ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

২০১৩ সালে সিলেট ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত একটি সেমিনারে উপস্থাপিত একটি গবেষনাপত্রে (Usage of Facebook: Bangladesh Perspective, S. M. Saief Uddin Ahmed, Md. Mohsin Hossain, Md. Mahbubul Haque) উল্লেখ ছিল, বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩৭ লাখ ৪ হাজার চারশ আশি জন। কোন কোন পত্রিকার প্রতিবেদন বলছে, ২০১৪ সালে মার্চে বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ৭০ লাখ। আশ্চর্যজনক ভাবে অক্টোবর নাগাদ এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১ কোটিতে। অর্থ্যাৎ মাত্র এক বছরে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে আড়াই থেকে তিন গুণ। কিশোর-তরুণ-মধ্যবয়স্ক এবং সকল পেশারজীবীতার ’কমন’ সমাবেশস্থল ফেসবুক। ’শুভ সকাল’ থেকে ’শুভ রাত্রি’ পর্যন্ত ফেসবুক। সামাজিক যোগাযোগের বৃহত্তর কেন্দ্র ফেসবুক প্রকৃত অর্থে আমাদের কতটা সামাজিক প্রতীয়মান করে তা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক করা যেতেই পারে।

অনলাইনে নাগরিক মিডিয়ার উত্থান ভার্চুয়্যাল বিপ্লব সংগঠনের পথ খুলে দেয়। ভার্চুয়্যাল জগতকে ছোঁয়া যায় না। কিন্তু ভার্চুয়্যাল জগত বড় ছোঁয়াচে। ফেসবুকে সাধারণ মানুষও গড়ে ১০০টি লাইক অর্জন করে নিজেকে সেলিব্রেটি ভাবতে পারে (কেউ কেউ নিজেকে উদীয়মান বুদ্ধিজীবীও ভাবেন)। ফেসবুকে কেবল ’লোকাল’ নয়, আমাদের প্রোফাইল ’গ্লোবাল’ হয়ে ওঠে। শুরুতে সামাজিক, রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীয় ক্রিয়ার নাগরিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে ফেসবুক থেকে আন্দোলন ’বুম’ হতে শুরু করে।

আমাদের দেশেই অনেকগুলো ইতিবাচক উদাহরণ রয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘তাহরির স্কয়ার’ অথবা ’আরব বসন্ত’ ফেসবুকের মাধ্যমে গণজাগরণ ঘটানোর শক্তিশালী দৃষ্টান্ত রেখেছিল। প্রশ্ন উঠেছিল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো সত্যিই বিপ্লব জাগাতে সক্ষম কি না। তখন ঘুণে ধরা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের সেই আন্দোলনের সকল প্রকার কৃতীত্ব দখল করে নিয়েছিল ফেসবুক, ইউটিউব আর টুইটার। কিন্তু তাহরির স্কয়ার (২০১১) আন্দোলন নিয়ে একটি অনলাইন সাইটে (http://journalistsresource.org) প্রকাশিত জরিপ থেকে চমৎকার তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়। জরিপের আওতায় থাকা আন্দোলনকারীদের মধ্যে ৫২ শতাংশ ছিল ফেসবুক ব্যবহারকারী এবং ১৬ শতাংশ টু্ইটার। অথচ ৪৮.৪ শতাংশ এই আন্দোলন নিয়ে প্রথম জানতে পেরেছিল কারো না কারো সাথে মুখোমুখি আলাপে।

যে আরবে বসন্তের ছোঁয়া লেগেছিল, সে আরব বিশ্বের বেশ কিছু রাষ্ট্রে আইএস এর রক্তাক্ত জঙ্গিবাদ গেড়ে বসেছে। সম্প্রতি হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে আনিত অবশিষ্ট অভিযোগগুলো থেকে তাকে রেহাই দিয়েছে মিসরীয় আদালত। কথা প্রসঙ্গে এক মিসরীয় বন্ধু আরবি টানের ইংরেজিতে খেদোক্তি করছিল, মিশরে এ ক‘বছরে যা অর্জন মানা হচ্ছিল, সব এখন ’Rolled back’ হতে চলেছে।

