ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

20110314-7march1-630

পরিপ্রেক্ষিতঃ
১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ছয় দফা দাবী পেশ করে, যেখানে সুনির্দিষ্ট করে স্বাধীনতার কথা উল্লেখ না থাকলেও এই ছয় দফা প্রস্তাবনার মূল উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীনতার দাবিকে প্রতিষ্টিত করা। পাকিস্তান সরকার কর্তৃক ছয় দফা প্রত্যাখ্যাত হয় এবং আইয়ুব-মোনায়েম গং সহিংসতার পথকেই বেছে নেয়। শুরু হয় ধরপাকড়। এই পর্যায়ে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার কর্মীরা গ্রেফতার হন। শেখ মুজিব, তাজউদ্দীন আহমদও বন্দি হন। পাকিস্তানের সামরিক শাসকেরা শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রবিরোধী আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামী করে তাকে ফাঁসিতে ঝুলানোর চক্রান্ত বাস্তবায়নে উদ্যোগী হয়। কিন্তু উনসত্তরের সেই গণআন্দোলনে ছাত্র-জনতার ক্রমবর্ধমান রোষের মুখে মামলা খারিজ হয় এবং ২২শে ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব মুক্তি লাভ করেন। ২৩শে ফেব্রুয়ারি বৃহত্তম জনসমাবেশে শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেয়া হয়। জেনারেল আইয়ুবের পতনে ক্ষমতার রদবদলে রাষ্ট্রপরিচালনায় আসে জেনারেল ইয়াহিয়া খান।

পরিস্থিতি আরো শ্বাসরূদ্ধকর হয়ে ওঠে যখন সত্তরের জাতীয় নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা পায়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একক সরকার গঠনের সাংবিধানিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করেন জুলফিকার আলী ভুট্টো, পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা, প্রস্তাব করেন পাকিস্তানের দু’ভাগে দু’জন প্রধানমন্ত্রী পদ্ধতির। শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফাও নামঞ্জুর করেন ভুট্টো।

.. .. .. A conspiracy has been going on against the people of Bangladesh by the bureaucrats, the vested interest, the ruling cliques and coterie for the last 22 years. If they are playing their old games now, they should know that they were playing with fire.” (Press conference by Sheikh Mujib, 26th November, 1970, APP)

ভাষণের প্রস্তুতিঃ
দেশের ভাগ্য নির্ধারণে তৎকালীণ প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩রা মার্চ অধিবেশন আহ্বান করেন । কিন্তু আকষ্মিকভাবে ১লা মার্চ এই অধিবেশণ মূলতবি করে সেনাপতি আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে হাত দিলেন যেন। পাকিস্তানি জে. রাও ফরমান আলী পরবর্তীকালে তার গ্রন্থে লিখেছেন, “ইয়াহিয়ার ঘোষণার পর সমগ্র বাঙালি জাতিই এবার যুদ্ধের পথে নেমে গিয়েছিল। আমার মনে কেন সন্দেহ নেই, অধিবেশন মুলতবি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানের ভাঙন ঘটেছিল।” ছাত্র-জনতা ছুটে গিয়েছিল সেদিন শেখ মুজিবের কাছে। হোটেল পূর্বাণীতে ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়ে সহকর্মীদের সাথে আলোচনারত বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিকভাবে জণাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে ঘোষনা করেন,”লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে। জনতার শোষণ মুক্তিই আমাদের লক্ষ্য। আমরা এই চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করবই। আগামী ৭ই মার্চ পর্যন্ত সমগ্র পূর্ব বাংলায় প্রত্যেকদিন বেলা দু’টো পর্যন্ত হরতাল অব্যাহত থাকবে। আর এর মধ্যে ষড়যন্ত্রকারীরা যদি বাস্তব অবস্থাকে স্বীকার করতে ব্যর্থ হয় তাহলে ৭ই মার্চে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হবে।” (একাত্তরের রণাঙ্গন, শামসুল হুদা চৌধুরী, আহমেদ পাবলিশিং হাউজ, ঢাকা, ১৯৮৪) বঙ্গবন্ধুর প্রতি আস্থাশীল বাঙালির মনোবল প্রবল দৃঢ়তায় গর্জে ওঠে, “পরিষদে লাথি মার/বাংলাদেশ মুক্ত কর।”

শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ২রা মার্চ ঢাকায় এবং ৩রা মার্চ সারাদেশে একযোগে হরতাল পালিত হয়। ২ মার্চ সেনাবাহিনীর গুলিতে বেশ কিছু মানুষ হতাহত হয়। হত্যার জবাবে বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “মনে রাখবেন, ৭ কোটি মানুষকে গুলি করে মারা যাবে না। আর যদি মারেন, তাহলে আমরাও মারবো।” তিনি ৩রা মার্চ পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত এক বিশাল জনসভায় সমগ্র পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। পল্টনের এই সভায় কবিগুরুর ’আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ গানটিকে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ঘোষনা করা হয়। ৪ঠা মার্চ বঙ্গবন্ধু জাতিকে সার্বিকরূপে প্রস্তুতি গ্রহণে বলেন, “চরম ত্যাগ স্বীকার ছাড়া কোনদিন কোন জাতির মুক্তি আসেনি।”

৭ই মার্চের ভাষণ পূর্ব আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াঃ
একাত্তরের মার্চকে এমনি এমনিই আর উত্তাল বলা হয়না, বিশেষত ৭ই মার্চকে ঘিরে একদিকে বাঙালি টগবগে অন্যদিকে পাকিস্তানি শাসকের বাড়ন্ত ভয়ভীতি, উৎকন্ঠা। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনও ৭ই মার্চকে তাদের পর্যবেক্ষণে রেখেছিল। ৫ই মার্চ ঢাকা থেকে দি টাইমস এর সংবাদতদাতা পল মার্টিন এক সংবাদে শেখ মুজিবুর রহমানকে বিদ্রোহী বাংলার শাসক হিসেবেই উল্লেখ করেন। ৬ মার্চ লন্ডনের দি টাইমস এর সম্পাদকীয় মন্তব্যে বলা হয়, “প্রতিবাদমুখর পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কচ্যুত হওয়ার দাবি ঘণ্টায় ঘণ্টায় তীব্রতর হচ্ছে।” ৬ই মার্চ করাচি থেকে পিটার হ্যাজেলহার্স্ট এক রিপোর্টে জানান, “পূর্ব পাকিস্তানের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে। ৭ মার্চ তিনি একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারেন অথবা সংসদ ডেকে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের যোগদানের আমন্ত্রণ জানাতে পারেন।” (দি সানডে টাইমস, ৭.৩.১৯৭১)। এমনকি ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে ওয়াশিংটনে ৬ই মার্চ আপাল-আলোচনায় ব্যতিব্যস্ত ছিলেন কিসিঞ্জার গং। সাংবাদিক মিজানুর রহমান খানের ২০০৮ সালে প্রকাশিত ’১৯৭১: আমেরিকার গোপন দলিল’ বইটির ১৩৩ পৃষ্ঠায় ’৭ই মার্চের ভাষণ শুনতে ওয়াশিংটনের রূদ্ধশ্বাস অপেক্ষা’ অংশে বলা হয়েছে,”মুজিবের সভার এক দিন আগে ৬ই মার্চ ওয়াশিংটন সময় ১১টা ৪০ মিনিটে শুরু হওয়া বৈঠকে কিসিঞ্জার স্টেট ডিপার্টমেন্টের পদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে বাঙালি নেতার সম্ভ্যাব্য ভাষণ নিয়ে প্রায় ৪০ মিনিট আলোচনা করেন। কিসিঞ্জারের সভাপতিত্বে উচ্চ পর্যায়ের ওই বৈঠকে শেখ মুজিব ভাষণে কী বলবেন, স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন কি না, তিনি যদি আমেরিকার সহায়তা চান, তখন তারা কী করবেন এসব নিয়ে আলোচনা হয়।” বইটির এই অংশে উক্ত বৈঠকে উপস্থিত ক্রিস্টোফার হোলেনের বক্তব্য তুলে ধরা হয়, “আগামীকাল মুজিবেব সামনে সম্ভবত তিনটি বিকল্প পথ খোলা । এক. একতরফাভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা, দুই. এর চেয়ে কম কিছু সম্ভবত দু’টি সংবিধার প্রণয়নের দাবি জানান, তিন. ২৫শে মার্চ ইয়াহিয়া আহৃত অধিবেশনে যোগ দিতে রাজি হওয়া।” ৭ই মার্চ সকালে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ড ধানমন্ডির ৩২ নম্ভব বাসভবনে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করে তাকে সেদিনের জনসভায় স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানান।

