ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

সভ্যতা আর জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার বর্তমান প্রেক্ষাপটে যদি প্রশ্ন করা হয় যে, আর্থ-সামাজিক অবস্থান বিবেচনায় রাখলে সামাজিক বৈষম্য এখন কতটা বিরাজমান? তাহলে বোধকরি কেউ কেউ এমন প্রশ্নকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করতে পারেন এবং কেউ কেউ বড়জোর বিজ্ঞতার সাথে উন্নতির পরস্পর ধাপগুলো দেখিয়ে খানিকটা স্বীকারোক্তির সাথে এও জানিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন, সামান্য যেটুকু বৈষম্য রয়েছে তা সমাজ এবং প্রশাসন দ্রুতই কাটিয়ে উঠবে। যদি প্রশ্ন করা হয়, আজকের যুগে দাসপ্রথা আছে কি না? তাহলে নিশ্চয়ই সবাই সজোরে ডানে থেকে বামে মাথা নাড়িয়ে একবাক্যে ‘না’ সূচক জবাবই প্রদান করবে। কারণ, ইতিহাস মোতাবেক দাসপ্রথার বিলুপ্তি ঘটেছে সেই উনিশ শতকে। সন্দেহাতীতভাবেই সেই বিলুপ্তি ঘটেছে। তবে উচ্চ এবং নিচ এই দুই স্তরের ভেদাভেদ করা মানবজাতির মজ্জাগত বৈশিষ্ট্য। তাই, হোক তা ধর্মীয় জাতপাত বা বর্ণবাদ অথবা অর্থনৈতিক অবস্থান- শ্রেণী বৈষম্যের প্রচলন যুগ যুগ ধরেই প্রচলিত থাকে। ফলে কোন না কোন ধর্ম, বর্ণ, গোত্রের সত্তা ক্রমাগতভাবে বৈষ্যম্যের শিকার হতে থাকে। ‘দলিত’ হলো তেমনই এক বৈষম্যের দৃষ্টান্ত।

উনিশ শতকে ‘দলিত’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন জ্যোতিরাও ফুলে। মারাঠি ভাষা থেকে আগত ‘দলিত’ শব্দটির অর্থ অবিকশিত, অবদমিত, নিষ্পেশিত। দলিত গোত্রভূক্তরা সামাজিকভাবে ’অচ্ছুৎ’ রূপেও বিবেচিত হয়ে থাকে। দলিতদের পেশাগত জীবনই মূলত এর কারণ। কসাই, মানুষ ও প্রাণীর বর্জ্য পরিস্কারক, আবর্জনা পরিষ্কারক হিসেবে দলিতদের দেখা যায়। দলিতরা মল, নালা-নর্দমা ও রাস্তাঘাট পরিষ্কারের কাজ করে বলে সমাজে তাদের অপবিত্র বলে গণ্য করা হয় । ফলে দলিতদের একঘরে করা হয় সমাজ ও সামাজিক আচার হতে। তাদের বিদ্যালয় ও উপাসনালয়ে প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা। আগে এমনকি তাদের বসতি গড়ে তুলতে হতো গ্রাম বা শহরের বাইরে। ভারতে দলিত জনগোষ্ঠী বেশী দেখা গেলেও নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলংকা এবং বাংলাদেশেও এই সম্প্রদায় আছে। সংখ্যাগরিষ্ঠই হিন্দু হলেও বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, শিখ, এমনকি মুসলিম ধর্মাবলম্বী দলিতও রয়েছে । ভারতে দলিত সম্প্রদায়ের অধিকার সংরক্ষণ করতে বিভিন্ন সময় আইন পাশ করা হয়েছে। ফলে রক্ষণশীল ভারতে দলিতদের বিকাশ ঘটতে শুরু করে। সমাজের গুরুত্বপূর্ণ নানা পর্যায়ে দলিতরা জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়। অবশ্য প্রধানত হিন্দু দলিতদেরই এই অগ্রযাত্রায় প্রাধান্য বিস্তার করতে দেখা যায়। ঘুঁটে কুড়ানি থেকে রাজরানী হওয়ার দৌড়ে অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে দলিত জনগোষ্ঠী। ১৯৯৭ সালে ভারতের দশম প্রেসিডেন্ট হিসেবে অধিষ্ঠিত কে.আর. নারায়ণ একজন দলিত ছিলেন। দলিত গোত্রভূক্ত মায়াবতী ২০০৮ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন ।

