ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

সংখ্যাটা ২ লাখ না সাড়ে ৪ লাখ, তা সুনিশ্চিত নয়। কারণ সংখ্যাটা আরও বেশি হতে পারে। একাত্তর শুধু গণহত্যাচিত্র নয়; ১৯৭১ এর নারী ধর্ষণচিত্র বিশ্বকে মূক করে দেয় বারবার। একাত্তরে নারী ধর্ষণ শুধু যৌনলালসা নয়, বরং সুপরিকল্পিত যৌনরাজনীতি। হিন্দু নারীরা শুধু নারী বলেই ধর্ষিত হননি, বরং মুসলিম পাকসেনাদের সুপরিকল্পিত যৌনরাজনীতিতে নারীর হিন্দুত্বও বিভৎস প্রতিহিংসার শিকার হয়েছিল। পাকসেনারা অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ভ্রুণ পর্যন্ত বেয়নেটে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করেছিল, আবার অসংখ্য ধর্ষিতা নারীদের জীবিত রেখেছিল, যেন তারা পাকিবীর্যজাত সন্তান জন্ম দেয় বাংলাদেশে। নির্যাতিত নারীরা পাঁচ-ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা হলে তাদেরকে মুক্তি দিয়ে উপহাস করা হতো, ‘যখন আমার পুত্র ভূমিষ্ঠ হবে, তুমি তাকে অবশ্যই আমার কাছে নিয়ে আসবে’ (‘When my son is born, you must bring him back to me’; Daktar: Diplomat in Bangladesh by Dr. Viggo Olsen)।

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় এল অর্জন নিয়ে, বন্ধু-স্বজন হারানোর বিষাদ নিয়ে, ৩০ লাখ শহীদের লাশ নিয়ে। অন্যদিকে জীবিত ধর্ষিতা নারীদের কাছে বিজয় এল পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় প্রশ্ন নিয়ে। এই প্রশ্ন ক্রমাগত আকারে বাড়তে থাকল। এই প্রশ্ন একসময় জন্ম নিল যুদ্ধশিশু হয়ে।

আমরা দেশপ্রেমে যতই অশ্রুবিসর্জন করি, স্বাধীন বাংলাদেশে জাতি হিসেবে শঠতার পরিচয় দিয়েছিলাম আমরা সেই সব নির্যাতিতা নারীদের কাছে। পাকসেনারা যে যৌনরাজনীতি প্রোথিত করেছিল, আমরা সেই মনস্তত্ত্বের ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রেখে পাকসেনাদের সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়ন করেছিলাম।

 

লাঞ্ছিত নারীদের সম্মান করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘তোরা আমার মা, জীবনের শ্রেষ্ঠ ধন স্বাধীনতার জন্য উৎসর্গ করেছিস। তোরা শ্রেষ্ঠ বীরাঙ্গনা’। লেখিকা নীলিমা ইব্রাহিম তাতে অশ্রসিক্ত হয়ে এই প্রতিজ্ঞাই করেছিলেন, ‘তোমার দেওয়া বীরাঙ্গনা নামের মর্যাদা আমি যেন রক্ষা করতে পারি’। এই প্রতিজ্ঞা নীলিমা ইব্রাহিমের একার হওয়ার কথা ছিল না। এটি হওয়া উচিৎ ছিল জাতির প্রতিজ্ঞা। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তীতে বীরাঙ্গনাদের প্রয়োজনের মুহূর্তেই জাতি বিস্ময়কর স্বার্থপরতার দৃষ্টান্ত গড়েছিল।

colum-pic1

যারা অঞ্জলী লাহিড়ির আলোকচিত্রটি দেখেছেন, তারা বুঝতে পারবেন পাকসেনাদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে কী পাশবিক অবমাননায় দিন কেটেছিল নারীদের। বিজয়ের পরও মানসিক অবমাননা বহাল রইল, যখন এইসব নারীদের মূল্যায়ন হল না পরিবারে, সমাজে।

২২ ডিসেম্বর ১৯৭১ এ, ’বীরাঙ্গনা’ রাষ্ট্রীয় খেতাব হল। নারীদের অবদানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়ন করে তাদের ’বীর নারী’ অর্থে বীরাঙ্গনা সম্মাননা ঘোষিত হল। আশ্চর্য মনস্তত্বে বীরাঙ্গনা অর্থ শুধু ধর্ষিতা নারীরূপেই দেখল এই সমাজ। রাষ্ট্রীয়ভাবে পুনর্বাসন প্রকল্প নেওয়া হল, যার একটি উদ্দেশ্য ছিল, বিবাহিত মহিলাদের স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং অবিবাহিতা ও বিধবাদের বিবাহ সম্পন্ন করা। তথাকথিত রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থায় যেখানে মেয়েদের পর্দানশীলতা এবং শুদ্ধতাই প্রধান, সেখানে এসব ধর্ষিতা নারীদের বিবাহের প্রকল্পটি তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি। অন্যদিকে কেউ কেউ এগিয়ে এলেও তারা সরকারের কাছে এর বিনিময়ে যৌতুক দাবি করে বসে (Brown-miller, Against Our Will)। হাসপাতালে, পুনর্বাসন কেন্দ্রে অনেক নারীর পরিবারই এসেছিল কন্যাকে দেখতে। কন্যার দুরাবস্থায় তারা ছিল অশ্রুসজল। কিন্তু অনেকেই নিজ কন্যাটিকে পরিবারে ফিরিয়ে নিতে অনাগ্রহী ছিল।

