ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

দৈনিক বাংলার মোড়ে আগুন জ্বলছে। আগুণ জ্বলছে সি এস সি কার্যালয়ে সামনে। মজাটে শীত থেকে বাঁচতে এ আগুন জ্বালেনি কেউ। শেয়ার বাজারে বিনিযোগ করে লাভের বদলে ক্রমাগত দরপতনদর্শীদের দিকবিদিক জ্ঞানশূণ্যতায় দানা বাঁধে ক্রোধ। সরকারের আশ্বাসে আস্থা রেখে বসে থাকার সুযোগ পাচ্ছে না বিনিয়োগকারীরা। সূচক নেমে যাচ্ছে। দ্রুত থেকে দ্রুততর। প্রতিদিন। পতনের রেকর্ড গড়ছে। কার কারসাজি? কার ব্যর্থতা? কার অদূরদর্শিতা? কার অপ-রাজনীতি? পথে বসে যাওয়া ক্ষুদ্র বিনিযোগকারীরাদের জমায়েত বেড়ে চলেছে রাজপথে। সরকার যুতসই কিছু বলছে না। তদন্ত কমিটি গঠন এবং ধ্বসের কারণ নির্ণয় হচ্ছে না। তাহলে সমাধান আসবে কী করে? ২০০৮ সালে জাপানের ২০ বছরের শেয়ার বাজার ইতিহাসে দ্বিতীয় বৃহৎ দরপতন ঘটে। সে সময় জাপানের অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, এই দূর্ঘটনা একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা যারা একক ব্যবসায়িক পদ্ধতি অনুসরণ করতো। ক্রমাগত আঠার দিন ধরে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে ৪.৫ ট্রিলিয়ন ইয়েন বাজারে ছেড়েছিল মুদ্রা বাজারের তারল্য ধরে রাখতে।

বাংলাদেশে গত কয়েকদিন অথবা মাঝে মধ্যে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা দরপতন সংকটে ভুক্তভোগী ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী আর সরকারের মধ্যে আন্তরিক যোগাযোগের অভাব দেখা যাচ্ছে। সামহোয়্যার ইন ব্লগের একজন ব্লগার অর্থমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ব্লগার সিস্টেম তার মাল সাহেব আমার টাকা ফেরৎ চাই শিরোনামের পোস্টে ক্রোধের বর্ষণ করে বলেন,

গতকাল মাল মুহিত সাহেব বলেছেন ১০ টাকার শেয়ার ১২ ১৫ টাকা হবে এমন টা হতে পারে না। ……………. ভাল শেয়ারের দাম বাড়বে না তো কমবে নাকি? তার এই উক্তি ইকোনোমিক্স এর জন্য কলঙ্ক!! মুহিত সাহেব আমাকে বলে দিন ডিএসই তে কোন শেয়ার টি ভাল আছে? নাম বলেন! নাকি ডিএসই তে দাম বাড়ার মত কোনো শেয়ার নাই? আপনি কি তাই ভাবছেন? এই ভাল শেয়ার কিনার পর আজ আমার প্রায় ৫০% বিনিয়োগ লস কেন? :(( সঠিক জবাব দিন তা নাহলে বলেন আমি ব্যার্থ, মাফ চান জনগনের কাছে। X( আমি আমার টাকা ফিরত চাই! X((

বিনিয়োগকারীদের বিক্ষোভ কেবল অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতকে ঘিরে নয়। এ প্রসংগে ব্লগার হরিপদ কেরাণী বলেন,

এরপর দ্বিতীয় সিরিয়ালে আসবেন আমাদের মহামান্য গভর্নর সাহেব। তিনি সম্প্রতি মনে হয় আইএমএফ এর দালাল হয়েছেন। কারণ আএমএফ এর সুপারিশ অনুযায়ী শেয়ার বাজারের পতন ঘটানো হয়েছে।

ব্লগে বিনিয়োগ, দরসূচক নিয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন অভিজ্ঞরা। ভুক্তভোগীরাও।