রাজনৈতিক অঙ্গনে দলিত সম্প্রদায়ের সাফল্যময় অন্তর্ভূক্তিকরণের পাশাপাশি, দলিত সাহিত্য সমাজে এক বিপ্লব জাগাতে সক্ষম হয়। মাহাত্মা ফুলে এবং আমবেদকারই সর্বপ্রথম দলিতদের সামনে তুলে ধরেন তাদের লেখার মাধ্যমে। এরই ধারাবাহিকতায় অসংখ্য দলিত মারাঠি, হিন্দি, তামিল, পাঞ্জাবি ভাষায় লেখালেখিতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। ১৯৬০ সাল নাগাদ ভারতে বেশ কিছু দলিত সাহিত্যিকদের পদচারণা শুরু হয়। এক্ষেত্রে লিটিল ম্যাগাজিনগুলো বেশ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। শ্রীলংকায় ১৯৬০ সাল পরবর্তীকালে দলিত সাহিত্যিক দমিনিক জিভা মূল ধারার লেখক হিসেবে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেন।

দলিত সাহিত্যের ক্রমিক বিকাশ নিয়ে ব্রিটিশ পত্রিকা ‘দি ইনডিপেন্ডেন্ট’-এ একটি পর্যবেক্ষণমূলক ও তথ্যপূর্ণ লেখা প্রকাশিত হয় গত ৩০শে জুন ২০১০-এ। দিল্লি থেকে এনড্রিউ বানকম্বে রচিত প্রতিবেদনটির অনুবাদ এখানে দেয়া হলো।

…………………………….

ঔপন্যাসিক এবং ছোটগল্পকার অজয় নাভারিয়া না হেসে পারেন না বলেই ফোঁড়ন কাটেন তাঁর ‘ভিন্নধর্মী’ পেশাজীবিতা নিয়ে। দিল্লির একটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘হিন্দুশাস্ত্র ও ধর্মগ্রন্থ’ বিষয়ে শিক্ষকতা করেন তিনি। ঊনচল্লিশ বছর বয়স্ক দলিত ও অচ্ছুৎ এই ব্যক্তির পূর্বসুরিদের জন্য কয়েক প্রজন্ম আগেও হিন্দু শাস্ত্রালোচনায় নিষেধাজ্ঞা ছিল, এর অন্যথা হলে জীবন বিপন্ন হতো। যাদের হুকুম তটস্থতার সাথে তামিল করতে হতো, এখন তাদেরকেই দীক্ষা দেয়ার পুলক সত্যিই তাঁর চেহারাকে হাস্যোজ্জ্বল করে তোলে।

তিনি বলেন, ”পঞ্চাশ বছর আগে একে অপরাধ বলে গণ্য করা হতো। আমি বিষয়টি নিয়ে ভাবি এবং আপনিও ভেবে দেখুন, যদি আমি সে সব ধর্মগ্রন্থ স্পর্শ করতাম তবে আমাকে হত্যা করা হতো”। দিল্লির এক সময়কার চাকচিক্যময় বৃটিশ ধাঁচের নকশার কনট প্লেসের কফির দোকানে বসে কথা বলছিলেন তিনি। ১৯৩১ সালে নির্মিত কনট প্লেস, যা সিপি নামেও পরিচিত, নতুন দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বৃত্তাকার বিপনী বিতান। একে দিল্লির বানিজ্যিক কেন্দ্রও বলা চলে। সেখানে একটি ভগ্নপ্রায় কফির দোকানের এককোণায় বসে বলছিলেন তিনি, ”তবে গণতন্ত্র আমাকে শক্তিশালী করেছে। এটি ক্ষমতা দিয়েছে নিচু গোত্রীয়দের এবং সাহায্য করেছে একটি অত্যাধুনিক সমাজ গড়ে তুলতে।”

