ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

আমার মেয়েটির বয়স যখন ৫ মাস তখন ওর খুব জ্বর হয়েছিল, জ্বরে অজ্ঞান হয়ে যেতো । এটা অজ্ঞান হবার প্রথম ঘটনা । ওর অজ্ঞান হওয়া দেখে আমি তখন এত জোরে চিৎকার করে কেঁদেছিলাম যে পাড়া প্রতিবেশী সবাই এই কান্না শুনে আমার বাড়ীতে ছুটে এসেছিল । আল্লাহ্‌কে বারবার বলছিলাম,তুমি আমাকে নিয়ে যাও, তবুও আমার মেয়ের যেন কিছু না হয় ,ওর কিছু হলে আমি পাগল হয়ে যাব, আমি বাঁচতে পারব না । আল্লাহ্‌র রহমতে ওর কিছু হয়নি। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত আমি ওকে সহজে চোখের আড়াল করিনি। ও যে আমার প্রাণ। আমার প্রতিটা খুশী ওকে ঘিরে । কিন্তু যখনই ভাবি ওকে বিয়ে দিতে হবে ,তখনি চোখে নির্যাতনের কালো পাহাড় ভেসে আসে । সুন্দর পোশাক পরা ভদ্রবেশী মানুষের পিশাচ মুখগুলো ভেসে আসে । আজ আমি এগুলো আপনাদের সাথে শেয়ার করব।

নারী নির্যাতনের রকমফের বলে শেষ করা যাবে না, ইভটিজিং থেকে শুরু করে ফতোয়া, ধর্ষণ, গনধর্ষণ, শারীরিক ও যৌন নির্যাতন, যৌতূক, এসিড নিক্ষেপ, সাইবার ক্রাইম, পারিবারিক তথা গার্হস্থ্য নির্যাতন ………. আরও কত কি !

প্রত্যেক নারীই ঘরে ও বাইরে কোন না কোন ভাবে নির্যাতিত হচ্ছে । যা বলে শেষ করা যাবে না । আজ আমি পারিবারিক নির্যাতনের এমন কিছু নমুনা তুলে ধরব, যা আমরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে সবাই জানি কিন্তু আত্মসম্মানের অজুহাতে কথাগুলো আলোর মুখ দেখে না, ভেতরে ভেতরে গুমরে কাঁদে। কিন্তু এগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা দরকার ,তবেই হয়ত এর সমাধানের রাস্তা দেখা যাবে ।

এধরনের নির্যাতন সাধারণত নারীরা বিবাহসূত্রে পেয়ে থাকে। নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত সকল পরিবারেই নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে, শুধু স্বরূপ ভিন্ন। আমেরিকা ভিত্তিক ন্যাশনাল ডোমেস্টিক ভাইয়লেন্স হটলাইন পারিবারিক নির্যাতনকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বড় শিরোনামে ৬ ধরনের নির্যাতনের কথা বলেছে : শারীরিক, আবেগগত, যৌন , ভীতিমূলক, অর্থনৈতিক ,আধ্যাত্মিক ।

কনে নির্বাচনের সময় সর্ব সাকুল্যে কনেকে পছন্দ হলেও পরবর্তীতে এ ধরনের প্রশংসা বানী শোনা রীতিমতো ঈদের চাঁদ দেখার মত ব্যপার । আমার প্রসঙ্গ সেখানে না ,বরঞ্চ পরবর্তীতে শ্বশুর বাড়ির লোকজন নানা কথায় মেতে উঠে। যা সত্যিই ভীষণ অপমানজনক । আমার এক ঘনিষ্টজনের স্বামী বিয়ের ৫ মাস পর থেকে তাকে বিভিন্ন সময়ে চেহারা নিয়ে বিভিন্ন কথা বলে,তার চিবুকের নিচে হালকা চেপে বলে তোমার গাল নিচের দিকে ঝুলে গেছে, চোখে কালি পরা ,খাটো লাগা ,কালো লাগা আরও অনেক ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ । বেচারি স্ত্রী বিষাদ নয়নে হজম করে, মনে মনে বলে এই ৫ মাসেই এত অসঙ্গতিপূর্ণ লাগছে ! আয়নায় একটু নিজের চেহারাটাও দেখ । একদিন নাকি স্বামীকে বলেছে ,তুমি বিয়ের জন্য আমাকে যখন দেখেছিলে, তখন আমি ফ্ল্যাট জুতা আর বিনা মেকআপে ছিলাম, যাতে আমার আসল আমিকে দেখতে অসুবিধা না হয়। নিশ্চয় তোমার মনে আছে। তখন তোমার চোখে আমি এমন ছিলাম না। আমি যেমন ছিলাম তেমনি আছি, শুধু বদলে গেল তোমার দৃষ্টি। বিয়ের পর তার লম্বা চুলের মন্তব্যে শাশুড়ি বলেন লম্বা চুল নাকি ভুতের মত লাগে ,আর অনেক কিছু । একজন স্ত্রীর জন্য এমন মন্তব্য কতটা মানহানিকর তা আমরা নারীরা তো বুঝিই এমন কি পুরুষরাও বোঝে ।

