ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 

যখন থেকে বাংলাদেশ টিম কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে এবং প্রতিপক্ষ হিসেবে ভারত টিম নির্ধারিত হয়েছে, স্নায়ুযুদ্ধ তখন থেকেই। কোয়ার্টার ফাইনালের এই নক-আউট ম্যাচটিকে ঘিরে ছিল নানা প্রস্তুতি, বহুমাত্রিক উত্তেজনা। খেলুড়ে দলের সঙ্গে দেশের পতাকার প্রতিনিধিত্ব জড়িয়ে থাকে বলে দেশপ্রেম বোধ খেলার হারজিতকে ছাপিয়ে ওঠে। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে রাজনীতি, বাণিজ্য, জুয়া, ক্ষমতা। প্রকট হয় আমাদের ভারত বিদ্বেষ, ভারতের বাংলাদেশ বিদ্বেষ। আমরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগে ফিরে যাই। ভারতবর্ষ ভাগে আসি। তারপর ‘৭১ নিয়ে ভার্চুয়াল যুদ্ধে নামি। ভাগ্য ভালো, কোয়ার্টার ফাইনালকে ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূচনা ‘না‘ করার মতো বোধবুদ্ধিসম্পন্ন আমরা দু’পক্ষই। তবে বাক্যবাণে জন্ম জাতপাত ভাষাকে ছাড় দিচ্ছেন না কোনও পক্ষই। খেলা কেবল আর খেলার উত্তেজনায় রইল না। হারজিত কেবল আর ‘স্পোর্টিং স্পিরিট’ দিয়ে মাপা যাচ্ছে না। বোঝা যাচ্ছে আগামীতে বাংলাদেশ-ভারতের যেকোনও ম্যাচ ‘ইগোসেন্ট্রিক’ ম্যাচ হবে। বোঝা যাচ্ছে আগামীতে বাংলাদেশ-ভারতের যেকোনও ম্যাচের হার ও জিত কঠোর ’প্রেস্টিজিয়াস’ হয়ে উঠবে। বোঝা যাচ্ছে আগামীতে বাংলাদেশ-ভারতের যেকোনও ম্যাচকে ঘিরে বিজ্ঞাপন ব্যবসা জমজমাট হবে।

দুপক্ষের প্রতিক্রিয়ার অতিরঞ্জন নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ আলাপের আরও দিক থাকলেও, গতকাল কোয়ার্টার ফাইনাল খেলার পর বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচ এই দুদেশের সমর্থকদের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক চর্চা হয়ে উঠেছে। এর কারণ, ভারতের জয় নয়, এর কারণ বাংলাদেশের হার নয়। পুরো ম্যাচটির গভর্নেন্সে থাকা আম্পায়ারের ও বিশ্বকাপ আয়োজক আইসিসি’র নীতিমালার নৈতিকতা একযোগে ক্রিকেটভক্ত ও ক্রিকেটবোদ্ধাদের হৃদয়ে সূচের মতো বিঁধছে।

ক্রিকেট বহু আগেই করপোরেট হয়েছিল। আমরা আইপিএল, বিপিএলকে স্বীকার করেও নিয়েছি। ক্রিকেটারদের নিলাম অনুষ্ঠানকে ঘিরে আমাদের আগ্রহ থাকে। তার মানে ক্রিকেট-করপোরেটকরণ সম্পর্কে আমরা জ্ঞাত। আমাদের সাকিব আল হাসানকে যখন কোলকাতা নাইট রাইডার্স কিনে নিয়ে যায়, আমরা গর্বিত হই। সাকিবের কারণে পুষে রাখা ভারত বিদ্বেষ ভুলে আমরা শাহরুখ খানের দল কোলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে হর্ষধ্বনি দিয়েছি। অর্থ্যাৎ ক্রিকেটের বাণিজ্যিকিকরণ আমাদের মাঝেও চর্চিত। কিন্তু বাণিজ্যিকিকরণ যে কখনও আমদের ন্যায্য প্রাপ্তি কেড়ে নিতে পারে, তা নিয়ে আমাদের মানসিক প্রস্তুতি ছিল না।

আম্পায়ার যদি অনিচ্ছাকৃত ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তাহলে হিসাবটা একরকম। অযোগ্য আম্পায়ারকে মাঠে দায়িত্ব দেওয়ার দায় আইসিসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিতে হবে। আর যদি আম্পায়ার ইচ্ছাকৃত ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তাহলে ক্রিকেটকে ঘিরে আন্তর্জাতিক জুয়ার আসরের অথবা বিজ্ঞাপন ব্যবসার প্রভাবে বিশ্বকাপ আয়োজক ও আম্পায়াররা ব্যবসামুখী বিশ্বকাপ উপহার দিতে এই ম্যাচের ফলাফল নির্ধারণ করেছে কি না, সেটার তদন্ত ও শাস্তি হতে হবে।

