ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

১.
ঈশ্বর তাকেই সহায়তা করেন, যে নিজেকে সহায়তা করে। ঈশ্বরবাদিতার এই মর্মার্থ নিয়ে একটি প্রচলিত বিদেশি গল্প আছে। নগরে প্রলয় ধেয়ে আসছিল বিধায় প্রশাসন থেকে সতর্ক সঙ্কেত জারি করা হয়। সকলকে নিরাপদে সরে যেতে অনুরোধ করা হয়। এক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে ঈশ্বরবাদী মানেন, কোথাও যেতে অস্বীকার করলেন। তিনি বলতে থাকলেন, যেহেতু তিনি ঈশ্বরবাদী, তাই ঈশ্বরই তাকে উদ্ধার করবেন।

এদিকে প্লাবনে জল বাড়তে থাকলে প্রতিবেশী এসে তাকে উদ্ধার করতে চান। কিন্তু প্রতিবেশীকে ফিরিয়ে দিয়ে লোকটি বলতে থাকেন, ঈশ্বরই তাকে উদ্ধার করবেন। পানি আরও বেড়ে গেছে ততক্ষণে; কোমর অব্দি। একটি ছোট ডিঙ্গি নিয়ে এক ব্যক্তি চিৎকার করে জলাবদ্ধ লোকটিকে ডিঙ্গিতে উঠে আসতে বললে লোকটি ডিঙ্গিওয়ালাকে ফিরিয়ে দিতে দিতে বললেন, কেবলমাত্র ঈশ্বরই উদ্ধার করবেন তাকে। ওদিকে গলা পর্যন্ত পানি উঠে গেছে। লোকটিকে উদ্ধারে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা এল। লোকটি এবারও আহ্বান ফিরিয়ে দিলেন এবং বলতে থাকলেন, ঈশ্বরই উদ্ধার করবেন।

পানি আরও বাড়তে থাকলে লোকটি ঘরের ছাদে উঠলেন। এ সময় একটি হেলিকপ্টার থেকে বিপদগ্রস্ত লোকটিকে দেখে দড়ি নামিয়ে দেওয়া হল। যথারীতি লোকটি এবারও ফিরিয়ে দিলেন সাহায্যের আহ্বান। ঝড়-প্লাবনে ঘর ভেঙে গেলে লোকটিকে জলস্রোত ভাসিয়ে নিল। স্বর্গে ঈশ্বরের সাথে দেখা হল লোকটির। বিস্মিত লোকটি প্রশ্ন করলেন, ঈশ্বর, তুমি তো আমাকে উদ্ধার করলে না? ঈশ্বর গম গম কণ্ঠে বলে উঠেন, মূর্খ! আমি তোমাকে সতর্ক করেছিলাম। প্রতিবেশী পাঠিয়েছিলাম। ডিঙ্গি পাঠিয়েছিলাম। ইঞ্জিননৌকা হেলিকপ্টারও পাঠিয়েছিলাম। এরপরও তুমি আর কী চাও?

২.
তত্ত্বাবধায়ক থিওরি প্রদানকারী নিজেই একসময় তত্ত্বাবধায়ক থিওরির বিপক্ষে বলছেন, এমন কথা গোড়ার দিকে টকশোতে সমালোচনার ছলে তোলা হতো। ভারসাম্য রক্ষায়, এও বলা হত, যিনি তত্ত্বাবধায়কের বিপক্ষে ছিলেন, তিনি পক্ষে আর যিনি পক্ষে ছিলেন তিনি বিপক্ষে। এমন কোনও মুচলেকা কোথাও ছিল না যে, তত্ত্বাবধায়ক নিয়ে যার যা অবস্থান তা আজীবন ধারণ করতে হবে। মত পরিবর্তনের এই গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা দুই নেত্রী অবশ্যই ধারণ করতে পারেন। তবে কে কোন প্রেক্ষাপটে, কী অভিজ্ঞতায়, কী উদ্দেশ্যে মত পরিবর্তন করছেন সেটাকে বিবেচনায় এনে ’টক’ করাটাই হবে যৌক্তিক।

মাগুরা নির্বাচন কেলেঙ্কারি, ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন করে ফ্রিডম পার্টিকে সংসদে বসানো, এবং অপরাপর ইস্যু নিয়ে আওয়ামী লীগ ক্রমান্বয়ে পুরোদস্তুর আন্দোলন আবহ গড়তে সমর্থ হওয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক থিওরি প্রতিষ্ঠা পায়, সাময়িক সমাধান হিসেবে। এই থিওরি ’পরীক্ষিত’ ছিল না বলে দ্রুতই এর ’লুপহোল’–এ কেবল আওয়ামী লীগ বা রাজনীতিবিদেরাও নয়, পুরো জাতিই এক অনাকাঙ্ক্ষিত অধ্যায়ের মুখোমুখি হয়।

