ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

প্রযুক্তিবিদদের কাছে ‘ডেটা মাইনিং’ (Data Mining) পরিচিত হলেও প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের কাছে বিষয়টি ততটা জানা নাও থাকতে পারে। যদিও এই ব্যবহারকারীরাই ডেটা মাইনিংয়ের যাবতীয় উপাত্তের জোগান দিয়ে যান আপন খেয়ালে; কখনও বেখেয়ালে। সহজ কথায়, গবেষণায় উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের ধরণই ডেটা মাইনিংয়ের মূল। একজন প্রযুক্তিবিদের কাছে উপাত্ত (Data), তথ্য (Information) ও জ্ঞান (Knowledge) হচ্ছে বিশ্লেষণের ক্রমান্বয় স্তর।

গবেষণায় এই বিশ্লেষণকে স্বয়ংক্রিয় (automated) করেছে তথ্যপ্রযুক্তি, যার কারিগরি কাঠামোতে মিলবে মাইনিং অ্যাপ্লিকেশন, মাইনিং সফটওয়্যার, ডেটা ওয়্যারহাউজ (Data Warehouse), অ্যালগরিদম (Algorithm)।

পুঁজিবাজারে বিপণন, মূল্যসূচক, পণ্যের বাজার অবস্থান, ভোক্তার চাহিদা বিশ্লেষণে ডেটা মাইনিং কাজে লাগে। এর মাধ্যমে বাজারমূল্য, ভোক্তা সন্তুষ্টি এবং প্রতিষ্ঠানিক লাভের উপর প্রভাব আগাম উপস্থাপন করা সম্ভব। ডেটা মাইনিং চিকিৎসাশাস্ত্রসহ নানা ধরনের শিক্ষামূলক গবেষণাতেও কাজে লাগে। ইন্টারনেট, ই-কমার্স আর সোশ্যাল নেটওয়ার্ক মিলেমিশে ক্রেতা, বিক্রেতা আর ব্যবহারকারীর একটি বৃহৎ বিচরণ ক্ষেত্র গড়েছে। ব্যক্তিগত সময় ব্যয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা, বৃহৎ ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন, প্রাতিষ্ঠানিক কর্ম সম্পাদন– সবই চলছে। এসবই সাইবার স্পেসে ডেটা মাইনিং-কে আবশ্যক করে তোলে।

ফেসবুকে হঠাৎ ফ্রেন্ড সাজেশনে স্কুল-বন্ধুকে পেয়ে খুশিতে নেচে উঠেছেন অনেকে। বন্ধুর সঙ্গে তোলা কয়েক বছর আগের ছবি আচমকা চোখের সামনে তুলে ধরে ফেসবুক বলছে, বন্ধুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাও। ফেসবুককে তখন কেউ ভেবেছেন ‘চমৎকারি বাবা’। কেউ ভেবেছেন ‘বুদ্ধিমান’ (Intelligent)। প্রাযুক্তিক ভাষায়, একে বলা যায়, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (A.I বা Artificial Intelligence)। এই এআই-কে সফল করতে পারে ডেটা মাইনিং।

২০১৪ সালে ঘোষণা দিয়ে শিক্ষার্থীদের ইমেইলে ডেটা মাইনিং বন্ধ করতে হয়েছিল গুগলকে, যা প্রযোজ্য ছিল ৩০ মিলিয়ন শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের জন্য। অভিযোগ বরাবরই রয়েছে, ব্যবহারকারীর মেইলবক্স স্ক্যান করে গুগল। আসলে মেইলবক্স স্ক্যান থেকে করা হচ্ছে ডেটা মাইনিং এবং তাতেই ব্যবহারকারীর পছন্দ সম্পর্কে জেনে তাকে ব্যবসায়িকভাবে কাজে লাগানোর কৌশল নিতে পারে গুগল। যেমন, ব্যবহারকারীর নেটসার্ফিং ইন্টারেস্ট অনুযায়ী গুগলে এ্যাডসেন্স প্রদর্শিত হতে পারে।

