ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

ঈদের পঞ্চম দিনের রাত ৮ টা বাজে। স্বামী, ভাই বোনদের দিয়ে একটি ফাস্ট ফুড শপে বসে আছি। দোকানটিতে সেলফ সার্ভিস সিস্টেম চালু, তাই নিজেরা খাবার অর্ডার করে বিল পে করে বসতে হয়। খাবার রেডি হলে আমাদের জানান দেয়া হয়, তারপর আমরা নিজেরা ট্রেতে করে খাবার নিয়ে আসি। এ কাজটি করতে আমার বেশ ভালই লাগে। জানান দেয়ার কাজ, খাবার শেষে এঁটো প্লেট, ট্রে, টেবিল মোছা এসব কাজগুলো করে ছোট ছোট কিছু শিশু ।

যথারীতি আমি এবং আমার ছোট বোন গ্রিল স্যান্ডুইচ ও হটডগের অর্ডার করলাম। কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, ক্যাশিয়ার সাহেব তখন এসব শিশু শ্রমিকের একজনকে ঠাস করে গালে চড় বসিয়ে দিলেন। আমি থতমত খেয়ে গেলাম। যথারীতি চড় মেরে তিনি চেয়ারে বসলেন। আমি তাকে টাকা পে করতে গিয়ে চড় মারার কারন জানতে চাইলাম ।

তিনি জানালেন কাষ্টমারের অর্ডারের গড়বড় করেছে । বার্গার ও চিজ বার্গারের অর্ডার অদল বদল করে দিয়েছে । এরকম নানান ভুল নাকি প্রায়ই করে । মারলে ঠিক হয়। তাই তিনি প্রতিদিন সকাল ও রাতে দুবেলা করে মারেতেন। আজ রাতের ডোজটা দিতে নাকি দেরি হয়েছে। আমি তাকে বললাম, একটু বুঝিয়ে বললে হয় না? এতক্ষণ হাসি মুখে বেশ আগ্রহ নিয়ে কথা বলছিল, আমার প্রশ্নে তার মুখ ম্লান হয়ে যায় । তিনি কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন, এমন না করলে ব্যাবসা নাকি চাঙে উঠবে। আমি বললাম, ছোট মানুষ, একটু ভুল তো হতেই পারে। শপ থেকে রাত ৯.৩০ এ বাসায় ফেরার সময় দেখি, শপের নিচের এক কোনায় শিশুটির মা চিতই, ভাপা পিঠা বানাচ্ছে । পাশে দাড়িয়ে শিশুটি মাকে দ্রুত একটি পিঠা দেয়ার তাগিদ দিচ্ছে, বলছে তার অনেক ক্ষুধা লেগেছে । আমি তখনও দেখলাম শিশুটির হাতে ময়দা মথনের চিহ্ন ।