অবশেষে রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চঃ
৭ই মার্চের প্রস্তুতিতে বাঙালির মধ্যে উৎসবের আমেজও ছিল, সাথে টান টান উত্তেজনা। জনসভা সফলের জন্য কারো অনুমতির তোয়াক্কা না করেই পাড়ায় পাড়ায় অলিগলিতে চলেছে মিছিল। সবাই জানতো সেদিন রেসকোর্স ময়দানে তিল ধারণের জায়গা হবে না। তাই সকাল থেকেই মানুষের ঢল নামে। গন্তব্য রেসকোর্স ময়দান। দুপুর দুটোর মধ্যেই জনসভার মাঠ লোকে-লোকারণ্য হয়ে যায়। তাজউদ্দীন আহমদ উপস্থিত জনস্রোতকে নিয়ন্ত্রণের জন্য বারবার মাইকে সবাইকে ধৈর্য্য ধারনের অনুরোধ জানান। শেখ মুজিব ছাড়া অন্য কোন নেতাই সেদিন কোন বক্তৃতা প্রদান করেননি। অবশেষে পাকবাহিনীর তাক করা আগ্নেয়াস্ত্রকে তাচ্ছিল্য করে প্রায় ১০ লাখ মানুষের মাঝে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯ মিনিটে রচনা করেছিলেন এক মহাকাব্য – ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ।

৭ই মার্চের ভাষণ পরবর্তী প্রতিক্রিয়াঃ
প্রবীণ সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবিএম মূসা লিখেছেন,

প্রকৃতপক্ষে ৭ মার্চের ভাষণের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি চরণ নিয়ে একটি আলাদা প্রবন্ধ লেখা যেতে পারে।” তিনি আরও বলেছেন, “৭ মার্চের আগেই আমরা স্বাধীন হয়ে গিয়েছিলাম, যখন থেকে ঘরে ঘরে স্বাধীন বাংলার সবুজ-লালের মধ্যে মানচিত্র আঁকা পতাকা উড়ছিল, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে যখন সরকার চলছিল, অফিস-আদালত ও ব্যবসা, কল-কারখানায় কাজ চলছিল।

বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী সরদার সিরাজুল ইসলাম, ৭ মার্চের ভাষণকে ‘মহাকাব্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন,

৭ মার্চ থেকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘটল এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটল ।

পাকিস্তানি সামরিক চিন্তাবিদ জেনারেল কামাল মতিনউদ্দীন তার ‘দ্য ট্র্যাজেডি অফ এরর’ গ্রন্থে লিখেছেন, “যে কোন দিক থেকেই ৭ মার্চ ছিল মুজিবের দিন। তার কণ্ঠে ছিল প্রচণ্ড আবেগ। পুরো পরিস্থিতি ছিল তার নিয়ন্ত্রণে। তার কণ্ঠের দৃঢ়তায় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া পাওয়া গিয়েছিল। তার পুরো বক্তব্যে এতটাই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল, মনে হয় সেদিন গাছ-পাথরও আন্দোলিত হয়েছিল। জনগণের প্রাণচাঞ্চল্য ছিল উদ্দীপনাময়।” (পৃষ্ঠা ১৯০)। এরপর তিনি বলেন,

প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১-এর ৭ই মার্চেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যায়।

অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ শেখ সাহেবের কর্মসূচীর প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করে মন্তব্য করেছিলেন,

আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান যে শর্তাবলী আরোপ করিয়াছেন তাহা নিম্নতম ও ন্যায় সঙ্গত। (ইত্তেফাক, ৯-৩-৭১)