ব্লগার প্রলাপ বলেছেন,

…ভাই, শেয়ার মার্কেটের পি/ই ১৫ এর নিচে হলেও আমার কাছে ভালো মনে হয় না। আপনি ব্যাংকে টাকা রাখলেও প্রায় ঝুঁকিহীন ভাবে ৮% ইন্টারেস্ট পাবেন। অর্থাৎ পি/ই ১২.৫। সেখানে শেয়ার মার্কেটের মত ঝুকিপূর্ণ বিনিয়োগে পি/ই ১০/১১ এর উপরে উঠতে দেয়াই উচিৎ না।

দরপতনের সম্ভাব্য কারণ নিয়ে সরকার কি আশংকা করছেন তা বিনিয়োগকারীদের কাছে সুস্পষ্ট নয়। তবে তাদের পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায় নানা আশংকার কথা।

ব্লগার কাঙ্গাল মুরশিদ বলেছেন,

যারা সত্যিই ফান্ডামেন্টাল দেখে শেয়ার কিনেছেন আমি মনে করি তাদের ধৈর্য ধারন করা উচিত। মনে হচ্ছে এই দরপতন ইচ্ছাকৃত। এ’জন্যই গতকাল সকাল থেকে প্রচুর পুলিশ র্যাব মোতায়েন করা হয়েছিল। যদি আগে থেকে দরপতনের কথা জানা না থাকে তাহলে এত নিরাপত্তার যৌক্তিকতা কি? মনে হচ্ছে সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট কোন একটা কুচক্রী গোষ্ঠীকে কিছু ভাল শেয়ার কম দামে পাইয়ে দেয়ার জন্যই এমনটা করা হচ্ছে। লস যা হওয়ার ততো হয়েছেই এখন শেয়ার ছেড়ে দিলেতো আর সেই লস পুরোন হবে না। তার চেয়ে মাটি কামড়ে পরে থাকেন – না খেয়ে মরে গেলেও শেয়ার ছাড়ব না – এধরনের পন করেন। আশা করা যায় সেই সিন্ডিকেট শেয়ার কিনতে শুরু করলেই ভাল কোম্পানীগুলোর দাম বাড়তে শুরু করবে।

ব্লগার চতুরঙ্গের ব্লগ থেকে পাওয়া যায় আজকের দৈনিক বাংলা মোড়ের জ্বলন্ত চিত্র।

জ্বলছে এস ই সি কার্যালয় এলাকা –

এস ই সি এলাকা

বিডিনিউজ২৪.কম এর আজকের তাজা খবর থেকে জানা যায়,

বিক্ষুব্ধ বিনিয়োগকারীরা মিরপুর ১ নম্বর গোল চত্বর ও ১০ নম্বর গোল চত্বরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করায় ওই এলাকা অচল হয়ে পড়ে। ১ নম্বর থেকে ১০ নম্বর পর্যন্ত সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় রোকেয়া সরণি ও টেকনিক্যাল-মিরপুর সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

লেনদেন শুরুর প্রথম ৫৫ মিনিটে আগের দিনের রেকর্ড ভেঙে মূল্যসূচক পড়ে যায় ৬৬০ দশমিক ৪৩ পয়েন্ট। এরপরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে শুরু করে।

ক্ষুব্ধ বিনিয়োগকারীরা মতিঝিলের রাস্তায় নেমে এসে বিক্ষোভ শুরু করে। পুরো মতিঝিল এলাকা জনসমূদ্রে পরিণত হয়। এ সময় মতিঝিল এলাকায় সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

আইন শৃংখলা বাহিনীর সাথেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে ।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সামনে র‌্যাব ও পুলিশ বিক্ষোভকারীদেরকে লাঠিপেটা করে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়। এ সময় চার সাংবাদিকসহ ৯ জন আহত হয়।

বিনিয়োগকারীদের সরকারবিরোধী শ্লোগান, রাস্তায় কাগজ কাঠ জড়ো করে তাতে অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় মতিঝিল এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

দৈনিক বাংলার মোড়ে একটি নির্মাণাধীন ভবনের শ্রমিকদের সরিয়ে দিয়ে বিক্ষুব্ধ বিনিয়োগকারীরা ইটপাটকেল নিয়ে তা পুলিশকে লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করে।

