ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

বরাবর,
উপাচার্য,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বিষয়: ভর্তি পরীক্ষায় ‘ইলেকটিভ ইংরেজি‘ অংশে শিক্ষার্থীদের বিমুখতা ও প্রশ্নপত্রের মান বিচারের আবেদন।

স্যার,
প্রচলিত একটা গল্প দিয়েই শুরু করছি, গল্পটায় ভালো ইংরেজি জানাই ছিল পাণ্ডিত্যের লড়াইয়ের মূল কৌশল। সেখানে একজন অপরজনকে প্রশ্ন করে ’আই ডোন্ট নো’ এর বাংলা কী? অপর চরিত্র যখন গলা খাকারি দিয়ে উচ্চ কণ্ঠে জানান দেয়, ’আমি জানি না’, তখন এই জবাবের সাক্ষী হয় গ্রামবাসী। প্রশ্নকারীর পাণ্ডিত্য অপরিসীম, তার প্রশ্নের উত্তর দিতে অপারগ উত্তরদাতা–এই ভেবে প্রশ্নকারীকে পাঁজাকোলা করে গ্রাম ঘুরিয়ে উল্লাস প্রকাশ করে গ্রামবাসী।

মাননীয় উপাচার্য,

এই গল্পটি উল্লেখ করে কিছুদিন আগে ফেসবুকের একটি গ্রুপে প্রশ্ন করেছিলাম। গ্রুপের সদস্যদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম ’আই ডোন্ট নো’ এর বাংলা অর্থ কী? সকলেই যখন মন্তব্য ঘরে লিখে যাচ্ছিল, ’আমি জানি না’, তখন আমাকে গল্পের প্রথানুসারে সবাইকে অকৃতকার্য ঘোষণা করতে হলো। তারা আমাকে পাল্টা প্রশ্নের কাঠগড়ায় দাঁড় করান– ‘এর অর্থ আপনিই বলুন তাহলে’? আমার উত্তর ছিল, ’প্রশ্নকারীকে প্রশ্ন করা যাবে না’!

স্যার,

ফেসবুকে প্রশ্ন করা এবং উত্তর দেয়া নিতান্তই মজাচ্ছলে ঘটছিল, তবে গণহারে অকৃতকার্য ঘোষণা দেওয়ার কালে আমাকে যেমন করে সকলের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হল, তা আমার জন্য ছিল খুবই প্রত্যাশিত। আমাদের চিন্তাজগতে এই প্রশ্নটি স্বভাবসূলভভাবে উচ্চারিত হোক, এই আগ্রহেই ফেসবুকে মজার আশ্রয় নিয়েছিলাম। বলতেই হচ্ছে, আমার উত্তরটি ছিল, আপনার একটি বক্তব্য দ্বারা অনুপ্রাণিত।

মাননীয় উপাচার্য,

গত সেপ্টেম্বর মাসে শীর্ষ সংবাদপত্র ও সংবাদমাধ্যমগুলোর আলোচিত শিরোনাম ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল। ঢাবির ইংরেজি বিভাগে মোটে দু’জন ভর্তির যোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে- এই সংবাদ হাস্যরসের সৃষ্টি করে যেমন, তেমন তীর্যক সমালোচনার মুখোমুখি করে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীকে। অসংখ্য জিপিএ ৫ প্রাপ্তি শিক্ষার মানকে ক্ষুণ্ণ করছে এবং তারই প্রতিফলন হচ্ছে ঢাবি’র ‘খ’ ইউনিটে ’ইংরেজি’ বিষয়ে কেবল ২ জনের বিবেচিত হওয়া – অভিযোগের সারবত্তা ছিল এমনটাই। সকলেই যখন শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি আঙ্গুল তুলছিলেন, তখন শিক্ষামন্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি, ভর্তি প্রশ্ন পদ্ধতি নিয়ে সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করেন। যার প্রত্যুত্তরে আপনার পক্ষ থেকে সাফ জবাব ছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা এখতিয়ার বহির্ভূত।

স্যার,
আমরা কিছু তথ্য পরিসংখ্যানে চোখ রাখতে পারি। যেমন,

– ২০১৪ সালে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ৭৮.৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে।
– ২০১৩ সালে পাস করেছিল ৭৪.৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী।
– ২০১৪ সালে ইংরেজিতে পাস করেছিল ৯২.৫৯ শতাংশ শিক্ষার্থী।
– ২০১৩ সালে ইংরেজিতে পাসের হার ছিল ৮২.৩০ শতাংশ।
– ২০১৪ সালে এসএসসিতে পাস করেছিল ৯৩ ভাগ।
– ২০১৩ সালে এসএসসি পাসের হার ছিল ৮৯ শতাংশ।