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং ইতিহাসবিদ ড. এ. আর মল্লিক লিখেছেন,

আমার মনে হয়, ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বাঙালির ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। .. .. ৭ই মার্চের ভাষণ বেতার (পরদিন) মারফত চট্টগ্রামে থেকেই আমাদের শোনার সুযোগ হয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি সংগ্রামে যোগ দেবার সিদ্ধান্ত নেই ঐ দিনই। (আমার জীবন কথা ও বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম, এ. আর. মল্লিক, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা, ১৯৯৫)

শিক্ষাবিদ ড. আনিসুজ্জামান ৭ই মার্চের অনুভুতির কথা এভাবে মনে রেখেছেন,

.. .. ৭ই মার্চের বক্তৃতা .. শুনতে পেলাম ৮ই মার্চে। কী অসাধারণ ভাষণ ! সর্বশরীর রোমাঞ্চিত হয়। বঙ্গবন্ধু যখন বললেন, ’এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’, তখনই মনে হলো, পৃথিবীর বুকে একটি নতুন জাতির জন্ম হলো .. ..। (আমার একাত্তর, আনিসুজ্জামান, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা, ১৯৯৭)

চট্টগ্রামস্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ইউনিটের সেকেন্ড ইন কমান্ড, মেজর জিয়াউর রহমানের এ প্রসঙ্গে একটি উক্তি উল্লেখেযাগ্য,

৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা আমাদের কাছে এক গ্রীন সিগন্যাল বলে মনে হল। আমরা আমাদের পরিকল্পনাকে চুড়ান্ত রূপ দিলাম। কিন্তু তৃতীয় কোন ব্যক্তিকে তা জানালাম না। .. .. .. (একটি জাতির জন্ম, দৈনিক বাংলা, ২৬শে মার্চ, ১৯৭২, পুনর্মুদ্রিত সাপ্তাহিক বিচিত্রা, স্বাধীনতা সংখ্যা, ১৯৭৪)।

৭ই মার্চের ভাষণ বিশ্লেষণঃ
কিছুদিন ধরে টেলিভীষনে মীর শওকত আলী’র সাক্ষ্যাৎকার ঘুরে ফিরে বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন চ্যানেলে আসছিল। প্রসংগ ছিল স্বাধীনতার ঘোষক বিতর্ক। সেই আলোচনাতেই মীর শওকত বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মূল রূপরেখাগুলো তুলে ধরেন তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে।

বঙ্গবন্ধুর সেই প্রতাপশালী ভাষণের কিছু অতি পরিচিত কিছু অংশে আলোকপাত করা যায় এভাবে-

“এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”
– এর অর্থ আমাদের লক্ষ্য কিন্তু নির্ধারিত হয়ে গেছে এবং এতে জনগণও সম্পৃক্ত হয়ে গেছে পূর্ণ সমর্থনে এবং আমরা যে স্বাধীন জাতিস্বত্ত্বা কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নিতে চাই তার সুষ্পষ্ট ঘোষনা দেয়া হচ্ছে।

“ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলো…তোমাদের যার যা আছে তা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ো “
– আমাদের লক্ষ্য ইতিমধ্যে নির্ধারিত। সংগ্রাম/যুদ্ধের আহ্বান হয়ে গেছে। এবার যুদ্ধের প্রস্তুতি, কৌশল কিভাবে হবে তার নির্দেশনা বহন করছে এই উক্তি।

“আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি ….”
– এ হলো চূড়ান্ত আদেশ। যদি বঙ্গবন্ধু আবারো যুদ্ধের আহ্বান করতে অসমর্থ হন, তবুও বাঙালি যেন এই সংগ্রাম অটুট রাখে।

বিশেষজ্ঞরা ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মূল সুরগুলোকে বয়ান করেন এভাবে –
• সামগ্রিক পরিস্থিতির পর্যালোচনা ;
• নিজ ভূমিকা ও অবস্থান ব্যাখ্যা ;
• পশ্চিম পাকিস্তানী রাজনীতিকদের ভূমিকার ওপর আলোকপাত ;
• সামরিক আইন প্রত্যাহারের আহবান ;
• অত্যাচার ও সামরিক আগ্রসন মোকাবিলার হুমকি ;
• দাবী আদায় না-হওয়া পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে সার্বিক হরতাল চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা ;

