ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 
282045_10150246238082944_3008545_n

মুখবন্ধ: গত বছর বিডিনিউজ২৪.কম সাইটে ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবসের উপর সংবাদ পরিবেশিত হয়েছিল। প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল, বিশ্বের অপরাপর দেশগুলোর সাথে ’বিপন্ন বাঘ বাঁচাও, সুন্দরবন বাঁচাও’ (Save endangered tigers, save the Sundarbans) এই স্লোগান নিয়ে বাংলাদেশও বিশ্ব বাঘ দিবস পালন করছে।

আজ ২৯ জুলাই ২০১১; অনলাইনে দেশের জাতীয় দৈনিকগুলো প্রথম পাতায় বিশ্ব বাঘ দিবস নিয়ে কোন খবর না থাকায় দ্বিধায় পড়ে গেলাম। গুগল খোঁজ নিশ্চিত করল অবশেষে। ডব্লিউডব্লিউএফ (ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড) বিশ্বের বিভিন্ন দেশ গ্লোবাল টাইগার ডে নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ পালন করছে আজ। পোচিং (অবৈধ্য ভাবে বন্যপ্রাণী হত্যা) বন্ধের ডাক দিয়েছে ডব্লিউডব্লিউএফ। গ্লোবাল টাইগার ডে -তে ডব্লিউডব্লিউএফ ভিয়েতনাম, চিন, নেপাল, মালয়শিয়া ও ভুটানে সরকারি পর্যায়ে মন্ত্রীদের সাক্ষাৎকার, টিভি টক শো, শিশুদের চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা, পোচিং বিরোধী বক্তব্য প্রচারসহ বেশ কিছু সচেতনতামূলক কর্মসূচী পালন করবে।

বাংলাদেশ এ বছর বাঘ দিবসে নিরব কেন?

মানুষ আগে গেলে বাঘে খায়। কিন্তু যখন বাঘই আগ বাড়িয়ে এগিয়ে আসে তখন? বাঘশুমারি ঘেঁটে দেখলে সেই পরিণতির চিত্র স্পষ্ট হবে। আন্তর্জাতিক হিসাবে পৃথিবীতে বিভিন্ন প্রজাতির বাঘের সংখ্যা মাত্র তিন হাজার দুইশ’টি। আর বাংলাদেশে? পরিসংখ্যান নিয়ে মতভেদ আছে। ১৯৯৯ সালে ব্রিটিশ জীববিদ ও ব্যাঘ্র বিশেষজ্ঞ টিসা ম্যাকগ্রেগর দাবি করেন, সুন্দরবনে দুইশ’টির বেশি বাঘ নেই। ২০০৪ সালে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাঘশুমারিতে পায়ের ছাপ শনাক্তকরণ পদ্ধতিতে বাংলাদেশে ৪১৯টি এবং ভারতে ২৭৪টি পূর্ণবয়স্ক বাঘ শনাক্ত করা হয়। এ বছরের জানুয়ারিতে ১৩টি দেশের সঙ্গে (টাইগার রেঞ্জ কান্ট্রি) বাংলাদেশও অংশ নেয় থাইল্যান্ডে আয়োজিত প্রথম এশীয় বাঘ সম্মেলনে। সেখানে বাংলাদেশের সরকারি হিসাবে উল্লেখ করা হয়, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ৪৫০টি। সম্মেলনে উপস্থিত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশও ব্রত নেয় ২০২২ সালের মধ্যে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার। সেই জানুয়ারি পার হতে না হতেই চিতাশাবককে হত্যা করে চ্যাংদোলা করে নিয়ে যাওয়ার ছবি ছাপা হয় পত্রিকায়। ঘটনাটি বরগুনা জেলার।