জনপ্রিয় গুগল স্ট্রিট ভিউও কিন্তু ভিজ্যুয়াল ডেটা মাইনিং করে। ৬৫তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ গুগল স্ট্রিট ভিউয়ে যুক্ত হয় ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। প্রযুক্তির চমৎকারিত্বে ‘মুগ্ধ’ ব্যবহারকারীরা সেসময় সবাই আপন আপন বাসস্থানের স্ট্রিট ভিউ ফেসবুকে উন্মুক্ত করেছিলেন। বিষয়টা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে তা নিয়ে অধিকাংশই ছিলেন অসচেতন। এখন আমেরিকা থেকে, চাই কী আইএসের ‘কল্পিত রাজধানী’ রাকা থেকেও ঢাকাকে রেকি করা সম্ভব। জনতার জাগরণের শাহবাগ পরিধিতে কত প্রশস্ত, তা উচ্চমান সম্পন্ন ৩৬০ ডিগ্রি স্ট্রিট ভিউতে ধরা পড়বে। স্ট্রিট ভিউতে দেখা যাবে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁ সংলগ্ন অলিগলি!

ডিপফেস (DeepFace) প্রযুক্তি ফেসবুক ফেস ডিটেকশনকে এতটাই সুচারু করেছে যে, আপনি চিনে ফেলার আগেই ছবিতে থাকা আপনার বন্ধুটিকে ফেসবুক চিনে নিয়ে নিজে থেকে তার প্রোফাইল ট্যাগ করার পরামর্শ দেয়। অন্যদিকে চেক-ইন জনপ্রিয়তা ডেটা মাইনিং-কে সহজ করেছে। চেক-ইন ডেটা বিন্যাস থেকে ঢাকা শহরের রেস্তোরাঁগুলোর কোনটায় কী পরিমাণ গ্রাহক আনাগোনা করে, কোনটাতে দেশি আর কোনটাতে বিদেশিদের যাতায়াত বেশি, তা লেখচিত্র-তালিকা করে উপস্থাপন অসম্ভব কিছু নয়।

ফেসবুকে কোনো ব্যবহারকারীর পক্ষ থেকে যত বেশি উপাত্ত দেওয়া হবে, ডেটা মাইনিং থেকে উক্ত ব্যবহারকারী তথা ব্যক্তির পছন্দ ও অপছন্দের ধরন তত স্পষ্ট হয়ে উঠবে। ইমোটিকন-এর ব্যবহারও ফেসবুকে থাকা ব্যক্তিটির মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা জানান দেয়। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং জগতে ডেটা মাইনিং প্রযুক্তি একভাবে ‘ওপিনিয়ন মাইনিং’ (Opinion Mining) এবং ‘টেক্সট মাইনিং’ (Text Mining) করে। এভাবে বয়স, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাসস্থান, কর্মক্ষেত্র, প্রিয় সিনেমা, প্রিয় বই, সম্পর্ক– এমন সব বিন্যাসে ব্যবহারকারীদের বিভক্ত করা সম্ভব। প্রেমিকার সঙ্গে সদ্য ব্রেকআপে কোথাকার কতজন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, তাও ডেটা মাইনিং করা সম্ভব। সম্ভব হতে পারে ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের শ্রেণিবিন্যাসকরণও! এভাবে সহজ হতে পারে জঙ্গি সংগঠনগুলোর ‘সদস্য’ খোঁজার কাজটিও!

আমার এক পরিচিত ব্যক্তি প্রায়ই ওমুক-তমুক ব্যাংক থেকে লোন, স্যালারি অ্যাকাউন্ট খোলার অফার ইত্যাদি কারণে দেওয়া ফোনকলে বিরক্ত হন। সম্প্রতি ব্যাংক আলফালা থেকে তাকে স্যালারি অ্যাকাউন্ট করার অফার দেওয়া হয় ফোনে। স্যালারি অ্যাকাউন্ট খোলার অফার বস্তুত প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ এবং অ্যাকাউন্ট বিভাগের কাছে যাওয়াটা সমুচিত ছিল; খোদ গ্রাহকের কাছে ফোন আসাটা ভোক্তা হয়রানির সমতুল্য। এ ছাড়া এটা-সেটা অফার নিয়ে এসএমএস কিন্তু আসেই সবার কাছে। ‘টেলি-মার্কেটিং’ এভাবেই চলছে। যে ব্যাংকে ট্রানজাকশন হয়নি কখনো, যে দোকানে পা দেওয়া হয়নি ভোক্তার, সেখান থেকে ফোনকল ভোক্তার কাছে কী করে আসে? তাহলে ভোক্তার উপাত্ত (যেমন ফোন নম্বর) বিকিকিনি হচ্ছে। এবং এ-ও ডেটা মাইনিং!