জিয়ে পাকিস্তান নাকি জয় পাকিস্তান নাকি পাকিস্তান জিন্দাবাদঃ
যে গতানুগতিক ভাষণটি আজ ৩৯ বছর ধরে আমরা শুনে আসছি, তার সর্বশেষে শেখ মুজিবের বজ্রকন্ঠে ধ্বনিত হয় ’জয় বাংলা’ । একটা বিতর্ক সময় সময় চাগিয়ে ওঠে যে, বঙ্গবন্ধু জয় বাংলার পর বলেছিলেন ’জয় পাকিস্তান’। এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান প্রায় সমান সমান। খুবই মজার হলো এই পক্ষ-বিপক্ষের মতামতগুলো গড়ে উঠেছে, সেই ৭১ সালে যারা বিচরণ করতেন তাদের কর্তৃকই। এখানে আরো একটি মজার খেলা আছে, আমাদের স্বাধীনতার বিরোধীতা করে শেখ মুজিবের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চান তারা সুযোগ বুঝে শেখ মুজিবের ’জিয়ে পাকিস্তান’ জিকির তুলে চুপ মেরে যান। কিন্তু প্রমাণ হিসেবে তাদের পক্ষ থেকে এখনো কোন অডিও/ভিডিও রেকর্ড পেশ করা সম্ভব হয়নি এই ৩৯ বছরেও। তবে অনেক প্রাজ্ঞজনের বক্তব্য থেকে আংশিক কথা তুলে এনে প্রমাণের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে যে শেখ মুজিব ’জিয়ে পাকিস্তান’ বলেছিলেন। তৃতীয় মজার ক্ষেত্রটি হচ্ছে, কেউ কেউ বলেন বঙ্গবন্ধু জিয়ে পাকিস্তান বলেছেন, কেউ বলেন জয় পাকিস্তান বলেছেন এবং কেউ বলেন পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলেছেন। তিনটি স্লোগান অর্থগত দিক দিয়ে একই হলেও এখানে তথ্যগত বিভ্রান্তি ঘটছে তাতে কোনই সন্দেহ নেই।

সাবেক প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমানের লেখা ‘বাংলাদেশের তারিখ’ (প্রথম সংস্করণ) নামক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘জয় বাংলা, জিয়ে পাকিস্তান’ বলে ৭ মার্চের ভাষণ শেষ করেন। এরপর অনেকের পুরনো স্মৃতিরোমন্থনে কিংবা মুখ থেকে মুখেতে শব্দ বিভ্রাট ঘটতে ঘটতে জিয়ে পাকিস্তান হয়ে গেল জয় পাকিস্তান কিংবা পাকিস্তান জিন্দাবাদ।

যারা শুনেছিলেন বলে দাবি করেন, তারা কী বলেন, তারা কী ভাবেনঃ
’জিয়ে’ শব্দটি মূলত সিন্ধিভাষীরা ব্যবহার করে। এর অর্থ বেঁচে থাকুক বা জয় হোক। ষাটের দশকের শেষ দিকে ও সত্তর দশকের শুরুতে তৎকালীন পাকিস্তানের সিন্ধু অঞ্চলে (বর্তমানে সিন্ধু প্রদেশ) পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনের অনুকরণে জিয়ে সিন্ধ নামে আন্দোলন শুরু করেছিলেন এক নেতা (সম্ভবত জনাব জিএম সৈয়দ)। ৭ই মার্চে যারা বঙ্গবন্ধুকে জিয়ে পাকিস্তান বলতে শুনেছিলেন বলে দাবি জানান তাদের কেউ কেউ এটাই ভেবেছিলেন বঙ্গবন্ধু পক্ষান্তরে কৌশলে সিন্ধি আন্দোলনের প্রতি তাঁর সমর্থন জানিয়েছিলেন । এ প্রসংগে কেউ কেউ বলেন যে, হাবিবুর রহমান কোন এক আলোচনাতে সম্ভবত ব্যক্ত করেছিলেন, জিয়ে পাকিস্তান বলে বঙ্গবন্ধু মূলত পাকিস্তানের প্রতি শেষবারের মত শুভেচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন।

