ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

বিকাল ৫টা। একটা বড় শপিং মলে আছি। উদ্দেশ্য ঈদ শপিং নয়, পুরনো মোবাইলটি অচল হয়ে গেছে, নষ্ট হবার আর সময় পেল না, একেই বলে বিপদের মধ্যে বিপদ। সস্তা দামের একটা মোবাইল ফোন কিনব।

ঈদুল ফিতরে পোশাক কেনার ধুম পরে যায়। ধনী, গরীব নির্বিশেষে সাধ্যমত নিজের এবং প্রিয়জনের জন্য পছন্দের পোশাক কেনার চেষ্টা করে। কোরবানির ঈদে সব খরচ কোরবানি খাতে চলে যায়। পোশাক কেনা তেমন হয় না। আমিও এসব মানুষের দলে। যে টাকা বেতন বোনাস মিলে হয়েছে তাতে বাড়ি ভাড়া, ব্যাংক ঋণের কিস্তি, সংসার খরচ, কোরবানির গরু কেনা বাবদ প্রায় শেষ।

সুগন্ধি মশলা না কিনলে তো শাহী ঘ্রাণ আসবে না; কিনতেই হবে। কিন্তু সমস্ত মসলা পাতির দাম তো দিনে দিনে বাড়ছে, সেই তুলনায় লং তো লম্বা হচ্ছে না, দারুচিনিতে তো চিনির পরিমান বাড়ছে না, গোল মরিচ দিনে দিনে বিন্দু মরিচ হচ্ছে, আদার সাথে কাঁচকলার ঝগড়া ঠিকই আছে, কোন একদিন মাংসের সাথে হলেই ভাল হবে। পেঁয়াজ রসুন তেলসহ সব কিছুর দাম ঊর্ধ্বমুখী। সরকারের হিসেবে এসবের দাম অনেক কম হওয়ার কথা। তাহলে বেশি কেন? প্রথম আলোতে এ নিয়ে রিপোর্টটি দেখলাম, ভাবলাম এমন দাম হলে তো আমাদের কষ্টই হতো না ।

অথচ কিছু মানুষ এবারের ঈদে শপিং করতে ঠিকই বিদেশে গেছে। গরুর হাঁটের সবচেয়ে বড় গরু, উট কোরবানি করছে । তারপরও প্রতিদিন দেশি-বিদেশি ফ্যাশন হাউজ গুলোতে ঢুঁ মারছে, যদি পছন্দের কিছু পাওয়া যায় । কিনছে দামি ব্র্যান্ডের সুগন্ধি ।

আমার মনে হয় আমার মত এমন মানুষের অভাব নেই । কিন্তু আমি ভাবছি ঐসব পরিবারের কথা। যাদের ঈদকে ঘিরে নেই কোন আনন্দ বরং ঈদ যেন কষ্টের কারণ, বাড়তি বোঝা । পত্রিকার পাতা উল্টালেই সেইসব মানুষরা শিরোনাম হয়ে আমাদের কষ্ট দিচ্ছে, আমরা তাদের কষ্ট অনুভব করার চেষ্টা করছি মাত্র কিন্তু ওরা যে প্রতিনিয়ত ভোগ করছে ।

যে বাবা-মা সন্তানকে ঈদের দিনে পোশাক তো দূরের কথা, সেমাই কিংবা এক টুকরা মাংস তুলে দিতে পারছে না, সেই সব মানুষের কথা ভেবে চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে ।

চার মাস বেতন পাচ্ছে না হাইটেক পার্কের ২৪ নিরাপত্তাকর্মী- গাজীপুরের হাইটেক পার্কের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ২৪ আনসার সদস্য চার মাস যাবৎ বেতন পাচ্ছেন না। ফলে জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার বক্তারপুরস্থিত হাইটেক পার্কে কর্মরত আনসার সদস্যরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বেতন না পাওয়ায় আগামি ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ওই ২৪ আনসার পরিবারের সদস্যরা।

গোপালগঞ্জে ন্যাশনাল সার্ভিসের ১৬ হাজার ৯২ জন কর্মীর বেতন নেই –গোপালগঞ্জে ন্যাশনাল সার্ভিসের ১৬ হাজার ৯২ জন কর্মী পাঁচ মাস ধরে কোনো বেতন পাননি। ওই কর্মীরা ভেবেছিলেন, ঈদের আগে তাঁরা বকেয়া বেতনের টাকা পাবেন। কিন্তু ঈদের আগেও তাঁরা ওই বেতন পাবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

