ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

 

‘ব্লগ দিয়ে ইন্টারনেট চালানো যায় না।’ যদিও ম্যাশেবলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপে জনপ্রিয় দশ ইন্টারনেট ব্যবহারের শীর্ষ দুটি জায়গা জুড়ে রয়েছে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং ও ইমেইল, তবে ইন্টারনেটে এর বাইরেও বিবিধ গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি কর্ম সম্পাদন সম্ভব। ইন্টারনেট শব্দটির সমার্থক হয়ে উঠেছে ‘মেঘজাল প্রযুক্তি’ (ক্লাউড টেকনোলজি)। ওরাকল তাদের প্রযুক্তি-সেবা প্রদানের কাঠামো ক্লাউডে রিইঞ্জিনিয়ারিং করেছে। আইবিএম বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন করছে ক্লাউড বাণিজ্যে। আমাজন, মাইক্রোসফট ও গুগলের রয়েছে বিশাল ক্লাউড প্লাটফর্ম।

প্রযুক্তি আর ইন্টারনেট মানে এখন মোবিলিটিও। ধীরগতির ইন্টারনেট হয়েছে জাদুঘরের গল্প। বৈশ্বিক গবেষণায় এলটিই (লং টার্ম এভল্যুশন) সবচেয়ে উচ্চগতিসম্পন্ন তথ্য বিনিময়ের যোগাযোগ মাধ্যম। বাংলাদেশে থ্রিজি প্রযুক্তি থাকলেও টেলিকম অপারেটরগুলোর প্রাযুক্তিক অবকাঠামো ফোর-জি সক্ষম। দেশের তথ্যপ্রযুক্তি গবেষণা খাত ও বাণিজ্য একেবারে সর্বশেষ বিশ্বচর্চা থেকে কয়েক কদম পিছিয়ে থাকলেও ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রকল্প আমাদের জন্য আশার আলো।

বই পড়া, গান শোনা, ভ্রমণ, ফটোগ্রাফির সঙ্গে শখ হিসেবে ইন্টারনেট সার্ফিং যুক্ত করাটা আজকাল চর্চিত। ডিজিটাল বাংলাদেশে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর আরেকটি অর্থ হল, সকলের আগ্রহ ও রোজকার কর্ম অনলাইনে জায়গা করে দেওয়া। প্রযুক্তি গণতন্ত্রায়নও সহজতর করে। ই-গভর্নমেন্ট পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন শুধু নাগরিক সেবা খাতগুলোর ডিজিটাইজেশনই নয়, সরকারের জবাবদিহিতা ও পলিসি-মেকিংএ জনগণের ই-পার্টিসিপেশনও নিশ্চিত করে।

যে কোনো অবকাঠামো প্রস্তাবনা, পরিকল্পনা, অনুমোদন ও বাস্তবায়নে বাজেট, কারিগরি খাত, মানবসম্পদ, মানোন্নয়নের পাশাপাশি সম্পূরক আইনি নীতিমালার কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। ডিজিটাল বাংলাদেশ অথবা প্রযুক্তিবান্ধব বাংলাদেশ প্রকল্পের সমান্তরালেও তেমনি প্রয়োজন আইনি কাঠামো। আশার কথা হল, আইন রয়েছেও। তবে সরকার, নাগরিক, বুদ্ধিজীবী মহলের বারোয়ারি দৃষ্টিভঙ্গিতে আইনি আলোচনা পরিষ্কার হওয়ার বদলে অস্পষ্ট ও দিকভ্রান্তই হচ্ছে বেশি।

বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অ্যাক্ট অ্যান্ড পলিসি মতে যে সকল আইন, বিধি ও নীতিমালা রয়েছে:

১. বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ সংশোধিত আইন, ২০১৪;

২. তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬/তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (সংশোধন) আইন, ২০১৩;

৩. জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালা, ২০১৫;

৪. তথ্য নিরাপত্তা পলিসি গাইডলাইন;

