ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

বাংলাদেশের ইলিশ সম্পদের উন্নয়নে ব্যপকভিত্তিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রণয়নের জন্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মৎস্য অধিদপ্তর নি:সন্দেহে ধন্যবাদার্হ। জলজ সম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ রক্ষা কার্যক্রম একটি অনুসরণীয় প্রকল্প। ভরা প্রজনন মৌসুমে ১১ দিনের পরিবর্তে ১৫ দিন এবং এবছর থেকে ২২ দিন মাছ ধরার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ফলে স্বভাবতই মা মাছ আরও নির্বিঘ্নে প্রজনন করতে পারবে। ধন্যবাদ জানাই সংশ্লিষ্টদেরকে, গত বছর অক্টোবরে প্রথম আলোতে প্রকাশিত ইলিশের প্রজনন ঋতু নির্ধারণ বিষয়ে আমার লেখাটি আমলে নিয়ে অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে শেষ পর্যন্ত মাছ ধরা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত বস্তবায়নের জন্য।

এক দশক আগের দুই লক্ষ মেট্রিক টন থেকে গত বছরের চার লক্ষ কিংবা এই বছরের পাঁচ লক্ষ মেট্রিক টনেরও অধিক (আনুমানিক) ইলিশ উৎপাদন দক্ষ ব্যবস্থাপনা ছাড়া কিছুতেই সম্ভব হতোনা। বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবছরে ইলিশের উৎপাদন অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে মনে হতেই পারে আগামী বছরে ইলিশের উৎপাদন আরও বাড়বে এবং আমরা রপ্তানির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছি।

44_hilsha_chandpur_090913

অন্য সবার মত আমিও চাই আমার দেশের ইলিশ রপ্তানি হোক, রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি ইলিশের সাথে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর আয়-উপার্জন বাড়ুক। কিন্তু ইলিশ রপ্তানির সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে আমাদের কিছু প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন। আগামী বছরও কি ইলিশের উৎপাদন এবছরের মত থাকবে? নাকি বাড়বে-কমবে? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আগে জানতে হবে কেন এই বছর ইলিশের উৎপাদন এত অসাধারণ। ইলিশের জীবনচক্র পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে পরিযায়ী এই মাছ বিস্তীর্ণ সমুদ্রে বিচরণ করলেও মোহনা অঞ্চলের লবণাক্ততা কমার সাথে সাথে উজানে উঠে এসে উপকূলীয় মোহনা ও নদ-নদীগুলোত ছাড়িয়ে পড়ে। প্রজনন ঋতু বা তার কাছাকছি সময়ে এই লবণাক্ততা যত কম হবে তত বেশি ইলিশ উপকূল-মোহনা-নদীতে বিস্তৃত হবে। এই বছর বর্ষান্তে নদীর উজানে ও বাংলাদেশে অতি বৃষ্টির কারণে একদিকে যেমন বন্যা হয়েছে তেমনি সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে উপকূল-মোহনার পানির লবণাক্ততা কমেছে অস্বভাবিকভাবে।

তুলনা করলে দেখা যাবে যে এবছরে লবণাক্ততার এই কমতি (dilution) এবং তার বিস্তৃতি নিকট অতীতের মধ্যে সবচেয়ে ব্যপক। প্রজনন মৌসুমের কাছাকছি সময়ে উপকূলীয় নদী-মোহনায় অল্প লবণাক্ত পানির এই বিশাল বিস্তৃতি সমুদ্র থেকে অনেক বেশি ইলিশ মাছকে উজানে উঠে আসতে প্রণোদিত করেছে এবং ঝাঁকে ঝাঁকে এসব ইলিশ জালে ধরা পড়েছে। ভরা প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ করার আগে যত মাছ ধরা পড়েছে তার অধিকাংশই কিন্তু ছিল প্রজননক্ষম মাছ, ধরা না পড়লে যারা এই সময়ে প্রজনন করত। এবছর ব্যপক হারে প্রজননক্ষম ইলিশের এই ধরা পড়া কিন্তু আগামী বছরগুলোতে ইলিশের উৎপাদনকে ব্যহত করবে।

এই বছরের মত আগামী বছরেও যদি প্রজনন-পূর্ব সময়ে আতি বৃষ্টি ও বন্যা না হয় (যা কাঙ্খিত নয়ও বটে) তাহলে এবছরের মত ইলিশের এত অধিক এবং অসাধারণ উৎপাদন নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে এখনি ইলিশ রপ্তানির সিদ্ধান্ত নেয়া কি সঠিক হবে? সেইসাথে ইলিশের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এইসব পরিবেশগত পরিবর্তনের বিষয় বিবেচনা করে পলিসি প্রণয়ন করা উচিত নয় কি?