ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

কেবলমাত্র পাকিস্তানেই জাতীয় পতাকার অবমাননা বিষয়ক আইনি ধারা সুষ্পষ্ট নয় বলে জানি। এছাড়া বহির্বিশ্বে জাতীয় পতাকার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, ভাবগাম্ভীর্য অক্ষুণ্ন রাখতে সুনির্দিষ্ট আইন ও শাস্তির বিধান রয়েছে। ভারতের জাতীয় পতাকা ব্যবহার বিধি কঠোর বলেই মানেন অনেকে। ভারতীয় ক্রিকেটার শচীন টেণ্ডুলকারের জন্মদিনের কেক তাদের জাতীয় পতাকার মতো তেরঙা ছিল বলে তাঁর বিরুদ্ধে পতাকা অবমাননার অভিযোগ উঠেছিল। বাদ যাননি অন্য সেলিব্রিটিরাও। একজনের পতাকা-রঙা শাড়ির পাড় পা ছুঁই ছুঁই করেছিল বলে বিষয়টা আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। খেলার সময় পরিধেয় তাঁর হেলমেটে বিসিসিআই লেখার পর জাতীয় পতাকা অঙ্কিত ছিল বলে শচীন টেণ্ডুলকার আরও একবার পতাকার অসন্মানের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। এ জন্য তাঁকে তাঁর হেলমেটে প্রথমে জাতীয় পতাকা এঁকে তার নিচে বিসিসিআই শব্দটি লিখতে হয়েছিল।

সাধারণত এ ধরনের আচরণের পেছনে ব্যক্তির কু-উদ্দেশ্য কাজ না করলেও, তার অজ্ঞতাবশত অবমাননাকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। কখনও কখনও মানুষ দেশপ্রেমে উদ্বেল হয়েও পতাকার অবমাননা করতে পারে। বস্তুত প্রতিটি দেশের জাতীয় পতাকার ব্যবহারবিধি পতাকা ব্যবহারের আচরণবিধিগুলোকে সংজ্ঞায়িত করে তা অগ্রাহ্য করার শাস্তি নির্ধারণ করে দেয়।

আইনি পদ্ধতিতে জাতীয় পতাকার মর্যাদা সুরক্ষায় ভারতের চেয়ে চীন আরও কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় সেখানকার আইনে আটকাদেশ, তিন বছরের জেল-জরিমানা ছাড়াও ব্যক্তির রাজনৈতিক অধিকার খর্ব হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফিনল্যান্ড, জার্মানি ও ডেনমার্কে জাতীয় পতাকার অবমাননা অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যদি ইচ্ছাকৃতভাবে এ ধরনের সংবিধান লঙ্ঘনকারী কর্মকাণ্ড কেউ করে, তবে শাস্তির মেয়াদ বেড়ে যায়। আরব বিশ্বের অনেক দেশেই জাতীয় পতাকায় ইসলামিক স্বাক্ষর রয়েছে। ইরানের পতাকায় ’আল্লাহু আকবর’ লিখিত আছে, আর সৌদি পতাকায় রয়েছে ইসলামি বিশ্বাস বাণী। এসব দেশে জাতীয় পতাকার মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এবং এর ন্যূনতম অবমাননা মূলত ইসলাম ধর্মের অবমাননার সামিল বলে বিবেচিত হয়।

লাল-সুবজ পতাকা হৃদয়ে ধারণ করে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর জন্ম নিয়েছিল বাংলাদেশ। ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিল এ দেশেরই মানুষ। নয় মাসের যুদ্ধে দেশ স্বাধীন করে আপন অস্তিত্ব, অধিকার, চেতনা ও মূল্যবোধ বিশ্ববাসীর কাছে ছড়িয়ে দিয়েছিল এ দেশই। ৩০ লাখ শহীদের রক্তে রাঙা আর নির্যাতিত ৪ লাখ মা-বোনকে জড়িয়ে রাখা বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা আমাদের অর্জন, আমাদের গর্ব, আমাদের অহঙ্কার। এ পতাকার ছায়াতলে আমরা বারবার একত্রিত হই। মিছিল করি পতাকা হাতে। প্রজন্মান্তরে সঁপে দিই এ পতাকা- এ আশ্বাসে যে, নতুন প্রজন্মই সমুন্নত রাখবে আমাদের বিজয়, আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের একাত্তর। এর অবমাননা মানে জাতির হৃদস্পন্দন থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। জাতীয় পতাকার অসম্মানের অর্থ বাংলাদেশের জন্মইতিহাস উপেক্ষা করা। আজ সে ধৃষ্টতাই দেখিয়েছে অপশক্তির ধারকরা।