যে বয়সে শিশুর স্কুলে যাওয়া , বিভিন্ন খেলা করে হাসি আনন্দে বেড়ে ওঠার কথা সে বয়স থেকে শিশুকে ধরতে হচ্ছে সংসারের হাল। মোটর, রিকশা, সাইকেল নির্মাণ, বিদ্যুৎ, ইটভাটা ,চা ষ্টল, হোটেল, রেষ্টুরেন্টে, রাজমিস্ত্রীর সাহায্যকারী , ওয়েলডিং কারখানায় , গার্মেন্টস, জুটমিল, কৃষিসহ বিভিন্ন কাজে শিশুরা জীবন জীবিকার পথ খোঁজে। অনেকেই ম্যাক্সি, টেম্পু, মাইক্রোবাসের হেলপার, কেউবা চালাচ্ছে রিক্সা, কেউ কাঠমিস্ত্রির সহকারী। অভাবের তাড়নায় বিভিন্ন ঝুকিপূর্ন কাজ করছে শিশুরা। জলন্ত কয়লা, বয়লারের লেলিহান আগুনের শিখা, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করছে শিশুরা। এতে ওদের শারীরিক , মস্তিস্ক গঠনেও বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। ঝুকিপূর্ন কাজ করার ফলে ওদের জীবনে অনেক দূর্ঘটনা ঘটে । ফলে কঠিন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা, অনেক সময় পঙ্গুত্ব বরণ করে , জীবনী শক্তি ক্ষয়ে অনেক শিশু মারাও যাচ্ছে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে এসব শিশু পিতৃ কিংবা মাতৃহীন , মা তালাকপ্রাপ্ত কিংবা বাবা মারত্মক দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত , মাদকাসক্ত কিংবা তারা কর্ম হীন থাকতে বেশি পছন্দ করেন। সংসারের হাল ধরতেই শিশুরা বিভিন্ন কাজে নিয়েজিত হতে বাধ্য হচ্ছে। শিশু শ্রমিকদের বয়স ১০ থেকে ১৪/১৫ বছর। সেই ভোর থেকে কাজ শুরু হয়ে রাতের অনেকটা সময় জুড়ে ওরা কাজ করে । একটু ভুল হলেই মালিকের হাতে মার খেতে হয় । কখনও কখনও তাকে চাকুরী হারাতে হয় । সারা দিনে কাজের রকম বুঝে ২/৩ বেলা খাবার দিয়ে থাকে । দিন শেষে ১৫ থেকে ৫০/৬০ টাকা কিংবা মাস শেষে ৫০০/৬০০ টাকা দিয়ে থাকে । যা তাদের শ্রম এবং প্রয়োজনের তুলনায় নগন্য । মালিক পক্ষের কাছে কোন দাবি তুললেই চাকুরিচ্যুত হতে হয়।

এত কাজ করে ওরা দুর্বল হয়ে পরে তারপরও কাজ করে, কারন কাজ ছাড়া যে খাবার জুটবে না। অভাবের তাড়ানায় তারা চুরি সহ বিভ্ন্নি অবৈধ পেশায় লিপ্ত হচ্ছে । আবার এদেরকে মাদকসেবীরা তাদের মাদকদ্রব্য বহনের কাজে লিপ্ত করে। কন্যা শিশুরা

প্রতিবছর ১২ জুন পালিত হয় শিশু শ্রম প্রতিরোধ দিবস ।এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য – ‘বিপদ সংকেত! শিশুরা ঝুকিপূর্ণ কাজে, আসুন শিশুশ্রম নিরসন করি।’ কিন্তু এটা কেবল আনুষ্ঠানিকতা । আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচের শিশুদের দিয়ে ভারি বা কষ্টের কোন কাজ না করানোর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও শিশুদের দিয়ে অবাধে চলছে শিশু শ্রম। ১৯২৩ সাল থেকেই শিশুশ্রম নিরসনে বিভিন্ন আইন রয়েছে। বাংলাদেশ আইএলও কনভেনশনের শিশুশ্রম সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারাসহ মোট ৩৩টি কনভেনশনে অনুস্বাক্ষর করেছে। শিশু অধিকার বাস্তবায়নে বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থাও কাজ করছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয় বিভিন্ন প্রকল্পও গ্রহন করেছে।

শিশু আইন-১৯৭৪ অনুযায়ী, কোন শিশূর কাছে উপযুক্ত চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নেশা হয়- এমন কোন পানীয় বা ওষুধ বিক্রি করা যাবে না। এমনকি যেসব স্থানে নেশাদ্রব্য বিক্রি হয়, সেখানে শিশুদের নিয়ে যাওয়া ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

সারা দেশে প্রায় ৪৫ লাখ শিশু নিষিদ্ধ শিশু শ্রমের শিকার। ২০১১ সালের সরকারি একটি জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে শিশু শ্রমিকদের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা এখন প্রায় ৭৯ লাখ। শহর অঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে শিশু শ্রমের প্রবণতা অনেক বেশি। শিশু শ্রমিকের মধ্যে মাত্র ১৫ লাখ শিশু শ্রমিক শহরে এবং ৬৪ লাখ রয়েছে গ্রামাঞ্চলে। এই শিশু শ্রমিকদের মধ্যে ৪৫ লাখ শিশু শ্রমিক ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে জড়িত। ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রমে নিয়োজিত প্রায় ১৩ লাখ শিশু এক সপ্তাহে ১শ ৬৮ ঘণ্টার মধ্যে কাজ করছে প্রায় ৯০ ঘণ্টা।

বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং আইএলও’র জরিপ অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ রয়েছে ৪৫ ধরনের। আর এর মধ্যে ৪১ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে অংশগ্রহণ করছে শিশুরা। শিশু শ্রমিকদের মধ্যে ৭৩ দশমিক ৫০ ভাগ পুরুষ শিশু এবং ২৬ দশমিক ৫০ ভাগ নারী শিশু। শিশু শ্রমিকের ৬ দশমিক ৭০ ভাগ আনুষ্ঠানিক খাতে এবং ৯৩ দশমিক ৭০ ভাগ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছে। এসব ঝুঁকিপূর্ণ কাজের মধ্যে রয়েছে মোটর ওয়ার্কসপে কাজ করা, ওয়েল্ডিং, গ্যাস কারখানা, বেলুন কারখানা, লেদ মেশিন, রিকশা চালানো, মাদক বাহক, বিড়ি শ্রমিক, বাস-ট্রাকের হেলপার, লেগুনার হেলপার, নির্মাণ শ্রমিক, গৃহ শিশু শ্রমিক, এমব্রয়ডারি, জাহাজ শিল্প, চিংড়ি হ্যাচারি, শুঁটকি তৈরি, লবণ কারখানা, বেডিং স্টোরের শ্রমিক, ইট ভাঙা, ইট ভাটা শ্রমিক, হোটেল শ্রমিক, ট্যানারি এবং রঙ মিস্ত্রিসহ আরো বিভিন্ন ধরনের কাজ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর(বিবিএস) ২০০৮ সালের হিসেবে অনুযায়ী দেশে শূন্য থেকে ১৭ বছর বয়সের শিশুর সংখ্যা ৬ কোটি ৭৭ লাখের বেশী। এদের মধ্যে প্রায় ৩৫ লাখ শিশু নানা ধরনের কাজের সঙ্গে জড়িত। মোট শিশু শ্রমিকদের মধ্যে ১৩ লাখ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। ২০০৮ সালের হিসেবে থেকে ২০১২ সালের হিসেবে যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে তাতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সরকারি প্রকল্পগুলো তেমন একটা কাজে আসেনি। মাত্র চার বছরের ব্যবধানে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে ১০ লাখ। শুধু তাই নয় আগের চেয়ে নির্যাতনের মাত্রা কমেনি, বরং বেড়েছে। শিশু শ্রমিকদের কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের মালিকরা স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক কোন আইনের তোয়াক্কা করছে না কেউ। এমনকি মজুরি কম দিয়ে প্রতিনিয়তই তাদের ঠকাচ্ছে। সংবিধানের ৩৪ অনুচ্ছেদ উপেক্ষা করে শিশুদের দিয়ে জোর করে কাজ করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অথচ এখন পর্যন্ত শিশু শ্রমের দায়ে বাংলাদেশে একজনকে শাস্তি পেতে হয়েছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় না।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা(আইএলও) শিশু আইনের বিভিন্ন ধারায় কাজের ধরনের ক্ষেত্রে শিশুর বয়স নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ১৬ থেকে ১৮ বছরের শিশুরা এই কাজ করতে পারবে। ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সের শিশুরা হালকা পরিশ্রমের কাজ করতে পারবে। অন্য দিকে বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের শিশু আইনে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত একজনকে শিশু হিসেবে ধরা হয়েছে। আবার জাতীয় শিশু নীতিতে ১৪ বছর বয়সের কাউকে শিশু হিসেবে চিহ্নিত করার বিধান দেওয়া আছে। ভিন্ন ভিন্ন বয়সের সুযোগ নিয়ে শিশুদের বিভিন্ন ধরনের কাজে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। আইনে শূন্য থেকে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের সবধরনের শ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ৫ বছর বয়সের শিশুকেও জোর করে নানা ধরনের কাজে নিয়মিত ব্যবহার করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে শিশু শ্রমের অন্যতম বা একমাত্র কারণ হলো দরিদ্র্য। দেশের ৩১ দশমিক ৬ ভাগ মনুষ দরিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করে। এ সব পরিবারের সদস্যদের মাথাপিছু আয় দৈনিক ৮০ টাকারও কম। এদের অনেকের নূন্যতম কোন জমিও নেই। ফলে এসব পরিবারের শিশুরা তাদের পেটের ক্ষুধা নিবারণ করার জন্য শিশু শ্রমে নিপতিত হয়। নিজেদের জন্য, পরিবারের জন্য তারা জীবন বাজি রেখে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতেও দ্বিধা বোধ করে না।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক সমীক্ষায় দেখা যায়,বাংলাদেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৬৫ লক্ষ (৬.৬ মিলিয়ন) যা পৃথিবীর মোট শিশু শ্রমিকের ২.৬ অংশ। আমাদের মোট জনসংখ্যার ৪৭ শতাংশ ই শিশু,যাদের বয়স ষোল বছরের কম। সমীক্ষায় দেখা যায়,এদের প্রতি ১০০জনে ১৯ জন শিশু শ্রমিক।একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের রাস্তায় শিশুর সংখ্যা ১১ লাখ ৪৪ হাজার ছাড়িয়ে যাবে।

