ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

এবারের ক্রিকেট বিশ্বকাপে ক্রিকেটভক্তরা ‘স্পোর্টিং স্পিরিট’ এর ধার দিয়েও যায়নি। আলিম দার পাকিস্তানি হওয়ার পরও পাকিস্তান বিদ্বেষ যখন আমদের মধ্যে দৃশ্যমান হয়নি, তখন সন্দেহ জাগে মাঠের খেলাকে পুঁজি করে ভারত বিদ্বেষকে চাঙ্গা করতে নিশ্চয়ই কোনও মহলের বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল। ‘বিদ্বেষ-বিদ্বেষ’ খেলাটা উত্তেজনাকর রূপ নেয় দু’দেশের সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং স্ফিয়ারে। এপার বাংলার সঙ্গে ওপার বাংলার একটা অম্লমধুর যোগাযোগ আছে। খেলাকে কেন্দ্র করে সেটা তিক্ততাতে রূপ নেয়। এতে ইতিবাচক-নেতিবাচক, পক্ষে-বিপক্ষে শিরোনাম তৈরি হয়েছে দু’পক্ষ থেকেই।

আসলে সংবাদটা হওয়ার কথা ছিল তখনই যখন বাংলাদেশি ব্যান্ড মাইলস-এর ড্রামার জিয়াউর রহমান তুর্য একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস শেয়ার দিয়ে লিখেছিলেন ‘বিচ প্লিজ…লে অফ’। কিন্তু সংবাদটা তখন হলো, যখন ওপার বাংলার কণ্ঠশিল্পী রূপম ইসলাম তেতে উঠেছিলেন। তুর্য ভারতীয় রূপসা দাসগুপ্তকে ‘বিচ প্লিজ’ বললে মিডিয়া নিশ্চুপ ছিল, কিন্তু রূপম ‘ছোটলোক’ বলতেই সেটা বাংলাদেশের অপমান দেখিয়ে মিডিয়া সরব হয়ে উঠল। বাংলাদেশের প্রায় সবকটি পত্রিকার জায়গা জুড়ে থাকলেন রূপম। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিংয়ে চলতে থাকলো রূপমের পিণ্ডি চটকানো। শেষে নাকে খত দিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে তবেই শেষ রক্ষা হলো রূপমের। তখনই রূপমের ব্যাখ্যা থেকে বেরিয়ে এলো মাইলস ব্যান্ডের ড্রামার তুর্যের স্ট্যাটাস প্রসঙ্গটি। জিয়াউর রহমান তুর্য স্ট্যাটাস শেয়ার দিয়ে ইংরেজিতে লিখেছিলেন ‘বিচ প্লিজ…’ অার সেই রূপসা দাসগুপ্ত হচ্ছেন রূপমের স্ত্রী।

রূপমের এই ব্যাখ্যার আগ পর্যন্ত সবাই রূপমের পূর্বের বক্তব্যকে ফেসবুকে শেয়ার দিয়ে বিরামহীন লিখে যাচ্ছিলেন ’এই হলো ভারতীয়দের চরিত্র’! রূপমের ব্যাখ্যা প্রদানের পর তাতে ভাটা পড়ল। পাশা উল্টে গেছে দেখে সবাই চুপটি করে রইলেন ততক্ষণ, যতক্ষণ না জিয়াউর রহমান তুর্য তার আরবান ডিকশনারির ঝাঁপি খুলে বসলেন। জিয়াউর রহমান তুর্যকে হয়ত বাংলাদেশের অনেকেই তেমন চেনেন না, সম্ভবত এ কারণেই জিয়াউর রহমান তুর্য তার ইংরেজি পাঠের লেকচারার হিসেবে হাজির করালেন মুখচেনা শাফিন আহমেদকে।

