ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

ফেব্রুয়ারি ২০১৪। অমর একুশে গ্রন্থমেলায় শব্দশৈলী’র স্টলে লেখক হিসেবে বসে পাঠক মনস্তত্ব জরিপ করার সুযোগ ঘটেছিল। শিশু-কিশোর-তরুণ-অগ্রজদের আগ্রহভরে রকমারি প্রজাতির বইয়ের পাতা উল্টাতে দেখেছি । লম্বা পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি লেবাসে কিছু তরুণদের দেখে বুঝে নেয়া যায় এরা মাদ্রাসা শিক্ষার্থী। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা স্টলে বিশেষ কোন ধরনের বইয়ের ফরমায়েশ রাখেন কিনা তা  জানার আকাঙ্খা ছিল। আমাকে অবাক করে আর সবার মতই মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা হাতে নিয়েছে, উল্টে দেখেছে স্টলে সাজিয়ে রাখা  সব ধরনের বই।  এক মাদ্রাসা শিক্ষার্থী যখন রবি শংকর মৈত্রীর কাব্যগ্রন্থ হাতে নিয়ে কয়েক পাতা পড়ে দেখেন, তখন আস্বস্ত হই, আমাদের সাহিত্যানুরাগ অদমনীয় এবং কবিকে কোন ধর্ম দিয়ে নিরূপন করি না আমরা। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন এমন আবৃত্তিকার দেখেছি। দেখেছি ধর্মে অনুরাগী উদারমনা সংস্কৃতকর্মী। আমরা জাতি হিসেবে অসাম্প্রদায়িক। আমাদের ধর্ম যার যার, কিন্তু আমাদের ইতিহাস, অর্জন, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, উৎসব এসবই গোষ্ঠি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার। এই শিক্ষা পরিণত বয়সে নয়, শিশু তার জন্মের পরবর্তী ধাপ থেকেই পরিবার, গুরুজন, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রব্যবস্থাপনা থেকে লাভ করবে।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের ভূমিকা রয়েছে পাঠসূচী প্রণয়নে ও আধুনিকিকায়নে। সরকার কর্তৃক হালের উদ্যোগ হচ্ছে মাদ্রাসা পাঠ্যসূচী সংস্করণ। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, চাকরি সহ অপরাপর প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্রে সমপর্যায়ের সুযোগ নিশ্চিতে এই সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী। তবে একটি শীর্ষ জাতীয় দৈনিকে এই পাঠ্যসূচী হালনাগাদ নিয়ে গত ১০ এপ্রিল যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে তা পাঠপূর্বক কোন সচেতন, সংস্কৃতিমনা এবং দায়িত্বশীল নাগরিক ভ্রুকুটি না করে পারেন না।

বাংলা সংস্কৃতির দর্শনকে প্রাজ্ঞতা দিয়েছে লালন। ধর্মীয় অন্ধতায় লালনকে অস্বীকার করার প্রবণতা সংস্কৃতির প্রতি হুমকি এবং সাম্প্রদায়িকতার গোড়াপত্তনের নিদর্শন। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা লালনের ’মানবধর্ম’ পাঠে কেন বঞ্চিত হবে?  বিপ্রদাশ বড়ুয়া, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় আর জ্ঞানদাশের রচনা যদি কেবল তাদের ভিন্ন ধর্মীয় পরিচয়ের  কারণে পাঠ্যসূচী থেকে কর্তিত হয়, তবে বর্তমান বিশ্বে ’রাষ্ট্রীয় রেসিজিম’ এর এমন দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত বিরল হবে।  রাষ্ট্রীয় তত্বাবধানে এ ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত জাতির জন্য লজ্জাকর।

মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা যদিও পাঠ্যবই থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িত ’কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ জানবে, কিন্তু কমিটি মোতাবেক জর্জ হ্যারিসনের গিটার হাতের ছবি বিযুক্ত হবে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য প্রস্তাবিত পাঠ্য থেকে।  যদিও মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ’তৈলচিত্রের ভূত’ শেষাবধি ’তৈলচিত্রের আছর’ হচ্ছে না, তথাপি নাম পরিবর্তনের এই চিন্তাধারাটিই মূলত কট্টরবাদীতার নমূনা। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ’মংডুর পথ’ পড়ানো হবে না, পড়ানো হবে না ’ব্রতচারী নৃত্য‘।  পরিমার্জনা এখানেই থেমে থাকেনি। তৃতীয় শ্রেণীর বাংলা বইয়ে হাফপ্যান্ট পরিহিত বালক আর কিশোরীর শাপলা ফুল তোলার যে আবমানকালের গ্রাম্য কৈশোরচিত্র, তার সাথে পরিচিতি ঘটবে না মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের। পঞ্চম শ্রেণীর বইয়ের প্রচ্ছদে কলসি কাঁখে ঘোমটা দেয়া গাঁয়ের বধুর ঘাড়ের পাশ দিয়ে  সাবলীলভাবে সামান্য অনাবৃত পিঠও নজরে এড়ায়নি স্টিয়ারিং কমিটির। ঢেকে যাবে গাঁয়ের বধুর পিঠ, হিজাব পড়বে শাপলা তোলা বালিকা, পাজামা পড়বে বালক।

এই বাস্তবতা বিবর্জিত ‘কানামাছি পাঠ্যসূচী’ প্রণয়ন করে কোমলমতি শিশুদের কোন নৈতিক আদর্শে দীক্ষিত করা হবে তার দায়িত্বশীল ব্যাখ্যা কর্তৃপক্ষ দিতে পারবেন কি? যুক্তি দেখানো হচ্ছে, এই বিশেষ ধরনের পরিমার্জনা মাদ্রাসা উপযোগী, যা শুধুমাত্র মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযোজ্য। অথচ মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা ভিন্ন কোন ভূখণ্ডে নয়, বাস করে এই দেশের পরিমণ্ডলে। শতবর্ষের চিরায়ত বাংলার রূপকে অস্বীকার করে কোন শিক্ষায় বেড়ে উঠবে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা? এ পাঠ্যসূচী  জাতিগত সাংস্কৃতিক চেতনা বিভক্তির এক অশনিসংকেত।

কেবল চাকরি লাভই শিক্ষার উদ্দেশ্য নয়। মনস্তাত্তিক বিকাশ, চিন্তাজগতের প্রসারণের নিমিত্তেই শিক্ষা।  স্টিয়ারিং কমিটি যে বিশেষ ধারায় মাদ্রাসা পাঠ্যসূচীতে সংস্করণ আনছে, তাতে করে আগামীতে মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত হাজার-লাখ প্রজন্ম লালন-দর্শন জানবে না; মাদ্রাসা পাস করা তরুণটি প্রবল দেশপ্রেমে গিটার বাজানোর ভঙ্গিমায় গাইবে না জর্জ হ্যারিসনের ’বাংলাদেশ’ গানটি। একই দেশে সাংস্কৃতিক বিভাজনের এই সূত্রপাত এড়াতেই হবে আমাদের। এই স্টিয়ারিং কমিটিতে স্কুল-কলেজ এবং প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বিজ্ঞ শিক্ষকমণ্ডলীদের যুক্ত করার আহবান জানাই। শ্রদ্ধেয় জাফর ইকবাল স্যারের মত বিদগ্ধ শিক্ষকের মত গ্রহনেও স্টিয়ারি কমিটি উপকৃতই হবে। পাশাপাশি মাদ্রাসা পাঠ্যসূচী সংস্করণে গৃহিত পদ্ধতি নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনা হওয়া জরুরী। মাদ্রাসা পাঠ্যসূচীকে ঢেলে সাজাতে চাওয়া অবশ্যই সাধুবাদযোগ্য, তবে কমিটির বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ধর্মান্ধতাকে প্রনোদনা দিচ্ছে।  মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা প্রকৃত আলোর মুখ দেখুক, আর তা নিশ্চিতকরণের অনিবার্য দায় রাষ্ট্রযন্ত্রেরই।

****
প্রকাশিত হয়েছে: দৈনিক সমকাল, ১৭ এপ্রিল ২০১৪ (লিংক)
samakal_17April2014