ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

সময়টা এ বছরের সেপ্টেম্বর। কথা হচ্ছিল ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল আওয়ালের সঙ্গে, তার কার্যালয়ে। ঠাকুরগাঁও জেলার ব্র্যান্ডিং লোগোটির নান্দনিক চেহারা, ব্যাখ্যা এবং প্রচারে এ মানুষটির ভূমিকা বুঝতে বেগ পেতে হয় না। ঠাকুরগাঁওয়ের ছয়টি উপজেলার মধ্য দিয়ে বয়ে চলা নদীগুলো নিয়ে তার উৎকণ্ঠা এবং নদী সুরক্ষায় তার উদ্যোগের ব্রত কিছুক্ষণ আলাপেই আবিস্কৃত হয়। নদী দখলদারদের নিয়ে তার ক্ষোভ যেমন জানা যায়, তেমনি নদী দস্যুদের উচ্ছেদে প্রশাসনের অনেক কার্যকরী পদক্ষেপে তার ইতিবাচক নেতৃত্ব নিয়ে স্থানীয়রা জ্ঞাত। ছয়টি পাপড়ির আদলে একত্র সোনালি আভা ছড়ানো ‘ঠ’ অক্ষরটি নিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের লোগোটির বাংলা স্লোগান ঐহিত্য ও সম্ভাবনার জনপদ। ইংরেজি স্লোগান হলো থ্রাইভিং ঠাকুরগাঁও। পোড়ামাটির ঐহিত্য আর সোনালি গমের সম্ভাবনার জনপদ কি আর নদী বাদে গড়ে ওঠে? জাগ্রত ঠাকুরগাঁও গড়তে কি প্রজন্মকে এড়ানো যায়? তাহলে প্রজন্ম এবং নদীর সম্পৃক্ততাই তো স্বপ্নের বাংলাদেশ! নদীমুখী প্রজন্ম গড়তে বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের বুকে নদীকে বহমান করতে তাদের নিতে হবে নদীর কাছে। নদীর পাশে। এ প্রসঙ্গেই ২০১৫ সালে প্রকাশিত সরকারি পরিপত্রটি নিয়ে আলোকপাত হয় আলাপে।

পরিপত্রটির বিষয় ছিল- দেশের উচ্চ মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সমমানের মাদ্রাসা, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সাঁতার প্রশিক্ষণ এবং অনুশীলন। পরিপত্রের প্রথম দুটি লাইন উল্লেখ না করলেই নয়- ‘জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ অনুযায়ী ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শারীরিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও খেলাধুলা পাঠ্য বিষয় হিসেবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সে পরিপ্রেক্ষিতে সাঁতারকে অন্যতম একটি ক্রীড়া হিসেবে গণ্য করার পাশাপাশি জীবন রক্ষাকারী কৌশল চর্চা হিসেবে দেখা হচ্ছে।’

জেলা প্রশাসক এমন একটি সরকারি উদ্যোগ নিয়ে রিভারাইন পিপলের এর আগের প্রত্যাশার কথা জানলেন। ২০১২ সালে সমকালেই প্রকাশিত হয়েছিল ‘ব্রজেন দাশের খোঁজে’ শীর্ষক কলাম, যেখানে প্রস্তাবনা ছিল- দেশের কি শহর, কি গ্রাম সব স্কুল-কলেজে শরীরচর্চা ক্লাসে সাঁতারকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। শিক্ষাঙ্গনের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সাঁতার নিয়মিতভাবে যুক্ত হোক। যেন এ প্রত্যাশার বাস্তবায়নেই সরকারি পরিপত্রে নির্দেশনা রয়েছে- ‘যেসব পুকুর বা জলাশয়ে সাঁতার প্রশিক্ষণ ও অনুশীলন করা হবে, সেসব পুকুর বা জলাশয় স্বাস্থ্যসম্মত ও সাঁতার উপযোগী করতে হবে…।’

দুঃখজনক হচ্ছে, পরিপত্রটির প্রচার ও বাস্তবায়ন স্থবির। অনেকের সঙ্গে আলাপেই বুঝেছি তারা পরিপত্রটি নিয়ে অবগত নন। বিষয়টি জেলা প্রশাসকের দৃষ্টি গোচরে আনতে তিনি এর বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিতে কার্পণ্য করলেন না। ঠাকুরগাঁও জন্মভূমি, তাই বিশেষ প্রত্যাশা ছিল ঠাকুরগাঁও থেকেই সরকারি পরিপত্রটির বাস্তবায়নের সূচনা হোক। ঠাকুরগাঁওয়ের কৃতী সন্তানদের সহায়তায় এ পদক্ষেপ নিশ্চয়ই একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে দেশের অপরাপর জেলা, উপজেলা আর ইউনিয়নে। জেলা প্রশাসককেও প্রতিশ্রুতবদ্ধ একজন মনে হলো এই প্রত্যাশার পরিপ্রেক্ষিতে। তাই তো নভেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হলো ‘টাঙ্গন নদী সুরক্ষা কমিটি’। গঠনের পরপরই কমিটির পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা হয় এবং জেলা প্রশাসক টাঙ্গন নদী সুরক্ষা কমিটিকে স্বাগত জানান।

আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের জায়গা থেকে এভাবে এক পা-দু’পা এগিয়ে একে অন্যের সহযোগী হতে হাত বাড়িয়েছি। নদীর জন্য নিবেদিতপ্রাণ নদীবন্ধুরা নদীকে জাগাবে। নদীবান্ধব প্রজন্ম গড়বে। এমন একটি বাংলাদেশের কারিগরদের দেশের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা ‘অজস্র নদী শুভেচ্ছা’।

2ndDec2017

প্রকাশকাল: দৈনিক সমকাল, ২ ডিসেম্বর ২০১৭