ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 
krishnochura2016
আরও কয়েকটা দিন কৃষ্ণচূড়ার আগুনে পুড়তে পারত সম্প্রতি আড়েবহরে বাড়ন্ত রাজধানী ঢাকা। তবে মৌসুমি ঝড় ও প্রতীক্ষিত বৃষ্টিতে নগরপথ এখন কৃষ্ণচূড়া ধোয়া। কিছুদিন পরই কৃষ্ণচূড়া, সোনালু, কনকচূড়ার বর্ণাঢ্য পুষ্পমঞ্জরি সাজঘরে ফিরবে আগামী বছরের প্রস্তুতিতে। কেবল ঝিরি পাতা দুলে উঠে প্রশান্তির বাতাসে জানান দেবে, দেশের রাজনৈতিক বাতাবরণ, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, কৃষ্ণচূড়া ফিরবে।
কৃষ্ণচূড়া যে কেবল ঢাকাতেই রাজত্ব কায়েম করে আছে তা নয়। নাগরিক সাংবাদিক কাজী শহীদ শওকতের সচিত্র লেখনী থেকে গোটা ময়মনসিংহ শহরের কৃষ্ণচূড়া জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার খবর জেনেছি। নারায়ণ সরকারের নাগরিক সাংবাদিক দৃষ্টিতে ধরা পড়েছিল হাতিরঝিল। ওখানকার বর্ণিল কৃষ্ণচূড়া নিয়ে তার সচিত্র লেখনী পড়ে সরকারকে সাধুবাদ না দিয়ে পারিনি।
২০১০ সালের দিকে সরকারের বনায়ন পরিকল্পনা সমালোচনার মুখে পড়েছিল। মনে আছে, মিরপুরে রোড ডিভাইডারসহ অনেক প্রধান সড়কে সারি সারি আকাশমনি দেখা যেত। মধুপুরের উজাড় হওয়া শালবনে ইউক্যালিপটাস আর আকাশমনি (অ্যাকাশিয়া) লাগানো হয়েছিল। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কে আকাশমনি প্রকল্পেরও সমালোচনা হয়েছিল। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ও গ্রামের দিকেও আকাশমনির বিস্তারণে চিন্তিত হয়েছিলেন পরিবেশ সচেতন সবাই। রবীন্দ্রনাথ আকাশমনির হলদে মঞ্জরির সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে একে সোনাঝুরি নামে ডাকলেও, আকাশমনি গ্রহণযোগ্য হয়নি পরিবেশবিদদের কাছে। জ্বালানি কাঠ প্রাপ্তি ছাড়া আকাশমনি পরিবেশে আর কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না। দীঘল ইউক্যালিপটাস গাছ অদ্ভুত সৌরভে বাতাস ভরিয়ে রাখলেও মাটির সিক্ততা শুষে নিতে পারে স্বার্থপরের মতো। মনে হচ্ছে, সেই আকাশমনি ও ইউক্যালিপটাস রোপণ থেকে সরকার বেরিয়ে আসতে পেরেছে।
এখন মিরপুরের রোড ডিভাইডারে সৌন্দর্যবর্ধন করছে রাধাচূড়াসহ আরও কিছু ফুলেল গাছ। শহরের বসুন্ধরার ওদিকের রাস্তার দু’পাশে দেখা যায় কৃষ্ণচূড়া গাছ। এয়ারপোর্ট যেতে রাধাচূড়ার সারি তো চোখে পড়বেই, আরও দেখা যায় কিছু সোনালু, কৃষ্ণচূড়া আর জারুল। ফিরতে পথে ডিওএইচএসের গলিতে ঢুকে বারিধারার পেছন পথে চোখে পড়বে পিংক শাওয়ার। নিসর্গবিদ দ্বিজেন শর্মা নাম দিয়েছিলেন