সম্প্রতি আরেক পরিচিত ব্যক্তি সকাল সকাল একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোনকল পান। অপর প্রাপ্ত থেকে পরিচয় দেওয়া হয় গ্রামীণ ফোন (জিপি) থেকে ফোন করা হচ্ছে। যাকে ফোন করা হলো তার নম্বরের শেষের দুটি ডিজিট বলে জানতে চাওয়া হয়, এটার ‘ওনার’ কি আপনি? আমার পরিচিত ওই ব্যক্তি ইতোমধ্যে রি-রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করেছেন সফলভাবে; নিশ্চিতকরণ বার্তাও পেয়েছেন। তা ছাড়া জিপি কলসেন্টার সিসটেমে ব্যবহারকারীর সাধারণ তথ্যগুলো থাকাটাই স্বাভাবিক। সুতরাং, পরিচিত ব্যক্তি উল্টো জানতে চান, আপনি জিপি থেকে ফোন করছেন, তা বুঝবো কী করে! এতে অপর প্রান্তের ব্যক্তিটি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং চিবিয়ে চিবিয়ে বলেন, জিপি কোনো ফালতু কোম্পানি নয়। অপর প্রান্তের ব্যক্তি আরো জানান দেন, আপনার ফোনের লাইন কেটে দেওয়া হবে তখন বুঝবেন!

পরিচিত ব্যক্তিটি তৎক্ষণাত জিপি কল সেন্টারে ফোন করে তাকে করা ফোনের নম্বরসহ পুরো বিষয়টি জানান। জিপি কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধি নিশ্চিত করেন, সিম রি-রেজিস্ট্রেশন করা আছে, সুতরাং এভাবে কেউ সিম বন্ধ করতে পারবে না।

জ্বিনের বাদশার মতো ঠকবাজি থেকে শুরু করে আতংক তৈরি করতে জঙ্গি হুমকি প্রদান– ডেটা মাইনিং কিন্তু চলছে! তবে প্রযুক্তি ভয়ংকর কিছু হয়ে ওঠে যখন এর পরিচালনাকারীর ভেতরে দানবরূপটি প্রকট আকার ধারণ করে। মানবের নৈতিক, মানবিক, রাজনৈতিক ও প্রাযুক্তিক স্খলন ঘটলে ডেটা মাইনিং কেবল ব্যক্তির গোপনীয়তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং আজকের বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদকে মদদ দেয়। ডেটা মাইনিং নির্ভর জঙ্গিবাদ বিস্তার ঠেকানোর কি প্রতিকার হতে পারে তবে? উত্তর: ডেটা মাইনিং-ই।

সম্প্রতি জিকা ভাইরাস বিস্তার সম্পর্কিত গবেষণায় প্রাযুক্তিক সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে এসেছে আইবিএম (IBM)। এ ক্ষেত্রে মানুষের ভ্রমণ-কাঠামো এবং প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত অবস্থার নানা উপাত্ত বিশ্লেষিত হবে। গবেষণায় ডেটা মাইনিং আসলে এভাবেই ইতিবাচক।

দু-চারজন জঙ্গির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় হলেই যদি জঙ্গিবাদের কারখানা ধরা হয় বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়কে, তবে বুঝতে হবে আমরা এখনো আবেগী এবং সীমিত দৃষ্টিকোণ থেকে জঙ্গি হামলাগুলোকে দেখছি। আলোচনার ভিত্তি গড়তে ডেটা মাইনিং সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশ ও বিদেশের জঙ্গি হামলাগুলোর যোগসূত্র, চরিত্র বিশ্লেষণ করা আবশ্যিক এখন। যেমন:

(১) আদর্শ জঙ্গিচরিত্র (Typical Terrorist Behavior) কেমন হতে পারে তা নির্ণয় করা;

(২) প্রযুক্তি প্রয়োগে জঙ্গিসংগঠনগুলোর বিভিন্ন ওয়েবসাইট ‘মনিটরিং’ করা;

(৩) স্পর্শকাতর তথ্য (রাষ্ট্রীয়, সরকারি, বেসরকারি) রয়েছে– এমন ডেটাবেজ/সিসটেম/এপ্লিকেশনে কার কতটুকু প্রবেশাধিকার রয়েছে তা খতিয়ে দেখা। প্রয়োজনে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য যাচাই করে দেখা;