৫. সাইবার সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি।

এছাড়া নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধকল্পে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২ বিদ্যমান রয়েছে। সম্প্রতি জনমত বিনিময়ে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০১৫ খসড়াটি অনলাইনে উন্মুক্ত হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি আইন এবং সাইবার আইন এক নয়; তবে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের একটি পরিশাখা হিসেবে সাইবার আইন গণ্য হতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, পুরো আইনের উদ্দেশ্য ও এর আধুনিকায়ন নিয়ে তার সিকিভাগও আলোকপাত হয়নি। অথচ আইনটি জুড়ে ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর তথা ডিজিটাল সিগনেচারের মতো চমৎকার একটি সংযোজন রয়েছে। ডিজিটাল সিগনেচার আইনটি স্বাগত না জানানো এবং আলোচনায় উপেক্ষিত রাখা নিতান্তই অপরিপক্কতা। একই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের প্রায় পুরোটা জুড়ে সরাসরি ডিজিটাল সিগনেচার আইনের বয়ান থাকা এক প্রকার অজ্ঞতা। এটা সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত আইন প্রণয়ন করার চাপের ‘ব্যাড আউটপুট’ও হতে পারে।

তথ্যপ্রযুক্তি আইন বরং সহজ করে বিন্যাস করা যায়। এটি একটি ট্রি-স্ট্রাকচার অনুসরণ করতে পারে। এর শাখায় থাকবে অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আইন। যেমন:

১. ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর আইন;

২. ইন্টেলেকচুয়্যাল প্রপার্টি আইন;

৩. সাইবার আইন;

৪. পর্নোগ্রাফি আইন;

৫. ডাটা সেন্টার আইন;

৬. তথ্যপ্রযুক্তির অপরাপর সম্পূরক খাত-সম্পর্কিত আইন।

সম্ভাব্য অপব্যবহার ও অপরাধ রোধে আইনের পরিধি বিশাল। রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে দূরত্ব তৈরিতে নয়, বরং নাগরিক হয়রানি রোধ করতেই রাষ্ট্রকে আইন প্রণয়ন করতে হয়। সাইবার স্পেসে ক্রমাগত মানুষের পদচারণা বাড়তে থাকায় এই ভার্চুয়্যাল রাষ্ট্রের জন্যও আইন প্রয়োজন হয়।

ব্যক্তিগত ই-মেইল কিংবা ফেসবুকিং ছাপিয়ে অনলাইন স্পেস এখন সকল ধরনের বাণিজ্য কেন্দ্র। সাইবার জগতে গৃহস্থালী সামগ্রী থেকে কর্পোরেট লেনদেনের সুযোগ করে দেয় ই-কমার্স। অনলাইন ব্যাংকিং, ক্রেডিট অথবা ডেবিট কার্ডে অনলাইনে কেনাকাটা, টিকেট বুকিং দেওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন অনেকেই। এখানে জোচ্চুরি, জালিয়াতি ঘটলে নাগরিকের আশ্রয় হবে আইন। কিন্তু সাইবার স্পেস হচ্ছে অসীম, সীমান্তহীন– যাকে বলে ‘বর্ডারলেস টেরিটরি’। এখানে ভিকটিম থাকতে পারে এক দেশে, ওয়েব সাইট হোস্ট হতে পারে আরেক দেশে, হয়রানিকারী থাকতে পারে তৃতীয় কোনো একটি দেশে। সে ক্ষেত্রে কী করে অপরাধী শনাক্তকরণ, ভিকটিমকে সহায়তাকরণ ও আইনের প্রয়োগ সম্ভব?

সম্প্রতি ‘নিরাপদ ইন্টারনেট’ শিরোনামে এক গোলটেবিল বৈঠকে ঠিক এ রকম আশংকাই উচ্চারণ করেছিলেন বিটিআরসি সিস্টেম অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ এমদাদ উল বারী:

“সমস্যা হয় দেশের ভেতরে আমরা রিয়েল আইপি পর্যন্ত ট্র্যাক করতে পারি। তবে দেশের বাইরে যখন হয় তখন তা শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।”

এই ‘সমস্যা’ গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা সাইবার অপরাধের ধরনটি মূলত ‘ক্রস-বর্ডার ক্রাইম’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা অপরাধী চিহ্নিতকরণ, অপরাধ ও অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে গিয়ে বিশেষ কিছু প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েন। যেমন,

ক. রাষ্ট্র-ভেদে সাইবার আইনের ভিন্নতা;

