ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

*****************
বারুদ ফিরিয়ে নাও
আফসানা কিশোয়ার
কাব্যগ্রন্থ
প্রচ্ছদ: আবু হাসান
প্রকাশক: শুদ্ধস্বর
মূল্য: ৪৮ টাকা
****************

আফসানা কিশোয়ারের অষ্টম কাব্যগ্রন্থ ’বারুদ ফিরিয়ে নাও’ । খসড়া পাণ্ডুলিপিটা ইমেইলে পেয়েছিলাম, বইমেলা ২০১২ শুরুর আগেই। বুঝেছিলাম ব্যক্তিগত ব্যস্ততা, পেশাগত ঝঞ্ঝাটের মাঝে মানুষ হারিয়ে গেলেও একজন কবি নিখোঁজ হয়না। মেলায় বই সংগ্রহ করেছিলাম। তবে খসড়ায় চোখ বুলিয়ে কিছু লেখা হয়েছিল, সে সময়। এটাকে পূর্নাঙ্গ রিভিউ বলা যাবে না। তবে কবিতা পাঠ পরবর্তী আলোছায়ার মত ভাবনা বলা যেতে পারে। …

ভীড় ভাট্টার ঢাকায় আজ চাঁদ উঠেছে, অনেকে জোছনা নিয়ে হয়তো গবেষণা করে
আমি চাকরী করি; মানুষের ছানাপোনায় উঠোন ভরে উঠে, শিশুর মুখের হাসিতে
দিনের ক্লেদ মুছে যায় হয়তো বা, আমার উঠোন খালি পড়ে, আমি কেবল চাকরী করি।

প্রেম, সৌহার্দ, স্বপ্ন – সকল ইতিবাচকতা জেরবার হয়ে গেছে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, বিশ্ব – প্রবলভাবে ভেঙ্গে পড়ছে। অথচ ছক কাটা জীবনে অভিব্যক্তিহীন কাজকর্মে সঁপে দিতে হচ্ছে হাত-পা-নাক-চোখ-মুখ। কবিতার কাঠামোতে শব্দ বসানো যায় না প্রতিবার। তবু কবি কাঙ্খাবাঞ্ছার স্রোতে ভেসে যান। ডুবে যান।

হতাশ হই না। সব অনিয়মের শেষ কথা অনিবার্য ধ্বংস। তারপর তো আবার বিনির্মাণ।
তারপর আবার রোমিও জুলিয়েট। ধুন্ধুমার প্রেম। হাপুস কাঁদা, জড়াজড়ি বেঁচে উঠা, মধ্যবয়সে স্মৃতিচারণা।

তারপরও ’উপদ্রুত মানুষ স্বার্থপরতার’ ভিড় করে আসে। কাটছাঁট হয়ে যায় সম্পর্ক। যোগাযোগ। তখন আফসানা কিশোয়ার লিখেন ’যে জীবন চাপ আর ছোট হয়ে যাওয়ার সমন্বয়ে বহমান’ , সে জীবনের কথা।

প্রতিদিনের ছ’শ শব্দ ও আগে যেখানে ভাবপ্রকাশের জন্য
অপ্রতুল ছিল, সেগুলো এখন গুটোতে গুটোতে এভাবেই
ঘেরাটোপে বাঁধা পড়ে থাকে। ‘ভালোবাসা’ অক্ষর ক’টির চাইতে
হাস্যকর আমার আর কিছু মনে হয় না।

তবুও, কবি তো কবি -ই। তাই আফসানা কিশোয়ার জানেন, ’এপিটাফ লিখিত হবে’। তিনি লিখেন ’দু’টি মানুষ’ -এর বিরল সম্পর্কেও কথা। ’ছিন্ন পদ্য’ নিয়ে দু:খের সাথে দু:খের জোড়া দিয়েছেন কবি। তারপর খুঁড়ে খুঁড়ে ’সম্পর্কের ব্যবচ্ছেদ’ করেছেন। ’দায়হীন বন্ধুতা’র সাথে সমঝোতায় উপনীত হয়ে খেদ কণ্ঠে বলেছেন-

বরফের উপর পা, পাথরে ঘষটানো গা,
আহা, কি যে যন্ত্রণা! তবু কাটি না রা;
কতকটা নিজের লাভ, সামাজিক পরিচয়,
তোমার সাথে ভাব বিনিময়
এখনো এই সমঝোতার পরিচয় নিয়েই অল্প হলেও সহজ হয়।

