ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

‘শোনো, একটা গল্প শোনাই সাতটি বীরের/অকুতোভয় বীরগাথা চির উচ্চ শিরের’, ইউটিউবে মেঘনাপাড় ধীবর বিদ্যানিকেতনের শিক্ষার্থীদের আবৃত্তির ভিডিও দেখে সঙ্গত কারণে আবেগতাড়িত হয়েছিলাম। ২০০৯ সালে লেখা আমার এই কবিতাটি আগ্রহভরে মেঘনাপাড়ের জেলেপাড়ার শিশুদের শিখিয়েছিলেন ব্লগার আজমান আন্দালিব। সুবিধাবঞ্চিত এই শিশুদের বাংলাদেশের ইতিহাসের এক টুকরো স্পর্শ দিতে চেয়েছিলেন এই ব্লগার। ব্লগার ইলিয়াছ চৌধুরী অনেকদিন ধরেই একাধারে বিভিন্ন ব্লগে লিখে আসছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণ তহবিলে আর্থিক অনুদান প্রদানে। লিখে চলেছিলেন ব্লগার নাহুয়াল মিথও। ব্লগার জাহিদ, ব্লগার জয়, ব্লগার মিথুন, ব্লগার মুজিবর, ব্লগার মোত্তালিব দরবারি আর প্রবাসী ব্লগার জিনিয়ার হাতে হাত রেখে আরও অনেক ব্লগারের অনুদান দ্রুতই একত্রিত হয়। ২০১২ সালের ১ ডিসেম্বরের কুয়াশা সকালে এই তরুণ ব্লগাররা পেঁৗছে গিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। ব্লগারদের পক্ষ থেকে দুটি স্মারক ইট কিনেছিল শহীদদের প্রতি পরম শ্রদ্ধায়।

1

কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবি নিয়ে সমগ্র জাতি যখন উত্তাল, ব্লগার জয়, ব্লগার মিথুন, ব্লগার মুজিবর তখন ছুটে গিয়েছিল মিরপুরের আলুব্দি গ্রামে। এই সেই গ্রাম, যেখানে কসাই কাদের ১৯৭১ সালে নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছিল। ব্লগাররা গ্রামবাসীর সহায়তায় কাদের মোল্লার কুশপুত্তলিকা বানায়। কসাই কাদেরের কুশপুত্তলিকা দাহ হয়। আর তার সঙ্গে চলতে থাকে কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে গ্রামবাসীর গগনবিদারী স্লোগান।

এসব তরুণ, আবেগপ্রবণ, মুক্তিযুদ্ধ না দেখা ব্লগারের মাথার ওপর সস্নেহে আশ্বাস জাগ্রত রেখেছেন সব সময় দুটি মানুষ_ কবি ও ব্লগার নাজনীন খলিল, কবি ও ব্লগার নুরুন্নাহার শিরীন। সশরীরে, ফোনে যখন যেভাবে সম্ভব সঙ্গে-কাছে-পাশে থেকে মনোবল জুগিয়েছেন এই দুই প্রিয় ব্যক্তিত্ব। কবি নুরুন্নাহার শিরীন আর কবি নাজনীন খলিলের ব্লগে একাত্তরকে জানা যায়, চেনা যায়, দেখা যায় তাদের অসংখ্য কবিতায়, স্মৃতিচারণে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলা ব্লগে তাদের লেখাগুলো ব্লগারদের সম্পদ।

সমকালে ২০১০ সালের ১২ ডিসেম্বর আমার একটি লেখা প্রকাশ হয়েছিল। লেখাটির প্রতিপাদ্যে আন্তর্জালে বীরশ্রেষ্ঠদের দিয়ে তথ্য বিভ্রাট নিরসনে আহ্বান ছিল ডিজিটালবান্ধব সরকার আর প্রজন্মের প্রতি। এই আলোচনার প্রেক্ষাপট মূলত উদূ্ভত হয়েছিল ব্লগ থেকেই। আমাদের অনিচ্ছাকৃত তথ্যবিভ্রাট আর স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির ইচ্ছাকৃত তথ্যবিকৃতি_ এই দুইয়ের মিশ্রণে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনলাইনে, ব্লগে, ফেসবুকে অনেক ভুল তথ্যের প্রচার হয়। বিজয়ের মাসের প্রারম্ভে এ বিষয়ে আজ আরেকবার সরকার, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানানোর সুযোগ করে নিতে হচ্ছে। পাশাপাশি আমরা যারা অনলাইনে লিখছি-পড়ছি, আমাদেরও প্রজ্ঞাবান হতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধে যারা অবদান রেখেছেন, তাদের আসলে ধর্ম-বর্ণ-জাতি পরিচয়ে আলাদা করে ভাবার অবকাশ নেই। আমাদের আজকের অস্তিত্বময়তার পেছনে এমন অসংখ্য বীর যোদ্ধা শ্র্রম, মেধা, দেশপ্রেম আর মানবতার স্বাক্ষর রেখেছেন। এমনই একজন ফাদার মারিনো রিগন। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্লগারস ফোরাম থেকে উদ্যোগ নিয়ে এই মানবসেবায় নিবেদিতপ্রাণ খ্রিস্ট সন্ন্যাসীকে ব্লগারস ফোরাম পদক ও সম্মাননা প্রদান করা হয়।

বাংলা ব্লগের আরেকটু গোড়ার দিকে ২০০৯ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ব্লগারদের সংগৃহীত দুই লক্ষাধিক গণস্বাক্ষর রচনা করেছিল এক ইতিহাস। দেশ-বিদেশের, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার বাংলা ভাষাভাষীরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখতে কতটা বদ্ধপরিকর তার শ্রমলব্ধ কিন্তু আন্তরিক নিদর্শন লিপিবদ্ধ করেছিল যেন ব্লগারদের সেই উদ্যোগ। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে, বাংলা ব্লগে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী-যুদ্ধাপরাধী-জামায়াত-শিবিরের মতো অপশক্তির বিরুদ্ধে দিনরাত এক করে জাগ্রত ছিল ব্লগাররা। কিবোর্ড চেপে চেপে লিখে চলেছিল অপশক্তি নির্মূলের শপথ।

বাংলা ব্লগে মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে যত গবেষণা, স্বাধীনতার চেতনাকে সশ্রদ্ধায় সমুন্নত রাখতে যত উদ্যোগ হয়েছে এ যাবৎ তা অভূতপূর্ব। আজ ২০১৩-এর শেষ প্রান্তে অগুনতি বাংলা ব্লগ, লাখ লাখ ব্লগার, কিন্তু সবার হৃদয়ে একটাই অনড় দাবি_ যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি। সব ব্লগারের চোখে একটাই স্বপ্ন, যুদ্ধাপরাধীমুক্ত, জামায়াত-শিবিরমুক্ত একটা সার্বভৌম ভূখণ্ড বাংলাদেশ। বাংলা ব্লগের ব্লগাররা এ জাতির লাল-সবুজ মাখা অতীত-বর্তমান আর ভবিষ্যৎ আগলে রাখে সবসময়। জাতীয় পতাকার ছায়াতলে ব্লগে-অনলাইনে-ফেসবুকে আর জনতার কাতারে সর্বদা সোনার বাংলাদেশ গড়ার শপথকে শানিত করে চলেছে ব্লগাররা।

*** *** ***
প্রকাশিত হয়েছে: দৈনিক সমকাল, ১ ডিসেম্বর ২০১৩