ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

১.

দিল্লিতে ২০১২ সালে জ্যোতি সিংয়ের ধর্ষণ ঘটনায় জনতা ফুঁসে উঠেছিল প্রশাসনের বিরুদ্ধে। দিল্লিতে জাতীয় নির্বাচনের অাগে বিজেপি তাদের নির্বাচনি প্রচারণায় ঘটনাটিকে ব্যবহার করে পাবলিক সেন্টিমেন্টকে মোদির পক্ষে নিতে।

মোদির পক্ষে নির্মিত ‘নারী সুরক্ষা’ শিরোনামে ৪০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও প্রচারণায় মায়ের চরিত্রে একজন নারী বলেন, ‘তিনি মেয়েকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিক্ষিত করেছেন, তবু ভয়ে থাকেন মেয়েটি কখন বিপদের মুখে পড়ে।’ ভিডিওর শেষভাগে নারীটি শঙ্কিত কণ্ঠে বলেন, ‘আঁখির কার কেয়্যা রেহে হ্যায় ইয়ে সারকার? হামারি বেটিওকো সুরকষা না দেপানেওয়ালো… জানতা মাফ নেহি কারেগি’। ভিডিওচিত্রের এই বক্তব্যটি কংগ্রেস সরকারের উদ্দেশেই ছিল। দিল্লি ধর্ষণের সেই ঘটনাটির প্রভাব কিছুটা হলেও কংগ্রেস দলের নির্বাচনে ভরাডুবিতে ভূমিকা রেখেছিল।

দিল্লি ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেবল জনতাই প্রতিবাদে নেমেছিল, তা নয়। ভারতের সংসদে নারী সদস্যরাও ক্ষোভ প্রকাশে জোরালো ভূমিকায় ছিলেন। ঘটনার পর সংসদে দাঁড়িয়ে সুষমা স্বরাজ ধর্ষকদের ফাঁসি দাবি করেন। তিনি প্রশ্ন করেন, দিল্লি পুলিশের ভূমিকা নিয়ে। তিনি প্রশ্ন করেন, সরকারের ভূমিকা নিয়ে। তিনি জানতে চান, অপরাধীদের শাস্তি প্রদানে এবং এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, তা নিশ্চিত করতে সরকার কী ব্যবস্থা নিচ্ছে?

একজন নারী সাংবাদিককে যৌন হয়রানি করার ঘটনার নিন্দা জানিয়ে রাজ্যসভায় বক্তব্য রাখেন জয়া বচ্চন। স্পিকার তাকে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়ায় জয়া বচ্চন উষ্মা প্রকাশ করে জানিয়েছিলেন, ‘যখনই নারী প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়, তখনই এমনটা ঘটে।’ নির্ভয়া তথ্যচিত্রের নিষিদ্ধ প্রসঙ্গে সাংসদ আনু আগা বলেছিলেন, ‘… পুরুষেরা নারীকে মর্যাদা দেয় না। এবং যখনই কোনও ধর্ষণ হয়, দোষ দেওয়া হয় নারীকে, নারী শালীন পোশাকে ছিল না, নারী পুরুষটিকে উত্তেজিত করেছিল…’।

বিজেপি সরকারের লোকসভা সাংসদ কিরন খের ধর্ষণ ও ধর্ষকামী মানসিকতার প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিলেন সংসদে। স্পিকার পর্যাপ্ত সময় দিতে না চাইলে কিরন খের আবেগতাড়িত হয়ে বলেছিলেন, ‘টু মিনিটস ম্যাম! দিস ইজ ভেরি ক্লোজ টু মাই হার্ট’। কিরন খের সামজিক মানসিকতাকে দোষারোপ করেন। তিনি দোষারোপ করেন পুরুষ সমাজকে। তিনি দোষারোপ করেন মায়েদেরও, যারা কন্যা সন্তানটিকে কেবল ঘরকন্যা হতে শেখান এবং তার জন্য সান্ধ্যআইন জারি রাখেন। কিরন খের প্রশ্ন করেন, ‘যে নারীরা বোরকা পড়েন, ঘোমটা দিয়ে চলেন, তাদের কি ধর্ষণ করা হচ্ছে না? কেবল জিন্স পরিহিতারাই কি ধর্ষিত হচ্ছে?’ কিরন খের স্পস্ট করে এও বলেন, ‘ধর্ষণের সঙ্গে জিন্সের কী সম্পর্ক?’ মানসিকতার উন্নতিকরণে বিদ্যালয়গুলোয় বিশেষ শিক্ষামূলক ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রস্তাবও রাখেন তিনি।

২.

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ব্যবস্থায় বর্তমানে ৫০টি সংরক্ষিত আসন রয়েছে নারীদের জন্য। আসনগুলো সরকার ও বিরোধীদলগুলোর মাঝে আনুপাতিক হারে বণ্টন করা হয়। পাশাপাশি, সংসদে প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা একজন নারী। সংসদের স্পিকার একজন নারী। ২০ দলীয় জোটের প্রধান শরিক বিএনপির চেয়ারপারসন একজন নারী। সর্বোপরি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একজন নারী। নারী ক্ষমতায়নের এমন চমৎকার চিত্র বাংলাদেশেই বিদ্যমান হওয়ার পরও এ সমাজে নারীমুক্তি ঘটেছে কি? নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে কি?

