ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

ধরুন, বুড়িগঙ্গার সঙ্গে কর্ণফুলীর দেখা হলো একদিন। বুড়িগঙ্গা কর্ণফুলীকে কী বলল জানেন? ওরে, কর্ণফুলীরে! সাক্ষী রাখিলাম তোরে! অভাগিনীর দুঃখের কথা কবি বন্ধুরে! ভাবছেন, বুড়িগঙ্গার দুঃখ! হ্যাঁ, যে নদীমাতৃক দেশের রাজধানীর গল্পটা শুরুই হয়েছিল বুড়িগঙ্গার তীর থেকে, সেই বুড়িগঙ্গা ধুঁকে ধুঁকে মৃতপ্রায়। বর্জ্য পরিবেষ্টিত হয়ে বুড়িগঙ্গা হারিয়েছে প্রবাহ। দখলদারদের আধিপত্যে ক্রমে ক্রমে বেদখল হওয়া পাড় কবে না বুড়িগঙ্গাকে একটা অপাঙ্ক্তেয় খাল বানিয়ে ছাড়ে! বুড়িগঙ্গা যে বন্ধুর কাছে তার দুরবস্থার বার্তা পৌঁছতে চায়, সেই আমরা কিন্তু মানচিত্রের সব নদীর প্রতি ভীষণ বিমাতাসুলভ হয়ে উঠেছি; বালক আর আপেল গাছের মর্মস্পর্শী গল্পটার মতো। বালক মনের আনন্দে আপেল গাছের ডালে ঝুলে, আপেল খেয়ে বেড়ে উঠল। পরিণত বয়সে আপেল গাছ তার খেলার জন্য নয়, প্রয়োজন মেটানোর জায়গা হয়ে উঠল। আর সে প্রয়োজন মেটাতে গাছটি উজাড় করে দিল সব আপেল। তাতেও প্রয়োজন মিটল না বলে গাছটিকে বিসর্জন দিতে হলো নিজের ডালপালা । চাহিদার শেষ হলো না এতেও। সবশেষে কাণ্ড হারিয়ে গাছটি কেবল শিকড়সমেত গোড়া নিয়ে মাটি আঁকড়ে পড়ে রইল একদা এক সময়ের একটি ফলবান আপেল গাছের স্মৃতিচিহ্নরূপে। নদী আর আমাদের সম্পর্কের রূপান্তরও ঘটছে এভাবে। শৈশব স্মৃতির ঝিকিমিকি দেখে নিন একবার নদীর স্রোতে। প্রমত্তা পদ্মায়। বহতি যমুনায়। নদীর পাড়ে প্যাকপ্যাকে কাদায় হাঁটু অবধি মাখামাখি দুরন্ত-বাড়ন্ত শৈশব-কৈশোর। রোদের ঝিলিকে রূপালি শরীরের চঞ্চলা মাছ হাতের মুঠিতে ধরে রাখার উদ্দাম আনন্দ! হাত-পা ছুড়ে প্রথম সাঁতার শেখার দুরন্ত রোমাঞ্চ। গরমে অতিষ্ঠ দুষ্ট ছেলের দলের নদীর বুকে ঝুপঝুপ ঝাঁপ। তারপর তারুণ্যে দুর্ধর্ষ নৌকাবাইচ! নাহ! এতটা নস্টালজিক হওয়ার সুযোগ নেই আজকাল। যমুনা কি আর আগের মতো জলবতী আছে? এখন চারদিকে কেবল মরা নদীর ‘মেলানকোলি’! কারণ চিত্রপট পাল্টে শুরু হয়েছে চাহিদার গল্প। এ গল্পটা আড়েবহরে এত বিশাল যে, জায়গা সংকুলান করতে নদী ভরাট করছি আমরা। তাতে রুদ্ধ হয়েছে একদা এক সময়ের খরস্রোতা নদীর গতিপথ। আমাদের উৎপাদনমুখী চাহিদার বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে পাওয়া বর্জ্যের আধার হিসেবে আমরা খুঁজে নিয়েছি নদীকেই। তাতে টলমল সরসী হয়েছে বদ্ধ ডোবা। আমাদের নৈতিকতা বোধের ধসে যাওয়া স্তরে সৃষ্ট গর্তগুলো ভরাট করতেই বুঝি গোমতী নদীর বুকে ড্রেজার চালিয়ে উপর্যুপরি বালু উত্তোলন চলছে! ওদিকে কর্ণফুলীও নাকি নিষ্প্রাণ হওয়ার পথে। করতোয়া স্পন্দনহীন। আমাদের নদীরা ভালো নেই, আমাদের আগ্রাসনেই।

২০১০ সালের ৬ জানুয়ারিতে বুড়িগঙ্গা পরিষ্কার কার্যক্রমের উদ্বোধন হয়। এক বছরমেয়াদি বুড়িগঙ্গা পুনরুদ্ধার প্রকল্পের দেড় বছরের মাথায় এ বছরের জুনে আদালত রায় দিয়েছেন, বুড়িগঙ্গার পানিকে আর পানি বলা যাবে না। বুড়িগঙ্গা এতটাই অস্বাস্থ্যকর যে, বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতেও নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। অবশ্য আগস্টে প্রায় সব ক’টা শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রে বুড়িগঙ্গায় অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়ার খবর প্রকাশিত হয়। বুড়িগঙ্গা প্রাণ ফিরে পাচ্ছে_ এমন বক্তব্যও শোনা যায় কর্তৃপক্ষীয় ব্যক্তিবর্গের কাছ থেকে। ব্যর্থতা ঢাকতেই কি এত উচ্চবাচ্য? এত প্রচারণা? কারণ এটা সহজেই অনুমেয়, বর্ষার ঘন ঘন বর্ষণে নদীতে পানির পরিমাণ বেড়ে যায়। তাতে অক্সিজেন বাড়াটাই তো স্বাভাবিক। তবে কর্তৃপক্ষ নজর না দিলে শুকনো মৌসুমে বর্জ্য মিশ্রিত দূষিত পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ পূর্বের মতো শূন্যের কোঠায় নামতে দেরি হবে না।

ভাবতে অবাক লাগে, নদীমাতৃক এ দেশে নদীর কদর হলো না! এখনকার প্রজন্ম নির্মল নদীর বুকে দাপিয়ে সাঁতার কাটার নিটোল আনন্দ থেকে বঞ্চিত! নৌকাবাইচ ঐহিত্য হারিয়ে গেল আমাদের অজান্তেই। যমুনার বুকে নাকি নৌকা চলে না আর। বদলে ধানের চারা রোপণ হয়। শাকসবজি বপন হয়। আমাদের নদীরা প্রশাসনের সদয় দৃষ্টি পেল না। সবটাই দায়সারা। আশঙ্কা হয়, মানচিত্র থেকে আঁকাবাঁকা নীল রঙা দাগগুলো না মুছে যায় একদিন! একটু চোখ রাখি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে দূরদেশে। ওখানে নদীরা কেমন করে বয়ে যায়? ওদের তো জীবনানন্দ দাশ নেই। ওরা কি বুঝবে একটা ধানসিঁড়ি নদীর মর্ম?

রাজধানী লন্ডন ছাড়াও বিশাল বপু ছড়িয়ে ইংল্যান্ডের বড় শহরগুলোকে ছুঁয়ে বয়ে চলেছে টেমস- ইংল্যান্ডের সর্বাপেক্ষা দীর্ঘ নদী। টেমসকে ঘিরে বর্ধিত হয়েছে শহরের সৌকর্যও। বিনোদন কেন্দ্র টেমস। বাণিজ্য কেন্দ্রও টেমস। যদিও এর কোনোটিই টেমসের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেনি। চোখ ফেরাই মিসরের দিকে। এক গ্রিক ইতিহাসবিদ বলেছিলেন, ‘মিসর হলো নীলের উপহার।’ মিসরীয় সভ্যতার জন্ম, বিকাশ নীলের পাড় ঘেঁষেই। মিসরে সুবিস্তৃত পরিসরে উন্নত নগরায়ন ঘটেছে। অথচ তা বিঘ্ন ঘটায়নি নীলের সাবলীল প্রবাহে। বিপরীতে আমাদের নদীরা? স্রোত হারিয়েছে। প্রাণ হারিয়েছে। নাব্যতা খুইয়ে বিলীন হতে বসেছে। আজ যদি বুড়িগঙ্গা টেমস হতো, তবে ‘লন্ডন আই’ থেকে কত শত চোখ তাকিয়ে থাকত! আহ! আজ বুড়িগঙ্গা নীল হলে, পর্যটকরা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখত বুড়িগঙ্গার নীলচে স্ফটিক জল। কিন্তু আমরা বঙ্গবাসীরা যদি কোনোদিন জীবনানন্দের মতো আবার ফিরে আসতে চাই শঙ্খচিল-শালিকের বেশে, তবে কোন নদীর তীরে ফিরব?

***
লেখাটি দৈনিক সমকালে প্রকাশিত হয়েছে ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১১ [,]