ফিরে আসার যাক এককালে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত (এই স্বীকৃতি একটি সুদূর অতীত ঐতিহ্য, বর্তমান নয়) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাকেন্দ্রিক আলোচনায়। আবারও কিছু পরিসংখ্যান দেখা যাক।

– ২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন সংখ্যা ৬ হাজার।
– ২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আবেদন করেছিল প্রায় ৩ লাখ শিক্ষার্থী।
– ২০১৪ সালে ’খ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৪০ হাজারেরও অধিক শিক্ষার্থী।
– ’খ’ ইউনিটে বরাদ্দ ২ হাজার ২২১ আসনের জন্য উত্তীর্ণ হন ৩ হাজার ৮৭৪ জন।
– ইংরেজি বিভাগে ভর্তির জন্য ১৫০ আসন বরাদ্দ, যেখানে ’খ’ ইউনিট থেকে নেওয়া হবে ১২৫ জন।

২০১৪ সালের ’খ’ ইউনিটের চিত্রের পাশাপাশি দেখা যাক ২০১৩ সালে ’খ’ ইউনিটে ভর্তি সংক্রান্ত পরিসংখ্যান।

– ২০১৩ সালে ’খ’ ইউনিটে ভর্তির জন্য আবেদন করে ৩৮ হাজার ৭৬৮ শিক্ষার্থী। পরীক্ষায় অংশ নেয় ৩৬ হাজার ৮৩৫ জন।
– ২০১৩ সালে ’খ’ ইউনিটে বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ২৯৬ আসন।
– ২০১৩ সালে ৫ হাজার ১২৮ জন শিক্ষার্থী ’খ’ ইউনিটে ভর্তির জন্য বিবেচিত হন।

মাননীয় উপাচার্য,

গত কয়েক বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় পাশের হারের তালিকা একযোগে দেখলে স্পষ্ট ধারণা হবে, পাশের সূচক আচমকা বৃদ্ধি পায়নি, বরং প্রতিবছরই ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদন মতে, শিক্ষার্থীদের ’আর্লি ড্রপ আউট’ সংখ্যা কমে আসায় গত কয়েক বছরে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও আগের তুলনায় বেশি; যা পাসের হারেও প্রভাব রাখছে। পাবলিক পরীক্ষায় পাশের হার বাড়লে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যাও বাড়বে। যদিও ’আসন’ সংখ্যা বরাবরই অপ্রতুল।

২০১৩ সালে ’খ’ ইউনিটে ২ হাজার ২৯৬টি আসন থাকলেও, ২০১৪ সালে আসন সংখ্যা ২ হাজার ২২১টি। অল্প কয়েকটি হলেও, আসন সংখ্যা কমে আসার এই কারণ কি সংবাদপত্রগুলোর মুদ্রণ প্রমাদ? নাকি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সময়ের সঙ্গে আসন বৃদ্ধি করে শিক্ষার্থীদের পছন্দের বিদ্যাপীঠে পাঠদানের সুযোগ দিতে যথেষ্ট আগ্রহ রাখেন না?

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসন সংখ্যা বাড়ানো নিয়ে তেমন কোনও জোরালো উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না। শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে দেশের শীর্ষস্থানীয় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কোনও ধরনের উৎসাহব্যঞ্জক প্রচারণায়, বিজ্ঞাপনেও দেখা যায় না। এর কারণ হতে পারে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বছরের পর বছর ধরে দেখে আসছেন আসন সংখ্যার কয়েকগুণ বেশি আবেদন জমা পড়ে এমনিতেই। তাই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নতুন করে শিক্ষার্থীদের আকৃষ্টকারী বিজ্ঞাপন নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে হয় না, কেবল ভর্তি ফরম বিক্রয়ের বিজ্ঞাপন প্রদান ছাড়া।

’একটি আসনের জন্য লড়বে ৪০ জন শিক্ষার্থী’ এরকম সংবাদ শিরোনাম প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করলেও এ ধরনের শিরোনাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মধ্যে কোনও দায়িত্বশীলতা জাগায় কি? এই দায়িত্বের বাইরে নয় সংবাদপ্রচারকারী গণমাধ্যমগুলোও। ভর্তি পরীক্ষার সঙ্গে মানসিক চাপ বৃদ্ধিকারী অতিরঞ্জিত শব্দ যেমন ‘ভর্তিযুদ্ধ’, ’আসনের জন্য লড়াই’ জাতীয় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় বরাবর।