সাংবাদিক নির্মল সেনের ‘তবে একথা সত্য, শেখ সাহেব ৭ মার্চের বক্তব্যের শেষদিকে বলেছিলেন, জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান’ বক্তব্যকে ব্যবহার করতেও ছাড়েন না সন্দেহভাজনরা। কিন্তু নির্মল সেনের পরবর্তী ব্যাখ্যাগুলোকে আড়ালে-আবডালে রাখা হয়। কী ছিল নির্মল সেনের সেই ব্যাখ্যা? নির্মল সেন বলেছিলেন-

…অধিকাংশ লোকের বিশ্বাস আমি মিথ্যা বলেছি। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমার স্মৃতি আমাকে বিভ্রান্ত করেনি। এবং আমার মতে, সেদিন জয় পাকিস্তান বলে শেখ সাহেব সঠিক কাজ করেছিলেন। একজন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে আমি একটি ভিন্ন কথা শুনেছি। বিশেষ করে বামপন্থী মহল এটা বলেছে। তারা সমালোচনা করেছে, শেখ সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা দিলেন না কেন? আবার একই মুখে বলেছেন শেখ সাহেব বুর্জোয়া নেতা। তিনি কিছুতেই স্বাধীনতা ঘোষণা দিতে পারেন না। আমার মত হচ্ছে, জয় পাকিস্তান না বলে কোনো উপায় ছিল না। তখনো আলোচনা শেষ হয়নি। ক’দিন পর ইয়াহিয়াদের সঙ্গে আলোচনা করার কথা। একটি লোকও স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত নয়। সেদিন যদি জয় পাকিস্তান না বলে শুধু ‘জয় বাংলা’ বলতেন এবং স্বাধীনতার ঘোষণা দিতেন তাহলে ইয়াহিয়া বাহিনী মারমুখী আক্রমণ করত। লাখ লাখ লোক প্রাণ হারাতো। তখন এই মহলটিই বলত জনতাকে কোনো প্রস্তুত না করে এ ধরনের স্বাধীনতা ঘোষণা বালখিল্যতা। এ জন্যই অসংখ্য লোকের প্রাণহানি হয়েছে এবং এর জন্যই শেখ মুজিবের বিচার হওয়া উচিত।…

নির্মল সেনের মধ্যে হয়ত আরো খানিক ইতঃস্ততা কাজ করছিল, তাই তিনি এ ব্যাপারে সরাসরিই বঙ্গবন্ধুর সাথে কথা বলেন। নির্মল সেনের ভাষ্যমতে বঙ্গবন্ধু সেদিন তাঁকে জানিয়েছিলেন,

…আমাকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে হলে অনেক পথ অতিত্রক্রম করতে হবে। ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারকে শেষ কথা বলতে হবে। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে ভুট্টো। তার সঙ্গেও কথা বলতে হবে। আমি এই আলোচনা শেষ না করে কিছু করলে পৃথিবীতে আমি জবাবদিহি করতে পারব না। আমি এখন ভালো অবস্থানে আছি। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হয়েও আমাকে ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে না। … আমাকে আমাদের সেনাবাহিনী ও সরকারের কর্মচারীদের সঙ্গে আলাপ করতে হবে। সেই আলাপ এখনো শেষ হয়নি। সবদিকে এত অপ্রস্তুত রেখে একটি দেশকে আমি সংগ্রামের মুখে ঠেলে দিতে পারি না। আপনি কি বোঝেন না ওইদিন চারদিকে শত্রু বেষ্টিত অবস্থায় আমার অন্য কিছু বলার ছিল না…।

এরপর নির্মল সেনের নিজের বক্তব্য ছিল, এরপরও যদি বলা হয় যে শেখ সাহেব ভুল করেছেন তো ওই ভুলটুকু না করলে ২৫শে মার্চের চেয়ে ৭ই মার্চেই অধিক সংখ্যক লোক মারা পড়ত।