আমি মনে করি একজন স্ত্রী, স্ত্রী হবার সাথে সাথে মায়ের ভুমিকাও পালন করে । স্বামীর খাবার, পোশাক পরিচ্ছদ ধোয়া ,ইস্ত্রি করা , যথাসময়ে কাজে পৌঁছানোর জন্য তৈরি করে দেয়া, অসুস্থ হলে রাত জেগে সেবা করা আরও কত কি, এসব কাজ স্ত্রীরা হাসি মুখেই করে থাকে। পুরুষরা এগুলো স্ত্রীর দায়িত্ব মনে করে থাকে এবং তাতে তারা মোটেই কৃতজ্ঞ নন। স্ত্রীর ভরন পোষণ করা স্বামীর জন্য ফরজ কিন্তু স্বামীকে রান্না করে খাওয়ানো, শ্বশুর শাশুড়ির সেবা করা একজন স্ত্রীর জন্য ফরজ নয়। আমরা স্ত্রীরা এসব ভালবেসে করি , মানবতাবোধ থেকে করি। একজন স্বামী মনে করে সে স্ত্রীর গায়ে হাত তুলতেই পারে, দু এক চাটিতে ঠোঁট কেটে রক্ত ঝরতেই পারে , ধর্মে বাধা নেই, কিন্তু না এটা ধর্মের নামে গোঁড়ামি । শাসক শ্রেণীর আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার ।

একজন বিবাহিতা নারী সকাল বেলার পাখী না হয়েও সবার আগে ঘুম থেকে উঠে । সকালের নাস্তা বানানো থেকে শুরু করে বাজার করা ,রান্না বান্না করা, ঘর পরিস্কার করা, সন্তানকে স্কুলে নেয়া আনা, সবাইকে খাওয়ানো ও অন্যান্য কাজ করতে হয় । যদি চাকুরীজীবী হন তবেও সবকিছু তিনিই সামলান। তবুও শ্বশুরবাড়ীর লোকজন কথাচ্ছলে বলেন, কি এমন কাজ তোমার ? বোবা সাজা ছাড়া কিছুই করার থাকে না তখন।

নব বিবাহিতা স্ত্রীকে “ কি এমন কাজ তোমার” বলতে দ্বিধা করে না । বলে ২ জনেরই তো সংসার কি এমন কাজ । আরে ২ জন বলে কি রুটি, পরোটা বানাতে হয় না ? ভাত রান্না করতে হয় না ? মাছ্‌, মাংস, শাক সবজি কাটতে হয় না ? রান্না করতে হয় না ? ঘর মুছতে হয়না ? থালা বাসন মাজতে হয় না ? কাপড় ধুয়া ইস্ত্রি করতে হয় না ? কাজের কি শেষ আছে? তারপরও এগুলু শ্বশুর বাড়ির লোকজনের চোখে পরে না । বলে বাসায় বসে শুধু খায় আর ঘুমায় আর টিভি দেখে । বাবা মায়ের সংসারে কয়টা মেয়ে এত কাজ করে? হুট করে নতুন সংসারে এত কাজ করতে তার যে কষ্ট হয় তা ওরা বুঝতে চায় না । কারণ একটাই ,সে তো পরের মেয়ে। আসলে আমাদের দুঃখ রাখার জায়গা নাই ।