আমাদের দেশে বারবার নারীর পোশাক নিয়ে কথা হয়। হিজাব নিয়ে কথা হয়। উৎসবে-পার্বণে নারী উপস্থিতিকে অনুৎসাহিত করে কথা হয়। গার্মেন্টসে অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ে– পুরুষের সঙ্গে নারী সহকর্মী ও সহপাঠী হিসেবে থাকলে শফি হুজুর তাতে ধর্মের নামে কুমন্ত্রণা দেন। শফি হুজুরের মুরিদরা তার ডাকে নেমে পড়েন, পথে-পথে নারীদের আটকে পর্দাপুসিদার সবক দিতে। এসব নারী হয়রানি নিয়ে একযোগে সংসদ কাঁপিয়ে প্রতিবাদ করেছেন কি নারী সাংসদরা?

সাংসদ হিসেবে কেবল সরকারি সুবিধা নেওয়া এবং সংসদীয় নিয়ম মোতাবেক কোনও প্রস্তাব উত্থাপন করাই তো আর নারী সাংসদ পদের কাজ নয়। নারীর প্রতি কুসংস্কার নিরসনে একজন নারী সাংসদ যদি দুটো কথা ঝেড়ে নাই বলেন, তবে মূল্য কী এই নারী ক্ষমতায়নের? দায়িত্বহীন এবং কাণ্ডজ্ঞানহীন প্রক্টরের অপসারণ চেয়ে নারী সাংসদরা কি একটিবার সংসদ ওয়াকআউট করতে পারেন না?

আমরা চাই, ভারতের কিরন খেরের চেয়েও আবেগ তাড়িত কণ্ঠে, ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বাংলাদেশের নারী সাংসদরা নারী স্পিকারের কাছে বারবার সময় চেয়ে নিয়ে বলুক, নারী তার পোশাকে উলঙ্গ নয়, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মানসিকতাই উলঙ্গ। আমাদের নারী সাংসদরা কি শফি হুজুরকে চটাতে চান না? কেন তারা বলেন না স্পষ্ট স্বরে, ‘হিজাব পরতে নারীকে বাধ্য করা যাবে না।’ কেন তারা নারী প্রতিনিধি হয়ে সংসদে বলেন না- ‘নারী নাভির নিচে শাড়ি পরলে, ঘোমটাহীন চললে, জিন্স-টিশার্ট পড়লেই তাকে ধর্ষণ করা জায়েজ হয় না।’ কেন তারা ক্রমাগত নারী অবমাননাকর বক্তব্যের জন্য শফি হুজুরের আইনি শাস্তি চেয়ে সংসদে দাবি তোলেন না?

নারীর প্রতি যৌন সন্ত্রাস বর্তমানে এক অদ্ভুত এবং উদ্ভট রূপ নিয়েছে ধর্মের নামে। এর আক্রমণ থেকে নারীকে মর্যাদার সঙ্গে রক্ষা করতে হবে। পরিবারে ও সমাজে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। অবশ্যই নারীকে হতে হবে শারীরিকভাবে সামর্থবান। কোনও নারী সাংসদ কি জোর গলায় সরকারের কাছে প্রশ্ন করেছে, ‘ধর্মের নামে নারী লাঞ্ছনা বন্ধে সরকার কী করেছে?’ কোন নারী সাংসদ কি সমালোচনা করে বলেছেন, ‘কেন পুলিশ নির্বিকার থাকে? কেন ঢাবি উপাচার্য নিষ্ক্রিয় থাকেন?’

কোনও নারী সাংসদ কি সংসদে তাগাদা দিয়েছে, ‘স্কুল পর্যায় থেকে নারীর জন্য শরীরচর্চা ক্লাসে কারাতের মতো আত্মরক্ষামূলক কৌশলগুলো বাধ্যতামূলক হিসেবে কেন যুক্ত হচ্ছে না?’

নারী সাংসদরা নারী সমাজেরও প্রতিনিধি। জাতি লজ্জিত হচ্ছে বারবার নারীর সঙ্গে ঘটে চলা যৌন সন্ত্রাসে। নারী সাংসদদের নিষ্ক্রিয়তা সেই লজ্জাকে বাড়িয়ে তোলে। নারীর কথা বলতে সংসদে নারী সাংসদদের এগিয়ে আসতে হবে। গলা ছেড়ে প্রতিবাদ করতে হবে, পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে, ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে, নিষ্ক্রিয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে। তবেই দেশের নারী ক্ষমতায়নকে উপলব্ধি করা যাবে ।

জাগো নারী সাংসদেরা, জাগো!

***

প্রকাশিত: এপ্রিল ১৯, ২০১৫, বাংলাট্রিবিউন