ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

হেফাজতে ইসলাম বিভিন্ন ছুতোয় সুযোগ পেলেই নীতি-নির্ধারক চরিত্রে অবতীর্ণ হয়। সরকার ও রাজনীতিকমহলের বিশেষ সমীহ থাকায় বিতর্কিত দাবি-দাওয়া ও বক্তব্যের পরও হেফাজতে ইসলাম যে কোনও বিষয়ে ধর্ম গুলিয়ে একটা ঘোলাটে পরিস্থিতি গড়ে তুলছেই। আমাদের নারীরা গার্মেন্টসে কাজ করলে তা হেফাজতের পছন্দ নয়। নারী-পুরুষের কো-এডুকেশন হেফাজতের পছন্দ নয়। নারীরা পহেলা বৈশাখে উৎসবে মেতে উঠলেও তা হেফাজতের অপছন্দ। যেন আজকে হেফাজতের মর্জিতে দেশ চালাতেই স্বাধীন বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছিল!

সানি লিওনি ঢাকা আসছেন খবরটা কোনওভাবে এখন পর্যন্ত দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। তবে হেফাজতের উত্তেজনা ও ফেসবুকে অসংখ্য প্রতিক্রিয়া এড়ানো সহজ হচ্ছে না। সানি লিওনির সম্ভাব্য সফর নিয়ে বিতর্কের শুরুটা হেফাজত করেছিল, যাকে এখন বেগবান করে ফেলেছি আমরা সবাই মিলে।

হেফাজতের সানি লিওনি সফরকে নিয়ে উচ্চমাত্রার উত্তেজনাকে মোটের ওপর সবাই সমালোচনা করলেও সানি লিওনিকে ঘিরে উষ্মা সকলের কণ্ঠে। এই উষ্মা প্রকাশকারীরা নিজেদের প্রগতিশীল দাবিকারি। ফলে এই মুহূর্তে প্রগতিশীল সমাজ দু’ভাগে বিভক্ত। একভাগ সানি লিওনির সফরকে নেতিবাচক মানতে চান না। অন্যভাগ সানি লিওনির বাংলাদেশ আগমনকে দেশীয় সংস্কৃতির উচ্ছন্নে যাওয়া মানেন। দ্বিতীয় ভাগে পরস্পর বিরোধী মতাদর্শধারণকারীরা সানি লিওনি প্রসঙ্গে প্রত্যক্ষ নয়তো পরোক্ষভাবে মতৈক্যে এসেছেন। অন্তত সানি লিওনিকে তার ‘জাত’ দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে তুলোধুনো হয়েছে পুঁজিবাদ। এতে করে সানি লিওনি প্রসঙ্গ পেয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা।

জাতের সংজ্ঞায়ন লালন ভিন্ন অন্য কেউ এত সরল ও তীর্যকরূপে করেননি। ‘গোপনে যে বেইশ্যার ভাত খায় / তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়?/ লালন বলে জাত কারে কয় /এ ভ্রম তো গেল না’– লালনের এ উপহাস জগতের তাবৎ কুলীন জাতের জন্য। বল্লাল সেন কৌলীন্য প্রথা প্রবর্তন করেছিলেন গুণ ও আচরণকে উচ্চমর্যাদা দিতে। তবে শেষপর্যন্ত কুলমর্যাদা হয়ে ওঠে বংশমর্যাদা রক্ষা। কুলীন সমাজ হয়ে ওঠে উচ্চজাত আর এর বাইরে সকলে বেজাত, আর অচ্ছুৎ। পর্নোজগত ছেড়ে আসা সানি লিওনিকে নিয়ে সকলে এখন সেই জাত-বেজাতের টানাপোড়নে আছেন।

কেবল আমাদের দেশেই সানি লিওনিকে ঘিরে টানাপোড়েন রয়েছে তা নয়। সানি লিওনি যে বিশাল মেইনস্ট্রিম শো-বিজে পর্নো ইন্ডাস্ট্রি ছেড়ে প্রবেশ করেছেন, সেখানেও কুলীন সমাজ বর্তমান বলেই সানি লিওনির জন্য পুরুষ অথবা নারী অভিনেতা সংকট রয়েছে। অবশ্য বিতর্কও সানি লিওনিকে জনপ্রিয় করছে। শো-বিজ জগতে এভাবে আলোচনার শীর্ষে থাকার সুযোগ ক্যারিয়ারের জন্য সহায়ক হয়ে ওঠে। যেমন করে সানি লিওনি বড় বড় ব্যানারের কুলীন নির্মাতাদের নজরে আসা শুরু করেছেন। যদিও কিছুদিন আগেও নাকি সানি লিওনির সঙ্গে এক ক্যামেরায় দাঁড়ানোতে উঁচু জাতের অভিনেতাদের রাজি করানো অসম্ভব ছিল। এ অংশে অনেকেই বলবেন, হিন্দি সিনেমাজগতের পুঁজিবাদী চরিত্র এভাবে একজন পর্নস্টার প্রতিষ্ঠিত করছে। অনেকে আরও একধাপ এগিয়ে বলছেন–আগামীতে হয়তো সানি লিওনি চমৎকার কোনও অভিনয় করে পুরস্কারও ছিনিয়ে নিতে পারেন। এমন ধারণাকারীরা সানি লিওনির জন্য শুভেচ্ছা বার্তা দিচ্ছেন না, বরং নিজেদের উৎকণ্ঠা প্রকাশ করছেন।

