ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 
নির্বাচনের আগে আগে আমেরিকার রাজনীতি শিষ্টাচারের লেবাস খুলে ফেলে। তখন সে অঙ্গনে চলা কলতলার ঝগড়া ‘টিআরপি’তে এগিয়ে থাকে। গত আগস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প আইএসের জনক সাব্যস্ত করলেন ওবামা ও হিলারিকে। ট্রাম্প অবাক করা কিছু বলেননি। তবে ট্রাম্প যদি নির্বাচনে জয়ী হন, সে ক্ষেত্রে আমেরিকার যুদ্ধনীতিতে পরিবর্তন আসবে কি? দল বা ব্যক্তি যা-ই হোক, যুদ্ধনীতির যে ধারাবাহিকতা আমেরিকার প্রশাসনে বলবৎ থেকেছে, নির্বাচনে জিতলে সেই ধারাবাহিকতায় ট্রাম্প আইএসের অভিভাবকত্ব ‘নেবেন না’ এমনটা ঘটার সম্ভাবনা শূণ্য।

অবশ্যই বিবিসি ও সিএনএনের মতো মিডিয়া না হলে আইএসের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা সহজ হত না। উম্মাদীয় হত্যা, আগ্রাসী ধ্বংসযজ্ঞ-– সবখানেই দায় নিতে তৎপর আইএস। কেবল আমেরিকাতে আইএস নেই! সমকামী ক্লাবে হামলাকারী ওমর মতিনকে নিয়ে একাধিক ধারণা দেওয়া হয়েছে। মতিন ‘স্বপ্রণোদিত’ আইএস-সমর্থক। অর্থাৎ আইএস আদতে আমেরিকায় নেই। মতিন মানসিক ভারসাম্যহীন। আমেরিকায় যে কোনো হামলার ঘটনায় নিয়মিত কারণ হল মানসিক ভারসাম্যহীনতা। মতিন সমকামী। সমকামী ব্যক্তির সমকামী ক্লাবে চালানো বিভৎসতা নিছক ‘ব্যক্তিগত’ আক্রোশ!

আমেরিকায় টিভি রিপোর্টার হত্যা জঙ্গিবাদ নয়; মুক্তমতের উপর আঘাতও নয়। যেমন করে আমাদের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, আমেরিকাও তেমনি নিজ দেশের সংগঠিত হত্যাকাণ্ডগুলো ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনার’ আদলই দিয়ে গেছে। আমেরিকায় আইএস না-থাকা নিয়ে ওরা আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব নিয়ে আবার ওরাই অতিউৎসাহী।

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে দেশে জঙ্গি তৎপরতা এবং আইএসের দায় স্বীকার আমেরিকাকে ঘন ঘন মঞ্চে ওঠার সুযোগ করে দিতে পারে। ইতালীয় ও জাপানি নাগরিক হত্যা এবং হোসাইনি দালানে হামলার পর বাংলাদেশে আইএস আছে কী নেই তা যাচাইয়ের পরামর্শ ছিল আমেরিকার। ২০১৬ সালে হিজড়া ও সমকামীদের অধিকার-বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘রূপবান’এর সম্পাদক জুলহাস হত্যাকাণ্ডের পর এপ্রিলে মার্শা বার্নিকাট স্পষ্ট দাবি করলেন, বাংলাদেশে আইএস রয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশ প্রশাসন হত্যাকাণ্ডগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা অথবা স্থানীয় জঙ্গিবাদই বলছিল, তাই জুনে (২০১৬) বার্নিকাটের মাধ্যমে আমেরিকা ফের জানিয়ে দিল, আইএস এখন সর্বত্র। তার মানে, বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব স্বীকার করার আহবান জানাচ্ছে (মূখ্যত চাপ দিচ্ছে) পশ্চিম।

