ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

নদীর দেশের মানুষ বললেই মনে হবে, এ তো নিশ্চিত পানিতে দাপাদাপি করে বেড়ে উঠেছে। কিন্তু আদপে আমাদের গল্পটা এভাবে লেখার সুযোগ ঘটছে না। কথায় বলে, কুয়োর ব্যাঙ সাঁতার জানে না। নদীমাতৃক দেশে আমরা একেকজন বেড়ে উঠেছি সেই কুয়োর ব্যাঙ হয়ে। আমার পরিচিতজনের মধ্যে সাঁতার জানে এমন সংখ্যা উল্লেখ করার মতো নয়।

ইন্টারনেটে অনেকক্ষণ খুটখাট করে কিছু পরিসংখ্যান খুঁজে দেখার চেষ্টা করলাম। দেশের জনগোষ্ঠীর কতসংখ্যক সাঁতার জানে? শতকরা হার কত হতে পারে? বয়সভেদে এ সংখ্যা কত? পরিসংখ্যানটা নারী-পুরুষভেদেই-বা কীরূপ? মনমতো তথ্য খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছি। এ অপ্রাপ্তির দুটি কারণ মোটা দাগে দাগান্বিত করা যেতে পারে- এ ধরনের কোনো জরিপ চালনা করাই হয়নি অথবা ইন্টারনেটে কোনোভাবেই এ ধরনের তথ্য সংযোজিত হয়নি। দুটি কারণই আশঙ্কার। তবে প্রথম কারণটি বাস্তব চিত্র হলে আপন ব্যর্থতার জন্য গলাজলে নেমে নদীর কাছে জোড় হাতে ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। যদিওবা আমি বড়মুখে আশাবাদী, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে এ ধরনের তথ্য বিদ্যমান। কারণ এখনও ক্রীড়াশৈলীর বড় অঙ্গন সাঁতারে মেডেল জিতে নিতে আমরা স্ট্রোক দিয়ে এগিয়ে যাই। নিশ্চয়ই বাংলাদেশ সাঁতার ফেডারেশন তাদের প্রয়োজনেই এ ধরনের পরিসংখ্যান ফি বছর সংগ্রহ করে থাকে। খেলুড়ে সাঁতারুরা পেশাদার। সাঁতারে অপর পেশাজীবী হলো ডুবুরি। এর বাইরে বিভিন্ন বয়সী জনগোষ্ঠী কি সাঁতারে অজ্ঞ? নাকি সাঁতারে অভিজ্ঞ?

প্রশ্ন উঠতে পারে, পেশাদার ছাড়া বাকিরা সাঁতার জানবে না কেন? নদীনির্ভর জনগোষ্ঠীকে জলের বুকে স্বাচ্ছন্দ্যে সাঁতরাতে না জানলে চলবে কী করে! শরীরচর্চার জন্য সাঁতার কার্যকরী ব্যায়াম। বিশেষত বাড়ন্ত ছেলেমেয়েদের জন্য। জলের সঙ্গে নির্ভয় আর অনুসন্ধিৎসু সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাঁতারের বিকল্প নেই। তবে সাঁতার শেখার আরও বড় প্রয়োজনীয়তা হলো আত্মরক্ষা।

আমাদের দেশে নৌদুর্ঘটনার পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক। ২০০৩ সালের এমভি নাসরিন-১ জাহাজটির ডুবে যাওয়া ছিল স্মরণকালের বড় নৌদুর্ঘটনা। সরকারি হিসাবে ৬৪১, আর বেসরকারি হিসাবে ৮০০ দাঁড়িয়েছিল মৃতের সংখ্যা। বিগত ৪০ বছরে কেবল মেঘনা নদীতেই নৌদুর্ঘটনা ঘটেছে শতাধিক। প্রতি বছর আমরা শুনে যাচ্ছি স্বজন হারানোর আহাজারি। এত লাশের ভার আমরা কী করে বহন করছি কে জানে!

নৌদুর্ঘটনার পেছনে সার্বিক ব্যবস্থাপনাগত অনিয়মই প্রধানত দায়ী। এত মৃত্যুর কারণ হিসেবে নৌযানে পর্যাপ্ত লাইফ সাপোর্ট ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি উদ্ধারকর্মীদের দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছতে দেরি করা নিয়েও অভিযোগ দেখা যায়। তারপরও এ আশঙ্কা করা হয়তো ভুল হবে না- ডুবন্ত যাত্রীদের অধিকাংশই সাঁতার জানতেন না। ফলে দীর্ঘক্ষণ পানিতে ভেসে থাকতে, সাঁতরে পাড়ে উঠতে ব্যর্থ হয়েছেন অনেকেই। সাঁতারে অজ্ঞতার কারণে নৌদুর্ঘটনায় পতিত হয়ে তাৎক্ষণিক আতঙ্কও গ্রাস করার কথা। সাঁতার শিক্ষা থাকলে এদের সিংহভাগের পক্ষেই এমন অতর্কিত দুর্ঘটনায় পানির সঙ্গে যুঝতে পারা সম্ভব হতো। অপরাপর মৃত্যুপথযাত্রীর রক্ষাকবচ হিসেবেও এগিয়ে আসতে পারতেন অনেকে। কোনো মা হয়তো আত্মরক্ষা করে তার শিশুসন্তানকেও সামলাতে পারতেন। আমরা অন্তত নির্ভার হতে পারতাম প্রিয়জনের সলিলসমাধির দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়ানোর হাত থেকে।

কেবল লঞ্চ দুর্ঘটনা থেকেই পানিতে মৃত্যু হচ্ছে, তা নয়। বন্ধুরা মিলে নৌবিহারকালের হুল্লোড় বিষাদে ছেয়ে যাচ্ছে সামান্য অসাবধানতার কারণে কারও পানিতে ডুবে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুতে। পুকুরে ডুবে স্কুলছাত্র, কিশোর-কিশোরীর মারা যাওয়ার ঘটনাও কম ঘটছে না।

মনে হতে পারে, শহরের লোকেরা পুকুর-নদীর সঙ্গে সম্পর্কহীন। তাই তারা সাঁতার জানে না। কেবল শহুরেদের দুষলে হবে না। অবস্থাদৃষ্টে ভাবতে হচ্ছে, গ্রামাঞ্চলের লোকেরাই-বা কতটা সাঁতার জানে আজকাল! লঞ্চ, নৌকার সব যাত্রীই নিপাট শহরবাসী তো নয়!

সাঁতার বলতেই যে কিংবদন্তির নাম মনে আসে, সেই ব্রজেন দাশ ছয়-ছয়বার ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়েছিলেন। কিছুদিন আগে হাসান বিপুলের প্রতিবেদন পড়ছিলাম (বিডিনিউজ, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১২)। দশ কিশোর-কিশোরীর সেন্টমার্টিন জয়। ১৫ কিলোমিটার সাঁতরে সেন্টমার্টিন পৌঁছেছিল তারা। মনে হলো এক নয়, একাধিক ব্রজেন দাশের দিগ্বিজয় গাঁথা পড়ছি। যদিও আমাদের সবারই দুরন্ত সাঁতারু হয়ে সাত সাগর পাড়ি দিতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, আমাদের জীবন-মৃত্যুর চ্যানেল সাঁতরাতে হচ্ছে একেকটা নৌদুর্ঘটনায় পতিত হয়ে, যেখানে সামান্য সাঁতার শিক্ষা হয়তো আমাদের অনেককে জীবন-চ্যানেল জয় করাতে পারে অনায়াসে।

শহরে একটা চর্চা চলছে অনেক দিন ধরেই। বাড়তি মেদ কমাতে পয়সা খরচ করে সাঁতার শেখেন অনেকে। অনেক শৌখিন অভিভাবক আবার সন্তানদেরও সাঁতার শেখাচ্ছেন। কিন্তু নদীর দেশে সাঁতার শিখতে অত্যাধুনিক শরীর চর্চাগারের সুইমিং পুলে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ ভেজাতে হবে কেন? দেশের কি শহর, কি গ্রাম- সব স্কুল-কলেজে শরীরচর্চা ক্লাসে সাঁতারকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। শিক্ষাঙ্গনের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সাঁতার নিয়মিতভাবে যুক্ত হোক। নৌদুর্ঘটনাগুলোতে নারী যাত্রীদের অসহায়ত্বকে বিবেচনা করে সাঁতারে মেয়েদেরও বিশেষভাবে উৎসাহিত করা জরুরি। এ ধরনের কার্যকর উদ্যোগের একটি বিশেষ ফায়দা হবে_ শিক্ষার্থীরা নদী-পুকুরের সঙ্গে একাত্ম হবে ক্রমাগত। তারপর নদী বাঁচাও আন্দোলনে সর্বাগ্রে থাকবে তারাই। কোথায় নদী মরে যাচ্ছে, কোথায় নদী নোংরা, বদ্ধ জলাধার হয়ে যাচ্ছে_ শিক্ষার্থীরাই জানান দেবে। তারাই দল বেঁধে নেমে পড়বে নদীতে-পুকুরে। হাতড়ে, সাঁতরে নদী বাঁচাবে, পুকুর বাঁচাবে। আর নিজে বাঁচতে সাঁতারশৈলী রপ্ত করবে। তারাই হয়ে উঠবে আমাদের আগামীর জীবন-চ্যানেল জয় করা ব্রজেন দাশ।

***
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল: দৈনিক সমকাল, ৩০ মার্চ ২০১২