ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

অনেকদিন পর নজরুল সঙ্গীত শিল্পী খালিদ হোসেনকে টিভিতে দেখলাম। নিজে চর্চাটা শেষাবধি ধরে রাখতে না পারলেও নজরুল সঙ্গীতের হাতেখড়ি ছিল খালিদ স্যারের কাছেই। সেও অনেক বছর আগের কথা। খালিদ স্যার অবশ্য তেমনি আছেন। কেউ শিখিয়ে দেয়নি; নিজে নিজে ভেবে দেখেছিলাম, নজরুল সঙ্গীত শিখলে কন্ঠে যত কারুকাজ তোলা যায়, সে কণ্ঠের জন্য যে কোনো গানের চড়াই-উৎরাই পার হওয়া ঝরনা ধারার নিরবিচ্ছিন্ন প্রবাহের মত। কান তৈরি হচ্ছিল শবনম মুশতারি, রওশান আরা মুস্তাফিজের কণ্ঠে নজরুল সঙ্গীত শুনে। কণ্ঠে গান তুলে দিলেন, হারমোনিয়ামে আঙ্গুল চালিয়ে নজরুলের সুর তোলা শেখালেন খালিদ স্যার।

এখন তো বহু বছর এই সদালাপী, বিনয়ি মানুষটার সাথে যোগাযোগ নেই। দেখা হলে শিক্ষার্থী হিসেবে চিনতে পারবেন না হয়ত। কিন্তু স্যারকে টিভিতে দেখলে কিছুক্ষণ বসি। তাঁর কণ্ঠে নজরুলের গান শুনি। শুনি নজরুলকে নিয়ে তাঁর কথা। পত্রিকায় পড়লাম নজরুল সঙ্গীতের অ্যালবাম প্রকাশ করেছেন। অনেক বছর পর, অ্যালবামের কাজ করলেন। আজকাল তো টিভি চ্যানেলে এমন সব কিংবদন্তি শিল্পীদের কেবল বিশেষ দিনে ডাকা হয়। বিটিভিতে হয়ত শিডিউল মোতাবেক গান পড়ে, কিন্তু বেসরকারি চ্যানেলে অগ্রজ পথিকৃৎদের চোখে পড়ে কম। যতদূর মনে পড়ে একসময় বিটিভিতে নজরুল সঙ্গীত, রবীন্দ্র সঙ্গীত নিয়ে সাপ্তাহিক গানের অনুষ্ঠান হতো। এখন আধুনিক, ব্যান্ড, রিমিক্স গানের যুগ। রবীন্দ্র, নজরুলও রিমিক্স হয়ে গেছে। নানারকম আবহ সঙ্গীতে নজরুল আর রবীন্দ্রের গান নিয়ে নিরীক্ষণ করছেন আজকের শিল্পীরা। যুগের প্রয়োজনে উপস্থাপনার ভিন্নতা আনা জরুরি। আজকের ছুটন্ত যুগের দুরন্ত প্রজন্ম সাদাকালো যুগের ঢিমে তালে পরিবেশনায় আগ্রহ পাবে না। তাদেরকে আকৃষ্ট করতে এই রিমিক্স, এই আধুনিক আবহের প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ। মৌলিক সৃষ্টির বিকৃতি না ঘটলেই হলো। শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে এই পরিমিত বোধকে জাগাতে শেষতক তাই মূলে ফিরতে হয়। শেকড়কে জানতে হয়। নজরুল যদিও সকল যুগেই অম্লান, অক্ষয়। কিন্তু তাঁর দর্শন, তাঁর বিদ্রোহ, তাঁর সাম্য, তাঁর ধর্ম, তাঁর মানবতা এবং সর্বোপরি তাঁর প্রকাশকে বুঝতে বুঝতে একেকটি প্রজন্ম পার হয়ে যাচ্ছে।