নাভারিয়া ভারতীয় সাহিত্যের পরিব্যাপ্ত ভুবনে একটি নীরব সংস্কৃতিক বিপ্লবের নেতৃত্ব দিচ্ছেন নিজের মতো করে। দীর্ঘ সময় ধরে নিষেধাজ্ঞাজনিত কারণে কেবল নিজস্ব ও স্থানীয় ভাষায় লেখালেখির চর্চা করেছেন। মূলধারার সাহিত্যচর্চা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পর হালে দলিত লেখকদের প্রায়ই বগলদাবা করে নিচ্ছেন দেশের বড় মাপের প্রকাশকরা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রাধাকৃষ্ণ প্রকাশনীর কথা, তারা এখন তাদের প্রকাশনাগুলোকে হিন্দি, ভারতের উত্তরাঞ্চলের মিশ্র ভাষা এবং আরো অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ করা শুরু করেছে।

ইতিপূর্বে চোখে না পড়লেও, ঔপন্যাসিক, কবি এবং ছোটগল্পকাররা সাহিত্য-বাজারে বড় রকমের সুযোগ এবং অভিবাদন লাভ করছেন ইদানীংকালে। এখন তো দলিত পত্রিকা, দলিত সাহিত্য-ফোরামের দুটো প্রতিযোগী দল রয়েছে খোদ দিল্লিতেই। দলিত সাহিত্যের ওয়ার্কশপও হচ্ছে। ’দলিত সাহিত্য’ -কে ঘিরে যে ক্রমবর্ধিত গুরুত্ব এবং উচ্ছ্বাস তার আরও প্রমাণ দেয়া যায়। ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক সাহিত্যিকদের স্বর্গ বলে খ্যাত বাৎসরিক মিলনসভা- জয়পুর সাহিত্য উৎসবে এ বছর অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন নাভারিয়া ।

ভারতীয় সমাজ কখনও কখনও কঠোর, এমনকি নিষ্ঠুরও বটে। হিন্দু শাস্ত্র মতে, মানুষকে চারটি প্রধান গোত্রে (এবং হাজার হাজার উপগোত্রে) বিভক্ত করার পুরাতন শ্রেণীবিন্যাস, আর কোথাও এতোটা জোরালোভাবে দেখা যায় না। ঐহিত্যগতভাবে, গোত্র ব্যবস্থা নির্ধারণ করে দেয় গোত্রীয়রা কোথায় বসবাস করবে, কী প্রকারের জীবিকা নির্বাহ করবে এমনকি তারা কী খাদ্য গ্রহণ করবে তাও। যারা গোত্র বহির্ভূত, তাদেরকে অশূচি এবং অশুদ্ধ হিন্দু বলে গণ্য করা হতো এবং তাদের কর্ম নির্ধারিত হতো শৌচাগার পরিষ্কার, চামড়া তৈরি এবং পথঘাট ঝাড় দেয়া ইত্যাদি।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দলিতরা এভাবে নির্যাতিত হয়ে আসছে। এমনকি বর্তমানকালের রক্ষাকবজ আইন ও এর কলেবরে বেড়ে ওঠা শহুরে সমাজ থাকা সত্ত্বেও এখনও অজস্র ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ অত্যাচার, বৈষম্য এবং আক্রমণের শিকার। দক্ষিণ ভারতের মানবাধিকার সংস্থার যৌথ সহযোগী, তামিল নাড়ু অচ্ছুৎ উচ্ছেদ ফ্রন্ট কর্তৃক একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে শ্রেণী ও কাঠামোগত বৈষম্যের যে সকল তথ্য-পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে তা রীতিমত স্তব্ধ করে দেয়ার মতো।

