ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

ঈদ উৎসবে দেশি-বিদেশি বন্ধু-সহকর্মীদের শুভেচ্ছা বার্তা পাচ্ছি দেড়-দু’দিন ধরে। ফিরতি শুভেচ্ছা জানাচ্ছিও। সকলেই যে মুসলিম তা নয়। সকলে বাঙালিও নন। একজন মুঠোফোন বার্তায় চমৎকার আন্তরিকতায় ঈদ মোবারক শুভেচ্ছার সাথে এও লিখেছেন, মে দ্য চয়েসেস্ট ব্লেসিংস অফ ‘আল্লাহ’ ফিল ইয়োর লাইফ এন্ড ইয়োর ফ্যামিলি উইথ জয় এন্ড প্রসপারিটি। তিনি বাঙালি হলেও, বাংলাদেশি নন। এবং মুসলিমও তো ননই। আমি ফিরতি বার্তায় তাকে রথযাত্রা উৎসবের শুভেচ্ছা জানালাম।

বাঙালির বারো মাসে তের পার্বন। ধর্মীয় আর সাংস্কৃতিক উৎসবে বাঙালির জীবনযাত্রা মুখরিত। বাঙালি বলতে এপাড় বাংলা আর ওপাড় বাংলা। আর বাংলাদেশি বললে, বাংলাদেশের সকল সম্প্রদায়, ধর্মীয় গোষ্ঠী। বাংলাদেশের সমাজচিত্রে মৌলবাদি শক্তির কট্টরবাদি অবস্থানকে তোয়াক্কা না করেই এদেশের জনপদে উৎসবের মাত্রায় আরো বৈচিত্রতা যুক্ত হয়েছে বিগত কয়েক বছরে। বিভিন্ন ধর্মে রয়েছে অগনিত ধর্মীয় উৎসব। এদেশে হিন্দু-বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপর রাজনৈতিক স্বার্থে ও ব্যক্তিস্বার্থে আক্রমণ হয়েছে বহুবার। তথাপি এই সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলো তাদের ধর্মীয় পরম্পরা আঁকড়ে রেখেছে। এর কোন কোনটা বড় পরিসরে, কোন কোনটা ছোট পরিসরে পালন হয়। আজকাল মিডিয়ার কল্যাণে হিন্দু ধর্মীয় এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের অনেক আচার আনুষ্ঠানিকতাও নজরে আসছে।

হিন্দুদের প্রধান পূজো, বৌদ্ধদের প্রধান ধর্মীয় আচারগুলো আড়ম্বরেই পালন হয় এদেশে। পশ্চিমবঙ্গে পূজোমণ্ডপ সজ্জার নান্দনিকতা ও নতুনত্বের তুলনায় ঢাকার মণ্ডপগুলো পিছিয়ে থাকলেও, বাংলাদেশে হাজার হাজার পূজোমণ্ডপ হয়। গত দুয়েক বছরে হোলি উৎসব আয়োজনের পরিধিও বেড়েছে। প্রবারণায় ফানুশ ওড়ে হাজার হাজার। সমস্যা হলো, এটুকু করেই নিজেদের ‘অসাম্প্রদায়িক’ ভাবার আত্মগড়িমায় ভুগতে শুরু করি আমরা। যদিওবা আমাদের ভেতরে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয়বোধের প্রভাব নিজস্ব স্বভাবসুলভতায় লুকিয়ে থাকে ঠিকই।

আমাদের ধর্মীয় উৎসবগুলো মোটের উপর পাশাপাশি নয়তো কাছাকাছি সময়েই আসে। ঈদ-উল-ফিতর এবং ঈদ-উল-আযহা হচ্ছে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় উৎসব। দুই ঈদকে কেন্দ্র করে আর্থসামাজিক পরিসরে বিশাল প্রস্তুতি চলে। দোকানে জমজমাট পসার, কার্যালয়ে ছুটিছাটা আর মিডিয়ায় ঈদের আয়োজন – চতুর্দিক ঈদ মুখর। ঈদের দিন রাজনৈতিক নেতাদের কোলাকুলি, তারকাদের কোলাকুলি – মিডিয়ার ঈদ সংবাদে প্রাধান্য বিস্তার করে। সকল স্তরের নাগরিকের সাথে প্রধানমন্ত্রীর সাদামাটা ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় আর বিদেশি ডেলিগেটদের সাথে ২০ দলীয় নেত্রীর রাজকীয় শুভেচ্ছা বিনিময়ও ঈদ উদযাপনের রাষ্ট্রীয় রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একবার জোর গলায় বলেছিলেন, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। রাষ্ট্র পরিচালকের মুখ নিসৃত এই বাণী সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। যারা সংখ্যায় লঘিষ্ঠ তারা মনোবল পান। আর যারা সংখ্যায় গরিষ্ঠ হওয়ার গরিমায় ভোগেন তারা সমঝে চলার বার্তা পান। সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মেকর্মে মনোনিবেশকারী একজনের সাথে আলাপে অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর এই উক্তিকে খারিজ করার আভাস পেয়েছি। তার প্রত্যাশা, ঈদ সবার উৎসব হোক। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানও ঈদ পালন করুক। তার আপত্তি, হিন্দু পূজো কেন মুসলমানের উৎসব হবে!