স্যার,

আমাদের দেশে আচমকা শিক্ষার্থীদের ‘অকৃতকার্য’ মানে ফেল করানোতে সকলের মধ্যে জোর তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। ’অধিক হারে পাস’ কোনও সমস্যা হতে পারে না, যদি শ্রেণীকক্ষে পাঠদান, শিক্ষকের যোগ্যতা, পরীক্ষা পদ্ধতি, প্রশ্ন পদ্ধতি ও উত্তরপত্র যাচাই পদ্ধতি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের হয়ে থাকে। ’খ’ ইউনিটে ইংরেজি বিভাগে মাত্র ২ জন বাছাই হওয়ায়, সবার মধ্যে আবারও পাবলিক পরীক্ষায় অধিক হারে পাশকে প্রশ্নবিদ্ধ করার গড় চেষ্টা দেখা গেছে। কেবল মাত্র মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ঢাবির ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

এই আলোচনার নেতিবাচক দিকটি কেউ চিন্তা করছে না। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কাছে মনে হতেই পারে, তাহলে ’ফেল’ করানো বিদ্যালয়-কলেজ ও রাষ্ট্রের জন্য একটি বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া। যদি একজন শিক্ষার্থী উত্তরপত্রে একটি প্রশ্নের জবাব বোঝাতে সক্ষম হয়, তাতে পাশযোগ্য নম্বর প্রদানে একজন শিক্ষক পদ্ধতিগত ও নীতিগত ভাবে দায়বদ্ধ। প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে এবং নকল রোধে আলোচনা, সমাবেশ, চাপ প্রয়োগ হতে পারে, কিন্তু ’অধিক হারে পাশ কেন হচ্ছে’ এমন শিরোনামে আলোচনা শিক্ষার্থীদের মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত করবে।

মাননীয় উপাচার্য,

নিশ্চয়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অবগত আছে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের কোচিং সেন্টারে (কোচিং বাণিজ্য) ভর্তি হয়ে ভর্তি পরীক্ষার তুমুল প্রস্তুতি নিতে হত এককালে। পত্রিকাগুলোতে রমরমা বিজ্ঞাপন থাকতো এসব কোচিং সেন্টারগুলোর। এসব কি মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষণ ছিল? এসব বন্ধে ঢাবি’র কোনও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে কি?

জ্বালাও-পোড়াও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা যথেষ্ট হয়রানি হয়েছে পরীক্ষার আগে, পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে। ’খ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সে সব ভুলে বাছাই পরীক্ষায় নির্বাচিত না হওয়াদের ’ফোকলা’ সম্বোধন করলেন। অথচ জাতীয় নির্বাচন প্রতিহত করার নামে বিদ্যালয়গুলোতে আগুন দেওয়া হয়েছিল। হরতালের বিভীষিকাকালে একজন মেয়ে শিক্ষার্থী চোখে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ’ফোকলা’ করার দায় কে নেবেন? প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা নিজেদের কার্যক্রমকে পুনর্নিরীক্ষণে নারাজ, কিন্তু অবলীলায় শিক্ষার্থীদের পাশ-ফেল নিয়ে মশকরা করার ছাড়পত্র হাতে পেয়েছেন যেন সবাই! আমরা সকলেই মেধার ঐশী মানদণ্ড হাতে নিয়ে ঘুরছি, আর শিক্ষার্থীদের গায়ে লেবেল সাঁটিয়ে দিচ্ছি, ’তুমি ইংরেজিতে ফেল, তুমি মেধাবী নও’!

মাননীয় উপাচার্য,

যদিও আপনি কড়া স্বরে জানিয়েছেন, ঢাবির পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না, তবুও শিক্ষার্থীদের স্বার্থে ’খ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে সামান্য আলোকপাত করা যাক।

– ইংরেজি বিভাগে ভর্তির জন্য প্রশ্নপত্রে দুই ধরনের ইংরেজি অংশে উত্তর করার নিয়ম ছিল এবার।
– ইংরেজি বিভাগে ভর্তি পরীক্ষায় নির্বাচিত হওয়ার শর্ত ছিল ‘সাধারণ ইংরেজিতে’ ৩০ নম্বরের মধ্যে ২০ এবং ‘ইলেকটিভ ইংলিশে’ ১৫ পেতে হবে।
– ১৪ আগস্ট এক ভর্তি নির্দেশিকায় জানানো হয়েছিল ‘খ’ ইউনিটের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হতে চাইলে ’ইলেকটিভ ইংলিশ’-এর বাধ্যতামূলক উত্তর করতে হবে শিক্ষার্থীদের।
– ১৭ সেপ্টেম্বর কলা অনুষদের পক্ষ থেকে ডিন অধ্যাপক সদরুল আমীন ২০১৪ সালে ইংরেজিতে ভর্তির জন্য নতুন প্রণীত ভর্তিশর্তগুলো তুলে ধরেন।
– ১৯ সেপ্টেম্বর ‘খ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

