ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

বছর পাঁচ আগেও এদেশে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যারা রাজনীতি সম্পর্কিত কথাবার্তা বলতেন-লিখতেন, তাদের আলোচনায় বাংলাদেশের পশ্চিমা নতজানু রাজনীতির সমালোচনা নিয়মিত ছিল। আজকাল চিত্রপট ভিন্ন। এখন আমেরিকার সরকার বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের নিকটাত্মীয় আর খোদ বাংলাদেশ সরকার যেন ‘শকুনি মামা’।

২০১৩ সালের এপ্রিলে ‘বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপ’ অনুষ্ঠানে মাননীয় তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে একই মঞ্চে বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকার সুযোগ ঘটেছিল। অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তু ছিল ‘ধর্ম অবমাননা’। সরকারের মুখপাত্র হিসেবে মাননীয় মন্ত্রীর কাছে এক ফাঁকে আর্জি রেখেছিলাম- সরকারকে এখন অভিভাবকের ভূমিকা নিতে হবে। তিন বছর গড়াতে গড়াতে সরকার আর তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সৃষ্ট বৈরিতায় আমার সেই প্রত্যাশা বিনষ্ট হতে দেখে যাচ্ছি।

সামরিক শাসন আর বিএনপির ক্ষমতাকালগুলোতে যখন আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন অসম্ভব হয়ে দেখা দিচ্ছিল, তখন অনেকেই মুখে মুখে বলতেন, তরুণ প্রজন্ম আওয়ামী লীগ পছন্দ করে না, বিএনপিকে ভোট দেয়। আওয়ামী লীগ স্বীকার করুক বা না করুক, অনলাইন চর্চা জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তরুণ প্রজন্মের গড়ে ওঠা সচেতনতা তাদের আওয়ামীমুখী করেছিল। যখন থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাওয়ার উচ্চকণ্ঠ তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জেগে উঠলো, আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় যাওয়ার প্রয়োজনীয়তাও উপলব্ধি হলো। জাগরণের সুর টের পেয়েছিল আওয়ামী লীগও, তাতে সাড়া দিয়ে নির্বাচনি ইশতেহারে যুক্ত হলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি।

 

২০০৮ সালের উৎসবমুখর জাতীয় নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চিন্তা করাটাও ছিল বোকামি। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের ‍উল্লেখযোগ্য কারণ ছিল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ওয়াদাকে বিশ্বাস করেছিল সাধারণ মানুষ, বিশেষত তরুণ ভোটাররা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্য নিয়ে আওয়ামী লীগের শুরুটা ঢিমেতালে হলেও মনে হচ্ছিল দল গড়তে আওয়ামী লীগ ক্রমান্বয়ে তরুণ প্রজন্মের ‘ধমনী’ বোঝার চেষ্টারত। ২০০৯ সালে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার যাত্রা শুরু ছিল তারই ইঙ্গিত। আওয়ামী লীগকে ঘিরে অনেক সমালোচনার ভিড়েও ডিজিটাল বাংলাদেশ ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মিডিয়ায়, অনলাইনে আর তরুণ প্রজন্মের আলোচনায়। আওয়ামী সরকারের ওপর আস্থা আর অনাস্থার দোলাচলে তরুণ প্রজন্ম যখন শাহবাগে ছুটে গেল কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ দণ্ডের দাবিতে, তখনও আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়কে তরুণ প্রজন্মের প্রতি মনোযোগী মনে হয়েছিল।

এর সামান্য পূর্বে অবশ্য অনেক অনলাইন বুদ্ধিজীবী বাক স্বাধীনতা, সাইবার আইন, ব্লগ আইন, ৫৭ ধারা একত্রে গুলে একটা অদ্ভুত উত্তেজনার বিস্তারে সফল হয়েছিল। সেই সুযোগে বাংলাদেশে ‘বাক স্বাধীনতা’ নিশ্চিত করতে ইউরোপ-আমেরিকার ফান্ড প্রবেশ শুরু হয়েই গিয়েছিল। এই বাক স্বাধীনতা সোজা কিছু নয়, এটা ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন ঘটনায় বোঝা গেল। ধর্মীয় কুসংস্কারাচ্ছন্নদেরও বাক স্বাধীনতা চাই, যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠীরও বাক স্বাধীনতা চাই, নাস্তিকের বাক স্বাধীনতা চাই, আস্তিকের বাক স্বাধীনতা চাই। বাক স্বাধীনতার বহুব্যবহার, চটুলব্যবহার, অপব্যবহার গোড়ার সেই সকল বুদ্ধিজীবীদের একে অন্যের সঙ্গে চিন্তার পার্থক্যগুলো প্রকট করছিল। অতঃপর বাক স্বাধীনতার দাবিদার সেই সব বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই নিশ্চুপ! অনেকে স্বর পাল্টেছেন!