আসলে অসাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠাটা সহজসাধ্য নয়। হিন্দুবাড়ি পুড়ে গেলে, বৌদ্ধ মন্দির ভেঙ্গে গেলে কিছু আর্থিক সহায়তা, কয়েকজনের রাজনৈতিক বিবৃতি আর কয়েকটা মানববন্ধন করলেই অসাম্প্রদায়িক হওয়া যায় না। বস্তুত আমরা প্রতিনিয়ত কোন না কোন সাম্প্রদায়িক আচরণ করেই চলি; আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার গরবে।

বিগত কয়েকদিনে বাংলাদেশে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় শিরোনাম মিডিয়া, ফেসবুক এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় হরফে জ্বলজ্বল করছে। ওদিকে রথযাত্রা উৎসবের আনন্দ অলিগলি দিয়ে পার হয়ে গেল। অথচ এই বৃষ্টি-বাদল মৌসুমে বাঙালি হিন্দুসমাজে রথযাত্রা একটি বড় উৎসব। কেবল ধর্মীয় উৎসব বলেই নয়, এর আয়োজন ঐতিহ্যবাহী ও শিল্পিত। রথের নির্মাণশৈলী ও উচ্চতা রথযাত্রা আয়োজনের আনন্দকেও বাড়িয়ে তোলে। ভারতের পুরি রথযাত্রার বিশেষত্ব হচ্ছে এর ৪৫ ফুট উচ্চতার বর্ণিল ও বর্নাঢ্য রথ। আমাদের দেশে কাছাকাছি উচ্চতার রথ রয়েছে ধামরাইয়ে।

ধামরাই রথযাত্রার ইতিহাস পুরনো। এককালে ৬০-৭৫ ফুট উচচতার রথ নির্মাণ করেছিলেন জমিদারেরা। দুঃখজনক হলো, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে পাকবাহিনী এই সুউচ্চ রথটি ধ্বংস করে দেয়, যার কারণে পরের বছর রথযাত্রা স্থগিত ছিল। বর্তমানে ৪২ ফুট উচ্চতার রথ রয়েছে ধামরাইয়ে। এই রথ তৈরিতে ২০১০ সালে কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা এসেছিল ভারত সরকার থেকে। ভারত সরকারের কাছে এজন্য কৃতজ্ঞতা। তবে এদেশের হিন্দুরা এদেশের নাগরিক। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের হিন্দু জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত তাদের ক্ষতিপূরণে মাত্র এক কোটি টাকার আর্থিক ব্যয় তো অসম্ভব কোন খরচ ছিল না আমাদের রাষ্ট্রের জন্য। বাংলাদেশি হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসবের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব ভারতের হাতে তুলে দেয়ার মাধ্যমে এদেশে হিন্দুদের ভাগ্যবিড়ম্বিত শরনার্থী করে রাখা হলো নাকি? ধামরাই রথের পুরনো ঐহিত্য ফিরে পেতে রাষ্ট্রের কাছে আবেদন, ৬০-৭৫ ফুট উচ্চতার ধামরাই রথ নির্মিত হোক রাষ্ট্রীয় খরচে। এতে করে ভারতের পুরি শহরের রথের মতো আমাদের ধামরাই রথ বিশ্বের হিন্দু ধর্মাবলম্বী ও পর্যটকদের কাছে প্রত্যাশিত তীর্থস্থান হয়ে উঠবে।

অনেক হতাশার মধ্যেও কাঙ্খিত রথযাত্রার বহুবছরের ঐহিত্য টিকে আছে। আজকে চতুর্দিকে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময়ের প্রাধান্যতার মধ্যেও রথযাত্রার আনন্দ উদ্ভাসিত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মাঝে। ধামরাই রথযাত্রা উদ্বোধনে অবশ্য যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। তবে শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাদের দেশের বিভিন্ন স্থানে রথযাত্রা আয়োজনে উপস্থিতির খবর মিডিয়াতে অনুজ্জল। ঈদ আয়োজন নিয়ে দিনের পর দিন চ্যানেলগুলোর অগুনতি ঝলমলে অনুষ্ঠানমালার ভিড়ে রথযাত্রা উৎসব নিয়ে চ্যানেলগুলোর বিশেষ কোন আয়োজন পাওয়া গেল না। অথচ হিন্দুস্থান নামে পরিচিত ভারতে ঈদ উপলক্ষ্যে বিশাল বাজেটে সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে। ভারতীয় তারকারা ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময়ে টুইট করছেন। আমাদের দেশের মিডিয়াতেও তারকাদের ঈদ শুভেচ্ছার খবর জানা যাচ্ছে, কোলাকুলির ছবি প্রকাশ হচ্ছে, কিন্তু আমাদের মিডিয়া জগতে কি হিন্দু ধর্মাবলম্বী কেউ নেই? তাদের মুখে রথযাত্রার শুভেচ্ছাবার্তা কি এদেশে হিন্দুগোষ্ঠীদের জন্য উৎসবের সংবাদ হতে পারে না?