জিয়াউর রহমান তুর্য এবং শাফিন আহমেদ আমাদের পরিচিত করালেন একটি আরবান সোসাইটির সঙ্গে। যেখানে তারা ’বিচ প্লিজ’কে একটি শহুরে রীতি হিসেবে দেখেন। আত্মপক্ষ সমর্থনে তাদের বক্তব্যের সঙ্গে অনলাইনের আরবান ডিকশনারি থেকে ‘কপি-পেস্ট’ করে কয়েকটি ইংরেজি লাইনও জুড়ে দিলেন তারা। হিন্দিতে জনপ্রিয় একটি কথা আছে, ’আংরেজ চ্যালে গেয়ে, আংরেজি ছোড় গেয়ে।’ কথাটির চল বাংলাতেও রয়েছে। তুর্য-শাফিনের ’আরবান’ ইংরেজি থেকে ওই চালু কথাটিই মনে পড়ে বারবার।

ফেসবুকে, সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক কিছুই স্ক্রল করতে করতে নজরে আসে। জরুরি নয়, অনলাইনের সব ট্রেন্ডকে স্বাগত জানাতে হবে কিংবা এর চর্চা নিত্য-জীবনের অংশ করে নিতে হবে। তুর্য-শাফিন এবং তার অনুসারীরা আরবান ডিকশনারির ধরন সম্পর্কে কতটা জ্ঞান রাখেন?

গুগলে ‘হোয়াট ইজ আরবান ডিকশনারি’ লিখে সার্চ দিলে আরবান ডিকশনারি ওয়েবসাইটের একটি লিংক আসে, যেখানে স্পষ্ট করে লেখা আছে, স্ল্যাং (গালি) হচ্ছে এই ওয়েবসাইটের একমাত্র উপজীব্য এবং আরবান ডিকশনারি হচ্ছে একটি ’স্ল্যাং অনলাইন ডিকশনারি’। ১৯৯৯ সাল থেকে প্রকাশিত এই ওয়েবসাইটি মূলত ’ইনফরমাল’ শব্দ ও প্রবাদ ভাণ্ডার গড়ে তুলতে শুরু করে, যার অধিকাংশই ’স্ট্রিট ল্যাংগুয়েজ’ থেকে অনুপ্রাণিত।

আরবান ডিকশনারি নিয়ে আইবিএম (IBM) একবার বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিল। সুপার কম্পিউটার ওয়াটসনকে শেখানো হয়েছিল আরবান ডিকশনারি। কিন্তু একটি অনুষ্ঠানে ওয়াটসন বারবার ’বুলশিট’ বলতে থাকলে আরবান ডিকশনারি মুছে ফেলাই যুক্তিযুক্ত মনে করা হলো। যেভাবে বাচ্চাদের মুখ সাবান দিয়ে ধুয়ে-মুছে দেন মা-বাবা, সেভাবেই ওয়াটসনের মেমোরি ক্লিন করা হয়েছিল। এমনকি বাড়তি ফিলটারও যুক্ত করা হয়েছিল। ওয়াটসন মূলত পোলাইট ল্যাংগুয়েজ আর প্রোফেনিটি (Profanity) এর মধ্যে পার্থক্য করতে পারছিল না, যেমন করে তুর্য-শাফিনও ’সৌজন্যমূলক’ শব্দ ও ’অশালীন’ শব্দের মধ্যে পার্থক্য খুঁজে পেতে অপারগ হন।

