ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

স্কুল জীবনে গরুর রচনা না শেখাটা বিরল। এমনও প্রচলিত রম্য রয়েছে, কেবল গরুর রচনা পড়ে যাওয়া ছাত্রটি যখন পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে নদীর রচনা পেল, তখন ইনিয়ে বিনিয়ে নদীর পাড়ে একটা গরু নিয়ে এল। অতঃপর শুরু হল গরুর রচনা। বিগত কয়েক মাসের সংবাদগুলো অনুসরণ করলে দেখা যায়, রাজনীতির পাড়ে গরুর রচনাই মুখ্য এখন।

বাংলাদেশ এবং ভারত– এই দুই প্রতিবেশী দেশে চতুষ্পদ প্রাণী গরুর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিই ভিন্ন। মূলত ধর্ম এই দৃষ্টিবিভাজনে প্রাধান্যতা রাখে। ধর্ম এখানে ’কজ’, এবং দৃষ্টিবিভাজন হচ্ছে ’ইফেক্ট‘। হিন্দু-প্রধান দেশ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে গরু জবাই নিষিদ্ধ। খাবারের দোকান ঘুরেও গরুর মাংসের টুকরা মিলবে না। বিপরীতে মুসলিম প্রধান বাংলাদেশে গরু জবাই ও গরুর মাংসের বেচাকেনা রোজ হচ্ছে। ভ্যানগাড়ি থেকে দামি রেস্তোরাঁ –গোমাংসের কাবাব ভুনার সুবাস জিভে জল আনে মাংস ভক্ষণকারীদের। ঢাকার ছোট-বড় রেস্টুরেন্টগুলো ’ভেজিটেরিয়ান’ ফুড মেন্যুর অর্থ বুঝতে অপারগ। একটি সাধারণ ভেজিটেবল আইটেম নিলেও তাতে দু’চারটে ছোট চিংড়ি নয়তো ফালি করে কাটা মুরগির মাংস মিলবে দিব্যি।

বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনে সমুচা-সিঙ্গারাতেও বিফ চলে আসে। অথবা এক চামচে একবার গরু ভুনা, একবার মুরগি ভুনা তোলা হচ্ছে। এমন অনেক আয়োজনে দেখেছি সংখ্যায় একজন-দু‘জন হিন্দুদের জন্য একটু আলাদা খাওয়ার ব্যবস্থাটা একেবারে আচমকা মনে পড়ে। সমুচাগুলো থালায় সাজিয়ে রাখলে, অনেকে বলতেও ভুলে যান ওটা বিফ সমুচা। অনেকে এও বলেন, আজকাল তো হিন্দুরা গরুর মাংস খায়ই!

মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে নিরামিষভোজী বা ভেজিটেরিয়ান হয়ে ওঠার প্রবণতা বিরল। প্রাণীহত্যাবিরোধী সংগঠনগুলোর তৎপরতাও খুব জোরালো হয় না। গরু কোরবানি মুসলিমদের মধ্যে একটি বড় ধর্মীয় রীতি। এই মুসলিম সম্প্রদায় মূলত উপমহাদেশীয় মুসলিম। আরব বা মধ্যপ্রাচ্যের কোরবানি গরু নয়, উট ও দুম্বা প্রধান। বাংলাদেশে সরকারিভাবে ’স্লটারিং হাউজ’ না থাকায়, মুসলিমদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবে এলাকায়, বাড়ির নিচে উন্মুক্তভাবে চলে গরু জবাই। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং যুগে জীবিত গরুর সাথে এবং মৃত-রক্তাক্ত গরুর সাথে সেলফি আপলোডের প্রতিযোগিতাও শুরু হয়েছে ইদানীং।

সামাজিকতার চেহারা যখন এমন, তখন আমাদের সমাজে ছোটবড় সামাজিকতায় হিন্দুরা বেশ নিরবেই নিজেদের ধর্ম বাঁচিয়ে রেখে চলছেন। বিষয়টা এক প্রকার অনুচ্চারিত বলে মুসলিম সহকর্মী, বন্ধুদের বোধদয়ের কোনও সুযোগও ঘটে না। যদিও এই মুসলিম গোষ্ঠীই বিদেশে গেলে রেস্তোরাঁয় ‘পোর্ক’ মেন্যুগুলো দেখে খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দেশে পরিবারে ফোন দিয়ে খাদ্যকষ্টে থাকার কথা জানিয়ে অশ্রুপাত করেন। এটা নিশ্চিত যে, তখনও তার বোধদয় ঘটে না, দেশে থাকতে হিন্দু সহকর্মীর সামনে বসে দুপুরের খাবারে গপগপিয়ে গরুর মাংস খাওয়াটা কত বড় অসৌজন্যতা ছিল।