এরপর সঙ্গত কারণেই আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি চাইছে না। এই না চাওয়া কেবল আওয়ামী লীগের জন্য নয়, অপরাপর দলের রাজনীতিবিদদের জন্য এবং সর্বোপরি জাতির জন্য মঙ্গলজনক। বিশেষত যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র চলছে, তখন পুনরায় একটি ’লুপহোল বেইজড থিওরি’, যার পূর্ব অভিজ্ঞতা তিক্ত ছিল, তাতে আস্থা রেখে জাতিকে দুর্যোগের মুখোমুখি না করাই বাঞ্ছনীয়। তাই আইনি পদ্ধতিতে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার প্রয়োজনহীনতার রায় একটি সুস্থ রাজনৈতিক পদ্ধতি ছিল। তাছাড়া প্রায় চুয়াল্লিশ বছরের রাষ্ট্রে একটি সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক পদ্ধতিতে নির্বাচন আয়োজনের মানসিকতা গড়ে তোলাও আবশ্যক।

যে উপলব্ধি আওয়ামী লীগের জেগেছিল, সে উপলব্ধি ক্যান্টনমেন্টে জন্ম নেওয়া দল বিএনপি‘র মধ্যে এখনও জাগেনি। যেহেতু আইনি রায় ছিল, তার বিরোধিতা অথবা রায় পুনর্বিবেচনার জন্য আইনমুখী হওয়াই শ্রেয় ছিল বিএনপি’র জন্য। পাশাপাশি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি একটা জনমত গড়ে তোলার কাজ করতেই পারে। এটাই গণতান্ত্রিক পন্থা। কিন্তু এ পন্থা থেকে যোজন দূরে অবস্থানরত একগুঁয়ে বিএনপি জামায়াতের সাথে জোট করে ১৮ থেকে ২০ দলে উত্তীর্ণ হয়ে গণতন্ত্র অন্বেষণের নামে এখন জনগণের শ্বাসরোধ করে দিচ্ছে। পরিস্থিতি চলে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সুশীল সমাজের সাথে গলা মিলিয়ে খোদ ২০ দলীয় নেত্রীও বলছেন এই কথা। যদিও এই বিশেষ ’পরিস্থিতি’কে নিয়ন্ত্রণহীন করার আহ্বান করেছিলেন ২০ দলীয় নেত্রী নিজেই, অবরোধ-হরতাল আহবানের মাধ্যমে। আর শুরু থেকেই এই পরিস্থিতিকে আস্কারা দিয়ে গেছেন কিছু টকশোজীবী, যারা নিজেদের ‍সুশীল সমাজ, নাগরিক সমাজরূপে পরিচয় দেন। মূলত সন্ত্রাসের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নেওয়াটাই ২০ দলের তথাকথিত ’আন্দোলন’ রূপরেখা।

৩.
দেশে ’গণতন্ত্র নেই, গণতন্ত্র নেই’ চিৎকারে ২০ দলে হাহাকার উঠে গেছে। সংলাপ হলে সমস্যার সমাধান হবে এমন বিলাপ এখনও চলছে। এই হাহাকারে দফায় দফায় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে সামিল হচ্ছেন ’জনবিচ্ছিন্ন’ অসংখ্য মুখ। টকশো’র গুরুচণ্ডালি বক্তব্যে জনগণ নিজেদের অধিকার ভুলে একটা ভ্রান্তি নিয়ে রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করছে আর রাজনীতিবিমুখ হয়ে উঠছে। নির্বাচনে অংশ নেওয়াও যে গণতন্ত্র এটুকু না বুঝলে যে কোনও সংলাপ কেবল ব্যক্তিবিশেষের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি করবে। সে গণতন্ত্র জনগণের কোনও কাজে দেবে না।

বস্তুত সংলাপ কার সাথে হবে? সুশীল সমাজ বলছেন, সরকারে থাকা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র সাথে। কিন্তু বিএনপি এখন একক কোনও দল নয়। বিএনপি মানে ২০ দল। ২০ দলে কারা আছে? বিএনপি এবং জামায়াত অঙ্গাঅঙ্গিভাবে ২০ দলের নেতৃত্বে আছে। তাহলে এই সংলাপ কেবল বিএনপি’র সাথে নয়, এই সংলাপ যুদ্ধাপরাধী দল জামাতের সাথেও।

২০ দলের সাথে সংলাপে যেমনটা উদ্যোগী দেখা গেছে নাগরিক সমাজকে, জামায়াতকে বিএনপি ও ২০ দল থেকে বিচ্ছিন্ন করতে তারা উদ্যোগী হননি মোটেও, কেবল হালকা চালে কেউ কেউ বলেন, বিএনপি’কে জামায়াত বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। রাজবন্দিদের মুক্তি চেয়ে ২০ দলীয় নেত্রীর বক্তব্য, বিএনপি’র প্রতি সভায় জামাতের কর্মীদের ভিড়, বিএনপি’র সভায় যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে ব্যানারে-স্লোগানে বিএনপি’র অবস্থান একদমই পরিষ্কার। জামায়াতকে সাথে নিয়ে সংলাপের আহ্বানে সুশীলগণ কোন গণতন্ত্রের পথ দেখাতে চান জাতিকে?