স্বামী বাহিরে কাজ করে টাকা রোজগার করে । তাই তার পরিশ্রম চোখে পড়ে আর স্ত্রীর শ্রমে টাকা আসে না তাই এই শ্রম কোন শ্রম না , এই ঘামের কোন দাম নেই । কাজ করতে গিয়ে কতবার যে হাত কাটে, আগুনে পোড়ে , গরম তেলের ছিটা কত যে শরীরে ছিটে , মরিচের লালে কত যে ঝাল, ঝালে যে কত জ্বালা – সে বা তারা কেউ বুঝলোনা । সমবেদনা জানাবে তো দূরের কথা বলে সাবধানে কাজ করতে পারনা । কান্নার স্রোত তখন ভীষণ জোরে আঘাত হানে । স্বামীসহ শ্বশুর বাড়ীর সবাই এই জ্বালা বোঝে, তবে তাদের মেয়ের বেলায়। স্ত্রী তো অন্যের মেয়ে । এই কান্নায় তো মন ভেজার কথা না ।

সবার আগে আমরা মানুষ, তারপর অন্য পরিচয়। আমাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার আছে, এই কথাটি স্বামীসহ শ্বশুর বাড়ীর লোকজন ভুলে যায়। তারা আমাদের চলাফেরা থেকে শুরু করে পেশা নির্বাচনসহ সব বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে থাকে, যা আমাদের মৌলিক অধিকার হরনের পর্যাযয়ে পরে । ঘরের চার দেয়ালের ভেতর এসব নিয়ে নারীরা কত যে অত্যাচারের শিকার হয়, তা বলে শেষ করা যাবে না । হোক না ছোট বড় কোন বিষয় তবু স্বামী এবং তার পরিবারের লোকজন স্ত্রীর মতামত নেয়ার প্রয়োজন মনে করে না ।

একজন নারী মা হিসেবে যথেষ্ট ভাল হলেও শাশুড়ি হিসেবে ভাল নাও হতে পারেন। আর এই সত্য কথাটা স্বামী বুঝতে চান না। তিনি ছেলের সামনে ও পেছনে দু রকম ব্যবহার করেন। যা সত্যিই দুঃখজনক। চোখের সামনে তিনি তার মেয়ে, মেয়ে জামাই, নাতি নাতনীকে ভালবেসে ভেসে যান আর একই সাথে পুত্রবধুর প্রতি কঠিন সমালোচনা করতেও তিনি ক্লান্ত হন না। হায়রে মানুষ, জীবনের শেষ পর্বে তবুও শোধরাল না। আর ননদ ননাশের কথা কি বলব ? হাতে না মারলেও ঠোঁটে অত্যচারের যত কৌশল আছে সব তাদের জানা। প্রয়োগ করতেও কৃপণতা নেই । ননদের কাছে আমরা নামে ভাবি মাত্র। যদি তারা বয়সে বড় হয় তবে তো কথাই নেই । আজকাল যদিও একক পরিবার ,তাই শ্বশুর বাড়ীর লোকজনের সাথে দেখা না হলেও দূর থেকে মোবাইল ফোনের কল্যাণে এসব নির্যাতন উনারা চালিয়ে যেতে পারছেন। আত্ম অহংকার ওদের বেয়াদব বানিয়ে দিয়েছে । অবশ্য এ ব্যপারে পুরুষ সদস্যের ভূমিকা কিছুটা নমনীয় ।

পুরুষরা তাদের শ্বশুর বাড়ীর লোকজনের সাথে এমন ব্যবহার করেন, যেন সে নিম্ন শ্রেণীর কোন মানুষের সাথে কথা বলছে । শ্বশুর শাশুড়ি বৃদ্ধ হলেও মেয়ের জামাই এবং তার পরিবারের সাথে এমন বিনয়ের সাথে কথা বলতে হয় ,যেন তাদের মেয়েকে বিয়ে করে তাদের মহা ঋণী করেছে । জামাই বাবু সর্বদা উনাদের ভুল খুঁজতে ব্যস্ত । এসব একজন স্ত্রীকে অনেক কষ্ট দেয় । অনেক সময় মা বাবা ভাই বোন দের সাথে কথা বলা, কিংবা তাদের কে আসতে বললে স্বামী এবং শ্বশুর বাড়ীর লোকজন ভাল চোখে দেখে না । কখনো কখনো বলে, বিয়ের পর বাবার বাড়ী পর হয়ে যায়, এটাকে নিজের সংসার মনে কর, আপন করতে শেখ । বাবা মায়ের জন্য মন খারাপ করলে কিংবা কান্না করলে বলে, বিয়ে কি আর কারো হয় না? বিয়ের পর শ্বশুর বাড়ীর মানুষের সাথে এমন ভাবে কথা বলতে হয় যেন ,আমি মহা পাপী, তাদের ছেলে আমাদের দয়া করছে ।

