ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

এইবারের বার তাইলে আসলেই মোদি সরকার!

বস্তুত মোদি আমাকে আচমকা মনে করিয়ে দিয়েছে রাহুল গান্ধী আমার শৈশব-কৈশোর বেলার দুরন্ত ক্রাশ ছিল!!!

এইবার মোদি নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণায় কোন কার্পন্য করেনি। মোদি নিশ্চিত করেছে যে ঢাক সে পেটাচ্ছে, তার প্রতি বোল যেন ‘কোনে কোনে তাক সুনাই দে’। হয়েছেও তাই। যদিও কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর কিছু প্রতিশ্রুতিশীল নির্বাচনী বিজ্ঞাপন চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছে, কিন্তু সেটা মোদি’র বিজ্ঞাপনকে টপকাতে পারেনি।

রাহুল গান্ধীর বিজ্ঞাপনে তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ঝলক আছে। আগামিকে সমৃদ্ধ করার ওয়াদা আছে। মোদির বিজ্ঞাপন ছিল সরকারের বিরুদ্ধে জনগনকে উস্কে দেয়ার কৌশল। সোজা কথায় রাহুল গান্ধীর বিজ্ঞাপন আর্ট ফিল্ম, আর মোদি সেখানে নির্মাণ করেছে আবেদনময় বানিজ্যিক ঘরানার বিজ্ঞাপন। ফলে ‘জনতা মাফ নেহি কারেগি’ আর ‘আব কি বার মোদি সারকার’ এর মত বুলি পাবলিক সহজেই খেয়েছে যে কোন আইটেম সং এর মত। এই যেমন, আমি নিজেই রাত-দিন এক করে ঘরে চিৎকার করতাম ‘আব কি বার মোদি সারকার’… যদিও দৃষ্টি ছিল রাহুল গান্ধীর দিকেই…!!!

রাহুল গান্ধী এই রাজনীতির জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। যতটা ছিল প্রিয়াংকা গান্ধী। কিন্তু মায়ের ইচ্ছেতে হোক, দলীয় চাপে হোক রাহুল তার ব্যক্তিইচ্ছাকে (যতদূর জানা যায়, তার অতীত প্রেম ত্যাগ এবং আগামিতে সম্পর্কিত না হবার সংকল্প) দমিত করেই রাজনীতির রঙ্গযাত্রায় পদার্পন করেছেন।

২০০৪ সালে রাজনীতিতে অভিষেক ঘটে রাহুল গান্ধীর। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে চ্যানেলে তার প্রথম সাক্ষ্যাৎকার হচ্ছে ২০১৪ সালে। রাহুল গান্ধীকে প্রচার বিমুখ বলা যাবে না। তবে তার প্রচার-প্রচারণার কৌশল বর্তমান ঘরানার রাজনীতি থেকে ভিন্নতর। নিজেকে ‘সিরিয়াস পলিটিশিয়ান’ দাবি করা রাহুল গান্ধী ‘পেরিফেরাল’ স্তরের আলাপের চেয়ে মূলে হাত দিতে চান। যুব উন্নয়ন, নারী ক্ষমতায়ন, দুর্নীতি দমন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ সর্বোপরি বর্তমান ‘সিসটেম’ এর পরিবর্তন নিয়ে রাহুল গান্ধীর বিভিন্ন ফর্মুলা বোদ্ধাগণের কাছে প্রসংশিত। কিন্তু তারপরেও আজকের বাস্তবতা হলো মোদি অথবা এনডিএ নিরঙ্কুশ বিজয়প্রাপ্ত আর কংগ্রেস নির্বাচনী ফলাফলে হাবুডুবু খাচ্ছে।

কংগ্রেস এর হারকে অনেকেই রাহুল গান্ধীর ব্যর্থতা হিসেবে নিচ্ছেন। রাহুল গান্ধীর বদলে প্রিয়াংকা গান্ধীকে দলের ভার সামলাতে দিতে চাইছেন অনেকে এমন আলাপ বাতাসে বিস্তারিত। কিন্তু প্রিয়াংকা হাল ধরলেই কি আসলে কংগ্রেস নির্বাচনী বৈতরনী পার হতে পারতো ভালয় ভালয়?