কিন্তু আইএস বাংলাদেশে নজর দেবে কেন? বাংলাদেশের প্রজন্মকে জানতে বাংলাদেশ সরকারের চেয়ে আমেরিকার আগ্রহই বেশি ছিল। ২০১২ সালে (মে মাসে) হিলারি ক্লিনটন আগ্রহী ছিলেন ‘বাংলাদেশের সঙ্গে আড্ডা’ দিতে। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে ফেসবুকে ‘বাংলাদেশের সঙ্গে আড্ডা’ দিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা। হিলারি ও মজিনার মতো ঝানু কুটনৈতিক নেতাদের আমাদের তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক-আর্থ-সামাজিক চিন্তার ধরন বুঝতে বেগ পেতে হয়নি নিশ্চিত। তরুণদের অনলাইনপ্রীতি, আমেরিকায় যাওয়ার ইচ্ছা, সরকারের প্রতি আস্থা অথবা অনাস্থা, রাজনৈতিক উৎসাহ অথবা বৈরাগ্য-– কোনোটাই পশ্চিমা প্রশাসনের বিশ্লেষণের বাইরে থাকার কথা নয়।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ে ভূমিকা রেখেছিল তরুণ প্রজন্ম। তরুণদের আওয়ামী-মুখাপেক্ষীতার প্রধান কারণ ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। এ জন্য অনলাইনেও তাদের ইতিবাচক তৎপরতা আওয়ামী লীগের সরকার গঠন অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছিল। অবশ্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার প্রজন্ম আওয়ামী লীগ সরকারকে নিয়ে দোলাচলের ভেতর দিয়েও গেছে। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সেই উৎকণ্ঠাই সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠেছিল গণজাগরণ মঞ্চ হয়ে কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে বিএনপি আর জামায়াত মিলেমিশে একাকার। জাতীয় পার্টির কণ্ঠস্বর ক্ষীণ। যে জনতা, যে প্রজন্ম আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা দিয়েছিল, কেবল সেই জনতা, সেই প্রজন্মই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বুঝে নিতে সরকারের মুখোমুখি। এই তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে আমেরিকার ‘আড্ডা’ দেওয়াটা তাই যথার্থ ছিল।

বাচ্চু রাজাকারের বিচারের রায় ফাঁসি হলেও তার ‘পলাতক’ অবস্থা ফাঁসি কার্যকরে অন্তরায়। এরপর কুখ্যাত কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন পরিস্থিতি উত্তাল করেছিল। জানা যাচ্ছিল জামায়াতের বিদেশি ‘লবিস্ট’ নিয়োগের ষড়যন্ত্র। যদিও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে শীর্ষ পাঁচ দেশের তালিকায় আমেরিকাকে পাওয়া যাবে, তারপরও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরোধিতাকারী যুদ্ধাপরাধীদের জন্য মানবিক হয়ে উঠল পশ্চিম।

শাহবাগে মুখে মুখে স্লোগান ছিল ‘ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই’; এটাই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জন্য ছিল বড় ’ট্রাম্প কার্ড’। বিশ্বে ‘ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট’ রহিতকরণের প্রক্রিয়ার সূত্র ধরে আচমকা জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি থেকে কখনও মৃত্যুদণ্ড বন্ধে বার্তা দেওয়া হয়েছে। কখনও ২০ দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুরে সুর মিলিয়ে বিচারের মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। যারা যুদ্ধাপরাধী ও মৌলবাদী হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছিল প্রতিবাদ সমাবেশে ও ট্রাইব্যুনালে, তাদেরকে পশ্চিমা গণমাধ্যম সম্বোধন করছিল ‘ইসলামিস্ট’ বলে। পশ্চিমা গণমাধ্যমের বিভিন্ন শিরোনামগুলো:

Bangladesh hangs Islamist leader despite U.N. objections, edition.cnn.com, ১২ ডিসেম্বর ২০১৩

Bangladesh Islamist Abdul Kader Mullah hanged, www.bbc.com, ১২ ডিসেম্বর ২০১৩

Death for Bangladesh Islamist leader Mir Quasem Ali, www.bbc.com, ২ নভেম্বর ২০১৪

Bangladesh Islamist politician Kamaruzzaman hanged, www.bbc.com, ১১ এপ্রিল ২০১৫

Bangladesh executes Islamist leader Motiur Rahman Nizami for war crimes, edition.cnn.com, ১১ মে ২০১৬

Bangladeshi Islamist leader to be executed in days after losing final appeal over historic war crimes tribunal, www.dailymail.co.uk, ৩০ আগস্ট ২০১৬

Bangladesh hangs Islamist Mir Quasem Ali for 1971 war crimes, www.bbc.com, ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬

ভারতীয় পত্রিকা ‘দ্য হিন্দু’ চেষ্টা করেছে একটি উপযোগী শিরোনামের: Bangladesh executes Jamaat leader Mir Quasem Ali (৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬)– যেখানে মীর কাশেম ও জামায়াতের সম্পর্ক উপস্থাপিত হয়েছে। বিবিসি একজন যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরীকে প্রতিবেদন শীর্ষকে পরিচয় করে দিয়েছে সংসদ সদস্য হিসেবে (Bangladesh MP Salahuddin Quader Chowdhury to hang for war crimes, বিবিসি, ১ অক্টোবর ২০১৫)।

বর্তমান সংসদে বিএনপি নেই। সাকা চৌধুরীর ‘সংসদ সদস্য’ পরিচয়ে ‘সাবেক’ উল্লেখ না করে বিবিসি কী বার্তা দিতে চায়? মীর কাশেম আলীর ফাঁসি কার্যকরের কিছুদিন পূর্বেও অ্যামনেস্টি ফাঁসি স্থগিতের বক্তব্য দিয়েছে এবং বিচারপ্রক্রিয়া ক্রুটিপূর্ণ উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে।

[Bangladesh: Halt imminent execution of Mir Quasem Ali after unfair trial, ৩০ আগস্ট ২০১৬]

যুদ্ধাপরাধীরের জন্য অ্যামনেস্টির মানবাধিকার সংজ্ঞা এবং জাতিসংঘের ফাঁসি কার্যকর ‘না’ করার চাপ বোঝায় লবিস্টদের লবিং কতদূর বিস্তৃত হতে পারে। ১০ অক্টোবর পালন করা হয় আন্তর্জাতিক মৃত্যুদণ্ডবিরোধী দিবস। এই দিবসের আড়ালে ইইউ মৃত্যুদণ্ড প্রথা তুলে নেওয়ার চাপ দিতে থাকে বাংলাদেশকে। অথচ ভিন্ন পদ্ধতিতে (যেমন লেথাল ইনজেকশন) আমেরিকাতেও মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে। তুরস্ক মতিউর রহমান নিজামীকে যুদ্ধাপরাধী মনে করেনি এবং নিজামীর মৃত্যুদণ্ডে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। সেই তুরস্ককে অচিরেই সরকারবিরোধী অভ্যুত্থানকারীদের জন্য মৃত্যুদণ্ড নিয়ে ভাবতে হয়েছিল।

পৃথিবীর অনেক দেশে মৃত্যুদণ্ড প্রথা না থাকলেও, রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও যুদ্ধাপরাধের মতো অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে। পশ্চিমা সংস্থাগুলোর এমন নগ্নভাবে বাংলাদেশে বহাল আইনি ব্যবস্থা নিয়ে মোড়লগিরি তাই নিন্দনীয়।

২০ দল এবং পশ্চিমাদের ‘নজরে’ ছিল তরুণ প্রজন্ম। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়ায় সরকারকে নৈতিক শক্তি জোগাচ্ছিল প্রজন্ম। সুতরাং প্রজন্ম আর সরকারের মধ্যে অনাস্থা জাগিয়ে দুপক্ষের বিভেদীকরণই মুখ্য কৌশল হয়ে উঠল।

ইন্টারনেট ও আকাশ সংস্কৃতির যুগে ভৌগলিক সীমার রক্ষণশীলতা দিয়ে বহুমুখী সংস্কৃতি আর জীবনযাপনের মিশ্রণ ঠেকানো দুরুহ। সরকারপক্ষকে ভোটের হিসাব করে চলতে হয় বলে, চিন্তা-সংস্কৃতি-যাপনের এইরূপ ‘হাওয়া-বদল’ বাংলাদেশের কোনো সরকারের পক্ষে গ্রহণ করা অসম্ভব– তা সে আজকের ডিজিটাল সরকার আওয়ামী লীগই হোক আর যে-ই হোক না কেন। অনলাইনে তরুণ প্রজন্ম যে কোনো বিষয়ে মতপ্রকাশে নিরিক্ষণধর্মী। হয়তো অতিমাত্রায় স্বাধীনতা-প্রত্যাশীও। এ কারণে সরকার ও অনলাইন ব্যবহারকারীদের মধ্যে নানা ইস্যুতে পরস্পরবিরোধিতাও হয়। অনলাইন প্রজন্ম এবং সরকারের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চরমে নিতে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘আমার দেশ’ পত্রিকা ‘নাস্তিক’ শব্দটি মুদ্রিত করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করে। ফলে–