জাতীয় পতাকার প্রতি গর্হিত অবমাননামূলক আচরণের তালিকায় রয়েছে পতাকা পোড়ানো, পদদলিত করা, ছিঁড়ে ফেলা, কেটে ফেলার মতো উগ্রতা। আর এ চিত্রই এখন ভাসছে জাতির সামনে– জাতীয় পতাকার অর্ধেক ছেঁড়া অংশ। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র কথা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে জনতার কানে – ’জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরোনো শকুন।’ প্রকাশ্যে যারা জাতীয় পতাকার অবমাননা করেছে, তারা একই সঙ্গে রাষ্ট্রবিরোধিতার অশনিসঙ্কেত দিয়ে গেছে। জনতা এ সঙ্কেত সম্পর্কে ওয়াকেবহাল, রাষ্ট্রকেও উপলব্ধি করতে হবে জনতার মতো করে। রাষ্ট্রকে চিহ্নিত করতে হবে জাতীয় পতাকার অবমাননাকারী এ অপরাধী গোষ্ঠীকে।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে, ১৯৭২ সালে পতাকা আইন করা হয়েছিল। ২০১০ সালের জুলাই মাসে আইনটি সংশোধিত হয়, যার পেছনে মূল পর্যবেক্ষণ ছিল বিশেষত নাগরিকদের অজ্ঞতার কারণে জাতীয় পতাকার অবমাননা। সংশোধনীতে সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত শাস্তি এবং ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়। না জেনে, না বুঝে আর অতি-উচ্ছ্বাসে যারা পতাকার ব্যবহারবিধি লংঘন করেন, তাদের অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে এ শাস্তিবিধান যথাযথ হতে পারে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি বাণিজ্যিক প্রচারণায়, বিজ্ঞাপনে জাতীয় পতাকার ব্যবহার বিধিবহির্ভূতভাবে করে থাকে, সে জন্য ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড ন্যায়সঙ্গত নয়। অপরাধের মাত্রা ভেদে অর্থদণ্ডের পরিমাণ বৃদ্ধি করার আইনি বিষয়টি রাষ্ট্র বিবেচনায় আনতে পারে।

বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা আইনে পতাকার প্রতি যে কোনো গর্হিত আচরণকে কীভাবে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে, তা সরকারকে খতিয়ে দেখতে হবে। কোনো গোষ্ঠী, সংগঠন বা রাজনৈতিক দল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও পরিকল্পিতভাবে দেশে অরাজকতা বা অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য জাতীয় পতাকার অসম্মান করলে একে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া, অভিযোগ দাখিল করা ও অভিযোগের অংশে রাষ্ট্রবিরোধিতামূলক আচরণ হিসেবে উল্লেখ করা জরুরি। প্রয়োজনে এসব গোষ্ঠীর নাগরিক-সামাজিক-প্রাতিষ্ঠানিক-রাজনৈতিক অধিকার রহিত করতে সরকারকে ‍পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে জড়িত সর্বোচ্চ সম্মানিত স্থাপনাগুলোতে (যেমন শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ) উস্কানিমূলক, অবমাননাকর, হেয়প্রতিপন্নকারী অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় চেতনা ও স্বাধীনতার পরিপন্থী আচরণের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। স্বাধীনতাবিরোধীদের দ্বারা পতাকা অবমাননার বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি অভিযোগ দাখিল করা হোক। পতাকা অবমাননার অভিযোগ উত্থাপন ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের বিলম্ব অবশ্যই অবহেলার সামিল হবে।

জনতা রাষ্ট্রের সঙ্গে আছে– তা সে ঘরে থাকুক কী কর্মক্ষেত্রে বা রাজপথে। জনতা শাহবাগ থেকে শুরু করে দেশজুড়ে পতাকা মিছিল করবে প্রয়োজনে। আসছে উত্তাল মার্চে শহরের প্রতিটি বাড়ির ছাদে, গ্রামের উঠোনে উঠোনে, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে বিজয়ের লাল-সবুজ নিশান উড়বে পত পত করে। প্রয়োজনে ’বিজয় ফুল’ বুকে ধারণ করে জীবিকার কাজ করে যাবে সবাই। এটা হবে আমাদের নিরব ও সরব প্রতিবাদ। এই হবে জাতীয় পতাকার প্রতি আমাদের উৎসর্গিত সম্মান। ’আমাদের পতাকা, আমাদের মান, সত্য, সুন্দর, বিজয় নিশান।’

এ বিজয় নিশান হাতে অগ্রসরমান জাতিকে, বুকে লাল-সবুজ লালন করা জনতাকে রুখবে কে?

***
লেখাটি প্রথম প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারী ২৪, ২০১৩, http://opinion.bdnews24.com