‘বিচ প্লিজ’ অনলাইনে উঠে এসেছিল বাস্কেটবল প্লেয়ার ইয়াও মিংয়ের মুখচ্ছবির জনপ্রিয় কমিক অঙ্কন সংস্করণের সঙ্গে কমেন্ট আকারে যুক্ত হয়। তাই বলে ‘বিচ প্লিজ’ মোটেও নির্মল মজার কোনও শব্দ নয়। এর শব্দগত উৎসও তাই বলে। ‘বিচ, প্লিজ’ (কমা যুক্ত) অথবা ’বিচ প্লিজ’ (কমা বিযুক্ত) – আরবান ডিকশনারিতে এই দুইয়ের যে বর্ণনা পাওয়া যায় তাতে এই শব্দটি নারীর উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। অপমান, অবমাননার জন্যই বাক্য বা কথপোকথনের শুরুতে ব্যবহৃত হয়। ‘বিচ প্লিজ’ এর প্রায় সমার্থক আরেকটি শব্দ হচ্ছে ‘নিগা প্লিজ’, যা ইংরেজিতে প্রায় সবক্ষেত্রেই লেখা হয় ‘N*gga Please’ । ‘নিগা’ এসেছে ’নিগার’ থেকে। আরবান ডিকশনারিতে ‘নিগার’ হচ্ছে গলায় দাসত্বের শৃঙ্খল বাঁধা কালো মানুষ। আর ’নিগা’ হচ্ছে, গলায় স্বর্ণের চেইন পরিহিত কালো মানুষ। নিগ্রোদের প্রতি কৌতুক অর্থে, যা বস্তুত ‘অফেনসিভ’, ব্যবহৃত হতে হতে ‘N*gga Please’ এর চল হয়েছে।

শুধু ‘বিচ’ এবং ‘বিচ প্লিজ’ এত বেশি ভিন্ন অর্থবোধক নয়। এসব শব্দের ব্যবহার আসলে অনলাইন এর বহু আগে থেকেই। ’৭০ দশকে পাশ্চাত্যের পতিতাবৃত্তি বলয়ে এ ধরনের শব্দের ব্যবহার করা হতো মূলত। এ ধরনের উচ্চারণ ‘ভায়োলেন্স’ ও নেতিবাচক উত্তেজনাকর পরিবেশ সৃষ্টিতে উস্কানি দিয়ে থাকে।

জিয়াউর রহমান তুর্য তো নিজের প্রতিক্রিয়া অশালীন ও আপত্তিকরভাবে ফেসবুকে লিখেছিলেন, উপরন্তু বিষয়টি নিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা না করার উন্নাসিকতা দেখিয়ে নিজের প্রকট অসৌজন্যতাবোধের প্রমাণ দিয়েছেন। রূপসা দাসগুপ্ত তার ফেসবুক স্ট্যাটাসের শেষাংশে বিরক্ত হয়ে লিখেছিলেন, ‘কান্ট ওয়েট টু আনফ্রেন্ড দিইজ ইডিয়টস’। ফেসবুকে তর্কাতর্কি হলে, কারও অযৌক্তিক আচরণে বিরক্ত হলে তাকে আনফ্রেন্ড করার ফেসবুকরীতি আছে। কারও প্রতি বিরক্ত হলে ‘ইডিয়ট’ বলাটাও আমাদের সবার মধ্যে চর্চিত। ইডিয়ট শব্দের অর্থ বোধবুদ্ধিহীন অথবা বোকা। কারও ওপর বিরক্ত হয়ে তাচ্ছিল্য করে ‘ইডিয়ট’ বলা হলেও, এটি ‘অশালীন’ কোনও শব্দ নয়। এটি বিশেষভাবে নারী বা পুরুষ অবমাননাকর কোনও শব্দ নয়। রূপসা দাসগুপ্ত তার ফেসবুক বন্ধু তালিকার কারও কারও, যাদের মধ্যে বাংলাদেশি থাকতেই পারে, আচরণে বিরক্ত হয়ে তাদের আনফ্রেন্ড করতে চাইছেন। রূপসা দাসগুপ্তের কথায় এর বাইরে জাতিগত বিদ্বেষ ছিল না মোটেও। রূপসা দাসগুপ্ত কাকে আনফ্রেন্ড করবেন এ ব্যাপারে জিয়াউর রহমান তুর্য থেকে অনুমতি নিতে হবে কি! নাকি বাংলাদেশিদের ফেসবুক ফ্রেন্ড করলে তাদের আনফ্রেন্ড করা অপরাধ!