আজকাল স্বামীরা অনেক উদার, সংসারের সব কিছুই নাকি স্ত্রীর । যেমন, বলে তোমার টিভি, তোমার ফ্রিজ, তোমার বাসা ইত্যাদি, কিন্তু ঝগড়া করলেই বলে বাসা থেকে বের হয়ে যাও, তোমার মত মেয়ের সাথে সংসার করা সম্ভব না …………। তাহলে আমাদের বাসা কোনটা ? আমরা এখানে কেন থাকি ? এবং কতদিন থাকতে পারব ?

নাটক সিনেমায় একজন নির্যাতিতা নারীর প্রতিবাদকে স্বামী বাহবা দিলেও নিজের সংসারে তা মেনে নিতে নারাজ। কভু আশীবিষে দংশেনি যারে, বুঝিবে সে কিসে, কি যাতনা বিষে । একমাত্র নির্যাতিত নারীরাই বুঝবে এর যে কত কষ্ট । জীবনতো একটাই,আর আমাদের ও তো মন আছে। দু জন মানুষ দু পরিবার থেকে আসে, তাই তাদের মত পার্থক্য যথেষ্ট পরিমানে থাকতে পারে, সংসারকে সফল ও সুখী করতে হলে বোঝাপড়া, সহযোগিতা প্রয়োজন । সর্বোপরি দুজনকেই ছাড় দিতে হবে। কিন্তু না স্বামীর একটাই কথা, দেখ আমি যা আছি তাই থাকব, বদলাতে পারব না । শ্বশুর বাড়ির একটাই কথা সবার মন রক্ষা করে চলতে হবে । আরে বাবা ,আমি বিয়ে করেছি, ব্লাড গ্রুপ চেইঞ্জ করিনি ,আমি রোবট হইনি । অনেক স্বামীরা স্ত্রীকে কোন পকেট মানি দেন না, ঠিকই তো যাদের পকেটই নাই তাদের আবার পকেট মানি ! সুতরাং সে তার কোন ব্যক্তিগত খরচ করতে পারে না । যদিও তার ইচ্ছে করে ।

বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের প্রতি নির্যাতন বন্ধের জন্য নারী এবং শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ ও যৌতুক নিরোধ আইন ১৯৮০ এবং এসিড নিক্ষেপ বন্ধের জন্য এসিড অপরাধ দমন আইন ২০০১ ও এসিড নিক্ষেপ আইন ২০০২ প্রণয়ন করা হলেও পরিবার পর্যায়ে নারীর প্রতি নির্যাতন বন্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট আইন নেই। জাতিসংঘ শিশু তহবিল কর্তৃক প্রকাশিত ২০০৯ সালের প্রতিবেদনের তথ্য মতে, বিশ্বের ৮৯টি দেশে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে নির্দিষ্ট আইন থাকলেও বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ কোনো আইন নেই। ফলে নারী জীবন দুর্বিষহ যন্ত্রণায় পরিপূর্ণ। শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা যায় ভারতে প্রতি বছর ৫০০০ জন নারী যৌতুকের কারনে শ্বশুর বাড়ীর লোকজনের হাতে খুন হয়। যার বিচার হয় না বললেই চলে ।

আজকে আমি সেসব নারীর কথা লিখছি, যাদের নির্যাতনের খবর কেউ জানে না, লজ্জায় কাউকে বলা হয় না। সবাই মনে করে সুখী দম্পত্তি, কিন্তু পর্দার আড়ালে কি ঘটে তা তো কেউ জানে না । যাদের স্বামী এবং শ্বশুর বাড়ীর লোকজন তাদের পুত্রবধূকে নির্যাতন করেন বলে মনে করেন না । শারীরিক অত্যাচার ছাড়াও প্রতিনিয়ত নারীরা যে ধরনের অত্যাচারের শিকার হচ্ছে তার কিছু নমুনা তুলে ধরলাম ।

