ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

সরকার শিগগিরই হাওর-জলাধার সংক্রান্ত একটি নীতিমালা প্রস্তাব করতে যাচ্ছে এমন আভাস পাওয়া গেছে সম্প্রতি। নীতিমালায় কী থাকছে তা নিশ্চিত নই, তবে নদীমাতৃক দেশরূপে পুনঃপ্রতিষ্ঠা পেতে নীতিমালাকে অবশ্যই নদী অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বুড়িগঙ্গাকে ঘিরে পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ে তোলা খুব বেশি দুরূহ হবে কি আমাদের পক্ষে? সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো যৌথভাবে ‘বুড়িগঙ্গা নগর’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নিতে পারে কি?
২৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব নদী দিবস। বিভিন্ন সংগঠনের আয়োজনে মুখর থাকে এ দিবস। এটি কোনো সরকারি ছুটির দিন নয়। অর্থাৎ কার্যদিবস, এদিন সাধারণত স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় স্বাভাবিক নিয়মেই পাঠদান হয়ে থাকে। বিশ্ব নদী দিবসকে কেবল সাংগঠনিক দিবস না করে শিক্ষার্থীদের মাঝেও নদী দিবসকে উপস্থাপন করলে, আগামীতে নদীপ্রেমী, নদী সচেতন প্রজন্ম পাবে জাতি। এদিন লোকালয়ের নিকটবর্তী নদীতে শিক্ষা সফরে যেতে পারে শিক্ষার্থীরা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে। সে সুযোগ যারা করে উঠতে পারবে না, তারা শিক্ষাঙ্গন মাঠে, নয়তো শ্রেণীকক্ষেই আয়োজন করতে পারে নদী উৎসব। যেখানে হয়তো নদী নিয়ে রচনা প্রতিযোগিতা হতে পারে। হতে পারে নদী নিয়ে কবিতা আবৃত্তি। নদী নিয়ে স্মৃতিচারণ। হতে পারে ভাটিয়ালি সুরের রেশ টেনে নদী সংস্কৃতি চর্চা।

এবার নদী দিবস এমন এক সময়ে এলো যখন দেশজুড়ে কেবল নদীভাঙনের খবর। অতিবর্ষণে প্লাবনের খবর। অধিক যাত্রী বহনের ফলে ডুবে যাওয়া লঞ্চের নদীর তীব্র স্রোতে তলিয়ে হারিয়ে যাওয়ার খবর। শীর্ণ নদীচিত্র এই তারিখে দেখা যাচ্ছে না, বরং নদী এখন প্রমত্তা। নদী এখন সর্বগ্রাসী। তবে আমরা জানি, এই ভারিবর্ষণ শেষ হলে নদী আবার শুকাবে। চর জাগবে। নতুন ক্ষেতিবাড়ি হবে। আর হবে কিছু অসাধুচক্র দ্বারা নদী দখল। আমাদের মানচিত্রের নদীগুলো একে একে শুষে নিচ্ছে এ দুর্বৃত্তায়ন।

প্রকৃতিচক্রে নদীহীনতা বড় আকারের ভারসাম্যহীনতা তৈরি করবে। কারণ নদীই পারে সাম্যতা রক্ষা করতে_ প্রাকৃতিক সাম্যতা, অর্থনৈতিক সাম্যতা, জীবনব্যবস্থায় সাম্যতা। এই প্রতিটি ক্ষেত্রই আবার রাজনীতির অঙ্গ। ‘নদী রাজনীতি’কে ইতিবাচক দিকে প্রবাহিত হতে দিতে চাই নদী গণতন্ত্রায়ন। নতুবা নদী অধিকার ফিরে পাওয়া সম্ভবপর নয়।

বৈশ্বিক পরিবেশবাদীরা ‘ওয়াটার ডেমোক্রেসি’ নিয়ে আন্দোলন করছে। এ আন্দোলনকে বৃহত্তর পরিসর দিতে পারে জলরাশির আধার নদী। ‘নদী গণতন্ত্র’ নিশ্চিত করতে পারে- (১) নদী প্রথমত প্রাকৃতিক সম্পদ, (২) প্রবাহিত নদী স্থানীয় জনপদের সম্পদ তথা সবার জন্য নদী, (৩) নদী প্রবাহে ন্যায্যতা ও সাম্যতা তথা সুষ্ঠু নদী শাসন, (৪) দূষণহীন নদী একটি মানবিক অধিকার, (৫) নদী নিরাপত্তা তথা নদী দুর্বৃত্তায়ন রোধে আইনি ব্যবস্থা ও (৬) নদী সংরক্ষণ।
রাষ্ট্রীয়ভাবে সরকার ও জনগণের মিলিত প্রচেষ্টাতেই নদী গণতন্ত্রায়ন বাস্তবায়ন হতে পারে। যদিও দুঃখজনক হলো, নদী আর আমাদের যোগাযোগে এক প্রকার ভাটা বিরাজমান। খেয়াল করতে হবে, নদীর দেশের মানুষ হয়েও আমরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাঁতার প্রতিযোগিতায় গৌরবোজ্জ্বল ফল করি না। আমাদের দেশে আর কোনো ব্রজেন দাশ জন্মাননি, যিনি বিলেতি নদীকেও জয় করেছিলেন। অসচেতন এই জাতিকে, এই রাষ্ট্রকে নদী অবহেলা থেকে সরে আসায় দেরি হবে আত্মঘাতী। কেবল নদী দিবস উপলক্ষে প্রশাসনিক প্রতিশ্রুতি, এরপর সারা বছর আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অবসান হোক। তবেই নদী গণতন্ত্রায়ন বাস্তবায়ন সম্ভব।

 

samakal_River6Points_28Sep2014

প্রকাশিত: দৈনিক সমকাল, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৪