শ্রম আইনের ৩৪ ধারা মোতাবেক কোনো পেশায় বা প্রতিষ্ঠানে কোনো শিশু বা কিশোরকে নিয়োগ করা যাবে না বা কাজ করতে দেয়া যাবে না, যদি না বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত ফরমে একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রদত্ত তাকে সমতা প্রত্যয়নপত্র মালিকের হেফাজতে থাকে। বাংলাদেশ শ্রম আইনের ২(৬৩) ধারানুসারে শিশু অর্থ ১৪ বছর বয়স পূর্ণ করেনি এমন কোনো ব্যক্তি এবং কিশোর অর্থ ১৪ বছর বয়স পূর্ণ করেছে কিন্তু ১৮ বছর বয়স পূর্ণ করেনি এমন কোনো ব্যক্তি [ধারা ২(৮)]

সরকার ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধে আইএলও’র ১৮২ সনদে স্বাক্ষর করেছে। আইন অনুযায়ী শিশু বিক্রি, পাচার, ভুমি দাসত্ব, দেহ ব্যাবসা , অশ্লীল দৃশ্যে অভিনয়ের জন্য শিশুর ব্যবহার, মাদক দ্রব্য উৎপাদন, মাদক পাচারে শিশুর ব্যবহার করাকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। এই সনদ অনুযায়ী ১৬ থেকে ১৮ বছরের কম বয়সের কোন শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে পারবে না।

রাজধানীর মিরপুর,আমিন বাজার,সাভার,জয়দেবপুর, টঙ্গী,সমগ্র পুরনো ঢাকা,বুড়িগঙ্গার ওপাড়ের কালীগঞ্জ,জিঞ্জিরা,মোহাম্মদপুর,বসিলা,এবং বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী কয়েক হাজার কল-কারখানা,(ছোট,মাঝারি) রয়েছে যেগুলোতে শিশু শ্রমিকের সংখ্যাই বেশি,এসব কারখানার মধ্যে রয়েছে পুরনো ব্যাটারি ভাঙ্গা,সীসা গলানো,সল্যুশন বা আঠা তৈরির কারখানা, আতসবাজি বানানোর কারখানা, লেদ মেশিন, জুতার কারখানা, সাবান ও কস্টিক সোডা প্রস্তুতের কারখানা, প্লাস্টিক গলানো, প্লাস্টিক এর কারখানা, চুড়ি,কসমেটিক, বিড়ির কারখানা, গাড়ির গ্যারেজ, ওয়েল্ডিং এর কারখানা, ফার্নিচারের কারখানা, রং ,পুটী, ভেজাল রং, কৃত্রিম গহনা, ইট/পাথর ভাঙ্গা, ইটের ভাটায় কাজ করা সহ নানান অমানবিক এবং ঝুঁকি পূর্ণ কাজে সর্বত্র শিশু শ্রমিক রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে,দেশের ৩৫ লাখ শিশু শ্রমিকের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে ১৩ লাখ শিশু,যা মোট শিশু শ্রমিকের ৪১ শতাংশ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলওর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের শিশু শ্রমিকরা প্রায় ৩৪৭ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত! এর মধ্যে ৪৭ ধরনের কাজকে ঝুঁকিপূর্ণ ও ১৩ ধরনের কাজকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে শুধুমাত্র একবেলা খাবার জোগাড় করতে এ পথশিশুরা দৈনিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ।