যারা শোনেননি বলে নিশ্চিত করেন, তারা কী বলেন, তারা কী ভাবেনঃ

এই প্রসংগেই এক ব্লগে মন্তব্য আকারে একজন জানান যে, তার সাথে আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর ফোনালাপ হয় এবং সেই আলাপে এই প্রপাগান্ডাটি যে স্ববিরোধী তা বলতে গিয়ে আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী পরিস্কার জানিয়েছেন, প্রথমত বঙ্গবন্ধু এধরনের কিছু একদমই বলেননি, এবং দ্বিতীয়ত যদি ধরেই নিতে হয় যে বঙ্গবন্ধু এমন কিছু বলেছিলেন তাহলে তিনি “জিয়ে পাকিস্তান’ না বলে “জয় পাকিস্তান” বলতেন। আরো একজন ব্লগার বলেছিলেন যে, তার বাবা সেই ভাষণের সরাসরি রেকর্ড করেছিলেন, ফলে সেই রেকর্ড শুনতে শুনতেই তিনি বড় হয়েছেন, এবং সেই রেকর্ড “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” জাতীয় কোন স্লোগান তিনি শোনেননি। একজন জানিয়েছিলেন, তিনি অনেক পুরনো একটি ভিএইচএস -এ এই ভাষণ দেখেছিলেন,শুনেছিলেন। এবং জয় বাংলা বলার পর বঙ্গবন্ধু মাইক্রোফোনের সামনে থেকে সরে যান।

শফিক আহমেদ নামে একজন একটি মন্তব্যে জানিয়েছিলেন যে, এর পূর্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে, ১৫ই অগাষ্টে বিটিভিতে প্রচারিত অনুষ্ঠানগুলো তার সংগ্রহে রেকর্ড করা রয়েছে। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের সম্পূর্ণ ভাষণটি রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তিনি জানান, আমরা যে গতানুগতিক অংশটি পর্যন্ত জানি, অর্থ্যাৎ “….এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা” এরপর সামান্য বিরতীতে শেখ মুজিব মঞ্চে আবারো ফিরে আসেন। (তারমানে জয় বাংলার পর জয় পাকিস্তান/জিয়ে পাকিস্তান/পাকিস্তান জিন্দাবাদ জাতীয় কোন স্লোগানের অস্তিত্ব তখন পর্যন্ত নেই)এবং ডায়াসের সামনে থেকে এগিয়ে মঞ্চের সামনে চলে আসেন। সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি আরো কিছু আবেগঘন কথা বলেন …যা অনেকটা এরকম –

আপনাদের সাথে কোনদিন বেঈমানি করিনাই…আমাকে জেল দিয়ে, ফাঁসি দিয়েও ভুলাতে পারে নাই…এই রেসকোর্সেই আপনারা আমাকে একদিন মুক্ত করে এনেছিলেন, সেদিন বলেছিলাম, জীবন দিয়ে হলেও আমি আপনাদের বিশ্বাসের মর্যাদা রাখবো, আমি জীবন দিতে প্রস্তুত” ………….. এরপর বঙ্গবন্ধু ভাষণের সমাপ্তি টানেন এইভাবে -“আমাদের সভা এইখানে সমাপ্ত, আসসালামু আলাইকুম”

প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক অধ্যাপক ডঃ অজয় রায় তার একটি রচনাতে জানান যে, তিনি ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত ছিলেন কিন্তু জয় পাকিস্তান জাতীয় কোন বাক্য তিনি সেদিনের ভাষণে শোনেননি। তিনি আরো যোগ করেন, ৮ই মার্চ ঢাকাসহ বাংলার সকল বেতার কেন্দ্রে ৭ই মার্চের ভাষণটি বারবার প্রচারিত হতে থাকে যেখানে এই বাক্যটি সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত ছিল। ডঃ অজয় রায়ের মতে রেডিও তে প্রচারিত ওই ভাষণটিই এখন পর্যন্ত সবচাইতে প্রামাণিক। এছাড়াও ডঃ অজয় রায় উল্লেখ করেন যে, ৭ই মার্চের ভাষণের পরের দিন অর্থ্যাৎ ৮ই মার্চ দৈনিক পাকিস্তান, ইত্তেফাক, পাকিস্তান অবজারভার, দি পিপল পত্রিকাগুলোতে কোথাও জয় পাকিস্তান নিয়ে কোন ধরনের তথ্য ছাপা হয়নি।