পরিবারে ও সমাজে পুনর্বাসিত হতে নারীদের শুদ্ধতা জরুরি। পাকিবীর্যে অন্তঃসত্ত্বা নারীকে সামান্য শুদ্ধ করতে সম্মতিতে ও অসম্মতিতে হয়েছিল অগণিত গর্ভপাত। সমাজ বা জাতি বোঝেনি, গর্ভজাত সন্তান আসলে মায়েরই। অনেক নারী হয়তো গর্ভপাতে রাজি হয়নি, আবার অনেকের স্বাস্থ্যগতদিক বিবেচনা করে গর্ভপাত করানো হয়নি। বীরাঙ্গনাদের নিয়েই রাষ্ট্র বিপাকে ছিল, তারপর যখন একে একে অসংখ্য যুদ্ধশিশু ভূমিষ্ঠ হল, তখন এদের পরিচয়, পুনর্বাসন নিয়ে সৃষ্টি হলো বহুমুখী জটিলতা। ১৯৭২ সালের ২১ জানুয়ারি মাদার তেরেসা গর্ভপাত পদ্ধতি বন্ধের সুপারিশ করেন এবং খ্রিস্টান মিশনারিগুলোতে ভুমিষ্ঠ শিশুদের দত্তক দিতে বলেন। যে জাতি যুদ্ধশিশুদের জন্ম স্বীকারে বিমুখ ছিল, সে জাতি যুদ্ধশিশুদের খ্রিস্টান মিশনারিতে খ্রিস্টধর্ম পরিচয়ে পালিত হওয়া নিয়েও আপত্তি তুলেছিল।

 

এরকম জটিলতাই চেয়েছিল পাকিসেনারা। টিক্কা খানের মন্ত্র ছিল, একজন ভাল মুসলিম সকলের সঙ্গে যুদ্ধ করবে, শুধু তার জন্মদাতা ব্যতীত। পাকিস্তান বুঝেছিল, বাংলাদেশের জন্ম অনিবার্য। তাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাদেশের এক প্রজন্মের জন্মদাতা হোক পাকিস্তান। বাংলাদেশিদের শরীরে বয়ে চলুক পাকিস্তানি রক্ত। জাতিও ঠিক এভাবেই ভাবতে শুরু করেছিল। ফলাফল, যুদ্ধশিশুদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া দেশে নয়, হল বিদেশবিভুঁইয়ে। শুধু যুদ্ধশিশুরাই নয়, অসংখ্য বীরাঙ্গনারাও নাম বদলে, পরিচয় বদলে বিদেশে পাড়ি জমালো। মূলত কানাডা, ফ্রান্স, সুইডেনেই অধিকাংশ পুনর্বাসন হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রচেষ্টায় এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার উদ্যোগ গৃহিত হয়। কিন্তু কত সংখ্যক বীরাঙ্গনা এভাবে চলে যেতে বাধ্য হলেন? কত সংখ্যক যুদ্ধশিশুকে দত্তক দেওয়া হল?

 

বিগত কয়েক বছরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিটি যখন পুনরুচ্চারিত হতে শুরু করল, নতুন প্রজন্ম যখন ’৭১ নিয়ে সরব হল, যখন গণমাধ্যম, গবেষণায়, প্রকাশনায় মুক্তিযুদ্ধ আবারও মুদ্রিত হতে লাগল, তখন বীরাঙ্গনাদের কথাও আবারও উঠে আসল। এখন প্রতিবছর টিভি চ্যানেলগুলো নিয়ম করে মার্চে, ডিসেম্বরে দেশের আনাচকানাচে থাকা বীরাঙ্গনাদের আক্ষেপ, দাবি প্রচার করে। গত কয়েক বছরে আমরা কিছু যুদ্ধশিশুদের কথাও জেনেছি। যারা বিদেশে নিজ নিজ ক্ষেত্রে, নিজ পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত, শিক্ষিত। এদের অনেকেই জেনেছে, শুনেছে বাংলাদেশের কথা। তাদের গর্ভধারিণী মায়ের কথা। এরা কেউ পাকিস্তান যায়নি। এরা ছুটে এসেছে বাংলাদেশ দেখবে বলে। এরা ছুটে এসেছে তাদের গর্ভধারীণী মাকে খুঁজে বার করবে বলে। অবশ্য আজকের দিনে নাড়ির টানে ছুটে আসা যুদ্ধশিশুদের সম্মান দেখিয়েছে জাতি, অথচ এককালে এদের জাতির লজ্জা মনে করা হতো। ঠিক সময়ে ঠিক দায়িত্ব নিতে না পারার যে জাতিগত ব্যর্থতা, তার দায় কিছুটা মোচন হতে পারে এতে।