কোন ভাবেই যদি স্বামী স্ত্রীর মাঝে বনিবনা না হয়, তবে বিবাহ বিচ্ছেদের সুযোগ আছে ‘হয় বিধিমতো রাখ, নয় সুন্দরভাবে বিদায় দাও।’ (সূরা বাকারা ) কোন ভাবেই জুলুম নির্যাতনের অবকাশ নেই । এছাড়া সুরা বাকারা-১৮৭,২২৮; নিসা-৪,১৯,২১,৩৪,১২৪; নাহাল ৫৮, ৫৯,৭২, ৯৭ ; ইসরা-৩১,৭০; হুজরাত-৪৯; ইমরান-১৯৫; আনাম-১৫১;নুর-৩০; তওবা-৭১ লিঙ্গবৈষম্য, ভেদাভেদ, অবজ্ঞা, অপমান, অত্যাচার, নির্যাতন, নিগ্রহ, পাশবিকতা ইত্যাদি অমানবীয় কার্যবলী নিষিদ্ধ এবং প্রত্যেকের অধিকার, মর্যাদা, দায়িত্ব সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ আছে । বিদায় হজ্জের ভাষণে হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) নারীদের প্রতি সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন । যদি কোন বিশেষ কারনে স্ত্রী স্বামীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে অথবা তাকে ছেড়ে চলে যেতে চায়, তখন স্বামীসহ তার পরিবার স্ত্রীর চরিত্র হননে ব্যস্ত হয়ে পড়েন । যা সত্যিই নিন্দনীয় ।

Bangladesh National Institute of Research and Training (NIPORT) এর একটি জরিপে দেখা যাচ্ছে, ১৫ হতে ৪৯ বছরের নারীদের শতকরা ৫৩ ভাগ স্বামীর হাতে শারিরীক কিংবা যৌন নির্যাতনের কথা উল্লেখ করেছে (২০০৮) । এত বিশ্বাস করে বাবা মা তার কলিজার টুকরা মেয়েকে একটি ছেলের কাছে, তার পরিবারের কাছে তুলে দেয় ,আর সেই পরিবার থেকে তাকে আঘাত নিয়ে ফিরতে হয় ,কখনও বা লাশ হয়ে । এই কি বিশ্বাসের প্রতিদান?

জাতিসংঘ পারিবারিক নির্যাতন, নারী-পুরুষ কলহ, ধর্ষণকে নীরব মহামারী হিসাবে চিহ্নিত করে তাঁর ভয়াবহতা তুলে ধরেছে । বাংলাদেশে পারিবারিক নির্যাতন, নিগ্রহের বৃদ্ধির হার অনুযায়ী বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বলে গবেষণা ফলাফলে দেখান হয়েছে (Source: www,allacademic.com/meta/p-nla-apa-recerch)

৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবস এবং ২৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস । আমরা কি শুধু এসব দিবস পার করব আর বিবৃতি দেব। পুরুষরা কি কিছু অঙ্গিকার করতে পারে না। একবার যদি ভাবে তার স্ত্রীটি কারো কন্যা, বোন । সে কষ্ট পেলে, কাঁদলে , তাঁদের কষ্ট হবে, তারা কাঁদবে । যেমন করে সে ভাবে তার মেয়ের বেলায় , বোনের বেলায়। তাহলে মনে হয় সে এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে না ।

আমরা নারীরা একই সাথে ঘর সামলাতে পারি , চাকুরী করতে পারি, আবার সন্তান জন্ম দিয়ে লালন পালন করতেও পারি। কিন্তু পুরুষরা ……? আমি মনে করি একজন নারীর জীবনে পুরুষের যতটা দরকার ,তারচেয়ে পুরুষের জীবন ধারনের জন্য নারীর প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশী । তারপর ও এত অবহেলা ,অত্যাচার কেন ? আমরা ও প্রতিবাদ করতে জানি, কিন্তু পুরুষদের সম্মান করি বলে তা করি না, ভাবি একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে । শুধু এটুকু বলতে চাই, ধোঁয়া শুধু আগুন থেকে নয়, বরফ থেকেও বের হয় ।