বিশৃংখল পরিস্থিতিতে পুলিশ এবং সাংবাদিকদের মধ্যেও ধাওয়াপাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে আমাদের অর্থনীতির মাসুদ, এবিসি রেডিওর সীমা ভৌমিক শীর্ষ নিউজের মতুর্জা, প্রথম আলোর ওয়ারিসসহ সাত-আট সাংবাদিক আহত হন।
পুলিশ-সাংবাদিক সংঘর্ষ

এ বিষয়ে বিস্তারিত পাওয়া যায় “হঠাৎই সাংবাদিকদের পেটাতে শুরু করলো পুলিশ…” শিরোনামে ব্লগার টি-ভাইরাসের পোস্টে।

চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়া হিসেবে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আগামীকাল, মঙ্গলবার ঢাকায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করেছেন জানিয়ে ব্লগার কলা ভবন থেকে একটি পোস্ট দিয়েছেন।

যারা শেয়ার বাজার পর্যবেক্ষণ করেন দীর্ঘ সময় থেকে, শেয়ার বাজারের আবহাওয়ায় শ্বাস নেন যারা, সূচকের নিম্নগামিতার পেছনের কারণ নিয়ে তাদের রয়েছে ব্যক্তিগত মতামত। এবং এমনটা চলতে থাকলে ভবিষ্যত কী হতে পারে, তা অভিজ্ঞরা ভবিষ্যৎবাণী করতে পারেন। ব্লগার চরমপত্র গত মার্চে তার ধারণা এবং আশংকার কথা জানিয়েছিলেন ব্লগে। তিনি আজ ১০ই জানুয়ারিতে উদ্ভূত পরিস্থিতির সাথে মিলিযে নিচ্ছেন তার বক্তব্য

তার অভিযোগ,

…বাংলাদেশ শেয়ার মার্কেটের উদ্দেশ্য এবং বিধেয় দুইই হলো কিছু বড় বড় বাটপার প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রন সংস্থা এসিসি, অর্থ মন্ত্রনালয় সহ সংশ্লিষ্ট সরকারী দপ্তর এবং মাফিয়া ইনভেস্টরদের সাথে মিলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগ কারীদের টাকা নিয়ে যাওয়ার একটি সফল ও অনৈতিক মার্কেট।

বিনিয়োগকারী হিসেবে উক্ত ব্লগারের দাবি,

সবগুলো সরকারী কোম্পানীকে অতিসত্ত্বর মার্কেটে এনে (অর্থমন্ত্রী ক্ষমতায় এসেই ঘোষনা দিয়েছিলেন বিটিসিএল টেলিটক সহ সরকারের ২৬ কোম্পানী ৩০% শেয়ার মার্কেটে ছাড়বে, যা শেয়ার মার্কেট আজকের আকারে বেড়ের ওঠার অন্যতম কারণ। কারন সাধারণ মানুষ মন্ত্রীর আস্বাশ শুনে মার্কেটে বিনিয়োগ করলেও ২ বছরে সরকারী কোম্পানীগুলোর একটিও মার্কেটে আসেনি ) এবং শেয়ার মার্কেটকে যথাযথ নিয়ন্ত্রন মার্কেটে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মধ্যে থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ছেড়ে দেয়া হউক।

শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ ক্ষুদ্র বিনিযোগকারীদের জন্য ক্রমাগত চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সূচক নিয়ন্ত্রন রাখা সরকারের জন্য সব সময়েই বড় একটি চ্যালেঞ্জ। সমস্যা হলো, সরকার এই চ্যালেঞ্জে ব্যর্থ হলে খেসারত গুনতে হয় বিনিযোগকারীদের। তবে আওয়ামী লীগের দু’বছর শাসনকালে শেয়ার বাজারের নিম্নমুখী সূচক আগামী নির্বাচনে তাদের জন্য একটি ’মাইনাস’ পয়েন্ট হয়ে দাঁড়াবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

************
প্রধান আলোকচিত্রঃ রাশেদুজ্জামান