সরকারের প্রতিহিংসার শিকার : ৬৮ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বেতন-ভাতা বন্ধ ৬৮ উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা মাসের পর মাস বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক রোষানলে পড়ে এসব কর্মকর্তা এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এদের মধ্যে ৫ কর্মকর্তা বেতন পাচ্ছেন না তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বেতন পাচ্ছেন না, এমন নির্যাতিত কর্মকর্তা রয়েছেন ৯ জন। দীর্ঘদিন বেতন-ভাতা না পেয়ে অনেকে বাসাভাড়াসহ সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। যাদের চাকরি ছাড়া আর কোনো আয়-রোজগার নেই, তারা পড়েছেন চরম সঙ্কটে।

ঈদের আগে প্রণোদনার টাকা পাচ্ছেন না উদ্যোক্তারা : দেড় হাজার গার্মেন্টে বেতন-বোনাস অনিশ্চিত। ঈদের আগে সরকারঘোষিত প্রণোদনা ও নগদ সহায়তার কোনো টাকাই পাচ্ছেন না পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা। নগদ সহায়তা ও প্রণোদনা মিলিয়ে সরকারের কাছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বস্ত্র ও পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেও অর্থ ছাড় করাতে পারছেন না তারা। পোশাক খাতের তিন শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

প্রণোদনার টাকা ছাড় না হওয়ায় পোশাক খাতের প্রায় দেড় হাজার কারখানায় ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।বিশেষ পর্যবেক্ষণ কমিটি সূত্রে জানা গেছে, পোশাক খাতে বেতন-বোনাসের দাবিতে প্রতিদিন অন্তত ১০ থেকে ১৫টি পোশাক কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটছে। চলতি আগস্ট মাসের শুরু থেকেই শ্রমিকরা বেতন-বোনাসের দাবিতে আন্দোলন করছেন। ঈদকে কেন্দ্র করে এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের খবর পাওয়া গেছে।মালিকপক্ষ নানা অজুহাতে বেতন-ভাতা ঈদের পর দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে ।

ঈদের আগে বেতন পাচ্ছেন না ন্যাশনার সার্ভিসের ১৬ হাজার ৯২ কর্মী (সূত্র: খুলনানিউজ.কম)। ঈদের আগে বেতন পাচ্ছেন না ন্যাশনার সার্ভিসের ১৬ হাজার ৯২ কর্মী। এই বেকার যুব ও যুব মহিলারা এবার ঈদ করবেন নিরানন্দে। গত পাঁচ মাস ধরে তারা কোন বেতন পান না। ভেবেছিলেন ঈদের আগে বকেয়া বেতনের টাকা পাবেন। দিন যাচ্ছে আর সেই আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে।

ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মীরা জানান, যুব উন্নয়ন অফিসে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ করছি। কিন্তু কোন আশা নেই। ঈদের আগে কেন আর কখনই আমরা টাকা পাব কি না এই নিয়েই এখন সন্ধিয়ান। সদর উপজেলার খটিয়াগর গ্রামের তাহমিনা আশিকুর রহমানের বক্তব্যকে সমর্থন করে বলেন, বেকার ছিলাম ভাল ছিলাম। তখন একভাবে চলতাম। এখন চাকুরী করি। বাড়ীর সকলের একটা প্রত্যাশা আছে। বাবা-মাকে বলেছিলাম, চিন্তা কর না। ঈদের সময় সব টাকা এক সঙ্গে পাব। তখন পাওনাদারদের টাকা পরিশোধ করে দিও। ছোট ভাই-বোনদের বলেছিলাম, ঈদের সময় নতুন জামা কাপড় কিনে দেব। এখন ওদের কি বলব।গোপালগঞ্জ জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মোঃ আজিজুর রহমান বলেন, যুব অধিদপ্তরে যোগাযোগ করা হচ্ছে। ৪/৫ দিন আগে জেনেছিলাম ফাইল অর্থ মন্ত্রনালয়ে আটকে আছে। ওই জায়গা থেকে ফাইল ছাড় হলে এক দিন সময় লাগবে। সেক্ষেত্রে ঈদের আগে পাওয়ার একটা সম্ভবনা আছে।

মণিরামপুরে ২৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩ শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারী বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত। মণিরামপুর (যশোর) উপজেলার ২৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত না হওয়ায় প্রায় ৩ শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারী ও তাদের পরিবার পরিজন এবারও ঈদ আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ধর্মপ্রাণ মুসলিম পরিবারে প্রতিবছর ঈদ আসে আনন্দের বার্তা নিয়ে। আর সরকারী বেতন-ভাতা বঞ্চিত হতভাগ্য শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছে ঈদ মানে এক বেদনাদায়ক দিন।

