ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

ফোনের ওপর প্রান্তে রোকন ভাই (শেখ রোকন)। রোকন ভাই মানেই একটা টলটলে নদীর জন্য আন্দোলন। নদী নিয়ে চিন্তা ছিল, কেবল ছিল না লেখালেখি।  রোকন ভাই ও তার ‘রিভারাইন’ এর নানা কর্মসূচী থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে শেষমেশ কলম ধরেছিলাম, নদীর কথা লিখতে। নদী বাঁচাও নিয়ে লিখতে গিয়ে অনুভব করলাম, নদীমাতৃক দেশের জনগোষ্ঠি ঠিক নদী উন্মুখ নয় । যেমন, হলফ করে বলা যায়, দেশের জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সাঁতার জানে না। একটু আনন্দ করতে নদীতে-পুকুরে সাঁতরাতে গিয়ে ডুবে মারা যাওয়ার দুর্ঘটনা ঘটছে প্রতিবছর। নৌদুর্ঘটনায় লাইফ সাপোর্ট অপর্যাপ্ততার ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তো রয়েছেই; তবে সাঁতার না জানার কারণেও আত্মরক্ষার চেষ্টাটুকুও সম্ভব হচ্ছে না।

সেই হতাশা নিয়ে প্রত্যাশার সুরে লিখেছিলাম ‘ব্রজেন দাশের খোঁজে’। লেখাটা ২০১২ সালের ৩০ মার্চ ছাপা হয়েছিল সমকালে। ওই সময় আরো একটি সংবাদে উচ্ছ্বসিত হয়েছিলাম। দশ কিশোর-কিশোরী ১৫ কিলোমিটার সাঁতরে সেন্টমার্টিন জয় করেছিল। মনে হলো যেন কিংবদন্তি ব্রজেন দাশের গল্প। এ গল্পে দশ জন ব্রজেন দাশ। তবে কেবল দশ জন কেন! দেশের প্রতিটি কিশোর-কিশোরই ব্রজেন দাশ হয়ে ওঠার শিক্ষা লাভ করুক। তখনই প্রস্তাব করেছিলাম ”দেশের কি শহর, কি গ্রাম- সব স্কুল-কলেজে শরীরচর্চা ক্লাসে সাঁতারকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। শিক্ষাঙ্গনের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সাঁতার নিয়মিতভাবে যুক্ত হোক”। প্রত্যাশা ছিল ওরা ”হাতড়ে, সাঁতরে নদী বাঁচাবে, পুকুর বাঁচাবে। আর নিজে বাঁচতে সাঁতারশৈলী রপ্ত করবে”। রোকন ভাই ফোনে সেই লেখাটা স্মরণ করিয়ে দিলেন সহোৎসাহে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন (৮ এপ্রিল ২০১৫) থেকে জানা গেল ’স্কুল-কলেজসহ দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাার্থীদের সাঁতার প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছে সরকার‘। দেরিতে হলেও সরকারের এই উদ্যোগ অভিভাবক ও আগামির প্রজন্মের কাছে সরকারের প্রতিশ্রুতিবদ্ধতার এক নজির। কারণ, কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সাঁতার চর্চা খুবই কার্যকরি। এই ঘোষনা তাই রোকন ভাই আর আমাকেই কেবল আনন্দিত করে না, এটা  ’রিভারাইন’ এর স্রোতশীল আনন্দ। এটা একজন সচেতন নাগরিকের জন্য আনন্দ ঢেউ।

শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের ওয়েব সাইটে প্রকাশিত পরিপত্রটি থেকে জানা গেল আরো বিস্তারিত। এই কর্মসূচির আওতায় থাকবে দেশের সকল উচ্চ মাধ্যমিক, মাধ্যমিক, নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সমমানের মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সাঁতার শিক্ষাকালীন সুরক্ষার পাশাপাশি প্রশিক্ষক ও মাসিক প্রতিবেদন ব্যবস্থার মত পরিকল্পনা কাঠামো বর্ণিত রয়েছে পরিপত্রে। এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংলগ্ন ও নিকটবর্তী জলাধারগুলো পরিষ্কার করে সাঁতার উপযোগীকরণ। এ অংশটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এতে  নদী-পুকুর-জলাধার বাঁচাও আন্দোলনের সফল বাস্তবায়ন সম্ভব।

poripotro

সরকার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নিশ্চয়ই সাঁতার প্রশিক্ষণকালে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এ নিরাপত্তা যেন প্রশিক্ষণ চলাকালে সকল শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে সতর্কতার সাথে পালিত হয়; নয়তো প্রশিক্ষণকালে ঘটতে পারে অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনা।  পূর্বের লেখাটিতে মেয়েদের সাঁতার শিক্ষায় বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধকরণ নিয়ে লিখেছিলাম। পরিপত্রটি থেকে বোঝা গেল মেয়েদের সাঁতার শিক্ষা নিয়ে সরকারও সজাগ। কোন সামাজিক সীমাবদ্ধতা যেন মেয়ে শিক্ষার্থীদের সাঁতার শেখাকে  বিঘ্নিত না করে, তা নিশ্চিতে সরকার প্রয়োজনীয় সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করবে বলেই ধারনা করি।

আরো দু’চারটে প্রস্তবনা যুক্ত করলে পরিপত্রটি পূর্ণাঙ্গতা পাবে।  প্রথমত, এই কর্মসূচীর আওতায় জেলা থেকে বিভাগ পর্যায়ে কতগুলো জলাধার রয়েছে তার ক্লাসিফায়েড ডাটাবেইজ তৈরী। দ্বিতীয়ত, দেশে বয়স ভেদে জনগোষ্ঠির কত সংখ্যক সাঁতার জানে  তারও একটি ক্লাসিফায়েড ডাটাবেইজ তৈরী। তৃতীয়ত,  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাৎসরিক সাঁতার প্রতিযোগিতা নিয়মিতকরণ। জেলা পর্যায় থেকে বিভাগীয় পর্যায় এবং সবশেষে জাতীয় পর্যায় – এই ধাপে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সাঁতার প্রতিযোগিতায় অগ্রসর  হতে পারে। চতুর্থত, নদী-পুকুরগুলো পরিষ্কার করে সাঁতার উপযোগী হলে, জলাধারগুলো নৌকা বাইচ উপযোগীও হবে। নৌকা বাইচ একটি ঐতিহ্যবাহী খেলা। উচ্চ মাধ্যমিক বা কলেজ পর্যয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা নিয়মিতকরণে সেই উৎসবমুখর ঐতিহ্য ফিরে আসবে।

সরকারি পরিপত্রটি আসলে ব্রজেন দাশ গড়ে তোলার রূপরেখা। এই ’ ব্রজেন দাশ প্রকল্প’ হাতে নেয়ায়  সরকারকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

***

পরিমর্জিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে: দৈনিক সমকাল, ২০ এপ্রিল ২০১৫

20April2015