প্রিয়াংকা এবং রাহুল – গান্ধী পরিবারের এই দুই উত্তরসূরী আচরণগত দিক থেকে অনেকটাই ভিন্ন। রাহুল যেখানে মোদির অনেক উস্কানিতে কুলুপ এঁটে থাকেন, প্রিয়াংকা সেখানে তিজস্বী সিংহির মত মুখিয়ে ওঠেন। চতুর মোদি, এই দুই ভাই-বোনের স্বভাব জানেন বলেই, রাহুলকে তাচ্ছিল্য করে ‘নবাবজাদা’ বললেও, প্রিয়াংকাকে সম্বোধন করেন নিজের কন্যা হিসেবে। এবং অবধারিতভাবে প্রিয়াংকা এর পাল্টা জবাব দেন।

কথা হল, প্রচলিত রাজনীতিতে, এই ধরনের অপ্রয়োজনীয় পাল্টাপাল্টি বক্তব্য রাজনীতির সভা, মাঠ আর মিডিয়াকে গরম করে। ফলে পাবলিকের মনোযোগ সেদিকেই প্রবাহিত হয় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই। রাহুলকে দিয়ে এভাবে চটজলদি মাঠ গরম না হলেও, প্রিয়াংকা রাজনীতির এই প্রচলিত ধরনে মানিয়ে নিতে সক্ষম এবং ডমিনেট করতেও সক্ষম।

তবুও, এ বিজয় আসলে মোদির ঝুলিতে যেতই। এই বয়সে মোদি নিজের সাথেই বাজি ধরেছিলেন যেন। কোন ফাকঁফোকড় রাখেননি বাজিমাৎ করে বাজি জেতায়। নিজের বৈবাহিক অবস্থা নিয়ে এত বছর নিশ্চুপ থাকা মোদি এবারই লিখিতভাবে স্বীকার করেছেন, সে তো এই নির্বাচনের স্বার্থেই।

এই বিজয় কেবল মোদির একার নয়। বস্তুত এবারের বিজয় মিডিয়ার। ভারতের সিংহভাগ মিডিয়ার নির্বাচনের পূর্বেই মোদিকেই সম্ভাব্য জয়ীরূপে হাজির করেছিল। এই মিডিয়াই নির্বাচনকালে মোদির ইমেইজ তৈরী করেছিল পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীরূপে।

যারা সুচিত্রা সেনের “আন্ধি” সিনেমাটি দেখেছেন, তাদের মনে থাকার কথা, সিনেমাটিতে দেখানো হয়েছিল, ভোটের আগে একটি দল কিভাবে পত্রিকায় ঢেলে অর্থ দিয়েছিল কেবলমাত্র ওই দলেরই খবর প্রথম পাতায় ছাপানোর জন্য। মোদিও এই পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। শোনা যায়, কোন পত্রিকায় পুরো প্রথম পাতা জুড়ে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন, যার জন্য নাকি ৫০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত খরচা করতে পিছপা হননি মোদি!

মোদির জয় আসলে রাজনীতির মাঠে মাত্রাতিরিক্ত বাজারি লেনদেনের জয়।

রাহুল এবং প্রিয়াংকা বয়সে এখন নবীণ। ধূসর চুল-দাঁড়ির সেয়ানা মোদিকে টেক্কা দেয়ার জন্য এইবারের নির্বাচন উপযুক্ত ছিল না তাই রাহুল কিংবা প্রিয়াংকার জন্য। কংগ্রেস সরকারের নিজস্ব গাফিলতিও দায়ি।

আর ভারত বা বাংলাদেশে এক অদ্ভূত ভোট ফর্মূলা আছে। একবার এই দল জিতলে, পরের বার ওই দল। এই ফর্মুলা কোন স্বাস্থ্যসম্মত ফর্মুলা বলে গ্রহণযোগ্য নয়, তবু এই ফর্মুলা বলেই ভারত-বাংলাদেশের নির্বাচনে পাল উড়েছে।

যা হোক, মোদি সরকার এরপর কী নীতিতে রাষ্ট্রপরিচালনা করে, এটা দেখার বিষয়। নয়তো খোদ মোদির বুলিই মোদিকে হয়ত দ্রুতই ধ্বনিত করতে হবে , “জানতা মাফ নেহি কারেগি” …