ভারতে কিছুদিন আগে সরকারি পর্যায় থেকে পর্নোগ্রাফি নিষিদ্ধ হলে ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের বাসিন্দারাও সরব হয়েছিলেন। ফলে সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনায় উদ্যোগী হতে হয়। হিপোক্রেসি প্রকট হয়ে ওঠে এখানেই। পর্ন দেখাকে প্রাপ্তবয়স্কদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত মানেন যে গোষ্ঠী, তারা কিন্তু প্রাক্তন পর্নস্টার সানি লিওনির আশেপাশে থেকে নিজেদের দূরে রেখে জাত রক্ষায় সচেষ্ট থাকেন। পরোক্ষভাবে সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত উপহাসটি ওই সময় করেছিলেন সানি লিওনি। স্বামীসহকারে সাবলীল ভঙ্গিমায় একটি ছবি পোস্ট করেন, যেখানে স্বামীর গায়ের পোশাকে লেখা ছিল ‘সেক্স সেলস’!

হ্যা, সেক্স আসলেই বিক্রি হচ্ছে দেদারসে। ভারত কিংবা বাংলাদেশ, এখানে মুখে যতই একজন সানি লিওনিকে তিরষ্কার করা হোক না কেন তার আগের পর্নো ক্যারিয়ারের জন্য, সত্য হলো এ অঞ্চলে দেদারসে রয়েছে  চটি সাইট, গোপন ভিডিও সাইট, মোবাইল পর্নো, পর্নোসিডি, হার্ডডিস্ক ভরা পর্ন। চাইলেই প্রেমিকার এমনকী স্ত্রী’র ভিডিও অনলাইনে ছেড়ে দেওয়াও যায়। শিশুপর্নোগ্রাফিও চলছে। এ অঞ্চলের বাসিন্দারা পর্নোকে ‘ব্যক্তিগত শিল্প’ মানেন। যৌনতার জন্য পর্নোগ্রাফি-এমনটা ব্যক্তিগত দর্শন। পর্নোভোক্তারা কামবাদ তত্ত্বে পর্নোকে গ্রহণযোগ্য করে নেন। এককালের রাজা-মহারাজাদের ছিল বাঈজী পাড়ায় যাওয়ার অভ্যাস। যে যুগ সমাপ্ত হলে, পতিতাপল্লীতে যাওয়া গেল বেড়ে। প্রযুক্তির যুগে সংযোজিত হলো পর্নোগ্রাফি। পর্নোমাদককে পুঁজি করে গড়ে উঠল পর্নোইন্ডাস্ট্রি। ভোগবাদ এবং পুঁজিবাদের জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত এই পর্নোইন্ডাস্ট্রি ততটাই সচেতন আলোচনার বাইরে যতটা সানি লিওনি বর্তমানে সমালোচিত। সানি লিওনি ধিকৃত হলেও পর্ন এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের কাছে স্বাগত।

যে ব্যক্তি নিয়ম করে সিগারেট ফুঁকেন, মাসে একবার শহরের পানশালায় যান, তিনি যদি বুদ্ধিজীবী হন তো বুদ্ধিজীবীর ভাষায় পৃথিবীর তাবৎ কিছুতে পুঁজিবাদের নোংরামি দেখবেন, ভোগবাদ দেখবেন। কেবল সিগারেট ভোগবাদী হিসেবে তামাক ইন্ডাস্ট্রির পুঁজিবাদকে এড়িয়ে যাবেন। ঠিক এমন করেই পর্নো ইন্ডাস্ট্রিকে সমালোচনার বাইরে রেখে একে প্রতিনিয়ত গ্রহণযোগ্যতা দেওয়া হয়।