১. ‘নাস্তিক’ তকমা এড়াতে চাওয়া জনতা শাহবাগ থেকে দ্রুত দূরে সরে গেল। অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন থেকে জনতাকে পিছু হঠানো গেল।

২. যে সরকার রাষ্ট্রকে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ অবস্থানে নিতে অপারগ, সেই সরকার ‘নাস্তিকতা’ নিয়েও দিশাহারা হয়ে গেল। যে কারণে ব্লগার রাজীবের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সমবেদনাও দ্রুত চাপা পড়ে যায়। অথবা অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের পর শোকে কাতর পিতার কাছে দুঃখপ্রকাশ সরকারের ইমেজ সংকটের আশঙ্কা তৈরি করে।

৩. দাবি যতই হোক, সরকার যেন ব্লগার হত্যাকারীদের বিচারে জোরালো তৎপর না হতে পারে, তাই সরকারকেও ‘নাস্তিক’ আখ্যা দেওয়া হল। এই তকমা এড়াতে হত্যাকারীদের আটকে সরকারের সদিচ্ছার অস্পষ্টতা সুস্পষ্ট হয়ে উঠল।

৪. ব্লগার-হত্যা প্রজন্ম আর সরকারের যুথবদ্ধতায় ভাঙ্গন ধরাল তো বটেই, জার্মানি-ইউকে-আমেরিকার বিভিন্ন সংস্থার গেলানো মুক্তমতের বড়ি ক্রমাগত সরকারের বিরুদ্ধে প্রজন্মকে বিষিয়ে তুলল। ঠিক এ কারণেই প্রথম ধাপে ‘ব্লগার-হত্যা’ জরুরি ছিল ষড়যন্ত্রকারীদের জন্য।
একেকটি হত্যাকাণ্ডের পর সরকারের নির্লিপ্ততা, ‘নাস্তিক’ হত্যা হচ্ছে ভেবে জনগণের প্রতিবাদহীন থাকা আর বিদেশি মিডিয়ার নাক-গলানো দেশে জঙ্গিদের সংগঠিত হতে দিচ্ছিল। প্রতিটি হত্যাকাণ্ড এমনভাবে পরিকল্পিত ছিল যেন পশ্চিমা গণমাধ্যমের আলো পড়ে। অভিজিৎ রায়ের আমেরিকার পাসপোর্ট থাকায় তাঁকে হত্যা করা হলে বাংলাদেশ সরকারকে সহজেই বেকায়দায় ফেলতে পারে আমেরিকা।

‘নাস্তিকতা’ নিয়ে সরকার যখন বেসামাল, তখন নতুন চাল হল ‘সমকামিতা’। অর্থাৎ জুলহাস হত্যাকাণ্ড। ব্লগার-হত্যা হলে কে এথিস্ট, কে সেক্যুলার, কে এলজিবিটি তা নির্ধারণ করছিল পশ্চিমা গণমাধ্যম। সার্বিকভাবে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিভিন্ন পশ্চিমা গণমাধ্যম যে বার্তা প্রচার করল তা এ রকম:

১. বাংলাদেশে ইসলামিস্টদের ফাঁসি হয়;

২. বাংলাদেশে নাস্তিক প্রজন্ম রয়েছে;

৩. বাংলাদেশে সমকামী গোষ্ঠী রয়েছে।

সরকার ও অনলাইন ব্যবহারকারীদের মধ্যে জন্মানো বিদ্বেষ কাজে লাগিয়ে পশ্চিমা দুয়ার খোলে প্রজন্মের জন্য। পশ্চিমা নিরাপত্তা আর পশ্চিমা অর্থ-– দুটোর কাছে হুড়মুড় করে সমর্পিত হয় অনেকে। পশ্চিম ‘বিশেষ’ ব্লগারদের জন্য এই সুযোগ-সুবিধা ঘোষণা করে। এই ‘বিশেষ’ বাছা্ইয়ের ‘গোপন’ ফর্মূলা থাকে আমেরিকা-ইউরোপের হাতেই।