 

ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের যে দীর্ঘ পুরনো ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা, তাতে ইসরায়েলের প্রতি কোন পরাশক্তি রাষ্ট্রের সমর্থন, অস্ত্র ব্যবসা বিস্তারের গোপন স্বার্থ বারবার হাওয়া দিয়েছে। গাজায় যুদ্ধের নামে গণহত্যা, শিশু হত্যাকে কি ফেসবুকে বসে ’হ্যাশট্যাগ’ দিয়ে ঠেকানো সম্ভব?

প্রযুক্তি যোগাযোগকে দ্রুত করে বিধায়, একটি কার্যক্রম মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বে। কিন্তু সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন এবং মানবাধিকার অর্জনের জন্য পথেই নামতে হয়। দীর্ঘসময় পথেই থাকতে হয়। আচমকা ’বুম’– মূল আন্দোলন নয়, তবে ‘হট টপিক’ তৈরি করে নিঃসন্দেহে, যা একটা ভিড় গড়তে সহায়ক। মূল আন্দোলন আসলে, দীর্ঘসময় যুগপদ থাকা, ময়দান স্ট্যাটেজি, দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা।

সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা ইস্যু যত তাড়াতাড়ি আসছে, তত তাড়াতাড়ি মিলিয়েও যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরাও সন্দেহ পোষণ করেন, ফেসবুকে সকলেই যতটা আদর্শবাদ ধারণ করেন, ব্যক্তিজীবনে তার প্রতিফলন সিকি আনাও আছে কি?

ফেসবুক অনেকটাই শো-ওয়ার্ল্ড। ব্যক্তি তার ব্যস্ততা, পরিচিতি, মেধা, অর্জন, অবসরের সেলফি প্রদর্শন করেন বিরামহীন। এই তালিকায় দেশপ্রেম প্রদর্শনও উল্লেখযোগ্য। এমনিতে আমাদেরই আত্মোপলব্ধি আছে, আমাদের দেশপ্রেম সুনির্দিষ্ট মাসভিত্তিক। এখন তা রূপান্তরিত হয়েছে ফেসবুক ভিত্তিক দেশপ্রেমে। ডিসেম্বর মাস এলে চ্যানেলগুলো লাগাতার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক দেখায়, সংবাদ আয়োজনগুলোতে খুঁজে খুঁজে মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনাদের নিয়ে প্রতিবেদন হয়। আমাদের সাজে-পোশাকে লাল-সবুজের আধিক্য দেখা দেয়। যে লোটো ব্র্যান্ডের আউটলেটে সারা বছর ইংরেজি গান চলে, সেখানেও মার্চ-ফেব্রুয়ারি-ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণাদায়ক গানগুলো বাজতে থাকে। মোবাইল অপারেটরগুলো বিজয়ের মাসে বিশেষ ছাড়ে টক টাইম প্যাকেজ দেয়। তাহলে ফেসবুকে আমরা পিছিয়ে থাকবো কেন?

ফেসবুকে যুগপদ বার্তা জানাতে সম্মিলিতভাবে একই প্রোফাইল পিক ধারণ একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি। এভাবে ফেসবুকের প্রোফাইল পিক কখনও কালো হয়ে উঠেছে, কখনও পতাকা ধারণ করেছে। ২০১১ কী ২০১২ সালের দিকেও বিজয়ের মাসজুড়ে প্রোফাইল ছবিতে জাতীয় পতাকা ধারণের উদ্যোগ দেখা গিয়েছিল। অনেকেই করেওছিলেন তা।