খ. সাইবার অপরাধ ও অপরাধী শনাক্তকরণে প্রযুক্তির প্রয়োগ করা গেলেও সে সব প্রযুক্তি প্রয়োগবান্ধব আইন না থাকা;

গ. ভিন্ন রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের ক্লাউড তথ্য এক্সেস অনুমতি-বিষয়ক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা।

২০১২ সালে বাংলাদেশে সাইবার যুদ্ধ আলোচনার জায়গা দখল করে নিয়েছিল। সে সময় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি আয়োজিত একটি কনফারেন্সে সংক্ষিপ্ত গবেষণাপত্রের মাধ্যমে প্রস্তাব করেছিলাম যে, ক্রস-বর্ডার সাইবার ল’ নিয়ে এগুনো জরুরি (Creation of Cross Border Cyber Laws to Combat Cyber Warfare at Regional and Global Levels, Author: Ireen Sultana, M. Abdus Sobhan)। এই প্রয়োজনীয়তার উপলব্ধি রয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। ২০১৪ সালে ফ্রান্সে সাইবার নিরাপত্তা-বিষয়ক একটি সেমিনারে উপস্থিত সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞরাও ক্রস-বর্ডার সাইবার আইনের অভাবে সুষ্ঠু তদন্ত দুস্কর হয়ে ওঠে বলে মত দেন।

আধুনিক সাইবার আইনে ‘ক্রস-বর্ডার’ শব্দের অনুপস্থিতি কাম্য নয়। চীন ২০১৫ সালের জুলাইয়ে সাইবার নিরাপত্তা আইনের প্রথম খসড়াটি জনমত যাচাইয়ের জন্য উন্মুক্ত করে। তথ্য নিরাপত্তা ও গোপনীয়তায় প্রাধান্য দিয়ে তৈরি এ আইনে প্রথম বারের মতো নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের ‘ক্রস-বর্ডার’ বিনিময়-বিষয়ক ধারার সংযুক্তি ঘটেছে।

‘দ্বিপক্ষীয় স্বার্থরক্ষা’ করে একটি সহায়তামূলক চুক্তি তথা ’মিউচুয়্যাল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স’ হতে পারে এই ক্রস-বর্ডার সাইবার আইনের অংশ। এ চুক্তির ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র (অনুরোধকারী রাষ্ট্র) অপর রাষ্ট্রের (অনুরুদ্ধ রাষ্ট্র) নিকট তদন্তে সহায়তা-সাপেক্ষে অনুসন্ধান, অভিযান, সাক্ষী শুনানি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করার অনুরোধ জানাতে পারে। অপর রাষ্ট্রের অসম্মতিতে অবশ্যই অনুসন্ধান ও অভিযান আন্তর্জাতিক আইনসম্মত নয়। এ কারণে ‘ক্রস-বর্ডার’ সাইবার আইনে, যা কখনও কখনও ‘ট্রান্স-বর্ডার’ সাইবার আইন হিসেবেও উল্লিখিত হয়ে থাকে, ‘দ্বিপক্ষীয় স্বার্থরক্ষা’র দিকে নজর দেওয়া বাঞ্ছনীয়।

বাংলাদেশ এখনও শতভাগ ডিজিটাল বা প্রযুক্তিবান্ধব নয়। সরকারের দিক থেকেও প্রযুক্তিগত সকল কার্যক্রম ক্রটিমুক্ত নয়। এই ‘না’ হওয়া দোষনীয় নয়। ক্রমাগত মতবিনিময় ও জনসচেতনতা প্রযুক্তি ও আইন সচেতন হতে সহায়ক। প্রযুক্তিবিদ, অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ভিকটিম সমন্বয়ে নিয়মিত মতবিনিময় সভায় দেশি ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ও আইন নিয়ে আলোকপাত করলে আইনি জটিলতা, অস্বচ্ছতা ও অপব্যবহার এড়িয়ে আধুনিক তথা কার্যকরী সাইবার আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ সম্ভব। নিরাপদ ইন্টারনেটের জন্য কার্যকরী সাইবার আইনই সুরক্ষা দিতে পারে সাইবার নাগরিককে।

সীমান্তহীন এই জগত নিরাপদ চারণভূমি করতে রাষ্ট্রকে তাই ভাবতে হবে ক্রস-বর্ডার সাইবার আইনের সম্ভাবনা নিয়েই।