এতে বিষদভাবে প্রকাশিত নানাবিধ অবমাননাকর তথ্য থেকে কিছু কিছু বৈষম্যমূলক আচরণ দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। যেমন, উচ্চগোত্রীয়দের সম্মুখে মুঠোফোন ব্যবহারে দলিতদের উপর নিষেধাজ্ঞা। ধোয়া কাপড় পরিধানেও মানা ছিল। কেবলমাত্র নারিকেলের খোলের মধ্যে চা পানের অনুমতি ছিল, তাও আবার মেঝেতে হাঁটু গেঁড়ে বসে। মন্দিরে প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল তাদের জন্য। তাদেরকে বাধ্য করা হতো বিষ্ঠা খেতে। তাদের নারীদের ধর্ষণ করা হতো এবং জীবন্ত দগ্ধ করা হতো।

এখন পর্যন্ত দলিত জনসংখ্যা ১৫০ মিলিয়ন, যা ভারতের জনসংখ্যার শতকরা ২০ ভাগ এবং এই গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান ধীরে ধীরে উপলব্ধি জাগিয়ে তোলে যে এই সম্প্রদায়কে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী হিসেবে গণ্য করার সময় এসেছে। এই অগ্রযাত্রায় শামিল হয়ে ভারতের বৃহত্তর অঞ্চল উত্তর প্রদেশে নিচু গোত্রের ভোটাররা তিনবার দলিত গোত্রভুক্ত মায়াবতী কুমারীকে মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত করেছিল।

জনসংখ্যার ঘনত্ব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল দলিত সাহিত্যের বিকাশেও, কারণ সম্ভাব্য বিশাল সাহিত্য-বাজারকে সামনে রেখে প্রকাশকরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠছিলেন। যেমনটা নাভারিয়া বলেন, ”তারা তাদের ব্যবসাই করবে। তারা তো আর যাজক নয়। লাভের দেখা পেলে তবেই তো তারা প্রকাশনায় তৎপর হবে। নয়তো নয়।”

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর লেখালেখি নিয়ে উদীয়মান আরো এক জনপ্রিয় মুখ রামনিকা গুপ্তা। যদিও তিনি দলিত গোত্রভূক্ত নন, কিন্তু যুদ্ধরত আম আদমী (Yuddhrat Aam Aadmi) নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকার উদ্যোক্তা। পত্রিকাটি পূর্ববর্তী প্রান্তিক লেখকদের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ ছিল। রামনিকার মতে, তিনি ও তার তিন সহকারি মিলে নিরলসভাবে শ্রম দিয়ে গত দু’দশকে ভারতজুড়ে প্রায় ১,৫০০ দলিত লেখককের লেখা প্রকাশ করেছেন। প্রতিষ্ঠিত প্রকাশকরাও নিয়মিতই তার শরণাপন্ন হন নতুন সাহিত্য-মেধা সম্পর্কে খোঁজখবর করতে। রামনিকা অবশ্য এই শর্তেই সহযোগিতা করেন যে, প্রকাশকদের পেপারব্যাক প্রকাশনা ছাপতে হবে, যা সাধারণ পাঠকের জন্য যথেষ্ট সাশ্রয়ী ।

কর্মক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া একতলা বাসার বসার ঘরে বসে রামনিকা পর্যবেক্ষণ করেছেন, দলিত সাহিত্যিকদের সাহিত্য রচনার বিষয় নিয়ে ঘাটতি হয় না কখনও। তিনি প্রভাবশালী লেখক এবং দলিত নেতা বি. আর. আমবেদকারের উদ্ধৃতি পুনরাবৃত্তি করে বলেন, প্রান্তিক মানুষদের নিজস্ব সাহিত্য থাকা প্রয়োজনীয় যেখানে তারা নিজেদের জীবনগাঁথার প্রকাশ ঘটাবে।