একজন পুরুষের মুখে স্ত্রীর প্রতি বিশেষ উপদেশ থাকে ,মায়ের সেবা করবে, মা সারা জীবন অনেক কষ্ট করেছেন । ভাল কথা, যত খারাপই হোক মাতৃভক্তি আছে তাহলে। কিন্তু কথা হল, সে যার উপর অত্যচার করছে, সে ও তো কারো মা । আমার পরিচয় ভিন্ন জনের নিকট ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মানুষ ত আমি একজনই । আমি যদি আমার স্বামীর দ্বারা নির্যাতিত হই খারাপ থাকি, তবে আমার সন্তান তো একদিন এই কথা বলে আমাকে সুখী করার দায়িত্ব অন্যের কাঁধে ফেলে দিবে । আসলে এগুলো হল বাহানা মাত্র । নিজের অক্ষমতা ঢাকার বৃথা প্রয়াস মাত্র । তার মানে আমাকে সুখী হওয়ার জন্য প্রথমে শাশুড়ি হতে হবে । আমি সারা জীবন আমার স্বামীর দ্বারা নির্যাতিত হব আর শেষ বয়সে ছেলে তার স্ত্রীকে বলবে আমার মাকে সুখী কর । আর আমি তখন সুখী হতেই থাকব ।

০৭.০৭ .১২ তারিখের প্রথম আলোতে দেখলাম, স্ত্রী যা বলে তাই করো শিরোনামে একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। ওহাইওর ওক হারবার এলাকার এক রেস্তরায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এক স্বামীকে “স্ত্রী যা বলে তাই করো” এই উপদেশ দিয়েছেন । সুখী দাম্পত্যের জন্য কথাটি নতুন না হলেও খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট উপদেশটি স্মরণ করিয়ে দেন ।

স্বামীর যে কোন অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা একটি স্ত্রীর জীবনকে পঙ্গু করে দিতে পারে ,যার বিন্দু মাত্র ভাবনা কিংবা দায়িত্ববোধ একজন স্বামীর নাই। অনেক স্ত্রীকে বলতে শুনেছি ,দেখ তোমার যেকোনো সমস্যা সবচেয়ে বেশি আমাকে কষ্ট দিবে, দেখ আমার মত এত আপনজন তুমি খুঁজে পাবে না । কেন আমাকে তুমি হেলা কর। সত্যিই ত তাই স্বামীর অসুখে স্ত্রীর অসুখ, স্বামীর সুখে স্ত্রীর সুখ,আর মৃত্যুতে স্ত্রীর একাকী বর্ণনাতীত কষ্টের জীবন । যে জীবনে পাশে থাকার কেউ নেই,ভালবাসার কেউ নেই । আর কারো কি হাসি, জীবনযাত্রা থেমে যাবে? না ,শুধু এই হতভাগী স্ত্রী তাকে ছাড়া অকুল সাগর পাড়ি দিবে । আসলেই ত এত বড় স্বজন আর কি কেউ আছে ? তার পরও বুঝল না ।

সন্তানের নামকরণের ক্ষেত্রে একই ঝামেলা দেখা দেয় । গর্ভধারিণী মা চাইলেও অধিকাংশ ক্ষোত্রে তা পারেন না । শ্বশুরবাড়ীর লোকজন এই দায়িত্ব নেন । স্বামীও এতে খুশী থাকেন ,কারন তার মা-বাবার খুশীটা তার কাছে বড় । কিন্তু একবারও ভাবে না, যে সন্তান জন্ম দিল, যে সন্তানের মা –সে ও তো চাইতে পারে তার পছন্দের নামে হোক সন্তানের পরিচয়। তবে কি এই অধিকার পেতে তাকে দাদি হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে ? অনেক সময় পুত্রবধুর দেয়া নাম গৃহীত হলেও শ্বশুর বাড়ীর লোকজন সেই নামে ডাকেন না । কেন এত বৈষম্য ?