প্রবাসীরা কীভাবে ঈদ পালন করেন, সে সংবাদও পত্রিকার পাতা জুড়ে থাকে প্রতিবছর। সকল প্রবাসী বাংলাদেশিরাই কি মুসলিম? প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রবাসে রথযাত্রা কীভাবে পালন করেন, এটা জানতে সংবাদ প্রতিবেদকের যথেষ্ট গলদঘর্ম হতে হলেও, এমন সংবাদগুলোই আমাদের অসাম্প্রদায়িকতার চর্চাকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

মমতা ব্যানার্জীর ফেসবুক ভ্যারিফায়েড পাতায় তার কর্মকাণ্ডের সচিত্র পোস্ট প্রকাশিত হয়েছে। দেখা গেল তিনি মাথায় কাপড় দিয়ে মুসলিম জনগোষ্ঠীর জামাত সমুখে বক্তব্য দিচ্ছেন। এরপর হিন্দু মন্দিরে প্রদীপ জ্বালিয়ে আরতি করছেন। মমতা ব্যানার্জী কট্টর রাজনীতিমনস্ক ব্যক্তি। নিজ ‘স্বার্থ’ সংরক্ষণে সুনাম ও দুর্নাম দুটোই ভোগ করেন তিনি। ভোট ব্যাংক সংরক্ষণের জন্য হলেও তিনি হিন্দুদের রথযাত্রা উৎসব এবং মুসলিমদের ঈদ উৎসব দুটোকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। একে তার রাজনৈতিক বিচক্ষণ কৌশলও বলা যেতে পারে। একই সাথে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির সুবার্তা দিলেন তিনি।

মুসলিম ধর্মীয় উৎসব ঈদকে আমরা সার্বজনীনরূপে প্রতিষ্ঠা করতে চাই। এর বিপরীতে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ধর্মীয় উৎসবগুলোকেও আমাদের সার্বজনীন হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ব্যক্তিগতচর্চায়, সামাজিক চর্চায়, রাষ্ট্রীয় চর্চায় এই সার্বজনীনতা সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যে কোন উৎসব ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ থেকে পঙ্কিলতা দূরীকরণে ভূমিকা রাখে। সৌহার্দ গড়ে। সম্প্রীতি গড়ে। মিডিয়া তথা সংবাদপত্র, টিভিচ্যানেল এবং চলচ্চিত্রাঙ্গন উৎসবের আয়োজনে আনে বাড়তি রঙ। বাড়তি আনন্দ। কেবল দুর্গা পূজো, বড়দিন, আর বৌদ্ধপূর্ণিমায় কম বাজেটের দায়সারা কিছু অনুষ্ঠান করলেই টিভি চ্যানেলগুলোর অসাম্প্রদায়িক উৎসব পালনের দায়ভার শেষ হয় না। মিডিয়ার সামান্য ওয়াইড এঙ্গেল কাভারেজে সকল উৎসবকে দেখতে হবে, দেখাতেও হবে। এমন যেন না হয় যে, সংখ্যাগরিষ্ঠের উৎসবই শীর্ষ শিরোনাম আর বাকিদের জন্য সেকেন্ডারি শিরোনাম!

ধর্মীয় উৎসবকে সম্প্রীতির বলার মাহাত্ব্য তখনই অনুভূত হয়, যখন সমসাময়িক সকল ধর্মীয় উৎসবকে সমচিত্তে উদযাপন করা যায়। শুভেচ্ছা বিনিময় কেবল একই ধর্মগোষ্ঠীর মধ্যে নয়, বিভিন্ন ধর্মগোষ্ঠীর মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময়ই ধর্মীয় সৌহার্দ্য। সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় উৎসব যেন অপরাপর ধর্মীয় উৎসবমুখরতাকে ম্লান না করে এমন প্রত্যাশায় সকলকে ঐহিত্যবাহী রথযাত্রা উৎসবের শুভেচ্ছা। সকলকে ঈদ উৎসবের শুভেচ্ছা।

 

***

প্রকাশিত: বাংলা ট্রিবিউ্ন ডটকম, জুলাই ২০, ২০১৫