দলিত এবং আদিবাসীদের সমস্যা নিয়ে প্রায় ডজনখানেক বইয়ের রচয়িতা মিসেস গুপ্তা গোত্রপ্রথা নিয়ে বলেন, ”ভারতীয় সংস্কৃতি বৈষম্যবাদী। এই দেশ অপব্যবহার করতে জানে। প্রত্যেকেই ভাবে ’সে আমার চেয়ে নিচু’ অথবা ’আমি তার চেয়ে উঁচু’। আমরা যা বলার চেষ্টা করছি তা হলো, আমরা সকলেই সমান এবং যদি কেউ দুর্বল থাকে তো আমরা তাদের সাহায্য করতে পারি উঠে দাঁড়াতে।”

ভারতের শহরাঞ্চলে জেগে ওঠা সচেতনতা ও সক্রিয়তার পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অগ্রগামী সাহিত্যচর্চা বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে বলেই দলিত সাহিত্যিকরা মনে করেন। যেখানে গ্রামাঞ্চলে গোত্রবাদীতা সর্বজনীন, সেখানে শহরের নানাবিধ উদাহরণে বোধগম্য হয় যে, ব্যক্তি বিশেষের গোত্রপ্রথা বিলুপ্তপ্রায়। শহুরে দলিতরা নিজেদের অধিকারের দাবিতে এখন অনেক বেশি সংঘবদ্ধ।

দীর্ঘ সময় ধরে সাহিত্যচর্চা এবং সক্রিয়তায় তৎপর অনিতা ভারতী একটি দলিত সাহিত্য ফোরামের মাসিক সভায় অংশগ্রহণ করতে দিল্লি চলেছেন। তিনি বলেন, ”ক্রমবর্ধনশীল সচেতনতার তৈরি হচ্ছে। জনগণ এখন অনেক শিক্ষিত এবং তারা তাদের অধিকার সম্পর্কে জানতে চায়।”

ভারতী বলেন, বৈষম্য নিরসনে দলিতদের হালের শ্রমসাধ্য উদ্যম বজায় রাখতে সাহিত্যচর্চার একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। নিচুজাতের প্রতি আক্রমণাত্মক ঘটনাবলী নিয়ে দলিত লেখকদের উদ্দেশ্যে ভারতী বলেন, ”তারা এখন এই বিষয়ে লিখতে পারে। তাছাড়া, মানুষ এখন উপলব্ধি করছে যে তারা দলিতদের সাথে খারাপ আচরণ করে এসেছে অতীতে এবং দলিত সাহিত্য সবার সামনে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।”

নিজের দ্বিতীয় উপন্যাস নিয়ে ব্যস্ত নাভারিয়াও এই বক্তব্যে সম্মত। যখন তিনি তার প্রথম উপন্যাস লেখেন, নাম উধার কে লোগ (পিপল ফ্রম দি আদার সাইড), তার কোন সন্দেহ ছিল না যে, এর প্রধান সমালোচনাকারী হয়ে উঠবে মধ্যবিত্তরা, যারা হলো শহুরে দলিতগোষ্ঠী। নাভারিয়া’র লেখায় বিভিন্নভাবে ফুটে উঠেছে গোত্রবাদীতা কীভাবে তার জীবনে প্রভাব ফেলেছে। এই কাহিনীতে বর্ণিত হয়েছে, দলিত পরিচয় আবিস্কারের পর একজন যৌনকর্মী-প্রেমিকা কর্তৃক দলিতের প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঘটনা। ”আমি দলিত সচেতনতা নিয়ে লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমার মধ্যে এই তাড়না আমি অনুভবও করেছি বহুবার”, নাভারিয়া জানান।