সামর্থ্য যেমনই থাকুক না কেন , ধার দেনা করে হলেও ঘটা করে বাবা মা মেয়ের বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন । তখন থেকেই শ্বশুর বাড়ীর লোকেরা দোষ খোঁজার চেষ্টা করে । আমি এমনও শুনেছি স্ত্রীর বাবা বাড়ি থেকে দেয়া মাছ মাংস কিনা অন্য উপহার কে পচা, মানহীন কিংবা অন্য কোন কারণ বলতে শ্বশুর বাড়ীর লোকজন দ্বিধা করে না । কোন বাবা মা নিশ্চয় তার মেয়ের শ্বশুর বাড়ীতে পচা ,মানহীন জিনিস পাঠান না। এসব কথা বলে ওরা শুধু পুত্রবধু কিংবা তার বাবা মাকে কষ্ট দেন না ,তারা তাদের হীন মানসিকতার পরিচয় ও দেন ।

মেয়ে জামাই কে জামাই আদর করলেও পুত্র বধু কখনও এই আদরের মুখ কেন দেখে না ,অথচ বাড়ীর বিবাহিতা মেয়েটির আগমনে শ্বশুর ,শাশুড়ির কদরের কমতি থাকে না। তবে পুত্রবধু বউ আদরটা কোথায় পাবে? সামর্থ্য না থাকলেও মেয়ে জামাই বাড়ীর লোকজনকে কদর করেই যেতে হবে, জামাইকে সন্তুষ্ট করতেই হবে, এই নিয়মটা কোথায় লিখা আছে ? একজন স্ত্রী তার শ্বশুর বাড়ীর কনিষ্ট লোকের দ্বারা অসম্মানিত হলেও স্বামী এ ব্যপারে নির্বিকার থাকেন, এবং স্ত্রী কিছু বলতে পারবে না, কেন ?

স্ত্রীর সামনে স্বামী,শাশুড়ি তাদের মেয়ে নাতনী নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও বধূটি তার মা বোনকে পাশে চাইলে স্বামী ,শ্বশুর বাড়ীর লোকজন তা মেনে নিতে নারাজ। বুঝলাম না, যে কাজ উনাদের জন্য পছন্দ সেটা অন্যের বেলায় কেন পছন্দের নয় ?

বিয়ের পর নববধুর এত দিনের শেখার উপড়ে নতুন সংসারে মানিয়ে নেয়া একটা কঠিন কাজ, হৃদয়ের শেখরে অনেক টান পরে,এটা অনেক কষ্টকর। একজন নারীই শুধু এই কষ্ট বোঝে। সেই সময়টাতে স্বামী তাকে ভালবেসে, পাঁশে থেকে কষ্ট লাঘবে অনেক সহায়তা করতে পারে । কিন্তু তা না করে শুরু উনি সহ উনার পরিবারের লোকজন নববধূকে ওদের ভাষায় “ টাইট ” দিয়ে রাখে, যা সত্যিই বর্ণনাতীত কষ্টের। এতে করে নাকি বউকে আয়ত্তে রাখা যায়। আমি জানি না কাউকে কষ্ট আদৌ কি কেউ সম্মান পেয়েছে ? অথচ একটু ভালবেসে, পাশে থেকে মনটা কত সহজেই জয় করা যায়। ভালবেসে একটি গোলাপ, কিংবা একটি ছোট উপহার বঁধুটির চোখে, মুখে সুখের হাসি ফোটাতে পারে, যে নারীটি পুরো জীবনটা স্বামীর জন্য কোরবান করতে প্রস্তুত, তার জন্য কি সে এটুকু করতে পারে না ?

এইতো সেদিন ব্র্যাড পিট হবু স্ত্রী আঞ্জেলিনা জোল কে আড়াই লাখ ডলারের ঘড়ি উপহার দিয়েছে। খবরটা খুব বড় করে পত্রিকাগুলো ছেপেছে। আসল কথা হল ভালবাসা । মূল্যবান উপহার নয় স্ত্রীর জন্মদিন ,বিবাহ বার্ষিকীর দিনটা না ভুলে আপনি ভালবেসে সামান্য একটা উপহার দিন, দেখবেন আপনার স্ত্রীর মুখটি ভালবাসার আলোতে কতটা উজ্জ্বল হয়। ইসলাম ধর্মে স্পষ্ট করে উল্লেখ আছে ,স্ত্রীকে দান হল সর্বোৎকৃষ্ট দান। গত ১১ আগস্ট প্রথম আলতে দেখলাম পৃথিবীর দ্রুততম মানব , জীবন্ত কিংবদন্তী উসাইন বোলটকে সংবাদ সম্মেলনে তার গার্ল ফ্রেন্ড সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন ,আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হল আমি কার প্রমে পড়ব । প্রেমে পড়লে ওই মেয়ে কি করে তাতে কিছুই যায় আসে না, আমি সেই দিনের জন্য অধীর অপেক্ষায় আছি । ভালবাসার এরুপ উদাহরণ অনেক দেয়া যাবে। ভালবাসতে পারার সুখ অনেক। ভালবাসার এত কাঙাল হয়েও নারীদের ভালবাসার এত আকাল ।