১৯৭১ সালে গণহত্যার পাশাপাশি জীবহত্যাও চলেছিল। তন্মধ্যে মুসলিম পাক বাহিনী কর্তৃক গরুহত্যার বিশেষত্ব ছিল হিন্দু সম্প্রদায়কে অবমাননা করা। একই ধারাবাহিকতায় বিএনপির ‘গণতান্ত্রিক অবরোধ-হরতালে’ কেবল মানুষই পোড়েনি, পেট্রোল বোমার শিকার হয়েছিল গরু পরিবহনকারী ট্রাক। যদিও গরুরা ভোটার নয়, আওয়ামী লীগ সমর্থক নয়, তথাপি বিএনপি’র গণতন্ত্রের আগুনে পুড়ে আস্ত কাবাব হয়েছিল গরু।

সীমান্ত হত্যা ইস্যুতে ভারত-বাংলাদেশের রাজনৈতিক-কূটনৈতিক সম্পর্ক বেশ স্পর্শকারত। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে গরু চোরাচালান একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা, দু’দেশের জন্যই। ২০১৪ সালে ভারত থেকে প্রায় ১৭ লাখ গরু পাচার হয়েছিল বাংলাদেশে। এই চোরাচালান ঠেকাতে ভারত অতিরিক্ত কঠোর হলে বিএসএফ কর্তৃক হত্যা ও হয়রানির শিকার হচ্ছে বাংলাদেশের সীমান্তবাসীরা। ভারত-বাংলাদেশ গরু ট্র্যাফিকিং নিয়ে কোনও বৈধ ব্যবস্থাপনা চালু করতে ব্যর্থ হওয়ায়, গরু চোরাচালানকে কেন্দ্র করে সীমান্তের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দু’দেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

হালে ভারতে গরুর মাংস জবাই ও ভক্ষণ নিষিদ্ধে ভারত সরকার উৎসাহী হয়ে উঠেছে। আইন প্রণয়নের সিদ্ধান্তও হয়েছে। একই সময় বাংলাদেশে গরুপাচার বন্ধে সর্বোচ্চ কঠোরতার বার্তা দেন ভারতের রাজনাথ সিং। তার বক্তব্যে বাংলাদেশিদের গোমাংস ভক্ষণের অভ্যেস ত্যাগে বাধ্যকরণেরও ইঙ্গিত ছিল। এর ফলাফল সরাসরি পড়েছে বাংলাদেশের গোমাংস বাণিজ্যে। এখন পর্যন্ত গরুর মাংসের ঊর্ধ্বসূচক মূল্য জানান দিচ্ছে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে গরুর অবস্থান।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার যে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক টানাপড়েন, তারও বহিঃপ্রকাশ ঘটছে গোমাংস দিয়ে। ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মুখতার আব্বাস যখন বলেন, গোমাংস খেতে চাইলে পাকিস্তান যেতে হবে, তখন আসলে ভারত-পাকিস্তানের দীর্ঘকালের রাজনৈতিক মনোমালিন্য দৃশ্যমান হয়। ’কজ এন্ড ইফেক্ট’ তত্ত্বে দাঁড় করালে, ভারত-পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিরূপ প্রেক্ষাপট গো-রাজনীতির একটি ’কজ’ এবং বাংলাদেশে গরু খাওয়া বন্ধে রাজনাথ সিং এর মন্তব্য সেই ’কজ’ এর ’ইফেক্ট’।