শৈশব থেকেই জীবন সংগ্রাম, পেশাগত জীবন বৈচিত্র্যতাই তাকে বিদ্রোহী করে তুলেছিল। নজরুল আমাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন শেখান। শব্দ তীর ছুড়ে আন্দোলনের সূচনা করেন তিনি। ফলাফল ব্রিটিশ রাজরোষের কোপানলে ‘যুগবাণী’ (১৯২২)। ‘বিষের বাঁশী’ নিষিদ্ধ (১৯২৪)। ‘ভাঙ্গার গান’ বাজেয়াপ্ত (১১ই নভেম্বর ১৯২৪)। ‘প্রলয় শিখা’ বাজেয়াপ্ত (১৯৩১)। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বাজেয়াপ্ত হয় ‘চন্দ্রবিন্দু’। ১৯২৩ সালে হুগলি জেলের অমানবিক নির্যাতনও আজন্ম বিদ্রোহী নজরুলকে দমাতে পারেনি। জেলেই রচিত হয় ‘শিকল পরার গান’। নজরুলের শব্দসম্ভার শোষণের তাণ্ডবকে এমনই চিরে ফালা ফালা করে দিতে সক্ষম ছিল যে, ‘যুগবাণী’ বাজেয়াপ্তের ২০ বছর পরও শাসকগোষ্ঠীর মনে এ গ্রন্থটিকে নিয়ে মূর্তিমান শংকা ছিল। ‘দুর্গম গিরি কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার …’ অথবা ‘কারার ওই লৌহ কপাট…’- ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের জন্য লিখিত কাব্য সংগীত যখন আমাদের ভাষা আন্দোলনে, মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণা জোগায়, তখন সেগুলো কেবলই বাঙালির অধিকার আদায়ের পথকে সুপ্রশস্ত করে তোলে। সেই এক স্ফুলিঙ্গের নাম নজরুল।

শিক্ষা জীবনের ছন্দ পতন সত্ত্বেও বহুমাত্রিক নজরুলের সাহিত্য জ্ঞানের বহর ও বাহার এক রহস্যই বটে। তাঁর শব্দ ভান্ডার, শব্দের প্রতি দখল, সাহিত্যে দেশি-বিদেশি শব্দ সংমিশ্রণের দক্ষতা অসামান্য। মুসলিম কবি হয়েও হিন্দু শাস্ত্রের চরিত্রগুলো নিয়ে জবরদস্ত দখল ছিল তাঁর। নজরুল কোনো রকম রাখঢাক ছাড়াই বলে ওঠেন, ’আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেই পদ-চিহ্ন/আমি স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ হানা খেয়ালী বক্ষ করিব ভিন্ন’। যে নজরুল বিধাতাকে প্রত্যাহ্বান করেন সেই তিনিই একের পর এক ইসলামি ভক্তিমূলক গান রচনা করে চলেন। ‘ও মোর রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ…’, এই গান ছাড়া আমাদের বাঙালি ধর্মীয়-সামাজিত আচার ঈদ যেন ঐতিহ্যের আমেজহীন। নজরুলের সুরেও রয়েছে বহু ব্যঞ্জন। ‘কাজী নজরুলের গান’ গ্রন্থের লেখক নারায়ণ চৌধুরী বলেছেন, ‘তিনি বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করেছেন উত্তর-ভারতীয় খেয়াল-টপ্পা-ঠুংরী-কাজরী-হোরী-লাউনী-নাত-গজল-কাওয়ালী প্রভৃতি বিচিত্র রকমের রঙদার সুরের ঐশ্বর্যে’ [মুক্তধারা, বাংলাদেশে প্রথম প্রকাশ: ১৯৯৩, প্রষ্ঠা-১৫]। ইদরিস আলী তার ’নজরুল সংগীতের সুর’ বইটিতে বলেছেন, ‘…বাংলা গানের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলা ভাষায় লঘু সঙ্গীত চর্চায় যে পঞ্চ প্রধান বাংলা গানকে চরম উৎকর্ষ সাধন করেছিলেন তার শেষ রূপকার ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম…’।

সমসাময়িক থেকে অদ্যাবধি সাহিত্যচর্চায় নারী যখন কেবল আরাধ্য দেবী হয়ে উঠেছে, নজরুল সেখানে নারীর হাতে তুলে দিয়েছেন নেতৃত্বের ঝান্ডা। তিনি লিখেছেন, ‘শিখালে কাঁকন চুড়ি পড়িয়াও নারী, ধরিতে পারে যে উদ্ধত তরবারী…’। নজরুলের মানসপটে যে সাম্যবাদী সমাজ উঠে এসেছে, তা কেবল শ্রেনী বৈষম্য মুক্তই নয়, নারী-পুরুষের অধিকারের ভেদাভেদ মুক্তও। তাই তো তাঁর কবিতায় আমরা পাই, ’সাম্যের গান গাই- আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই! বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’।

