ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

বিভিন্ন মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলো প্রতিনিয়ত রিচার্জের উপর বোনাসের যে বিজ্ঞাপন গুলো দিচ্ছে, তা যে ভাবে উপভোগ করার পদ্ধতি উল্লেখ থাকে , তা আসলেই প্রহসন । আমি ব্যাক্তিগত ভাবে গ্রামীণ এবং এয়ারটেল ব্যাবহার করি । আমি উপার্জনহীন একজন মানুষ, তাই মোবাইলে কথা বললে বুঝে শুনে বলি । অল্প কথা বলা কিংবা পিক , অফ পিক আওয়ারের কথা ভাবতে হয় । গণমাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপন দেখলে সেই সুযোগের সদব্যাবহার করতে চেষ্টা করি ।

এয়ারটেলের কথাই বলি –

প্রতিদিন ৫ টাকার কথা বললেই ১ টাকা ফেরত , খুশির কথা , কিন্তু এতে থাকে শর্ত প্রযোজ্য। অন্য অপারেটরে কথা বলতে হবে বা অন্য কিছু , এবং সময় বেঁধে দেওয়া , কেন ? এটা কি মূল ব্যাল্যান্সের সাথে যোগ করা যায় না ? আমার যাকে খুশী আমি তাকে করব । তবেই না বোনাসটা আমার কাজে লাগবে ।

কখনো কখনও বলে রিচার্জের আগে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে । দেখুন কার এত মনে থাকে , কিংবা সবাই হয়ত জানেও না । সেতো রিচার্জে এই বোনাসটা পাবে না । আমি নিজেও অনেক সময় রেজিঃ না করে রিচার্জ করে ফেলি , তারপর মনে হলে বলি –রেজিঃ করলে কয়টা টাকা বেশি আসতো । রেজিঃ তে চার্জ কাটে না , ওদের যদি দেয়ার ইচ্ছা থাকে তাহলে রিচার্জ করলে বোনাসটা আপনিতেই দিয়ে দিক । এত ভনিতা করার দরকার কি ? বোনাস দিলে নিবে না এমন মানুষ কে আছে ?

প্রতিদিন সবাই কত কত টাকা রিচার্জ করছে , বোনাসটা যদি আপনিতেই যোগ হয়ে যায় তাহলে সবাই এর সুবিধা ভোগ করতে পারবে । যেন মেঘ না চাইতেই জল মনে হবে ।তখন মানুষ কে আকৃষ্ট করতে বিজ্ঞাপনের দরকার হবে না । প্রায় সময় এসএমএস আসে , – — টাকা বোনাস আপনি যদি এত থেকে এত তারিখ পর্যন্ত এত টাকা ব্যাবহার করেন তবে । কেন , এইসব ঝামেলা না করে বলুক ব্যাবহারের উপর এত % হারে বোনাস পাওয়া যাবে । তাহলেই তো হয়।

এখন এবারের ঈদে আবার নতুন আইডিয়া বের করেছে , বার্গারের ছবি দিয়ে ট্রিপল বোনাসের ব্যবস্থা করেছে । আমি অধম আবারও ফাঁদে পা দিলাম । আমি প্রথমে ২০ টাঁকা তারপর ৩০ টাকা তারপর আবার ৫০ টাকা আমার এয়ারটেল নম্বরে ৩ বারে রিচার্জ করতে । এভাবে ১০০ টাকা রিচার্জ করলাম । আমার বোনাস এসেছে ১১৫ টাকা আর এসএমএস ৪০০ টি । কিন্তু ওদের হিসাব মতে আরও বেশী হওয়ার কথা ছিল । কারণ প্রতি রিচার্জে যথাক্রমে ১০০%, ২০০% , ৩০০% হারে বোনাস পাওয়ার কথা ।

সীমাবদ্ধতা তো আছেই নন এফ এন এফ নম্বর হলে চলবে না , সময় বেঁধে দেয়া আরও কত কি ! আমি যাদের সাথে কথা বলি তাদের সাথে এফ এন এফ করা , যাই হোক বোনাসের একটি টাকাও আমি খরচ করতে পারিনি । ৩ দিন শেষ , বোনাসও শেষ । আমার কথা বোনাসই যদি দিবে , তাহলে এত শর্ত না দিলে কি হয় না ?