(৪) জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) একটি ছবি যুক্ত থাকলেও সরকারি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে ব্যক্তির কয়েক ধরনের প্রোফাইল ছবি থাকা জরুরি। ফেসিয়াল রেকগনিশন সিসটেম (Facial Recognition Systems) ব্যবহার করে জঙ্গিদের ছবি বিশ্লেষণ করলে পরিচয় মেলানো সহজ হতে পারে। যদিও এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতা আছে;

(৫) ফেসিয়াল রেকগনিশন সফটওয়্যার ব্যবহার করে সিসিটিভি ফুটেজ থেকে চেহারা নির্ণয়। এ ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতা আছে;

(৬) এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে সংগঠিত সব জঙ্গি-কর্মকাণ্ডের ‘ইনসিডেন্ট ডেটাবেজ’ তৈরি করতে হবে। প্রতিটি ঘটনার বিশ্লেষণ থেকে প্রাপ্ত উপাত্তের ডেটা মাইনিং করে হামলা ও পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে যোগসূত্র, সাধারণ চরিত্র নির্ণয় করতে হবে;

(৭) পাঁচজন জঙ্গির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেখে অনুসিদ্ধান্ত না টেনে বরং এখন পর্যন্ত আটককৃত কিংবা নিহত সব জঙ্গির পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল তথা ডেটাবেজ করতে হবে। এরপর এদের জন্মস্থান, বয়স, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, ভ্রমণবৃত্তান্ত, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, অর্থনৈতিক অবস্থার উপাত্তগুলো সমন্বয় করে এদের মধ্যকার যোগসূত্র, সাধারণ চরিত্র নির্ণয় করতে হবে;

(৮) জাতীয় পরিচয়পত্রকে আরো ডিজিটাইজড করতে হবে। ব্যক্তির নামে জঙ্গি, জেএমবি, জামায়াত-শিবির, পেট্রোলবোমা হামলা, যুদ্ধাপরাধজনিত মামলা, আটকাদেশ থাকলে উক্ত ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রের ডেটাবেজে এসব মামলা ও আইনি বিবরণ যুক্ত করতে হবে। এনআইডি নম্বর ব্যবহার করে এসব তথ্য কেবলমাত্র সরকারের গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ‘বিশেষ অনুমতি’ সাপেক্ষে দেখতে পারেন। এ ধরনের ডেটাবেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ কিংবা গোয়েন্দা সংস্থা সন্দেহভাজনদের তালিকা প্রস্তুত করতে সক্ষম হবেন;

(৯) নিখোঁজ ব্যক্তি সংক্রান্ত তথ্য (যেমন জিডির বিবরণ) এনআইডি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে সংযুক্ত করা উচিৎ। ব্যক্তি কবে থেকে নিখোঁজ, কবে ফিরলেন নাকি ফিরলেন না– এসব ডেটা মাইনিং করাও আবশ্যক;

(১০) খেয়াল করতে হবে, গুলশান হামলাকারীদের প্রোফাইল ছবিগুলোতে আলোর প্রাচুর্যতা দেখা গেছে। জঙ্গিদের হাতে, অস্ত্রের উপর, মুখের একপাশে উজ্জল আলো যেভাবে ছিল, তা হয় দিনের আলো নয় তো বড় ফ্লাশ লাইটের আলো। কিন্তু কল্যাণপুরের জঙ্গিদের ছবিগুলোতে ‘আলো ঘরে’ তোলা আলোর মতো সীমিত। আলোর আধিক্যে এবং সম্ভবত ক্যামেরার মানের কারণেও গুলশান হামলায় জড়িত জঙ্গিদের প্রোফাইল ছবিগুলোর ‘মান’ কিছুটা ভালো মনে হয়েছে। রিটা কাৎজের ‘সাইট’ ও আইএসের মুখপত্র ‘আমাক’ সত্যায়নকারী হয়ে যেসব ছবি প্রচার করছে, সেসব ছবির ইমেজ/ফটো ভেরিফিকেশন করা প্রয়োজন। গুলশান হামলাকারীদের ছবির পেছনের ব্যাকগ্রাউন্ড আর কল্যাণপুরে অবস্থানতর জঙ্গিদের ছবির প্রাযুক্তিক বিশ্লেষণ করলে জঙ্গি সংগঠনগুলো বিভ্রান্তি কম ছড়াতে পারবে;

(১১) বাংলা-ইংরেজি-আরবি মিশিয়ে যে তিন তরুণের ভিডিওবার্তা প্রচার হয়েছিল, সেই ভিডিও ইমেজ ভেরিফিকেশন করা প্রয়োজন। পেছনের ঘোলাটে ব্যাকগ্রাউন্ডে চলমান গাড়ি, রাস্তা– এসব কোন শহর হতে পারে, তা নির্ণয় প্রযুক্তির ব্যবহারে অসম্ভব কিছু নয়।

সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধে ‘ক্রস-বর্ডার সাইবার আইন’ নিয়ে একটি ‘কনফারেন্স পেপার’ লিখেছিলাম ২০১২ সালে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ‘মতামত’ পাতায় লিখেছিলাম ২০১৫ সালে। সরকারের কাছে প্রস্তাবনা ছিল–

‘দ্বিপক্ষীয় স্বার্থরক্ষা’ করে একটি সহায়তামূলক চুক্তি তথা ‘মিউচুয়্যাল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স’ হতে পারে এই ক্রস-বর্ডার সাইবার আইনের অংশ। এ চুক্তির ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র (অনুরোধকারী রাষ্ট্র) অপর রাষ্ট্রের (অনুরুদ্ধ রাষ্ট্র) কাছে তদন্তে সহায়তা-সাপেক্ষে অনুসন্ধান, অভিযান, সাক্ষী-শুনানি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করার অনুরোধ জানাতে পারে। অপর রাষ্ট্রের অসম্মতিতে অবশ্যই অনুসন্ধান ও অভিযান আন্তর্জাতিক আইনসম্মত নয়। এ কারণে ‘ক্রস-বর্ডার’ সাইবার আইনে, যা কখনো কখনো ‘ট্রান্স-বর্ডার’ সাইবার আইন হিসেবেও উল্লিখিত হয়ে থাকে; ‘দ্বিপক্ষীয় স্বার্থরক্ষা’র দিকে নজর দেওয়া বাঞ্ছনীয়।

এ বছর সাইবার নিরাপত্তা ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়ে প্রতিকার পেতে ফেসবুকের সঙ্গে চুক্তি করেছে সরকার। সম্প্রতি সাইবার পরিসরে আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ-ভারতের সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) স্বাক্ষর এই সম্ভাবনা জাগালো যে, সরকার ক্রসবর্ডার সাইবার আইন কাঠামোতে এগোচ্ছে। এখন দ্বিপক্ষীয় স্বার্থরক্ষা করে উপাত্ত, দক্ষতা, প্রযুক্তি, আইন সহযোগিতা সহজ ও দ্রুত হবে।

কমনওয়েলথ-এর একটি সাইবারক্রাইমবিরোধী উদ্যোগ (Commonwealth Cyber-crime Initiative) রয়েছে। আছে সাইবার ক্রাইম নিয়ে কমনওয়েলথ মডেল আইন। প্রত্যাশা থাকছে, কমনওয়েলথ অন্তর্ভুক্ত দেশ বাংলাদেশ এই কাঠামোর সুবিধা ও সহযোগিতা প্রাপ্তি নিয়ে শিগগিরই আলোচনায় বসবে।

২০১২ সালে ‘যুদ্ধাপরাধের বিচার ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা’ শীর্ষক ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটি সেমিনার হলে এক আলোচনায় শঙ্কা প্রকাশ করেছিলাম যে, জামায়াত-শিবির অনেক বেশি ডিজিটাইজড। আজকের উপলব্ধি হচ্ছে, দেশে ও বিদেশে প্রতিটি জঙ্গিসংগঠন প্রযুক্তির চূড়ান্ত অপব্যবহার করে মানবজাতির ক্ষতিসাধনে লিপ্ত। এসব জঙ্গি নিধনে একতা, সততা, দক্ষতা ও আইন ছাড়াও প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

উপাত্তখনন:

১. Data Mining Emotion in Social Network Communication: Gender differences in MySpace – Mike Thelwall, David Wilkinson, Sukhvinder Uppal

২. নিরাপদ ইন্টারনেট ও ‘ক্রস-বর্ডার সাইবার’ আইন

৩. http://thecommonwealth.org/commonwealth-cybercrime-initiative

৪. অনলাইনে জঙ্গি তৎপরতা রুখতে চুক্তি করবে বাংলাদেশ-ভারত

http://bangla.bdnews24.com/bangladesh/article1189047.bdnews

৫. Facial recognition: is the technology taking away your identity?

https://www.theguardian.com/technology/2014/may/04/facial-recognition-technology-identity-tesco-ethical-issues

 

***

প্রকাশিত: http://opinion.bdnews24.com, ২৯ জুলাই, ২০১৬