ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

আসন্ন মেয়র নির্বাচন নিয়ে গণমাধ্যমে, রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং খোদ জনগণের মাঝেও চাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনী ইশতেহার ভরে উঠছে প্রতিশ্রুতিতে। অবশ্য টক শোতে বিজ্ঞজনরা বলছেন, মেয়রের আসলে এত ক্ষমতা নেই। তাহলে কেবল মশা মারার জন্য নগরপিতা নির্বাচিত করার এই সাড়ম্বর কেন?
মেয়র শব্দের অর্থ বৃহত্তর। শহরের পৌর সরকার ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি হচ্ছেন মেয়র। ইতিপূর্বে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতে মেয়রের বৃহত্তর ভূমিকা জনগণ কতটুকু অনুভব করতে পেরেছিল? ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ওয়েব পোর্টালে যে অর্গানোগ্রাম মেলে, তাতে বোঝা যায়_ একজন মেয়র চাইলে অনেক কিছুতে তার ক্ষমতার প্রয়োগ করতে পারেন, যদি তিনি দক্ষ ও সদিচ্ছাধারী হন। মেয়রের তত্ত্বাবধানে নগর পরিকল্পনা, প্রকৌশল, রাজস্ব, স্বাস্থ্য, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন, পরিবহন, আইন, জনসংযোগসহ বেশ কিছু দাপ্তরিক বিভাগ রয়েছে। এর পরও মেয়রের কার্য ও ক্ষমতা নিয়ে সংশয় থাকলে একজন নির্বাচিত মেয়রের উচিত তার কাজের পরিধি ও ক্ষমতা জনগণের কাছে সুস্পষ্টকরণ। নতুবা এত সব প্রতিশ্রুতি নির্বাচন-পরবর্তীকালে অর্থহীন হবে।
সবুজ ঢাকা, পরিচ্ছন্ন ঢাকা, গরিববান্ধব ঢাকা, জলাবদ্ধতামুক্ত ঢাকা, ওয়াইফাই ঢাকা, নিরাপদ ঢাকা, আধুনিক ঢাকা – এমন হরেক রকম প্রতিশ্রুতি ভাসছে ঢাকার আকাশ-বাতাসে। কিন্তু একজন মেয়র, যার হাতে রয়েছে নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষমতা, বুড়িগঙ্গাকে এড়িয়ে তিনি ঢাকাকে কীভাবে উন্নত নগরীরূপে গড়বেন?

বুড়িগঙ্গা টেমস হলো না কেন‘ – ২০১১ সালে আক্ষেপ করে কলাম লিখেছিলাম সমকালে। টেমস নদী লন্ডনের শহরকে ঝলমল করে। নীল নদ মিসরের ইতিহাস হয়ে ওঠে। আর আমাদের বুড়িগঙ্গা দখলে, বর্জ্যে বিলুপ্ত হতে চলে। সবুজ নগরী হতে হলে আগে বুড়িগঙ্গায় স্রোতপ্রবাহ চাই। আধুনিক নগরী হতে হলে আগে দখলমুক্ত বুড়িগঙ্গা চাই। পরিচ্ছন্ন নগরী গড়তে হলে আগে বুড়িগঙ্গার বর্জ্য অপসারণ চাই। কে লইবে বুড়িগঙ্গার ভার?
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মানচিত্র অনুযায়ী ঢাকা দক্ষিণ ভাগের পাশ ঘেঁষেই রয়েছে বুড়িগঙ্গা। ঢাকা দক্ষিণে প্রার্থী সংখ্যা প্রায় ২০ জন, যদিও মূল আলোচনা চলছে সাঈদ খোকন ও মির্জা আব্বাসকে ঘিরে। মির্জা আব্বাসের পক্ষে তার স্ত্রী প্রচার অব্যাহত রাখলেও তার নির্বাচনী ইশতেহার এখনও অস্পষ্ট। সাঈদ খোকনের ইশতেহারে ‘নিরাপদ বুড়িগঙ্গা’ উল্লেখ থাকলেও তিনি প্রচারে প্রাধান্য দিচ্ছেন যানজট নিরসন। অন্যদিকে, জাতীয় পার্টি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন মিলনের ইশতেহার নিয়ে গণমাধ্যমে যতগুলো সংবাদ শিরোনাম হয়েছে, তাতে বড় করে প্রাধান্য পেয়েছে বুড়িগঙ্গা। তার ১৮ দফার নির্বাচনী ইশতেহারে বুড়িগঙ্গা দখলমুক্তকরণ ও ঐতিহ্যবাহী এ নদীকে দূষণমুক্তকরণের প্রতিশ্রুতিটি বুড়িগঙ্গাকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে।
টক শোতে আলোচকরা বলছেন, সরাসরি বুড়িগঙ্গা উন্নয়নে কাজ করার ক্ষমতা নাকি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রের হাতে নেই। অথচ ঢাকার অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত বুড়িগঙ্গা নদীর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষমতা অ বশ্যই মেয়রের থাকা উচিত। প্রয়োজনে বুড়িগঙ্গা রক্ষার্থে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নিকটবর্তী নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যৌথভাবে বুড়িগঙ্গা রক্ষার নীতিমালা বাস্তবায়নে সরকারকে প্রস্তাবনা দিতে পারেন ঢাকা দক্ষিণ থেকে নির্বাচিত মেয়র।
নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, পরিবেশ ও নদী রক্ষা আন্দোলনে জড়িত সংগঠনগুলোর উচিত বুড়িগঙ্গা রক্ষায় দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মেয়রের প্রশাসনিক ক্ষমতা নিয়ে আলোকপাত করা। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মেয়র নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব প্রার্থীকে একত্র করে আসন্ন মেয়র নির্বাচন নিয়ে বুড়িগঙ্গা পাড়ে ‘লাইভ’ নির্বাচনী আলোচনা অনুষ্ঠান আয়োজনে যে কোনো গণমাধ্যমই এগিয়ে আসতে পারে। যেমনভাবে প্রার্থীরা ভোটারদের দুয়ারে ধরনা দিচ্ছেন, তেমন করে বুড়িগঙ্গা পাড়ে হোক নির্বাচনী প্রচার এবং আলোচনা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মেয়র নির্বাচনে নিশ্চিত হোক বুড়িগঙ্গামুখী প্রার্থিতা এবং বুড়িগঙ্গামুখী একজন মেয়র।

***

প্রকাশিত: সমকাল, ২৬ এপ্রিল ২০১৫

26April2015