এখন পর্যন্ত ম্যাচে আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্ত অথবা পক্ষপাতিত্ব অথবা বাজে আম্পায়ারিং নিয়ে অসংখ্য মন্তব্য, কলাম, টুইট, ফেসবুক স্ট্যাটাস রয়েছে। ক্রিকেটবোদ্ধাদের মধ্যে সাবেক ক্রিকেটারদের অধিকাংশই স্বীকার করছেন, মাঠে বাংলাদেশ টিমের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ হয়নি। গ্যালারিতে একজন ক্ষুব্ধ দর্শক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ’ইনডিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল’ প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে ধরেছিল। একই সুরে আইসিসি’র দিকে সমালোচনার তীর ছুঁড়েছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সাবেক ক্রিকেটাররাও।

মজার বিষয় হলো আইসিসিকে ’ইনডিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল’ সম্বোধন করে মন্তব্য করেছেন এই প্রতিষ্ঠানেরই সভাপতি আ হ ম মুস্তফা কামাল। তার এই বক্তব্য বিভিন্ন পত্রিকার প্রকাশিত হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে আইসিসি থেকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতিও এসেছে। আইসিসি আম্পায়ারের সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত অভিহিত করেছে এবং আইসিসি’র একজন সদস্য হওয়ার পরও এই বোর্ডের বিরুদ্ধে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে তারা মুস্তফা কামালকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে।

মুস্তফা কামালের বক্তব্যটি যদিও চমকপ্রদ ছিল, কিন্তু বাস্তবিকভাবে তা কতটা বস্তুনিষ্ঠ ও কার্যকর মন্তব্য, তা বোধগম্য নয়। আইসিসি যদি ’ইনডিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল’ হয়ে থাকে, তাহলে আইসিসি’র গভর্নিং বডির ১১তম সভাপতি হিসেবে এই দায়ভার তো তার ওপরও বর্তায়।

মুস্তফা কামাল আরও বলেছেন, তিনি প্রয়োজনে পদত্যাগ করবেন। তার এ বক্তব্যে ধরে নেওয়া যায়, আইসিসির মতো প্রতিষ্ঠানে তার সভাপতি পদে থাকা অথবা না থাকা প্রতিষ্ঠানটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এমন গুরুত্বপূর্ণ পদমর্যাদার একজন ব্যক্তি যখন ওই প্রতিষ্ঠানের বিপক্ষে মত দেন, তখন ধরে নিতে হয়, তিনি কেবল আবেগে নয়, কোনও তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে বলছেন। নতুবা মুস্তফা কামালের পদত্যাগ ক্রিকেটে, মাঠে, আইসিসি’র নীতিমালায় কী পরিবর্তন আনতে সক্ষম?

মুস্তফা কামাল বিষয়ে ক্রিকেট ফ্যানদের দুঃসহ এলার্জি আছে। বিষয়টি নিশ্চয় মুস্তফা কামালও অনুভব করেন। যদিও হ্যাপী-রুবেল ঘটনায় রুবেলকে বিশ্বকাপ আসরে নিশ্চিত করণে তিনি সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করেছিলেন, সে তো ক্রিকেটপ্রেমীদের মন পেতেই। তার (এবং বিসিবির) সেই প্রচেষ্টা কতটুকু ’নৈতিকভাবে’ ছিল সে বিষয়ে ইতিপূর্বে বাংলাট্রিবিউনে প্রকাশিত আমার দু’টো কলামে সন্দেহ পোষণ করেছি। আইসিসি নিয়ে মুস্তফা কামালের গ্যালারির উত্তেজিত দর্শকের মতো চটজলদি মন্তব্যগুলোয় পুনরায় মনে হয়েছে তিনি কার্যকরী পদক্ষেপের চেয়ে ক্রিকেট ফ্যানদের মাঝে নিজের ‘পাবলিসিটি’ অর্থাৎ জনপ্রিয়তা বাড়ানোর এক নাটকীয় চেষ্টা করছেন।

প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিদের প্রতিবাদ ও আবেদনের কিছু আচরণগত নিয়ম থাকে। মুস্তফা কামাল যদি মাঠের ঘটনাটিকে সেই পদ্ধতিতে আইসিসি বরাবর উপস্থাপন করেন, তবে ম্যাচের ফলাফলে কোনও পরিবর্তন না হলেও অন্তত দুঃখপ্রকাশ ও আগামীর খেলায় কীভাবে ভুল সিদ্ধান্ত এড়ানো সম্ভব, সে বিষয়ে সতর্ক হওয়ার দিকগুলো উত্থাপিত হতে পারে। হয়ত এ প্রস্তাবনায় নীতিনির্ধারকের ভূমিকা রাখতে পারেন খোদ মুস্তফা কামালই।

