ছিল কাদের মোল্লার কুশপুত্তলিকার অন্তিম পরিণতি আলুব্দির মাটিতে…

ফাঁসিকাষ্ঠে কাদের মোল্লার কুশপুত্তলিকা

আইন সংশোধন হয়েছে, বিচার পুনরায় নিরীক্ষণ হবে… কাদের মোল্লার ফাঁসি হবেই এবার…