সানি লিওনি শো-বিজ জগতে পদার্পন করেছেন এবং তার পূর্বের পর্নো ক্যারিয়ারের যবনিকাপাত ঘটিয়েছেন। অতীতকর্ম এত সহজে তার পিছু ছাড়বে না তা নিশ্চিত, তবে অতীত ফেলে আসা সানি লিওনিকে তার বর্তমান দিয়েই দেখা দরকার।  সানি লিওনি এখনও এমন শক্তিশালী কোনও অভিনেত্রী না হলেও চলচ্চিত্র জগতে সকলে কাজ করতে করতেই কাজ শেখেন। সানি লিওনি নিজেকে অভিনেত্রী হিসেবে দাঁড় করাতে চাইলে তিনিও অন্যসব অভিনেত্রীর মতো করে বিভিন্ন চরিত্রে নিজেকে নিয়ে নিরীক্ষণ করেই একটা জায়গায় পৌঁছবেন। তাহলে এখনকার সানি লিওনিতে আমাদের এলার্জি কেন?

বস্তুত এ অঞ্চলে একটু কোমর দুলানি, আধটু বক্ষ দোলানিতে সংস্কৃতির বিজাতীয়করণ হয়ে যায়! মুক্তসংস্কৃতি, মুক্তআকাশের যুগে নিজেদের সংস্কৃতি নিয়ে ক্ষণে ক্ষণে শঙ্কিত হয়ে ওঠাটা কট্টর মৌলবাদী আচরণ ভিন্ন অন্য কিছু নয়। যে কারণে ক্রিকেট, ফুটবলের পুঁজিবাদে সামিল হওয়া যেতে পারে, বিনোদন জগতও সেই একই পুঁজিবাদের অনুসারী। যে কারণে ইতিপূর্বে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বিভিন্ন তারকা বাংলাদেশে এসে স্টেজ শো করে গেছেন, একই কারণে সানি লিওনিও আসতে পারেন। সানি লিওনি পর্নোগ্রাফি প্রচারণার জন্য আসছেন এমন কোনও তথ্য কি হেফাজত ও কুলীন জাতের কাছে আছে?

আসলে এ অঞ্চলে রেওয়াজ রয়েছে চরিত্রবানরা পতিতাপল্লীতে থাকেন না, তবে যান। এ অঞ্চলে ধার্মিকেরা পতিতা পল্লী উচ্ছেদ করেন, খদ্দের উচ্ছেদ নয়। ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হবে যে! এখানে নারীদের দেখলে সক্ষম পুরুষের লালা ঝরা নিয়ে হেফাজতি ওয়াজ গ্রহণযোগ্য।  এখানে নিয়ত হুর দেহ, বক্ষ, ত্বক বর্ণনা করে তরুণ প্রজন্মকে পরকালের জন্য প্রলুব্ধ করা হয়। এ সব যৌন সুড়সুড়ি সর্বস্ব ওয়াজগুলো নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই কেন?

হুরগমন এর পার্থিব সংস্করণ হচ্ছে এ অঞ্চলের পতিতাগমন।  প্রযুক্তি অবশ্য সামাজিক চরিত্রের কৌলীন্য রক্ষা সহজ করে দিয়েছে। যার যার ব্যক্তিগত কক্ষে পর্নো দেখা তার তার অধিকার। প্রযুক্তি পুঁজিবাদকেও ভেঙে দিয়েছে। মহারাজাদের যেরূপ কামতাড়না ছিল, আজকের মুটে-মজুরেরও সেরূপ কামতাড়না রয়েছে; আজকের তরুণ প্রজন্মেরও রয়েছে একই কামাবেগ। প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় মোবাইলে পর্নো, হার্ডডিস্কে পর্নো, অনলাইনে বসে পর্নো। তারপরও সকলেই চরিত্রবান, কেবল দুশ্চরিত্র হলেন সানি লিওনি একাই!

সানি লিওনির এখন তবে কী করণীয়? পর্নোজগত ছেড়ে আসার পেছনে নিশ্চয়ই তার বিশেষ কোনও দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। সে উদ্দেশ্য বাণিজ্য, খ্যাতির মোহ হলেও দোষের নয়। তিনি নিজের পর্নোস্টার পরিচিতি থেকে বেরিয়ে এসে মেইনস্ট্রিম পরিচিতি গড়তে চান। কিন্তু ক্রমাগত সানি লিওনিকে ধিক্কার জানিয়ে  আসলে কী বলতে চান সবাই? তবে কি সানি লিওনিকে পুনরায় পর্নোসিনেমায় ফেরৎ যাওয়ার বার্তা দিচ্ছে কুলীন সমাজ!

 

***

প্রকাশিত: বাংলাট্রিবিউন, ২৬ আগস্ট ২০১৫