হত্যাকারীদের ধরার চেয়ে নাস্তিকতা ও সমকামিতা নিয়ে সরকারি মন্ত্রীরা যখন বেসামাল বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন, তখন বিদেশি নাগরিক হত্যা শুরু হল। বিধর্মী-নাস্তিক হিসেবে হিন্দু-বৌদ্ধ হত্যাও শুরু হল। এত কিছুতেও জঙ্গিবাদের আন্তঃসম্পর্ক ধরতে অপারগ সরকার ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ তত্ত্বে অটল রয়ে গেল।

বাংলাদেশ-সম্পর্কিত সংবাদ শিরোনামে ততদিনে আইএসকে ইশারা করতে সক্ষম হয়েছে পশ্চিমা গণমাধ্যম। ধর্মীয়-সামাজিক রক্ষণশীলতা, ভোটের মারপ্যাঁচে সরকারকে ব্রিবত রাখা গেছে। প্রজন্মকে পাঠানো হয়েছে দূর দেশে। দেশে কাউকে কাউকে মুক্তমত নিয়ে সরকার-বিরোধিতায় ব্যস্ত রাখা গেছে। আমজনতাকে বিরূপ করা গেছে ‘নাস্তিকতা’ ও ‘সমকামিতা’ শব্দ দ্বারা এবং দেশে থাকা বাকিদের মাঝে অঘাটে-কুঘাটে চাপাতির আঘাতে মরার ভয় ঢুকে গেছে।

রাষ্ট্রকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে এমন দুর্বল মুহূর্তে পৌঁছে দিয়ে বড়সর হামলার ক্ষেত্র গড়া হল। জঙ্গিবাদ অবশ্যই লাভজনক ‘ব্যবসা’। আইএস একটি জায়ান্ট করপোরেট হাউজ। এর শাখা আছে। যেমন, আইসিল (Islamic State of Iraq and the Levant) অথবা আইসিস (Islamic State of Iraq and Syria)। এর ‘ব্র্যান্ডিং‘ রয়েছে। এখানে বিভিন্ন পদমর্যাদা আছে। এখানে কর্মী নিয়োগ হয়। কর্মীদের প্রশিক্ষণ হয়। অস্ত্র কেনাবেচা হয়। মাদক কেনাবেচা হয়। জান্নাত কেনাবেচা হয়। যৌনতা সরবরাহ হয়। অর্থ লেনদেন হয়। ক্ষমতা কেনাবেচা হয়।

যেভাবে বোকো হারাম জোট বাঁধে আইএসের সঙ্গে, বাংলাদেশে জেএমবি তেমন আইএসের মিত্র সংগঠন হয়ে ওঠে। আইএসের পতাকাতলে ষড়যন্ত্রকারীরা হাতে হাত মেলায় নিজ উদ্দেশ্য হাসিলে। আওয়ামী লীগ সরকারের যে কার্যক্রমগুলো আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক শত্রুতা জাগিয়ে তুলেছিল:

১. ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকারীদের বিচার ও ৫ খুনির (ফারুক রহমান ও সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা, মহিউদ্দিন আহমেদ ও একেএম মহিউদ্দিনের) ফাঁসি কার্যকর করা। পলাতক ৬ জনেরও ফাঁসির রায় হওয়া।

২. যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায় কার্যকর করা। প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও যুদ্ধাপরাধী সাকাচৌর ফাঁসি সম্পন্ন করা। জামায়াতের অর্থের প্রধান যোগানদাতা মীর কাশেমের বিচার ও ফাঁসি প্রদান। জামায়াতের আদর্শ গোলাম আযমকে আটক ও যুদ্ধাপরাধী প্রমাণ করা। ধর্মীয় মৌলবাদ প্রচারকারী, কুরুচিপূর্ণ ওয়াজ মেহফিলকারী সাঈদীকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সাজা দেওয়া।

৩. বিএনপির নির্বাচন বর্জন হুমকিতে না টলে নির্বাচন করা এবং ফলশ্রুতিতে বিএনপির সরকার গঠন কিংবা বিরোধী দল না হতে পারা।