২জুন ২০১১ প্রথম আলোতে শেখ সাবিহা আলম একটি প্রতিবেদনে লন্ডন ভিত্তিক চিকিৎসা বিজ্ঞান সাময়িকী ল্যন্সেটের একটি প্রবন্ধের বরাতে উল্লেখ করেন, নির্যাতনের শিকার নারীরা হৃদরোগ, আন্ত্রিক ও যৌন রোগ , মাথা ও মেরুদণ্ডে ব্যথা, গর্ভধারণে জটিলতা, গর্ভস্থ শিশুর মৃত্যু, চরম বিষণ্ণতা ইনফ্লুয়েঞ্জার মত রোগে ভোগেন। তাদের মধ্যে প্রচণ্ড ভীতির সঞ্চার হয়। তারা সব সময় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। যে মা নিষ্প্রভ , নিরাপত্তা হীনতায় ভুগেন, সে কিভাবে সন্তানকে সঠিক ভাবে লালন পালন করবেন ? আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (icddrb)এক গবেষণায় নারী নির্যাতনকে বাংলাদেশের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি বলে মন্তব্য করা হয়েছে। icddrb এর গবেষক রুচিরা তাবাসসুম বলেন, যারা দীর্ঘ মেয়াদে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার, তারা ভগ্ন স্বাস্থ্যের অধিকারী। হাঁটা চলা ও দৈনন্দিন কাজ কর্মে এদের কষ্ট হয়। তীব্র ব্যথা বেদনা, স্মৃতি ভ্রষ্ট হওয়ার প্রকোপও বেশি। অনেক ক্ষেত্রে এসব নারীদের সাথে সন্তানের সুসম্পর্ক হয় না ।

আসলে বধূটির প্রতি স্বামীসহ তার পরিবারের লোকজনের দৃষ্টি ভঙ্গি বদলাতে হবে। যে ভাবে তারা তাদের কন্যা, বোনটির সুখের কথা ভাবে, বধূটির বেলায়ও সেরূপ ভাবতে হবে। প্রয়োজনে কাউন্সেলিং এর সাহায্য নিতে পারে। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক বিতর্কের নয় ,ভালবাসার , শ্রদ্ধার, উদারতার, বোঝাপড়ার । আল্লাহ্‌ প্রদত্ত স্বর্গীয় সম্পর্ক ।

আমি জানি কারো কষ্টের কথা শুনলে সত্যিই কষ্ট লাগে, কিন্তু এই কষ্টের স্বীকার যদি আপনার বোন, কন্যা হয়ে থাকে তবে আপনার কেমন লাগবে ? হ্যাঁ নির্যাতিতা নারীটিও কারো বোন ,কন্যা কিংবা হতভাগী মা। আমি যে প্রসঙ্গ তুলে ধরে এত কথা লিখলাম, আমি মনে করি সে একই সমস্যা আমাদের সবার । আমরা কি আমাদের মেয়েটিকে এই ভেবেই বিয়ে দেব, যে সে চাইলেও আমাদের কাছে আসতে পারবে না, আমাদের জন্য কাঁদতে পারবে না, আমরা তার বাসায় যেতে পারব না , তার স্বামীর সাথে অতি বিনয়ে অপরাধীর মত কথা বলতে হবে, সামর্থ্য না থাকলেও তার সুখের জন্য নিয়মিত উপহার দিতে হবে , আজ থেকে সে শুধু সবাইকে খুশী করার কাজে প্রতিজ্ঞা বদ্ধ থাকবে, আর যাবতীয় অন্যায় মুখ বুজে সহ্য করবে ।

এবার বলুন, আমার, আপনার্‌, আমাদের কন্যাটিকে আমরা কার হাতে তুলে দেব ?

তথ্যসুত্র- প্রথম আলো ,দৈনিক ডেসটিনি ও অন্যান্য ।
লিয়া সরকার ।