তুর্যের ’বিচ প্লিজ‘ –এ ক্ষিপ্ত হয়ে রূপম ইসলাম যে প্রতিক্রিয়া দেন তাতে বাংলাদেশকে নতুন পাকিস্তান বলাতে তুর্য নিজেকে দেশপ্রেমিকরূপে উপস্থাপনে রূপমের এরূপ প্রতিক্রিয়ায় আপত্তি তোলেন। জিয়াউর রহমান তুর্য যদি ড্রাম, ক্রিকেট, ফেসবুক ও আরবান ডিকশনারির বাইরে আর কিছু নিয়ে খোঁজখবর রাখেন তাহলে জানবেন, ‘বাংলাদেশটা পাকিস্তান হতে চলেছে’ এমন উৎকণ্ঠা অনেকের মধ্যেই বিরাজমান। মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে বাধাগ্রস্ত করার প্রক্রিয়া – এসব মিলিয়ে দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা যখন নিবন্ধ লেখেন, টকশো করেন, তাদের বহুজন সরকার, প্রশাসন, মিডিয়াকে এই আশঙ্কার কথা তুলে সতর্ক করেন। রূপমের ওই কথাতে তাই বিশেষভাবে জাতিগত অবমাননা খুঁজে পাওয়া যায় না, তবে অনেকের আচরণের প্রেক্ষিতে তার ক্ষোভ ও বিস্ময়কে স্পষ্ট দেখা যায়।

পাশ্চাত্যের সিনেমাগুলোতে দুটো ’বিশেষ’ শব্দ (স্ল্যাং) ডালভাতের মতো উচ্চারিত হয়। এটাও নিশ্চয়ই ওদের আরবান চর্চা। ভারতীয় সিনেমাতেও সেই শব্দের ব্যবহার অল্পবিস্তর হয়। অধিক হারে হলে সেন্সর হয়ে শুধু থেকে যায় ’বিপ বিপ’। আমাদের দেশে এসব শব্দ সরাসরি কাউকে উদ্দেশ করে লেখার শহুরে রীতি একেবারে বিরল।

আরবান ও শহুরে রীতি বলে ’বিচ প্লিজ’ এর মতো স্ট্রিট ল্যাংগুয়েজকে ‘জাস্টিফাইড’ করার একটি নিন্দনীয় চেষ্টা জিয়াউর রহমান তুর্য ও শাফিন আহমেদ করেছেন। তারা কোন শহরে ও কোন ’আরবান’ সোসাইটিতে বাস করেন তা ভেবে শংকিত হতে হয়। তাহলে কি জিয়াউর রহমান তুর্য ও শাফিন আহমেদের পরিবারের নারীদেরও যে কেউ এভাবে সম্বোধন করেন? তুর্য -শাফিনের যুক্তি মেনে তাদের পরিবারের নারীদেরও ’বিচ প্লিজ’ বললে, ধরে নিচ্ছি তারা বিষয়টাকে শহুরে রীতি মোতাবেক স্বাভাবিকভাবেই নেবেন!

জিয়াউর রহমান তুর্য ও তার সাফাইয়ে শাফিন আহমেদ অত্যন্ত অনায্যভাবে জাতি বিদ্বেষ উস্কে ফ্যানদের সিমপ্যাথি ও সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের মিডিয়ার একটি প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ও তিনি পেয়েছেন বলে মনে করা যায়। আমাদের জানা উচিৎ দেশপ্রেম শুধু আমাদের কপিরাইটকৃত আবেগ নয়। প্রত্যেক দেশের নাগরিকের নিজ দেশের প্রতি দেশপ্রেমবোধ রয়েছে। সেটাকে সম্মান করতে ’না’ পারাটা হচ্ছে অসৌজন্যতা, অভদ্রতা ও অশালীনতা।

 

***

প্রকাশিত: ০৪ এপ্রিল ২০১৫, বাংলাট্রিবিউন ডটকম