ভারত সরকার পক্ষের অনেকের কট্টর অবস্থান, বাংলাদেশ ও ভারতে এখন পর্যন্ত চর্চিত। বাংলাদেশের আলোচনার প্রেক্ষাপটটি তুলনামূলকভাবে সাধারণ। অবধারিতভাবে ভারতের সমালোচনা হচ্ছে, তবে যে কোনও ইস্যুতে ভারতীয় পণ্য বর্জনের হুজুগ উঠলেও ভারতীয় গোমাংস বর্জনে কোনও আন্দোলন ঘটেনি বাংলাদেশে। বিপরীতে ভারতে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিক্রিয়া ছিল সাহসি, মানবিক ও প্রথা ভাঙ্গার। ভারতের চলচ্চিত্র অঙ্গনের অনেক হিন্দুধর্মাবলম্বী অভিনয় শিল্পীরা ভারত সরকারের গোমাংস ভক্ষণ বন্ধের পরিকল্পনা নিয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। মহারাষ্ট্রে হিন্দু-মুসলিম একত্রে গোমাংস ভক্ষণ করে এর প্রতিবাদ জানিয়েছে। সর্বশেষ বোমা ফাটানো প্রতিবাদ করেছেন ভারতের সুপ্রিমকোর্টের সাবেক বিচারপতি মার্কন্ডেয় কাটজু। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, হিন্দু হওয়া স্বত্ত্বেও তিনি গোমাংস আহার করেছেন এবং পুনরায় গোমাংস গ্রহণের ইচ্ছা রাখেন।

বৈশ্বিক প্রাণী অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলনের বিপরীতে মুসলিম সমাজে কোরবানির বিকল্প চিন্তক সংখ্যা শূন্য হলেও, ভারতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে কেউ কেউ ধর্মীয় ধারণা ভেঙে গোমাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধের সরকারি ঘোষণার প্রতিবাদে মানবদেহের প্রোটিন চাহিদা, কসাই-বিক্রেতাদের কর্মসংস্থান এবং সর্বোপরি মানবাধিকারকে উপস্থাপন করেন।

গরুর মাংস খাওয়া বা না খাওয়ার চেয়ে গোমাংস নিয়ে উক্ত দর্শন ভঙ্গিটি মুসলিমদের জন্যও শিক্ষণীয় হওয়া দরকার। হিন্দুগোষ্ঠীর কেউ যদি উপলব্ধি করতে পারেন, গোমাংস ভক্ষণেও স্বাধীনতা থাকা উচিৎ, তেমনি মুসলিম গোষ্ঠীরও দায়িত্ব কারও গোমাংস ’না’ ভক্ষণের রীতিকে সমীহ করা। সম্প্রতি পাকিস্তান এই রীতিকে সম্মান না জানিয়ে বোধহীনের মতো পাকিস্তান-নেপাল যোগাযোগে বৈরিতার জন্ম দিয়েছে।

ভূমিকম্প বিধ্বস্ত দেশ গড়ে দেওয়ার বাড়োয়াড়ি ভিড়ে যে যার ফায়দা নেওয়ার কাল চলছে নেপালে। এর মাঝেই হিন্দু প্রধান দেশ নেপালে ত্রাণ হিসেবে পাকিস্তান পাঠালো গরুর মাংসের মশলার প্যাকেট। গরুর মাংসের মশলা দিয়ে খাসি, চাইকি মুরগিও রাঁধা যাবে অবশ্যই। তবে প্যাকেটে যদি গরুর মাংসের মশলা লেখা থাকে, তা নিশ্চিত হিন্দু ধর্মীয়দের অনুভূতিকে আঘাত করবেই। কথায় কথায় যে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তারা কী অবলীলায় অপরের দুঃসময়ে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করে বসে! পাকিস্তান ঘটনাটি অস্বীকার করতে চাইলেও, নেপাল সাফ জানিয়েছিল, ক্ষুধামৃত্যু হলেও তারা পাকিস্তানের ত্রাণ স্পর্শ করবে না। গরু দু’টো দেশের রাজনৈতিক যোগাযোগে কী পরিবর্তন ঘটিয়ে দিতে সক্ষম তার আরও একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হলো এ ঘটনায়।

নিরীহ প্রাণী গরুর কোনও ধর্ম নেই। গরুকে ধর্মীয় বিভেদের পাল্লায় চড়িয়েছে মানুষ। উপকারী প্রাণী গরুর কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শ নেই। তবে উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে ক্রমাগত ’ফ্যাক্টর’ হয়ে উঠছে গরু। গরুর ঘাস ভক্ষণের মাঠটি এখনও সবুজ শীতল হলেও, গো-রাজনৈতিক অঙ্গন বেশ উত্তপ্তই। গো-রাজনীতি উপমহাদেশের রাজনীতিকে কোথায় কোথায় চড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় রাজনীতি সচেতন প্রত্যেকেরই এখন তা পর্যবেক্ষণের সময়।

 

****
প্রকাশিত: বাংলা ট্রিবিউন, মে ২৪, ২০১৫