তবে কবি অনুসন্ধানী মনের। ভগ্নতায় আত্ম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন না। তমসা কাটিয়ে ভোরের প্রতীক্ষায় বলে ওঠেন-

আবার ভালোবাসার অন্তঃর্জালে তোমাকে বাঁধতে
সুর সাধি গভীর মনোযোগে,
যে সুর আমার নিদ্রাহীনতার দুঃসহ রাত্রিগুলো
শৈশবের মতো সহজ করে দেয় – তোমার বিরল মৌতাতে
সাহসী ভোরের একজন হয়ে উঠি আমি বা আমরা
পুনরায়।

উত্তরাধিকারের খোঁজে” অপেক্ষমান কবির আত্মবিশ্বাসের দেখা মেলে, তাতে ধার অনুভূত হয়। অথবা কবির ভেতরে পার্থিব রেওয়াজকে উপেক্ষার মনোভাব দেখা যায়। প্রথা ভাঙতে গিয়ে কবি ’ছন্দ ভাঙ্গার গান’ শুনিয়েছেন। একটু উন্নাসিক কণ্ঠে বলেছেন, ’গোল্লায় যাক সমাজ ভাবনা’!

আসলে কবি আফসানা কিশোয়ার স্বাধীনচেতা। যেন মার্চের আগুন চিত্তে আগলে রাখেন সারাক্ষণ। আবার স্বাধীনতার বিশুদ্ধ নম্রতাকেও ধারন করেন বুকে।

এমন সত্য উচ্চারণের পরও
জানতে কি আর চাও?
এই মার্চে ভালোবাসার সাথে ”স্বাধীনতা”
এটুকু না হয় প্রকাশ্যেই মেখে নাও!

যদিও কবির মত ভালবাসার উত্তাপে উষ্ণতা খোঁজেনি বিশ্ব। কবি তাই সাম্রাজ্যবাদ দেখেছেন। বেনিয়াদের দামামা দেখেছেন। অর্থনীতির রাজনীতি দেখেছেন। বারুদের ছাইয়ে আত্মজার মুখ মলিন হলে কারও কি ভাল লাগবে? কবির মনে জেগেছে এমন উদ্বেগ। সমাধান একটাই দেখেছেন কবি। মানবকে এই ধ্বংসাত্মক বারুদ ফিরিয়ে নিতে হবে। কালো ধোঁয়াশাচ্ছন্ন নয়, একটা উন্মুক্ত আকাশের নীচে এসে দাঁড়াবে সত্যিকারের সভ্যতা।

তবে মানব তুমি বারুদ ফিরিয়ে নাও
এক আকাশের সামিয়ানা দিয়ে
সবাইকে ছেয়ে দাও।

আফসানা কিশোয়ার সাধারণ মানব-মানবীর জীবনকে অসাধারণভাবে উল্টেপাল্টে দেখেন। সমাজ-বিশ্বকে ভেঙেচুড়ে দেখেন। সবটাই গড়ার প্রত্যাশায়। কবিতায় উচ্চারিত হওয়া শব্দে কবির এই প্রচেষ্টা, এই প্রত্যাশা পাঠককে প্রভাবিত করবে।

… আফসানা কিশোয়ার ব্লগে আর আগের মত সরব নন। মুখবন্ধে কারণের আভাস দিয়েছি। তবে ব্যক্তি আফসানা কিশোয়ার বরাবর সরব। মুখর। প্রতিবাদী। যারা তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি, তারা আফসানা কিশোয়ারকে কখনও দুরন্ত ’টমবয়‘ রূপে পান, কখনও প্রবল নারী রূপে। কাছের মানুষেরা ভীষণ বন্ধু রূপে। আর তারপর সবকিছু ছাপিয়ে আফসানা কিশোয়ার কেবল কবি হয়ে ওঠেন। কবি মার্চে জন্মেছিলেন বলে বোধকরি একাত্তরের মার্চের মত অগ্নিঝরা হতে পারেন। আর তারিখটি ৮ই মার্চ ছিল বলে হয়ত নারী হিসেবে প্রবল প্রতিভাত তিনি। বন্ধু, সহযাত্রী, প্রিয় কবি-লেখক আফসানা কিশোয়ারের জন্য শুভ কামনা সর্বদা।