লাখো কণ্ঠে জাতীয় সংগীত গেয়ে বিশ্ব রেকর্ড কার্যক্রম আলোচনা ও সমালোচনা দুটোই কুড়িয়েছিল। প্রথমত, ইসলামি ব্যাংকের অর্থায়ন, যা পরে সরকার কর্তৃক ফিরিয়ে দেওয়া হয়, দ্বিতীয়ত, ব্যয়বহুল আয়োজন – সমালোচনার অন্যতম অংশ ছিল। দেশপ্রেম ক্যাটেগরিতে বিশ্ব রেকর্ডের আরেকটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে হালে। কে এই উদ্যোক্তা তা সুস্পষ্ট জানা নেই। এই রেকর্ড কোন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক স্বীকৃত হবে, কর্তৃপক্ষের কাছে রেকর্ডের তথ্যপ্রমাণ কীভাবে জমা দেয়া হবে, সেটাও জানা নেই। কিন্তু ফেসবুক, ব্লগ, কিছু ওয়েবসাইটের পাতায় মহামারির মত যে বার্তাটি ছড়িয়ে গেছে তা হলো, আগামী ১৬ ডিসেম্বর সকলে ফেসবুক প্রোফাইল ছবিতে জাতীয় পতাকা ধারণ করতে যাচ্ছে, যা হবে অনন্য রেকর্ড। শুধু তাই নয়, এই রেকর্ডের মাধ্যমে নাকি তরুণ প্রজন্ম নিজেদের প্রমাণ করতে সক্ষম হবে!

 

তরুণ প্রজন্ম মানে ভিন্নতা। তরুণ প্রজন্ম মানে চাঞ্চল্য। এই তরুণ প্রজন্ম ’৫২, ’৬৯, ’৭১ এ গনগনে রাজপথে পা রেখে দাঁড়িয়েছিল। সেই তরুণ প্রজন্ম আজকে যখন ভার্চুয়্যাল প্লাটফর্ম ফেসবুকে লগইন করে মাত্র একটা মাউসের ক্লিকে দেশপ্রেম প্রমাণের প্রতিযোগিতায় রত, বিষয়টা তখন ব্যথিত করে।

ফেসবুক আমাদের আপাতমস্তক এমনভাবে গ্রাস করেছে যে, আমরা ফেসবুকে লগইন করা মাত্রই আমাদের বোধবুদ্ধি খুইয়ে বসি। আমাদের চিন্তাশক্তি এখন ফেসবুক দ্বারা পরিচালিত হয়। ফেসবুকই বস্তুত আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে। আশংকাটি অমূলক নয়, তথ্যপ্রযুক্তি আমাদের বেগবান করে, আমাদের আবেগকে ম্রিয়মাণ করে দিচ্ছে। আমাদের দর্শনবোধ হালকা হয়ে প্রদর্শনবোধ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে অনলাইনে।

অনেকের মতো এভাবে বার্তা দিতে চাই না যে, দেশপ্রেম প্রদর্শনের বিষয় নয়, কেবলি মননে ধারণের বিষয়। বিষয়টা এমন যে, আগে দেশপ্রেম ধারণ করতে হবে, তারপরই তা আপনাআপনি দারুণভাবে প্রদর্শিত হবে আমাদের উদযাপনে, সংস্কৃতিতে, পাঠে, শ্রবণে, রঙে। ফেসবুকে দেশপ্রেম দেখানো যাবে না তাও নয়, তবে বিজয় উৎসব উদযাপন হচ্ছে একটি গৌরবময় বাস্তব। ঘর ছেড়ে বেরুতে হবে তাই- দলে দলে, পায়ে পায়ে, কাতারে কাতারে। পতাকা কেবল হাতে নয়, থাকবে হৃদয়ে, যে হৃদয়ে দেশমাতৃকাকে ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ দিয়ে অমর হলেন ৩০ লক্ষ শহীদ। পতাকা লেপ্টে থাকবে আমাদের শরীরে, যে শরীরের আব্রু রক্ষার্থে ৪ লক্ষ বীরাঙ্গনারা একটা পতাকা খুঁজেছিল, একটা পতাকায় ঢেকেছিল নিজেদের।

 

প্রকাশিত: https://www.banglatribune.com, ১১ ডিসেম্বর ২০১৪