এত ক্ষোভ, এত হতাশা, এত অভিযোগ উচ্চারিত হচ্ছে চারদিকে, কিন্তু তিনদিন পরেও বিসিবি থেকে লিখিত কোনও আবেদনপত্র জমা পড়েনি আইসিসি’র টেবিলে। বিসিবি সবে বলা শুরু করেছে, আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ পাঠাবে। এ বিষয়ে বিসিবি পরবর্তী সভায় সিদ্ধান্ত নেবে। বিসিবির সেই পরবর্তী সভা কবে হবে? যেকোনও পরিস্থিতিতে ‘ইমার্জেন্সি মিটিং’ আয়োজনের চর্চা কেন নেই বিসিবির? ডিজিটাল বাংলাদেশে বিসিবি তো ভিডিও কনফারেন্সেও সভা আয়োজন করে প্রতিবাদলিপি রচনার কাজ করতে পারে।

বিসিবি জানিয়েছে, রিভিউ-এর সুযোগ নেই, তবে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদলিপি পাঠানো হবে। এতে সমস্যা নেই। কারণ জরুরি বিষয়টা হলো, মাঠে খেলার যে অংশে আম্পায়ার কর্তৃক ’ত্রুটি’ হয়েছে বলে ক্রিকেট বোদ্ধাদের অভিযোগ রয়েছে, সে অংশগুলোকে তারকা চিহ্নিতকরণ।

আমরা ব্যাখ্যা চাই, ‘ফুলটস’ বলকে ‘নো বল’ চিহ্ণিত করার এই নীতিমালা কবে থেকে প্রযোজ্য? ক্রিকেটার-কোচগণ কি এই রকম নো বলের সংজ্ঞা সম্পর্কে জ্ঞাত? ইতিপূর্বে কোন খেলায় এমন পজিশনের বলকে ‘নো বল’ ধরা হয়েছে?

আমরা ব্যাখ্যা চাই, কেন ছক্কার বদলে আউট ঘোষিত হয়েছিল?

আমরা ব্যাখ্যা চাই, কেন টিভি রিপ্লেতে জুম করে দেখানো হয়নি বলের অবস্থান? হাতের অবস্থান? পায়ের অবস্থান? বাউন্ডারি সীমানার অবস্থান?

আমরা ব্যাখ্যা চাই, কেন থার্ড আম্পায়ার সঠিকভাবে ছক্কা, নো বল বিশ্লেষণ করলেন না?

বিসিবি কেবল আনুষ্ঠানিকতার খাতিরেই আবেদন করবে না আশা করি। প্রতিটি পর্যবেক্ষণের ক্রিয়েটীয় কারিগরি দিক ও সপক্ষের যুক্তি প্রতিবাদলিপিতে লিখিত না হলে, এই কাগুজে প্রতিবাদ কোনও অর্থ বহন করবে না।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সাবেক ক্রিকেটার ও ক্রিকেট বিশ্লেষকদের সব পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্যগুলোকেও প্রতিবাদলিপিতে ব্যবহার করা উচিৎ বিসিবির। মুস্তফা কামাল বলেছেন, তিনি আইসিসির পরবর্তী সভায় ম্যাচের পক্ষপাতিত্ব প্রসঙ্গ উত্থাপন করবেন। আশা করি, তিনিও অভিযোগ, যুক্তি ও আন্তর্জাতিক মহলের মন্তব্যগুলোকে আইসিসির সেই সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে ও জোরালোভাবে পাঠ করবেন। ধরে নিচ্ছি, এর মধ্যে অবশ্যই বিসিবিও তাদের প্রতিবাদলিপি পাঠানোর কাজটি সম্পন্ন করবেন।

এই প্রতিবাদলিপি ম্যাচের ফলাফল পুননির্ধারণে জরুরি নয়। এই প্রতিবাদলিপি ও আইসিসির পক্ষ থেকে যুক্তিখণ্ডন অথবা ভুল স্বীকারে জরুরি, যেন আগামীতে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব না হয়। ক্রিকেটে আমরা খেলে হারব, খেতে জিতব। হার-জিত নিয়ে কোনও পক্ষের সঙ্গে অমানবিক রাজনীতি, অনৈতিক বাণিজ্য ও জাত-দেশ-ভাষা বিদ্বেষ যেন না হয়। এতবড় আয়োজনে কেবল ভুল সিদ্ধান্তের কারণে একটা খেলুড়ে দলের স্কোরবোর্ড উল্টে যাবে, এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন আগামীর কোনও আসরে না হয়।

 

***
প্রকাশিত: বাংলাট্রিবিউন, মার্চ ২২, ২০১৫