জাতির লজ্জাকে লাঘবে এগিয়ে এসেছে ট্রাইবুন্যাল-২। যুদ্ধাপরাধী সৈয়দ কায়সারের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড রায় হয়েছে এবং এই রায় উৎসর্গিত হয়েছে বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুদের প্রতি। এই উৎসর্গিত রায়ে বড় একটি সত্য প্রতিষ্ঠা পেয়েছে আজ –ধর্ষণ, হত্যার চেয়েও মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধ। এখন এই উপলব্ধির প্রতিফলন ও বাস্তবায়ন হোক যুদ্ধাপরাধীদের প্রতিটি বিচারকার্যে।

যখন ট্রাইব্যুনাল এভাবে রূঢ় সত্যভাষ্য দেয়, আমাদের বিবেকের অকেজো অঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ খেলে তখন। তাই ট্রাইব্যুনালের কাছে আবেদন, আগামী রায়ে জাতিকে ও রাষ্ট্রকে বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বাস্তবায়নে এড়িয়ে যাওয়া দায়িত্ব যেন স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। জাতিকে যেন মনে করিয়ে দেওয়া হয়, বীরাঙ্গনা অর্থ ধর্ষিতা নয়, বীরাঙ্গনা অর্থ যে নারী রণাঙ্গনে বীরযোদ্ধা। ট্রাইব্যুনাল যেন জানিয়ে দেয় জাতিকে, যুদ্ধশিশুরা পাকিস্তানের নয়, যুদ্ধশিশুরা আমাদের লজ্জা নয়, যুদ্ধশিশুরা আমাদের নারীদের সন্তান, আমাদের অর্জন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ফসল, যুদ্ধশিশুদের নাড়িপোঁতা আছে আমাদের মাটিতে।

 

কোনও কোনও চিকিৎসক দল জানিয়েছিলেন, যুদ্ধশিশু জন্ম দিয়েছিলেন ৪০ হাজার নারী। সমাজকর্মী ড. জিওফ্রে ডেভিসের বক্তব্য অনুযায়ী এই সংখ্যা ২ লাখেরও বেশি হতে পারে। অন্যদিকে ঢাকার বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে ২৩ হাজার নারীর গর্ভপাত ঘটানোর তথ্যও পাওয়া যায়। সম্ভবত সরকারি নথিতে একসময় নির্যাতিত নারীর পরিসংখ্যান ৩ লাখ অন্তর্ভূক্ত ছিল। সঠিকভাবে আমরা জানি না কত সংখ্যক যুদ্ধশিশু জন্ম নিয়েছিল, কতজনকে বিদেশে দত্তক সন্তান হিসেবে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল। এই পরিসংখ্যান থাকা আমাদের ইতিহাসের জন্য জরুরি। দেশে থাকা বীরাঙ্গনাদের অধিকাংশই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার আড়ালে রয়ে গেছে। প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বয়স্ক, দুস্থ বীরাঙ্গনাদের ভাতা প্রদান রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করতে হবে। বীরাঙ্গনাদের ’মুক্তিযোদ্ধা’ মর্যাদা দেওয়া হবে, কিন্তু কত সংখ্যক বীরাঙ্গনা রয়েছে, তাদের রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যান না থাকলে এই মর্যাদা ঘোষণা হবে বায়বীয়।

 

বাংলাদেশেও রয়ে গেছে যুদ্ধশিশুরা। সমাজে এদের পরিচয় বীরাঙ্গনা সন্তান হিসেবেই হোক। শুধু একটি রায়ই নয়, একটি স্বাধীনতা দিবস, একটি বিজয় দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসর্গিত হোক বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুদের প্রতি। রাষ্ট্রীয়ভাবে স্যালুট জানানো হোক যেখানে যতো বীরাঙ্গনা আছে, যুদ্ধশিশু আছে। রাষ্ট্রীয় মানপত্রে আহ্বান জানানো হোক, যুদ্ধশিশুরা দেশের কিংবা পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক, যে ধর্ম ও জাতি পরিচয়েই বেড়ে উঠুক, তারা আমাদের লাল-সবুজ পতাকাতলে একমঞ্চে জমায়েত হোক। আমরা বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুসহযোগে একসঙ্গে সেদিন গাইব, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’। সেদিনও আমরা বিচারের দাবি নিয়ে সমস্বরে একটি স্লোগানই দেব – একাত্তরে নারী সম্ভ্রম নষ্টকারী, হত্যাকারী সেইসব ঘৃণিত যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসিই হতে হবে।

 

***

প্রকাশিত: https://www.banglatribune.com, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৪