১৯৪৭ সালের শিশু আইনের ৪৪নং ধারায় শিশুশ্রমিকদের কোথাও নিয়োগদানের অপরাধে ১ হাজার টাকা জরিমানা ও ৩৪নং ধারায় শিশুদের দৈহিক নির্যাতনের অপরাধে ২ বছর শ্রম কারাদন্ড অথবা উভয়দন্ডে দন্ডিত করার বিধান থাকলেও এসব জাগায় তার কোনো তোয়ক্কা না করেই শিশুদের ওপর চালানো হচ্ছে অমানবিক নির্যাতন । মালিক পক্ষের কথা শিশুদের দিয়ে কাজ করানো যদি অপরাধ হতো, তাহলে তো পুলিশ অবশ্যই গ্রেপ্তার করতো । হ্যাঁ তাই তো ।

শিশুদেরকে কঠিন শ্রমে নিয়োজিত করার পেছনের কারণ সংসারের অসচ্ছলতা কারো কারো অভিভাবক না থাকা এবং অসচেতনতা। আইন আছে কিন্তু তার প্রয়োগ নেই।

সরকারের উচিত শিশু শ্রম প্রতিরোধ দিবস পালনটি শুধু আনুষ্ঠানিকতায় পালন না করে এর গুরুত্ব উপলব্ধি করে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করা । তবেই এর উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন সম্ভব । সরকার কে বলছি , দয়া করে এই সব শিশুদের ৫ টি মৌলিক অধিকার,যথা – অন্ন ,বস্ত্র , বাসস্থান , শিক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করুন ।

এত কিছুর পরও আমরা আশায় বুক বাধি হয়ত একদিন বন্ধ হবে এ শিশু শ্রম। ওরাও তো কারো পুত্র ,কন্যা , ভাই, বোন । আমরা কেন ওদের দিকে তাকিয়ে আমাদের সন্তান , কিংবা ভাই বোনের মুখটি স্মরণ করতে পারি না । আমাদের সহযোগিতার হাতটা কেন এগিয়ে দিচ্ছি না ।

মালিক পক্ষের লোকজন, যে টাকা একবেলা রেস্টুরেন্টে বসে খেয়ে বিলাসিতা করেন তাই না হয় একটি শিশুকে দিয়ে দিন , এতে আপনার কিছুই ফারাক পরবে না , কিন্তু ঐ শিশুটির অনেক চাহিদাই পূরণ হতে পারে । প্রত্যেক বিত্তবান মানুষ যদি একটি করেও অসহায় শিশুর দায়িত্ত নেন তাহলে এসব অসহায় শিশুগুলো দেশের বোঝা না হয়ে হতে পারে মানব সম্পদ। সব দায়িত্ব কি শুধু সরকারের , আমাদের কি কিছুই করার নেই ? আমরা কি এই ভেবে বসে আছি , আবার কখন ও যুদ্ধ হলে অস্ত্র হাতে নিয়ে যুদ্ধ করব । প্রতিনিয়ত যে কত ধরনের যুদ্ধ করছে আমাদের দেশের মানুষ গন , আসুন এই সব যুদ্ধে আমরা সাধ্যমত নিজেদের সামিল করি । দেশ মাতার ঋণ একটু একটু করে শোধ করার চেষ্টা করি ।

তথ্য সুত্র – প্রথম আলো মানব জমিন ও অন্যান্য ।

লিয়া সরকার ।