রাজনীতির কালো দিকটা প্রকট হয়ে উঠতে শুরু হলো সাইবার, বাক স্বাধীনতা আর অর্থের অপব্যবহারে। অনেকের ধর্ম সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গিকে ব্যবহার করে মারণাস্ত্র তৈরি হলো এবং তার প্রয়োগও হলো। শুরুতে আওয়ামী লীগ সরকার তরুণ প্রজন্মের দিকেই ঝুঁকে ছিল। আর বিএনপি তথা ২০ দল প্রাণপ্রাত করে যাচ্ছিল হেফাজতের ঝাণ্ডা গাড়তে। বিচার প্রক্রিয়ায় যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি যত নিশ্চিত হচ্ছিল, অপরাজনীতি ততই অভ্যন্তরীণ খোলস ছেড়ে আন্তর্জাতিক হয়ে উঠতে শুরু করলো।

কোনও সন্দেহ নেই, আন্তর্জাতিক চক্রান্ত সত্ত্বেও দেশের মানুষ বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের ওপর আস্থা ধরে রাখতে চেয়েছে বারবার। যে তরুণ প্রজন্ম সরকারের ওপর আস্থা রাখছিল, যে জাগরণে সরকারও শরিক হচ্ছিল, তাকে প্রশ্নবিদ্ধ- ছত্রভঙ্গ করাটাই হলো সফল অপরাজনীতির মূলমন্ত্র। সুতরাং গুটি চালে ‘নাস্তিকতা’ নিয়ে বড় বড় শিরোনাম পত্রিকায়। হেফাজতের আগমন। ব্লগার হত্যা শুরু!

শাহবাগীরা নাস্তিক চিহ্নিত হলে, সাধারণ নাগরিক যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে শাহবাগে গিয়েছিল, তারা ‘নাস্তিক’ ব্লগারদের সঙ্গে শাহবাগে পায়ে পা মেলাতে স্বভাবতই পিছু পা হলো। অপরাধের তদন্ত ও বিচারে সরকারও যেন গড়িমসি করে তাই সরকারকেও নাস্তিক ডাকা হলো যখন-তখন। সুতরাং সরকার নিজ ভাবমূর্তি রক্ষার্থে সংগঠিত অপরাধের তদন্ত ও বিচার নিশ্চিতের চেয়ে আস্তিকতার চাদরে নিজ ভাবমূর্তি ধরে রাখতে ব্যস্ত হয়ে ‍উঠলো। ব্লগার হত্যা করে নাস্তিক নাম দেওয়ায় পাবলিক সেন্টিমেন্ট হত্যার বিপক্ষে জাগ্রত না হয়ে, নাস্তিকতা প্রসঙ্গেই বিক্ষুব্ধ হচ্ছে। সরকারও ‘স্পর্শকাতর’ বিষয়ে নিজেকে নিরাপদ রাখা শ্রেয় মনে করছে। তাতে লাভবান হচ্ছে কে? ক্ষতি হচ্ছে কার?

আজকে এসে বুঝতে অসুবিধা হয় না গুটি চালটা আমেরিকা, ইউরোপ, জাতিসংঘ বেশ পোক্ত হাতেই করেছে। তারা বাক স্বাধীনতার নামে তরুণদের সামনে ঠেলে দিয়েছে সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে। তাতে বাক স্বাধীনতার আবদারে আমার দেশ, হেফাজত, জামাত, বার্গম্যানের প্রোপাগান্ডা চালানোর পথও সুগম হয়েছে।

আওয়ামী সরকার অপরাপর পরিস্থিতি সামলাতে ব্রিবত হলেও, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে দৃঢ় ছিল। সরকার, তরুণ প্রজন্ম আর ধর্মভীরু সাধারণ নাগরিককে নাস্তিকতা প্রসঙ্গে একে অন্যের প্রতিপক্ষ করতে পারলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি নিয়ে গড়ে ওঠা গণজাগরণকে দাবিয়ে দেওয়া সহজ হয়। এরই ফাঁকে জামাতি অর্থায়নের লবিস্টদের মুখপাত্র হয়ে উঠতে শুরু করলো জাতিসংঘ। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি হলে, যা বাংলাদেশে আইনসিদ্ধভাবে সর্বোচ্চ দণ্ড, জাতিসংঘের পরাণ পোড়ে। আবার ব্লগারদের, যাদের অনেকেই প্রতক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির আন্দোলনে শরিক ছিলেন, হত্যা হলেও প্রাণ কাঁদে।

যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি হলে আমেরিকার পত্রিকায় ইসলামিস্ট-এর ফাঁসি হওয়ার শিরোনাম হয়। আর ব্লগার হত্যা হলে নাস্তিক হত্যার শিরোনাম। বাংলাদেশে কে নাস্তিক আর কে ইসলামিস্ট তা নির্ধারণ করে দিচ্ছে আমেরিকা! কিন্তু আমেরিকার চালাকি কে বুঝবে? ইউরোপ-আমেরিকার ফান্ড প্রজন্মের চিন্তাকে কিনে নিচ্ছে। ব্লগার হত্যা হলে যখন জাতিসংঘ, ইউরোপ, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র ব্লগারদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য তড়িঘড়ি করে দরজা খুলে দেয়, তখন চোরা হামলায় নিজ দেশের গলিতে পড়ে থাকা একেকটা লাশ কী করে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ক্যাসিনোতে দান দান তিন দান বাজির চাল হয়ে ওঠে তাই নিরস চেয়ে দেখি।

অপরাজনীতির চরিত্র অবশ্য বহুমুখি। যখন ধর্ম বিষয়ক লেখালেখি নিয়ে আমাদের ইসলাম ধর্মাবলম্বী রাষ্ট্রপক্ষ তাদের অবস্থান খোলাসা করেছে, তখন নতুন বিষয়ে অগ্নিপরীক্ষা – এলজিবিটি অর্থ্যাৎ সমকামিতা! একজন সেতার বাজানো শিক্ষক হত্যা হলে আমেরিকা-ইউকে-জার্মানি টুইটারে স্ট্যাটাস দেওয়ার বদলে অপেক্ষা করে একটা যুৎসই লাশের। রূপবান পত্রিকার সম্পাদক জুলহাস হলেন সেই যুৎসই লাশ। অতপর টুইট টুইট!

দুঃখজনক হলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আমরা জোরেসোরে ধন্যবাদ দিতে পারি না, কিন্তু হেফাজত গলা বাড়িয়ে আনুষ্ঠানিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে। প্রিয় প্রধানমন্ত্রী কি বুঝতে পারেন যে নাগরিকদের নিরাপত্তার দায়কে রাষ্ট্র যত ‘ডিজওউন’ করছে, হেফাজত ততই আপনাকে ‘ওউন’ করছে?

কেউ কেউ, অথবা অনেকেই যে মধ্যস্বত্বভোগী নয়, এমনটা বলার জো নেই আর। লাশের রাজনীতির লভ্যাংশ যে যার মতো বুঝে নিচ্ছে; কেউ নিরাপত্তাজনিত উৎকণ্ঠায় অথবা কেউ নিরাপত্তার নাম ভাঙিয়ে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম এখন ভেগে যাচ্ছে নিরাপত্তার ‘লোভে’ আমেরিকায়, জার্মানিতে।

হেফাজতের ‘হেফাজত করনেওয়ালা’ সরকার ভেবে দেখছে না একটা প্রজন্মের একাংশকে আওয়ামীবিরোধী করা হচ্ছে। সরকার তরুণ প্রজন্মের অভিভাবক হতে নিমরাজি! হায় সরকার! ওদিকে আমেরিকা-জার্মানির আশ্রিত থাকতে পশ্চিমা রাজনীতির দু’মুখো নীতি নিয়ে কথা বলার সেই প্রজন্মকেও মুখে কুলুপ এঁটে থাকতে হচ্ছে। হায় প্রজন্ম!

তবু নিরাপত্তার ‘প্রয়োজনে’ আর নিরাপত্তার ‘অজুহাতে’ ভাগ প্রজন্ম ভাগ! এ সরকার তোদের নিরাপত্তা দেবে না। এক থাল নিরাপত্তা নিয়ে বসে আছে জাতিসংঘ, ইউরোপ, জার্মানি, আমেরিকা!

 

******
বাংলাট্রিবিউন, মে ১৯, ২০১৬