১২/১৩ বছর বয়সে, স্কুলছাত্র থাকাকালীন সময়ে নাভারিয়া একটি পীড়াদায়ক, অপমানজনক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। সে সময় দলিত শিক্ষার্থীদের মেধাবৃত্তি প্রদান কার্যক্রম ঘোষণা করা হয়েছিল। তার শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে এসে জানালেন, নাম তালিকাবদ্ধ করার সুবিধার্থে কেবল নিচুগোত্রের শিক্ষার্থীরা যেন উঠে দাঁড়ায় । ”আমি কখনও দাঁড়াইনি। আমি বরং প্রধান শিক্ষকের কাছে গিয়েছিলাম [মেধাবৃত্তির জন্য আবেদন করতে]”, নাভারিয়া স্মৃতি রোমন্থন করেন, ”আপনি শুনে হয়ত বেশ লজ্জিতই হবেন, এক বন্ধু আমাকে বলে উঠেছিল,’তুমি দেখতে মোটেও দলিতদের মত নও।’ আমি তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম,’দলিতদের চেহারা কেমন হয় বলে তোমার ধারনা?’

নাভারিয়া সেই প্রস্তাবনা ও পরামর্শকে খারিজ করেন, যার প্রবণতা কেবলমাত্র ”বিশুদ্ধ” দলিত ইস্যু এবং জেনে বুঝে নিজেদের দলিত হিসেবে উপস্থিত করে সহমর্মিতা আদায়, যা নতুন প্রজন্মের লেখকেরা হরহামেশাই করে থাকেন। তিনি মনে করেন, এই প্রবণতা জাতি-বৈষম্যকে দুর্বল বা ভঙ্গুর করার পরিবর্তে আরো পোক্ত ও জোরালো করে। তিনি যুক্ত করেন, ’যেখানে সমাজেই বিভাজন আছে সেখানে সাহিত্যে কেন বিভাজন থাকবে না? প্রকাশকেরা এই বিভাজনকে উৎসাহিত করেন না যদিও, কিন্তু প্রতিফলিত করেন ঠিকই।’ ‘বর্ণপ্রথা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্ণগোত্রহীন ভারতকে আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না । একজন ব্যক্তি যদি হিন্দু পরিচয়ে পরিচিত হন তবে নিশ্চিতভাবে তিনি বা তার গোত্র কোন না কোন বর্ণের অর্ন্তভুক্ত হবেন।’

ইংরেজি ভাষায় প্রকাশনার প্রথাকে অগ্রাহ্য করার বড় কাজটি বাকি রয়ে গেছে এখনও। সত্যি হলো, লেখকেরা সেই মাধ্যমেই কাজ করেন যেখানে পাঠকেরা সহজেই দীক্ষিত হতে পারে। যদিও ভারতী এবং অন্যান্যরা বলেন, এলিটবর্গীয়দের সুনজর পেতে ইংরেজি মাধ্যম এখনও বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রয়ে গেছে।

নাভারিয়া এরকম আরও অজস্র বাধাবিঘ্ন প্রত্যক্ষ করেন আগামীতে, তবে সেগুলো মোকাবিলা করার সামর্থও তার রয়েছে। ”লেখালেখি আমার পেশা নয়, নেশা”, দিল্লির গরম হলদে সূর্যটা যখন আকাশের গা বেয়ে পিছলে পড়ছিল, তখন কফি শেষ করতে করতে বলছিলেন তিনি। ”যদি আমার মাথায় নতুন কোন আইডিয়া আসে তাহলে আমি ঘুমাতেই পারি না। দু’তিন রাত ধরে আমি নির্ঘুমই থাকি, যতক্ষণ না কাজটা শেষ হয়। এটা আসলে সমাজের কাছে একরকম দায়বদ্ধতা বলা চলে।”

মূল প্রতিবেদনটির লিংক: http://www.independent.co.uk

***
লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল: সাময়িকী, ২৮.৭.২০১০