সমকালের গত ৩ অক্টোবর সংখ্যায় একরামুল হক শামীমের একটি লেখা প্রকাশিত হয়। নিতান্তই বাঘ (কাক)তালীয় ঘটনা যে গত ৩ অক্টোবরই দু’দুটি লেখা ছাপা হয়েছে সমকালে। কলাম লেখক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গের অবতারণা করেছিলেন তার লেখায়, ‘বাঘগুলো মরে যাচ্ছে কোথায়?‘, আসলে আমরা হিংস্র বাঘকে পকেটস্থ করে নিচ্ছি। এখন হাতি মরলেই লাখ টাকা নয়, বরং বাঘ মেরে ফেলে কেবল চামড়া বেচলেও কড়কড়ে নোটের নগদ ১৫ লাখ টাকা কামিয়ে নেওয়া যায়। বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশে রমরমা ব্যবসা রয়েছে বাঘের চামড়া ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের। সবচেয়ে বড় বাজারটি নিয়ন্ত্রণ করে চীনের ঐতিহ্যবাহী ওষুধশিল্প। এভাবে শিকারি বাঘ নিজেই শিকারে পরিণত। ১৯৯৬ থেকে ২০০০ পর্যন্ত প্রায় ২৪টি বাঘের মৃত্যু ঘটে। এর মধ্যে ২০০০ সালের প্রথম তিন মাসেই দুটি বাঘ মারা পড়ে। ২০০৪ এবং ২০০৫ সালে তিনটি বাঘ মারা যায় সাতক্ষীরা রেঞ্জের সুন্দরবনে। ২০০৯ সালে তিনটি বাঘ মারা যায়। স্বাভাবিক মৃত্যু এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত কারণের চেয়ে মূলত বাঘ শিকারিদের দৌরাত্ম্য এবং বন বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার সঙ্গে স্থানীয় জনগণের আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে পিটিয়ে, বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে, ইটপাটকেল ছুড়ে বাঘ মারার আচরণগুলোই দায়ী। নিয়ম হচ্ছে, বাঘ যদি জনপদে আক্রমণ করে তবে ট্রাঙ্কুলাইজার ব্যবহার করা, যা দিয়ে ঘুমপাড়ানি গুলি ছোড়া হয়। বাংলাদেশ টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান অনুযায়ী বন বিভাগের সব কর্মী ও প্রহরীকে ট্রাঙ্কুলাইজার বন্দুক চালানো জানতে হবে। জানা যায়, এলাকাবাসীকে উদ্ধার করতে বন বিভাগ কর্তৃপক্ষ বহু ক্ষেত্রেই সাড়াহীন ছিলেন। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষ জানান, তাদের কাছে বাঘ ধরার মতো পর্যাপ্ত সরঞ্জামাদি নেই


১৯শেমার্চ২০১০, দৈনিকপ্র্রথমআলো; পিটিয়ে হত্যা করার পর চিতা শাবকটিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে

১৯শে মার্চ ২০১০, দৈনিক প্র্রথম আলো; পিটিয়ে হত্যা করার পর চিতা শাবকটিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে – See more at: http://blog.bdnews24.com/laboni/29302#sthash.2em8aapr.dpuf
১৯শে মার্চ ২০১০, দৈনিক প্র্রথম আলো; পিটিয়ে হত্যা করার পর চিতা শাবকটিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে – See more at: http://blog.bdnews24.com/laboni/29302#sthash.2em8aapr.dpuf
১৯শে মার্চ ২০১০, দৈনিক প্র্রথম আলো; পিটিয়ে হত্যা করার পর চিতা শাবকটিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে – See more at: http://blog.bdnews24.com/laboni/29302#sthash.2em8aapr.dpuf)

প্রশ্ন হচ্ছে, বনের বাঘ প্রতিবার লোকালয়ে চলে আসছে কেন? খাদ্যের সন্ধানে। পূর্ণবয়স্ক বাঘের দৈনিক গড়ে প্রায় ৭-৮ কেজি মাংসের প্রয়োজন। ৩০-৪০ কেজির বেশি শিকার করলে সপ্তাহে একবার শিকার করাই যথেষ্ট বাঘের জন্য। খাদ্য সংকটের হেতু কী? কারণ খুবই সুস্পষ্ট। বনের পরিবেশ যথেষ্টই ভারসাম্যহীন। যেহেতু গ্রামগুলোতে বাঘের আনাগোনা হচ্ছেই, তাই সম্ভাব্য এলাকাগুলো বন থেকে একটু দূরে রাখার বিষয়টি কি বন বিভাগ কঠোরভাবে ভেবে দেখেছে? কোনোভাবেই বাঘ হত্যা না করে কীভাবে গ্রামবাসী কেবল আত্মরক্ষার্থে বাঘকে সাময়িকভাবে দ্রুত বন্দি করতে পারে অথবা এলাকা থেকে বনের দিকে তাড়িয়ে দিতে পারে, সে ব্যাপারে গ্রামবাসীরও কিছু প্রশিক্ষণ-জ্ঞান থাকা উচিত। মানুষের তাড়া খেয়ে রয়েল বেঙ্গল টাইগার কখনও খেজুর গাছে, কখনও তালগাছের মাথায় উঠে গেছে! গাছের মাথায় উঠে থাকা বাঘকে পরে বন বিভাগের কর্মীরা এসে ট্রাঙ্কুলাইজার দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে নামিয়ে আনে। বাঘ হত্যার পুনরাবৃত্তি চলতেই থাকলে ২০২২ সালে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা তো নেই-ই, বরং তা অর্ধেকে এসে ঠেকবে। অথবা আরও ভয়াবহ ভবিষ্যদ্বাণী করতে গেলে বলতে হয় বাঘ প্রজাতি শূন্যের কোঠায় এসেও দাঁড়াতে পারে! বন্যেরা বনে থাকুক। আমরা লোকালয়ে।

****
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল: ৯ই অক্টোবর ২০১০, দৈনিক সমকাল (লিংক)

***