লালসোনাইল। ঢাবি এলাকায় প্রতি বছর জারুল ফুলের দাপট। তপ্ত গ্রীষ্মে জাতীয় সংসদ ভবনের চারপাশে বসন্ত আনে সোনালু আর কনকচূড়ার বাহার। চন্দ্রিমা উদ্যানে চোখ ধাঁধিয়ে যাবে কৃষ্ণচূড়ার ছটায়। এ সময়টা আলোকচিত্রীদের জন্য ব্যস্ততার। সাহিত্যিকরাও কবিতা আর গল্পে কৃষ্ণচূড়াময় হয়ে ওঠেন। সংবাদপত্র কৃষ্ণচূড়া-জারুল-সোনালু নিয়ে প্রতিবেদন ছাপে। ২০১১ সাল থেকে ‘কৃষ্ণচূড়া আড্ডা’ নামে অনানুষ্ঠানিক মিলন মেলা করে আসছে কিছু তারুণ্যদীপ্ত মুখ। বোঝা যায়, কৃষ্ণচূড়া ছোঁয়াচে। কৃষ্ণচূড়া মাদাগাস্কারের না হয়ে বরং এই ভূমে স্থায়ী নিবাস গেড়েছে।
প্রসঙ্গত জাপানের জাতীয় ফুল চেরিও এ সময়ে ফুটে থাকে। মোহময়ী সৌন্দর্যের চেরি জাপানিদের সাহিত্য আর সংস্কৃতিতেও। চিত্রশিল্প কি হস্তশিল্প, শিল্পী চেরি ফুলের অবয়ব ফুটিয়ে তুলবেনই। মাস ধরে চেরি উৎসব চলে জাপানে। একে সাকুরাও বলে। উৎসবে মেতে থাকে রাজধানী থেকে রাজপ্রাসাদও। উপহারস্বরূপ আমেরিকানরা পেয়েছিল ৩০০০ চারা। তাই তো নিউইয়র্কেও হয় সাকুরা উৎসব। জাপানিরা পরিবার নিয়ে চেরি গাছের নিচে বসে সময় কাটান। যেমনটা আমরা কৃষ্ণচূড়া গাছের ছায়ায় আড্ডা দেই বন্ধু-স্বজন মিলে।
আজকাল চন্দ্রিমা উদ্যানে দর্শনার্থীরা খুব বেশিক্ষণ লেকের পাশে বা গাছের নিচে বসে থাকতে পারে না। নিরাপত্তায় নিয়োজিত বাহিনী দায়িত্ব পালনে তৎপর হলে কিছুক্ষণ পরপর একটা ছোটাছুটি তৈরি হয়। অনেক সময় তাদের বোঝানোও মুশকিল হয় যে, এখানে একদল মানুষ ‘কৃষ্ণচূড়া আড্ডা’ দিতে এসেছে। পুলিশ বাহিনী কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়েও সৌন্দর্য উপভোগের মুহূর্তগুলো হারিয়ে ফেলেন কর্তব্যের ঘেরাটোপে।
নগরজুড়ে কৃষ্ণচূড়া থাকলেও আয়েশে বসে সৌন্দর্য দেখার মতো উদ্যান আর পরিস্থিতি বিরল। এদিক থেকে সরকারের অনন্য প্রকল্প হাতিরঝিল হতে পারে একটি সম্ভাবনা। নগরবিদরা আরও পরিকল্পিতভাবে উদ্যান গড়তে পারেন। নগরের বিভিন্ন সড়কদ্বীপে কৃষ্ণচূড়া, জারুল, লালসোনাইল, সোনালু, কনকচূড়া, রাধাচূড়া রোপণের পাশাপাশি সড়কদ্বীপের নামকরণও হতে পারে ফুলের নামে। নিশ্চিতভাবে দেশি-বিদেশি পর্যটকের মন কাড়বে তা।
এখন উৎসবপ্রেমী এ জাতির জাতীয়ভাবে ‘কৃষ্ণচূড়া উৎসবে’ মেতে ওঠায় প্রয়োজন সৌন্দর্যময় সরকারি পরিকল্পনা। উত্তর ঢাকা ও দক্ষিণ ঢাকার দুই মেয়রকে কৃষ্ণচূড়াময় শুভেচ্ছা জানিয়ে তাদের কাছে এই প্রত্যাশা রাখলাম। হতে পারে আগামীতে নগরীর উত্তরে আর দক্ষিণে ‘কৃষ্ণচূড়া উৎসবের’ প্রধান মুখ হলেন এই দুই মেয়রই!
17May2016