শব্দ ব্যবহারের ভিন্নতা, ক্ষুরধার তীক্ষ্ণতা নজরুলের অনেক রচনাকে বহুবারই উপেক্ষিত করেছে, আবার একই কারণে প্রত্যাশিতও করেছে। বিদ্রোহী কবির ‘বিদ্রোহী’ কবিতা আমরা হয়ত কণ্ঠস্থ করে নেই, কিন্তু তাঁর প্রতিটা দ্রোহের ইতিহাসকে কতটুকু আত্মস্থ করতে পেরেছি আমরা? নজরুল কী কেবল বিশেষ দিনে আমাদের কাছে স্মরণীয় হয়ে উঠছে না? প্রাত্যহিক জীবনে নজরুলকে কতটা আর কিভাবে ধারণ করি আমরা? কণ্ঠে সুরের কারুকাজ ঢেলে দিতে পারি হয়ত, কিন্তু কতটুকু লালন করতে পারি নজরুলের বাণীকে? আজকের যুগের সাথে নজরুলের সৃষ্টির কোথায় একটা দূরত্ব আছে। এই নিয়ে খালিদ স্যারও সেই টিভি অনুষ্ঠানে বলছিলেন। এটি হয়ত প্রচার গত কমতি, হয়ত উপস্থাপনা গত ত্রুটি। ছোটবেলায় নজরুলের প্রতি জন্ম-মৃত্যু বার্ষিকীতে বিটিভিতে নজরুল রচনার নাটক দেখতাম। তাতে নজরুলের গানও থাকতো মনে পড়ে। সাদাকালো নাটকগুলোতে বেশিরভাগ সময় মুখ্য চরিত্রে জহির উদ্দিন পিয়ারকে দেখা যেতো। এক সময় নজরুলের নাটক বলতে জহির উদ্দিন পিয়ারের সেই কাঁপা কাঁপা ভঙ্গিমার অভিনয় চোখে লেগে আছে। এখন বহু চ্যানেল, বহু প্রতিভা। কিন্তু নজরুলকে নিয়ে ওই আবেদন-নিবেদন কই? ঘাটতি আসলে আমাদের চর্চায়। আমাদের গবেষণায়। তাই গবেষণার সুযোগ প্রয়োজন এই দূরত্ব ঘোচাতে। প্রয়োজন সাহিত্য মনস্ক একটি প্রজন্ম গড়ে তোলা। নজরুল ইনিষ্টিটিউট রয়েছে। কিন্তু আরো স্বয়ংসম্পূর্ণ ও প্রবাহমান একটি চর্চাকেন্দ্র দরকার। ত্রিশালের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা জেনে আশা করছিলাম, এ বিদ্যাপিঠ নিশ্চয়ই নজরুলের সাহিত্য চর্চায় একটি বিশাল ভূমিকা রাখতে পারবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েব সাইট ঘেঁটে এর বিভিন্ন অনুষদ সম্পর্কে প্রাথমিক ভাবে জেনে হতাশ হলাম। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ৪টি প্রধান অনুষদে রয়েছে- বিজ্ঞান ও প্রকৌশল, ব্যবসা-প্রশাসন, সামাজিক বিজ্ঞান ও কলা। কলা বিভাগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য, সঙ্গীত, নাট্যকলা রয়েছে। কবির নামে গড়ে ওঠা এই বিশ্ববিদ্যালয় কেবলই সাহিত্য-সংস্কৃতি-কলা-দর্শন নিয়ে পাঠ-চর্চা ও গবেষণার নিবেদিত কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারতো। একটি বৃহত্তর ও দূর্লভ সংগ্রহের সাহিত্য পাঠাগার গড়ে উঠতে পারতো এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাতে ক্রমাগত গড়ে উঠবে নজরুলের ৪০০০ সৃষ্টিকে ধারণ করার মত একটি সাহিত্যানুরাগী প্রজন্ম। আমাদের দেশে শান্তি নিকেতন না থাক একটি সাহিত্য নিকেতন তো হতে পারে।

বস্তুত আমাদের জানতে হবে সরব নজরুলের নির্বাক অভিমানের কথা, বাকরুদ্ধ নজরুলের মুখরিত দ্রোহের কথা। যে নজরুল অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলেছেন, শৃঙ্খল ভাঙ্গার কথা বলেছেন, ছাত্র সমাজকে যুথবদ্ধ হতে বলেছেন, প্রেমের কথা, বিরহের কথা, নদীর কথা বলেছেন; সে নজরুলের মননে যে সমাজচিত্র, দেশচিত্র তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে তাকে নিবিষ্ট ভাবে জানা ছাড়া তো দ্বিতীয় কোন বিকল্প নেই।

***
লেখাটি জুন ৬, ২০১১ তারিখ বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডক কম এর স্বপ্নযাত্রা বিভাগে প্রকাশিত হয়েছিল