গ্রামীণ ফোনের বেলায়ও একই অবস্থা ,

রিচার্জের আগে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে । না করলে হবে না । বিগত মাসের চেয়ে চলতি মাসে যত টাকা বেশি ব্যাবহার করবে তার উপর বোনাস , নানান কিছু । ১০ টাকায় ৪০ মিনিট কিনলে এক দিনেই শেষ করতে হবে । বারে, আমি নগদ টাকা দিয়ে কিনেছি , অন্তত ২ দিন সময় দিক । আমার কি ৪০ মিনিট ভালভাবে ব্যবহার করার অধিকার নেই ? অন্য অপারেটরের কথা জানি না । যত প্যাকেজেই ঘোষণা করা হোক না কেন , আসলে ঘুরে ঘুরে যেই লাউ সেই কদুই হয় ।

আরেকটি কথা , এসব কোম্পানিগুলো বিভিন্ন এসএমএস এ বাংলা লিখা গুলো ইংলিশে লিখে, কিন্তু চাইলেই বাংলা ভাষায় এসএমএস পাঠাতে পারে। এসব লিখার মর্মোদ্ধার করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পরে । যেখানে বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার স্বীকৃতি পেয়েছে , এবারের আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বাংলা ভাষায় ব্যালট পেপার ব্যবহার হয়েছে । সে খানে আমাদের দেশে বাংলার ব্যাবহার কম হচ্ছে কেন ? এটা অনুচিত বলে আমি মনে করি । আশা করি বিষয়টি বিবেচনা করা হবে ।

আমাদের দেশ গরিব দেশ । এ সব চটকদার বিজ্ঞাপন না বানিয়ে আপনারা খরচ কমান। বাংলালিংক তো মিনিট ব্যাপী বিজ্ঞাপন বানায় । কি লাভ এত করচ করে ? আমরা অলরেডি জেনে গেছি দেশে গ্রামীণ ফোন , বাংলালিংক , এয়ার টেল , টেলিটক , সিটিসেল , রবি ইত্যাদির নেটওয়ার্ক আছে । আর নতুন করে জানাতে হবে না । যখন আমরা আমাদের প্রিয়জনদের সাথে কথা বলি , তখন বুঝি এসব নেটওয়ার্কের মুল্য, যখন নেটওয়ার্কের অভাবে কথা বলতে পারি না, তখনও বুঝি এসব নেটওয়ার্কের গুরুত্ব কতখানি । আমরা সেজন্য আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ ।

এ সব প্রতিষ্ঠানকে বলছি , আপনারা সাদামাটা বিজ্ঞাপন দিন , প্রয়োজনে শুধু কথা বলে ১৫/২০ সেকেন্ডে জানিয়ে দিন , আপনাদের দেয়া সুবিধার বিজ্ঞাপন । আমি জানিনা সারাদিন কত শত বার যে ফোন কোম্পানির বিজ্ঞাপন গুলো প্রচারিত হয় । এছাড়া অনুষ্ঠান স্পন্সর করা , সংবাদ পত্র , অনলাইন , বিলবোর্ডে বিজ্ঞাপন আরও কত কি তো আছেই । আমি মনে করি , এসব মাত্রাতিরিক্ত । এসব খরচ তো আমাদের কাছ থেকেই উঠান । তাই এত খরচ বাদ দিয়ে এই টাকা আপনারা সমাজসেবা মূলক কাজে ব্যায় করুন । সবচেয়ে ভাল হয় শিশু এবং বৃদ্ধ দের কল্যানে ব্যয় করলে । আপনারা চাইলে ফাণ্ড করতে পারেন ।

এসএমএস এর মাধ্যমে আমরা আমাদের সাধ্যমত টাকা পাঠানোর সুযোগ করে দিতে পারেন । ১৬ কোটি মানুষের দেশে প্রতি মাসে ১ লাখ মানুষ যদি ৫ টাকা করেও এসএমএস করে পাঠায় তবেও ৫ লাখ টাকা হবে , বছরে ৬০ লাখ টাকা হবে । এটাই বা মন্দ কি ? বিজ্ঞাপন দিয়ে টাকা অপচয় না করে মহৎ কাজের উদ্যোগ নিন ।

আমি জানি আমার এ স কথার জবাবে উনারা তাদের CSR (Corporate social responsibility ) কার্যক্রমের কথা বলবেন । নিম্নে এ সব মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলোর বিশেষ CSR কার্যক্রম গুলো উল্লেখ করছি –

গ্রামীণ ফোন –

নিরাপদ মাতৃত্ব ও শিশুর যত্ন প্রকল্প ।
১৭ লক্ষাধিক দরিদ্র ও দুঃস্থ গর্ভবতী মা ও তাদের সন্তানদের বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান ।
২৮৭৮০ জন মানুষের বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা প্রদান এবং ৩৪৫৮ জন লোক দৃষ্টি শক্তি ফিরে পেয়েছে ।
জাতীয় টিকা দিবস , AIDS এর মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সচেতনতা সৃষ্টি ।
৪০০, ০০০ এর অধিক পল্লী ফোনের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে ।
বাংলাদেশ স্পেশাল অলিম্পিক টিমের গর্বিত স্পন্সর ।
এসিড দগ্ধদের চাকুরীর সুযোগ সৃষ্টি করা ।
দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান ।
দুঃস্থ ও থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য রক্তদান শিবির ।
বগুড়াতে দরিদ্র ও দুঃস্থ রোগীদের জন্য ব্লাড ব্যাংক প্রতিষ্ঠা ।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে জরুরী ত্রান সেবা ।