নারায়ণগঞ্জে বকেয়া বেতন-বোনাসের দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের মানববন্ধন। নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার সিদ্ধিরগঞ্জে আদমজী রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় (এইপিজেড) হাইল্যান সোয়েটার ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের শ্রমিকেরা ৩ মাসের বকেয়া ও ঈদ বোনাসের দাবিতে সোমবার মানববন্ধন ও সমাবেশে করেছে। হাইল্যান স্যুয়েটারের শ্রমিক তোফাজ্জল হোসেন, আবু জাফর, সেলিম ও মহসিন জানান কারখানাটিতে প্রায় ৫শ’ শ্রমিক কাজ করেন। গত ৩ মাস ধরে তারা বেতন ও বোনাস পাচ্ছেন না। গার্মেন্টস মালিক পক্ষ তাদের বকেয়া বেতন বোনাস দেই দিচ্ছি বলে টালবাহনা শুরু করেছেন। মালিক পক্ষ থেকে তাদের পাওনা বকেয়া বেতন-বোনাস পরিশোধের জন্য তারিখ দেওয়া হলেও তা পরিশোধ করা হয়নি।

নতুন শিক্ষকদের বেতন নেই ৬ মাস —বগুড়ার দুপ চাঁচিয়া উপজেলার রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকেরা ৬ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না । ঈদুল ফিতরের সময় বেতন হওয়ার কথা থাকলেও বেতন হয়নি ।

এ রকম শিরোনামের মানুষগুলো ঈদে কেমন আছে? কেমন থাকতে পারে? এ প্রশ্নের জবাব মালিক মহল কি জানার চেষ্টা করেছেন? একবারও কি ইচ্ছে করে না,নিজের বিবেককে জাগাতে? সরকার  দুর্নীতি করতে করতে ক্লান্ত। এখন ঘুমাচ্ছে । জানি না কোন আমলে জাগবে।

শিল্প কারখানার মালিকরা বছরে বছরে গাড়ির মডেল পাল্টান, বিদেশ ভ্রমন, বিদেশে বাড়ি করেন, কিন্তু যাদের শ্রমে ঘামে এসব টাকার মালিক হন তাদেরকে প্রাপ্য টাকা দিতে কেন যে এত আপত্তি, বোধগম্য নয়। পরিশ্রমের তুলনায় নামমাত্র মজুরি । তারপরও এর জন্য বিক্ষোভ করতে হয়, মার খেতে হয়, জেলে যেতে হয়, কখনও কখনও মরে যেতে হয় । তারপরও সুরাহা হয় না ।

কেন সরকার ভাবছে না, শিক্ষকেররা ক্ষুধার্ত পেট নিয়ে দিনের পর দিন পাঠদান করেই চলছেন। তাদেরও তো পরিবার আছে । তারা তো স্ত্রী সন্তানকে ঈদে রঙিন পোশাকটি দিতে চায় । তাদের মুখে খুশির হাসিটি দেখতে চায় । সাধারণ মানুষদের কি মন থাকতে নেই? স্বপ্ন থাকতে নেই?

অনেক সরকারি চাকুরীজীবীদের খরচের বাহার দেখে বলি, তাদের স্কেল অনুযায়ী এত খরচ কিভাবে সম্ভব? অনেক তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীদেরও ঢাকা শহরে বাড়ি আছে। অনেক কিছু লিখতে ইচ্ছে করছে। এসব কথা লিখলে শেষ হবে না ।

আমি আবার আমার কথায় ফিরে আসি। সব কিনে আর পোশাক কেনার মত বিলাসিতা করার সুযোগ আমার নেই । আমার স্বামী খুব চাইছে আমি যেন টোকেন হিসেবে হলেও সাদামাটা একটা পোশাক কিনি । আমি জানি স্বামী হিসেবে খুব বিব্রত বোধ করছে, একমাত্র স্ত্রীকে ঈদে কোন উপহার দিতে পারছেনা । আমাদের সামনে অনেকে অনেক অনেক শপিং করে নিয়ে যাচ্ছে, কর্মচারী, ড্রাইভার এগুলো গাড়িতে তুলে রাখছে । বেগম সাহেবা, পুত্র কন্যাগন পরম তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে গাড়িতে বসছেন । আমার সামনে দিয়ে সাদা, কালো লাল গাড়িগুলো সাঁই করে চলে যাচ্ছে । আমি তার এই বিব্রতকর লজ্জিত মুখটা দেখতে চাইছিনা বলে , ডান হাতটি একটু চেপে ধরে বললাম – আগামি ঈদে লিমুজিন কিনব ।

তথ্যসূত্রঃ প্রথম আলো , ভোরের ডাক , আমার দেশ ও অন্যান্য ।