দেখা যাচ্ছে ভর্তি পরীক্ষার নতুন নিয়মকে সামনে রেখে মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণে শিক্ষার্থীরা মোটে এক মাস সময় পেয়েছিল। ১৭ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ ভর্তি পরীক্ষার মাত্র দু’দিন আগে সংবাদ সম্মেলন করে নতুন নিয়ম সম্পর্কে জানানো একটি ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপিঠের দায়িত্বশীল আচরণের মধ্যে পড়ে না। এ বিষয়ে আরও আগেই বিস্তারিত ঘোষণা আসা জরুরি ছিল।

স্যার,

মেধাকে যদি কেবল পরীক্ষার নম্বরপত্র দিয়ে পরিমাপ করা যেত তবে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন মেধাবী নন অবশ্যই। সম্প্রতি আপনি বলেছেন, ’জিপিএ-৫ পাওয়া সবাই সমান মেধাবী নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় তার প্রমাণ হচ্ছে’। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ভর্তি পরীক্ষাকে মূলত একটি ’বাছাই প্রক্রিয়া’ হিসেবে সম্বোধন করে বক্তব্য রাখেন। এই সম্বোধন যৌক্তিক। কারণ, পাবলিক পরীক্ষাগুলোই মূলত শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের গোড়ার দিকের মেধা যাচাইকারী পরীক্ষা। ভর্তি পরীক্ষা একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়া, যেখানে ইতিমধ্যে পাবলিক পরীক্ষায় কৃতকার্য মেধাবীদের থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ধারণক্ষমতা অনুসারে নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষার্থী বাছাই করা হয় বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চতর পাঠের জন্য। তারপর নির্বাচিত বিষয়ে অধ্যয়ন করে একজন শিক্ষার্থী আবারও মেধার পরিচয় দেন বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষা, গবেষণা ইত্যাদির মাধ্যমে উচ্চতর ডিগ্রির সনদপ্রাপ্ত হয়ে।

ভর্তি পরীক্ষা প্রকৃত মেধা যাচাইয়ের মানদণ্ড নয়। ভর্তি পরীক্ষা কোনও সনদ প্রদান করে না। এখানে পাশ-ফেল জাতীয় শব্দ ব্যবহার না করে নির্বাচিত, অনির্বাচিত, বাছাই–এমন শব্দ ব্যবহার করাই শ্রেয় হবে। ভর্তি পরীক্ষায় নির্বাচিতরাই প্রকৃত মেধাবী-এমন করা দাবি প্রতিষ্ঠা করা অনুচিত হবে। ভর্তি পরীক্ষায় নম্বর বন্টনে ভগ্নাংশ কিংবা এক নম্বরের পার্থক্যও নির্বাচন তালিকায় ব্যবধানের সৃষ্টি করে। এই ব্যবধান প্রকৃত মেধা পরিমাপের সূচক নয় কোনওভাবেই। তবে শিক্ষার্থীর ভর্তি পরীক্ষা প্রস্তুতিকে পরিমাপ করা যেতে পারে।

মাননীয় উপাচার্য,

আমরা যারা শিক্ষার মান, অধিক সংখ্যক পাসের হার নিয়ে নাখোশ, তারা বস্তুত এখনও জানি না, ’ইলেকটিভ ইংরেজি’ অংশে কী ধরনের প্রশ্ন করা হয়েছিল। তবে আসন ফাঁকা না রাখতে ভর্তি শর্ত ইতিমধ্যে শিথিল করা হয়েছে। সাধারণ ইংরেজিতে ২০ নয়, ১৮ এবং ইলেকটিভ ইংরেজিতে ১৫ নয়, ৮ নম্বর প্রাপ্তরা ভর্তির জন্য বিবেচিত হবে। সাধারণ ইংরেজি কত সাধারণ ছিল তা জানা নেই, তবে এই অংশে আগের ধারণা থাকার সম্ভাবনা পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতি নিতে সহায়ক ছিল, তা বোঝা যায়। কারণ এই অংশের ফলাফলে বড় কোনও অঘটন দেখা যাচ্ছে না।

ইলেকটিভ ইংরেজি অংশটি নতুন বিধায় অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা তাতে অংশ নিতেও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেনি। এ কারণেই ’খ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় নির্বাচিত ৩ হাজার ৮৭৪ জনের মধ্যে ‘ইলেকটিভ ইংরেজি’ অংশে উত্তর করেছিল মাত্র ১৭ জন। সঠিকভাবে কোনও তথ্য না থাকলেও, পত্রিকা থেকে জানা যাচ্ছে, ’খ’ ইউনিটে অংশগ্রহণকারী ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে সম্ভবত মাত্র ১৭০০ জন ইলেকটিভ ইংরেজি অংশ স্পর্শ করেছিল। কেবল জিপিএ ৫ প্রাপ্তদের শিক্ষার মান নিয়ে আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখলে ঢাবি নিঃসন্দেহে এই অংশে শিক্ষার্থীদের কাছে সততার পরিচয় দিচ্ছে না। কেন ইলেকটিভ ইংরেজি অংশ শিক্ষার্থীদের বিমুখ করেছিল উত্তর প্রদানে, এটা জানা গুরুত্বপূর্ণ।

পাবলিক পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেলেই কিন্তু কেউ টোফেল, আইইএলটিএস, জিআরই জাতীয় ইংরেজি দক্ষতার পরীক্ষায় ভাল করে না। এ ধরনের পরীক্ষাগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদী অনুশীলন করতে হয়, বিভিন্ন মডেল টেস্ট অনুসরণ করতে হয়। মনে রাখা দরকার, জ্ঞানের জন্য পাঠ আর পরীক্ষায় পাশের জন্য প্রস্তুতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

স্যার,

বাংলাদেশ ব্যতিক্রম হলেও, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ফেল হওয়ার পরিসংখ্যানকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। পরীক্ষায় ভাল ফলাফলের মানসিক ও পাঠদান পদ্ধতি নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়। শুধু তাই নয়, ‘মানসম্মত’ প্রশ্নপত্র তৈরিতেও বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদরা নানা পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়াটারলু’র পোর্টালে ’সেন্টার ফর টিচিং এক্সিলেন্স’ বিভাগে নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন প্রণয়নে কিছু ছোট ছোট পরামর্শ দেওয়া আছে। যেমন দীর্ঘ ও যৌগিক বাক্য এড়িয়ে প্রশ্ন করতে বলা হয়েছে।

Vanderbilt University এর পোর্টালে সেন্টার ফর টিচিং বিভাগে Cynthia J. Brame এর একটি চমৎকার নিবন্ধ আছে। একটি নৈব্যর্ত্তিক প্রশ্নকে দুটো অংশে ভাগ করা হয়েছে – শাখা (Stem) ও বিকল্প (Alternative)। প্রথম অংশে মূল উপস্থাপনা (Problem) এবং দ্বিতীয় অংশে থাকে সম্ভাব্য উত্তরসমূহ। প্রশ্ন উপস্থাপনা হতে হয় সুনির্দিষ্ট বক্তব্য দ্বারা গঠিত, কিন্তু বাহুল্য তথ্য (Irrelevant Material) বর্জিত।

image2

এরকম অসংখ্য আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র আছে। আপনার মাধ্যমে জানতে চাই, ঢাবি কি এ ধরনের কোনও গবেষণায় আছে? এ বিষয়ে শিক্ষকদের জন্য কোনও কর্মশালা হয় কি? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষার্থীদের উপযোগী, মানসম্মত আধুনিক ভর্তি প্রশ্নপত্র নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করার আহবান জানাই।

সম্মানিত উপাচার্য,

খোলা চিঠি শেষ করতে চাই, একটি নাটিকার সার গল্প দিয়ে। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এক সাংস্কৃতিক আয়োজনে নাকি সামান্য ’স্যাটায়ার’ করে নাটিকাটি মঞ্চস্থ করেছিল। অনুষ্ঠানে আমি অনুপস্থিত থাকলেও, পরবর্তীতে অন্যান্য সহপাঠীর কাছ থেকেই শুনেছিলাম। কোন এক বিষয়ে ফাইনাল গ্রেড প্রকাশ হওয়ার পর দেখা গেল, এই বিষয়ের সকল শিক্ষার্থী ’এফ’ গ্রেড প্রাপ্ত অর্থ্যৎ কিনা অকৃতকার্য। সহজ ইংরেজিতে যাকে বলে ফেল। যখন সব শিক্ষার্থীই একযোগে অনুত্তীর্ণ, তখনই নাটিকার ’টুইস্ট’ ছিল। ’এফ’ গ্রেড লেখা ফলাফলপত্র হাতে শিক্ষার্থীরা বলে উঠেছিল, যে সাবজেক্টে সব স্টুডেন্ট-ই ফেল, সে সাবজেক্টের টিচার কি আর পাস করল? টিচারও ফেল!

 

***

প্রকাশিত: http://www.banglatribune.com, অক্টোবর ১৮, ২০১৪