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ কি কোন প্রেক্ষাপটেই ম্লান হয় আদৌ?
যারা খুব সূক্ষ্ণভাবে জিয়ে পাকিস্তান প্রসংগটি টেনে আনেন তাদের মধ্যে অনেকে আবার এক কাঠি সরেস হয়ে বঙ্গবন্ধুকে রাজাকার বলে বসেন! বঙ্গবন্ধু রাজাকার হলে সেসময় পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাকে নিয়ে তটস্থ থাকতো না। কিংবা গোলাম আযম, নিজামীরা যারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সমর্থন দিয়েছিল তারা তখন শেখ মুজিবকে বুকে টেনে নিতে দেরী করতো না।

জিয়ে পাকিস্তান বলা অথবা না বলা নিয়ে তর্কের উগ্র পর্যায়ে খেয়াল রাখুন, সেদিন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি শব্দ একই সাথে ধ্বনিত হচ্ছিল উপস্থিত জনতার মাঝেও। ফলে সেদিন, সেসময় উত্তাল জনতা যদি বঙ্গবন্ধুর প্রতি কোনরূপ বিরূপ মনোভাব পোষণ না করে তাঁর নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে পালনে সাড়া প্রদান অব্যাহত রাখে, তাহলে যে সন্দেহের আঙ্গুল বঙ্গবন্ধুর দিকে তোলা হচ্ছে, সে সন্দেহের আঙ্গুল তো উপস্থিত জনতার দিকেও তোলা উচিৎ। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই আশা করা যায় যে, এই বোকামিটুকু করার মত ধৃষ্টতা আমরা কেউ দেখাবো না।

কেউ কেউ দাবি করেন, স্বাধীনতার পর সমস্ত রেকর্ড থেকে জিয়ে পাকিস্তান মুছে ফেলা হয়েছে। যে রেকর্ডগুলো মুছে ফেলা হয়েছে, সেগুলো নিশ্চিতভাবে সরকারি আর্কাইভে থাকা রেকর্ড। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধচলাকালীন সময় তো এই ভাষণ শুনে শুনেই জনতা অনুপ্রাণিত হয়েছিল, অনেকের কাছেই সেই ভাষণের সংগ্রহ থাকার কথা। এগুলো খুঁজে খুঁজে তো মুছে ফেলা সম্ভব হওয়ার কথা নয়।

যেসব প্রত্যক্ষদর্শীরা জিয়ে পাকিস্তান এর উচ্চারণরণকে নিশ্চিত করেন তারা কিন্তু বঙ্গবন্ধুর প্রতি বীতশ্রদ্ধতা দেখানোর মত সাহস করেননি, বরং এর যৌক্তিকতা, প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষাপটকেই পরবর্তীতে পরিস্কার করেছেন, এবং সেই অংশটিই অনেক সুবিধাবাদিরা এড়িয়ে যান সন্তর্পনে।

বঙ্গবন্ধুর সব সিদ্ধান্তই সঠিক, তিনি সব ক্ষেত্রেই দূরদর্শী ছিলেন তা নয়। তিনি নেতা হিসেবে যতটা সফল ছিলেন, শাসক হিসেবে ততটা বলিষ্ঠ ছিলেনা না অনেকক্ষেত্রেই। বস্তুত দুনিয়ায় আলোচিত কোন নেতাই এমন ভুলক্রটির উর্ধ্বে ছিলেননা কখনই। ফলে সব কথার শেষ কথা এই যে, জিয়ে পাকিস্তান বলা , না বলাতে বঙ্গবন্ধুর আন্তরিক ভূমিকাকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই, তেমনি ৭ই মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণও এতো কিছুর পর কোন ভাবেই ম্লান হয়ে যায় না।

 

***

বঙ্গবন্ধু ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছিলেন!