ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, ব্লগ সংকলন: সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড

সহ পেশাজীবী, তাই সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড নিয়ে সাংবাদিকদের আবেগ, দ্বায়িত্ব, দায়বদ্ধতা আমাদের মত সাধারণ নাগরিকদের চেয়ে হাজার গুণ বেশি হবে – এমন ধারনাটাই অলিখিত ভাবে ধারণ করে ছিলাম আমরা সম্ভবত। কথা ছিল ৮ এপ্রিল সাংবাদিকদের সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ কর্মসূচীর সাথে সংহতি প্রকাশ করবো আমরা ব্লগাররা। সাংবাদিকদের বক্তব্যকে অনুসরণ করব। তাদের পদযাত্রায় পা মেলাব। অবস্থান ধর্মঘটে পাশে দাঁড়াব প্রতিবাদলিপি হাতে। তাদের প্রতি আমাদের আস্থার জায়গাটা এরকমই ছিল। কিন্তু কর্মসূচীর একদিন পূর্বে অর্থ্যাৎ গত ৭ এপ্রিলে সাংবাদিকরা একটি চা-চক্রে যোগ দেয় এবং তারপরই চক্রাকারে পাল্টে যায় প্রতিবাদের ভাষা।

গনগনে গরমের নাভিশ্বাস উঠে যাওয়া দিনের পর কাঙ্খিত ঝুম ঝুম বৃষ্টি এসেছিল গত শুক্রবার। সেই শীতলতা গতকালও ছিল বটে। এমন ওম ওম আবহাওয়ায় ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে চাঙ্গা বোধ করে বুঝি আর প্রতিবাদের ধূলোমাটিতে গড়াগড়ি দিতে আগ্রহবোধ করলেন না সাংবাদিক বন্ধুরা। ৮ তারিখের পূর্ব ঘোষিত প্রতিবাদকে প্রায় এক মাস স্থগিত করে দিতে সাংবাদিক বন্ধুরা ৪৮ ঘন্টা সময় নেননি। ধরে নেয়া যায়, তাহলে এবার কোন কট্টর আশ্বাস ছিল হত্যাকারী গ্রেপ্তারের সম্ভাবনা নিয়ে। কিন্তু আমরা সংবাদ পাঠকরা পত্রিকার পাতা উল্টে, চ্যানেল বদলে বদলেও কোন সম্ভাবনার ছিটেফোঁটার স্বাদ নিতে পারি না কেন?

মাননীয় সরাষ্ট্রমন্ত্রীর বেধে দেয়া ৪৮ ঘন্টার পর আমরা পেরিয়ে গেছি ৪৮ দিনও – সূত্রহীন, তথ্যহীন, সম্ভাবনাহীন দিন! আমাদের অস্বস্তি, আশংকা দানা বেঁধেছিল সে কারণেই। আমাদের ছাই চাপা ক্ষোভ ফুঁসে উঠছিল সে কারণেই। কিন্তু সে সবে ঢেলে দেয়া হল ধূমায়িত চা! সাংবাদিকদের আচমকা পরিবর্তিত সিদ্ধান্তকে ব্লগাররা মেনে নিতে পারছিল না। তড়িৎ প্রতিক্রিয়া ছিল, প্রত্যেকের। ভ্রুকুটি করেছিল ব্লগাররা – তাহলে এই আস্থার জায়গাটাও নড়ে গেল? গলে গেল? গরম চায়ের ধোয়া হয়ে উড়ে গেল? নাহ! আলাদা আলাদা ভাবনাগুলোকে জড় করতে ৪৮ সেকেন্ড-মিনিট-ঘন্টা পার করার মত কালক্ষেপণ করেনি ব্লগাররা। ব্লগার থেকে ব্লগার এক জন আরেকজনকে সামলে নিল, সামলে দিল। সিদ্ধান্ত হল, ব্লগাররা তাদের প্রতিবাদ জারি রাখবে তাদের মত করেই। ব্লগারদের প্রতিবাদের উদ্দেশ্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি নয়, অস্থিরতা সৃষ্টি নয়। নাগরিক হিসেবে একটা নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শাস্তি দাবি করার অধিকার, দ্বায়িত্ববোধ আমরা প্রত্যেকে বহন করি। আমরা কারো মুখস্ত বুলি আওড়াই না, নিজের বিবেচনা-বিচক্ষণতা-জবাবদিহিতা-দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই কথা বলি। আর তাই আমাদের তো কারো তারিখ বেধে দেয়া, তারিখ পিছিয়ে দেয়া কর্মসূচীর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকার প্রয়োজনীয়তা নেই!

একজনের ডাকে সাড়া দিয়ে আরেকজন, তারপর আরেকজন, এভাবে ব্লগাররা ঠিকই জড় হতে শুরু করল ৮ এপ্রিল দুপুর ১২টা থেকে, রাজু ভাস্কর্য চত্বরে। জাহেদ-উর-রহমান, আবু সুফিয়ান, জাগো বাহে জাগো, মঞ্জুর মোর্শেদ, আরিফ হোসেন সাঈদ, সোহেল মাহমুদ, কৌশিক আহমেদ, নাহুয়াল মিথ, রাফে সাদনান আদেল, মাহবুবুর রহমান এবং আরো কয়েকজন। ব্লগারদের ক্ষোভের উত্তাপ, প্রতিবাদের উত্তাপ সূর্যকেও স্পর্শ করেছিল। গনগনে সূর্যের নীচে রাজু ভাস্কর্য চত্বরে দাঁড়িয়ে ছিল ব্লগাররা কালো ব্যানার হাতে। প্রতিবাদের ভাষা লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে। ব্লগারদের এই প্রতিবাদে সামিল হয়েছিলেন ফটো সাংবাদিক বন্ধুরা।

2012-04-08-16-15-09-April........................ Eight 13

রাস্তায় চলতি রিকশায় থাকা যাত্রীরা পড়ে পড়ে দেখছিলেন ব্যানারের ভাষা। প্ল্যাকার্ডের ভাষা। ওদিকে ব্লগার সোহেল, ব্লগার জাহেদ, ব্লগার জাগো বাহে জাগো, ব্লগার আবু সুফিয়ান নিজেদের ক্ষোভের কথা, আশংকার কথা, প্রত্যাশার কথা জানান দিচ্ছিলেন।

অবস্থান কর্মসূচীর পর ব্লগাররা ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে পদযাত্রা করে। পদযাত্রায় থেকে থেকে স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠছিল ব্লগারদের দল। পথচারীরা স্লোগান কানে যেতেই ব্যানার-প্ল্যাকার্ডগুলো পড়ে দেখার চেষ্টা করছিলেন। রিকশার যাত্রীরা পেছনে ফিরে ব্যানার-প্ল্যাকার্ড পড়ার চেষ্টা করছিলেন। তাদের নড়ে ওঠা ঠোঁট তাই বলে। ব্লগারদের হাত ততক্ষণে ঘামে ভিজে উঠেছে। কিন্তু তবুও শক্ত হাতে ব্যানার আর প্ল্যাকার্ড ধরে, দৃঢ়তার সাথেই তারা এগুচ্ছিলেন … আর ক্ষণে ক্ষণে স্লোগান চলছিল – চলছে লড়াই চলবে। ব্লগাররা লড়বে

যেমনটা বলা হয়েছিল, ছবির হাটে এসে শেষ হয় ব্লগারদের প্রতিবাদ পদযাত্রা। ব্লগারদের চেহারায় তখনও দৃঢ়চেতা ভাঁজ। যে যার মত প্রকাশ করলেন আবারো। সবার একটাই প্রত্যাশা, লোক দেখানো প্রতিবাদ নয়, বিশৃঙ্খলতাও নয়, ধারাবাহিক ও দ্বায়িত্বশীল প্রতিবাদে ব্লগাররা নিয়মিতভাবে থাকবে। ব্লগারদের চেষ্টা থাকবে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডকে বিস্মৃত হতে না দেয়া। নতুবা রাষ্ট্রের জন্য এ ধরনের ব্যর্থতা একটি কলঙ্কজনক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ব্লগাররা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেনি, বরং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ যে সরকারের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বায়িত্ব, সে কথাই স্মরণ করিয়ে দিতে সচেতন ব্লগারদের যূথবদ্ধতা। প্রতিটি ব্লগার বারবার বলছেন, তাহলে আগামিকাল আমাকে যে কেউ হত্যা করতে পারে নৃশংসভাবে। প্রতিটি ব্লগার বলছেন, এবং তাহলে আমাকে হত্যা করা হলে আমার হত্যাকারী এই দেশে অথবা বিদেশে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে দিনের পর দিন ঘুরতে পারবে রাষ্ট্রিয় আইন-কানুনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে। একজন নাগরিকের পক্ষে তা মেনে নেয়া যায় না। তাই ব্লগাররা রাষ্ট্রকে তার দ্বায়িত্বশীল ভূমিকায় দেখতে চায়। সুতরাং, ব্লগারদের প্রতিবাদ চলবে। ব্লগে। রাজপথে। আবার ব্লগে। পুনরায় রাজপথে।

BloggersInProtest1

ছবি ক্যাপশন: প্রতিবাদ ভাষ্য লেখা প্ল্যাকার্ডের বান্ডিল

সুশৃঙ্খল, অহিংস প্রতিবাদের পক্ষে অবস্থানকারী ব্লগাররা এ বিষয়ে একমত যে প্রতিবাদ চলবে নিরবিচ্ছিন্নভাবে এবং নানা ভাবে। ব্লগারদের পক্ষ থেকে আগামির কর্মসূচী নিয়ে বেশ কিছু প্রস্তাবনা আসে। প্রতীকী প্রতিবাদের অংশ হিসেবে তিনটি উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবনা হচ্ছে –

১। আগামি ১৫ এপ্রিল, সকাল ১১:০০টা থেকে দুপুর ১:০০টা পর্যন্ত ’ব্লগ বিরতী’ অর্থ্যাৎ ‘ব্লগ ব্ল্যাকআউট’ পালিত হবে। এই দু’ঘন্টা ব্লগের ইউআরএল (blog.bdnews24.com) ব্রাউজ করলে এর নিয়মিত পাতার বদলে একটি বিশেষ পাতা পাওয়া যাবে – যা হবে সম্পূর্ণ কালো ব্যানার। অর্থ্যাৎ পুরো ব্লগ সাইট কালো হয়ে যাবে। এই কালো ব্যানারের মাঝে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে ব্লগারদের প্রতিবাদলিপি থাকবে।

২। ১৬ এপ্রিল থেকে ৫ মে পর্যন্ত ব্লগের হোমপাতা বা ইউআরএল ব্রাউজ করা মাত্র একটি ভাসমান ব্যানার আসবে প্রতিবাদলিপি/বক্তব্য সহকারে। এই ব্যানারটি একজন ব্লগার/ভিজিটর চাইলে বন্ধ করে দিতে পারেন এবং স্বাভাবিক ভাবে ব্লগ ব্রাউজ করতে পারেন।

৩। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ও সাগর-রুনি স্মরণে একটি চিত্র প্রদর্শনী আয়োজন করা হবে। ইতিমধ্যে ব্লগে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত প্রতিক্রিয়ামূলক পোস্ট ও মন্তব্য প্রকাশিত হয়েছে অসংখ্য-অগুনতি। ব্লগারদের এই সকল প্রতিক্রিয়া থেকে বাছাইকৃত কিছু বক্তব্য বা বক্তব্যের অংশ বিশেষ যুক্ত করা হবে চিত্র প্রদর্শনীতে।

BloggersInProtest2

 ছবি ক্যাপশন: ব্লগার আরিফ হোসেন সাঈদ এবং ব্লগার সোহেল মাহমুদ

১ নং ও ২ নং বিষয়ে ইতিমধ্যে ব্লগ টিমকে জানানো হয়েছে এবং তাদের সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাসও পাওয়া গেছে। তবে ১ নং, ২ নং ও ৩ নং প্রস্তাবনায় ব্লগারদের আরো কিছু করণীয় আছে।

১। ’ব্লগ বিরতী’ বা ’ব্লগ ব্ল্যাকআউট‘ ব্যানারের জন্য এক/দুই লাইনের বস্তুনিষ্ঠ বক্তব্য/প্রতিবাদ লিপি জানানোর জন্য ব্লগারদের অনুরোধ করা হচ্ছে। অনুগ্রহ করে মন্তব্য ঘরে, আপনার প্রস্তাবিত বক্তব্যটি জানান দিন।

২(ক)। ছবি প্রদর্শনী কবে-কখন হচ্ছে এ সম্পর্কিত আপডেট জানা যাবে ব্লগার আবু সুফিয়ানের কাছ থেকে।

২(খ)। তবে তার পূর্বে প্রতিক্রিয়া মূলক বক্তব্য/মন্তব্য বাছাই করতে ব্লগারদের সহযোগিতা প্রয়োজন। বাছাই কাজে ব্লগার মঞ্জুর মোর্শেদ ও ব্লগার জাগো বাহে জাগো -কে সহযোগিতা করার অনুরোধ করছি। সর্বশেষ পোস্ট পাতায় সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত ব্লগ পোস্টগুলোর সংকলন লিংক নিয়ে একটি ব্যানার আছে। আশা করা যায়, এই লিংক থেকে বাছাই করণ প্রক্রিয়াটি কিছুটা সহজসাধ্য হবে। এখন পর্যন্ত অনেকগুলো পোস্টই সংকলিত হয়েছে। যেসব পোস্ট এখনো লিংকে নেই, সেগুলোকেও সংকলিত করতে ব্লগ টিমের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারি আমরা।

২(গ)। বাছাইকরণ শেষে, অর্থ্যাৎ দ্বিতীয় ধাপে বাছাইকৃত বা নির্বাচিত প্রতিক্রিয়া/মন্তব্যগুলো (ব্লগার নাম সহকারে) প্রিন্ট আউট ও লেমিনেশন করতে হবে। অত:পর ছবি প্রদর্শনীর সাথে এর সমন্বয় করতে হবে। এই অংশে ব্লগার সোহেল মাহমুদকে দ্বায়িত্ব নেবার অনুরোধ জানাচ্ছি। প্রিন্ট আউট ও লেমিনেশন বিষয়ে কিছু অর্থ খরচ হবে, যা আমরা জনা কয়েক ব্লগার মিলে ভাগ করে নিতে পারব বলে আশা রাখি।

BloggersInProtest3

ছবি ক্যাপশন: সমাবেশ ও আলোচনা শেষে …

সহজ হিসেব মতে, এখন একটা উপসংহার টানার কথা। কিন্তু এখন মুলত শুরু … … …। তবে আমরা ব্লগাররা, আমরা নাগরিকেরা আশাবাদী আমরা একটা উপসংহারের দিকে যাচ্ছি। যাব। আমরা বিভিন্ন বয়সের, পেশার মানুষেরা একত্রিত হচ্ছি একটি সুস্থ, স্বাভাবিক, নিরাপদ রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে নিজেকে উপলব্ধি করার জন্য। নিরপরাধ মানুষদের হত্যার দায়ে হত্যাকারীদের বিচার করে রাষ্ট্রই আমাদের সে উপলব্ধিকে সংরক্ষন করবে, এটাই ব্লগারদের প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশায় ব্লগাররা অনঢ় ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ কারণে প্রতিবাদের মঞ্চে ব্লগারদের দেখা যাবে আগামিতেও …

***
> সমাবেশের ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড তৈরীর কাজটি অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সাথে সম্পন্ন করেছেন ব্লগার সোহেল মাহমুদ ও ব্লগার রাফে সাদনান আদেল
> ইউটিউব ভিডিও ব্লগার নাহুয়াল মিথ কর্তৃক ধারণ ও আপলোডকৃত
> পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা: সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্লগার সমাবেশ, ভিডিও পডকাস্ট, ব্লগার আরিফ হোসেন সাঈদ
> ‘চা খাওয়ালেও’ চুপ হবে না ব্লগাররা , www.bdnews24.com
> ‘No tea can silence us’ , www.bdnews24.com
> সাগর-রুনির খুনির গ্রেপ্তারের দাবিতে রাজপথে ব্লগাররা, http://www.dw.de