৪. জামায়াত নিষিদ্ধকরণের সম্ভাবনা তৈরি করা।

দেশে আইএস থাকার পশ্চিমা চাপ অস্বীকার করাটা হয় সরকারের নির্বুদ্ধিতা নয়তো রাজনৈতিক কৌশল। এ কারণে প্রয়োজন হল গুলশান হামলার মতো একটি ‘হাই-প্রোফাইল’ হামলার। যেখানে সরকারের মেট্রোরেল প্রজেক্ট বন্ধের সম্ভাবনা তৈরি হয়, তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে হতাশা-অবিশ্বাস গড়ে ওঠে। আর আইএসের অস্তিত্ত্ব স্বীকার করে নিতে শোকে কাতর জাতির পক্ষ থেকেই প্রবল চাপ তৈরি হয়।

গায়ে কাঁটা দেওয়া সত্য হল, তরুণ প্রজন্ম মরছে আর চাপাতি হাতে মারছে তরুণ প্রজন্মই। কিছু প্রজন্ম ভয় নিয়ে দেশে রয়ে গেছে, কিছু প্রজন্মকে সুবিধাভোগী করে দেশছাড়া করা হয়েছে। শাহবাগে ‘যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির’ দাবিতে স্লোগানের বিপরীতে আমদানি হল ‘নাস্তিকদের ফাঁসির’ দাবিতে শাপলা চত্বরে স্লোগান। তরুণ প্রজন্মকে এরূপে ছত্রভঙ্গ করে দিলে এ জাতির কী ভবিষ্যৎ থাকে?

বিপথে কেবল নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী যায়নি, মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরাই এমন হয়ে উঠছে না, বিপথে গেছে ঢাবি-পড়ুয়া, মেডিকেল-পড়ুয়া, বুয়েট-পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও। ভিকারুননিসা নুন স্কুলের শিক্ষার্থীও এ মিছিলে আছে। বিপথে গেছে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে কর্মরতরা। কেবল অবিবাহিতরা নয়, বিবাহিত ব্যক্তি স্ত্রী-সন্তানসহ জঙ্গিবাদে পা দিয়েছে।

‘ডুজ এন্ড ডোন্টজ’ ব্যতীত আমরা আসলে তরুণদের কী আদর্শ শেখাচ্ছি? কী দর্শন দিচ্ছি? কী ইতিহাস পড়াচ্ছি? কী দেশপ্রেম বোঝাচ্ছি? কী রোল মডেল উপস্থাপন করছি? কী সংস্কৃতি উপহার দিচ্ছি? কী সাহিত্য তুলে দিচ্ছি? কী চলচ্চিত্র বানিয়ে দিচ্ছি? কী মূর্ছনা পেয়েছে তারা? কী উৎসব, কেমনধারা বিনোদন, কোন কোন নাগরিক অধিকার, কী ধরনের রাজনীতি, কোন নিরাপত্তা, কী স্বাস্থ্য, কী ধর্ম, কোন স্বাধীনতা, কেমন সমাজ, কীরূপ প্রকৃতি উপহার পাচ্ছে প্রজন্ম?

তরুণ প্রজন্ম নিয়ে আমাদের গবেষণা নেই। আমেরিকা নয়, বাংলাদেশ সরকারের উচিৎ প্রজন্মের বহুমুখী চিন্তাজগতের সঙ্গে নিয়মিত ‘আড্ডা’ দেওয়া। কংক্রিট-নির্ভর উন্নয়ন অস্বীকার করার জো নেই, কিন্তু তরুণ প্রজন্মের মনোন্নয়নে অবহেলা আমাদের রাষ্ট্রীয় সংকটে ফেলবে এভাবেই।

যেভাবে আমেরিকা ‘বিন লাদেন‘ প্রজেক্টের নিষ্পত্তি ঘটিয়েছিল, সেভাবে শিগগির ওরা আইএস প্রজেক্ট ফাইলটিও বন্ধ করে ভাগাড়ে ফেলবে। কিন্তু পশ্চিমের এসব ’ফ্রাংকেস্টাইন’ প্রজেক্ট আমাদের তরুণ প্রজন্মের মগজে যে আত্মঘাতী বিষ ছড়িয়েছে বারবার, তাতে আমাদের জাতিগত ক্ষতি হয়েছে।

এ ক্ষতি পূরণে তীব্র, আন্তরিক, সচেতন, গবেষণামূলক, মনস্তাত্ত্বিক ও যুথবদ্ধ প্রচেষ্টা আমাদের করতেই হবে।

প্রকাশিত: http://opinion.bdnews24.com, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