৪.
কিছুদিন আগে টকশো’তে এসে বিএনপি’র এক নেতা বলছেন, গুলশান কার্যালয়ের সামনে ’মিসক্রিয়েন্টস’রা এসে ’লম্ফঝম্ফ’ করছে। গুলশান কার্যালয়ের সামনে যে পরীক্ষার্থীরা অবরোধ বন্ধের দাবিতে দাঁড়িয়েছিল, গণতন্ত্রের ঠুলি আঁটা বিএনপি’র কাছে এরা কি তাহলে ’মিসক্রিয়েন্টস’?

সংলাপবান্ধব টকশোজীবীরা রোজ টকশোতে বলছেন, সরকার ব্যর্থ সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণে। সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে দুর্বৃত্তদের হামলা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়? তাহলে কি বৈশ্বিক সন্ত্রাস বন্ধে আইএস, তালেবান, বোকো হারামের সাথেও সংলাপ করতে হবে! বরং সুশীল সমাজ কি ২০ দলের হরতাল বন্ধে উদ্যোগী হতে পারে না? বেগম খালেদা জিয়ার জন্য ভোটের আয়োজন করতে সুশীল সমাজ যতটা তৎপর ততটা তৎপর কী তাদের দেখা গেছে ১৫ লাখ পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা আয়োজনে?

৫.
সুশীল সমাজ বারবার বলছে, সরকারের দায়িত্ব একটু বেশি। সরকার প্রধানের উচিত সংলাপে এগিয়ে আসা। কেউ কেউ বলছে, একটা ফোন করলে, পুনরায় ফোন করা যাবে না, তা তো নয়। কেউ বলছে, সরকারের যে কোনও পর্যায় থেকেই অাহ্বান আসতে পারে। এই সকল বক্তব্য মূলত নির্ভেজাল প্রহসন। কারণ শিক্ষামন্ত্রীকে প্রতিদিন হাতজোড় করতে দেখা গেছে বিএনপি-বেগম খালেদা জিয়া-২০ দলের কাছে। শিক্ষামন্ত্রীও তো সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যারা আদতেই সংলাপে বসতে চায় তারা শিক্ষামন্ত্রীর অনুনয়ে বিনয় দেখিয়েও এগিয়ে আসতে পারতেন।

গণতন্ত্রবাদী মাননীয় ২০ দলীয় নেত্রী এবং সংলাপবাদী সুশীল সমাজের জন্য শুরুর গল্পটা মনে করিয়ে দিতে হয়। আদালতের রায়টা ছিল সকলের জন্য একটা প্রস্তুতির নির্দেশনা, যাতে কর্ণপাত করলেন না ’গণতন্ত্রবাদীরা’। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অাগে আহ্বান জানানো হয়েছিল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার, সেখানেও সাড়া দেয়নি ২০ দল। প্রধানমন্ত্রী নিজে ফোন করে দাওয়াত দিলেন, হরতাল প্রত্যাহার করতে বললেন, ২০ দলীয় নেত্রী জামায়াত ছাড়া হরতাল প্রত্যাহার ও সংলাপের দাওয়াত কবুল করলেন না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গুলশান কার্যালয়ের ফটক পর্যন্ত এলেন, কিন্তু ফটক ছিল বন্ধ। জনগণ ব্যানারে-ফেস্টুনে অনুরোধ লিখে লিখে রোজ গুলশান কার্যালয়ে দাঁড়াল, কিন্তু ’গণতন্ত্রবাদী’ গুলশান কার্যালয় কাঁটাতারের বেড়ায় নিজেদের ঘিরে নিল।

’গণতন্ত্র, গণতন্ত্র’ জপতে জপতে আদালতের নির্দেশনাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে, নির্বাচনকে বয়কট করা হয়েছে, সংলাপের জন্য বাড়ানো প্রধানমন্ত্রীর হাতও ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, শিক্ষামন্ত্রীর অনুনয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, জনগণের ডাকও উপেক্ষা করা হচ্ছে, এরপর এইসব প্রহসনবাদীরা আর কোন ’গণতন্ত্র’, কোন ’সংলাপ’ প্রত্যাশা করে?

 

***

প্রকাশিত: http://www.banglatribune.com, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