বাংলালিংক –

কক্সবাজার সি বীচ পরিচ্ছন্নতা প্রকল্প
হাজী ক্যাম্পে হজ্জ যাত্রীদের বিভিন্ন সুবিধা প্রদান যেমন , এসি বাস , পানি সরবরাহ , ফ্রি ফোন কল , মোবাইল চার্জ করনের ব্যবস্থা ।
এতিম খানায় খেজুর পানি এবং ইফতার বিতরন ।
ICT সহায়তায় দরিদ্র শিশুদের কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন ।

রবি –

শীতার্ত মানুষের জন্য কম্বল বিতরন ।
১০০০ স্কুলে প্রতিদিন Daily star পত্রিকা বিতরণ ।
দূরবর্তী গ্রামে ৭২ টি কলেজে কম্পিউটার কর্নার স্থাপন।
বিভাগীয় শহরে পাবলিক লাইব্রেরী ইন্টারনেট কর্নার স্থাপন ।
“প্রতিবন্ধিতা করবো জয় ” এই কর্মসূচীর অধীনে পঙ্গু শিশুদের চিকিৎসা সেবা প্রদান ।
প্রধান রেলওয়ে স্টেশন গুলোতে বিশুদ্ধ পানির সুব্যাবস্থা ।
প্রত্যন্ত অঞ্চলে কয়েকশ বাড়িতে সোলার প্যানেলের সুবিধা প্রদান ।
ব্লাড ক্যানসার রোগী সোমা কে সহায়তা প্রদান ।

টেলিটক

শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুসেবায় এসএমএস হেল্প লাইন ।
ক্যানসার রোগী বুশরা কে সহায়তা ।
রক্তদান কর্মসূচী ।
৫০০ কম্বল প্রদান ।

এত বড় মোবাইল অপারেটর কোম্পানির জন্য এই কাজগুলো কি যথেষ্ট ? গ্রামীণ ফোন মোটামুটি সন্তোষজনক কাজ করছে । বাংলালিঙ্কের জন কল্যানমূলক কার্যক্রম কি সন্তোষ জনক ? টেলিটকের তো আরও খারাপ অবস্থা । মনে ছবি তুলে নিজেদের ওয়েবসাইট ভরানোর চিন্তা ।

ঠিক আছে , আপনারা আপনাদের সাধ্যমত , পছন্দমত কাজ করেন , আমি সে দিকে হস্তক্ষেপ করছি না । দয়া করে আপনারা শুধু বিজ্ঞাপন বাবদ এসব অপচয় কমিয়ে অসহায় শিশু এবং বৃদ্ধদের কল্যানে ফান্ডের ঘোষণা দিন । এটাই হতে পারে আপনাদের জন্য শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞাপন । বিজ্ঞাপন দিয়ে শুধু তেলের মাথায় তেল না দিয়ে আসুন আমরা রুক্ষ মাথায় তেলের যোগান দিই।

সাধারন মানুষেরা আমাদের দেশের নেতা , ধনী ব্যবসায়ী, শিল্পপতিদের মত লুটপাটের চিন্তা করে না । আমরা সবাই দেশের দুর্দশা লাঘবের জন্য কাজ করতে চাই । মোবাইল কোম্পানিগুলো হতে পারে এ ব্যাপারে শক্তিশালী মিডিয়া । মানুষের জন্য কল্যানকর পদক্ষেপই হবে আপনাদের প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন, আমরা সাধারন জনগন নেব আপনাদের কথা প্রচারের দায়িত্ব । মোবাইলে এসএমএস পাঠিয়ে বিভিন্ন প্যাকেজের খবর জানানোটাও তো বিজ্ঞাপনের কাজ করছে।

নিজের লভ্যাংশ থেকে বলছি না বিজ্ঞাপনের খরচ আর আমাদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে শুরু করুন মহতী পদক্ষেপ । এত টুক তো আপনারা চাইলেই পারেন ।

আমাদের দেশে দু একটি কোম্পানি আছে যারা তাদের প্রোডাক্টের বিক্রয় মুল্য থেকে ১ টাকা কিংবা ছোট একটি অংশ সমাজসেবা মূলক কাজে ব্যায় করে । আমি তাদের সাধুবাদ জানাচ্ছি। আশা করছি অন্যান্য প্রতিষ্ঠান গুলো এভাবে এগিয়ে আসবে ।

আমরা প্রসাধনী থেকে শুরু করে খাবার , পোশাকের জন্য নানান দেশী বিদেশী প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভরশীল । এ সব ক্ষেত্রে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা , কিন্তু মোবাইল নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রে আমরা হাতে গোনা কয়টি প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভরশীল । গোটা দেশের মানুষের উপর গুটি কয়েক প্রতিষ্ঠান আধিপত্য বিস্তার করে আছে । তাই এ সব প্রতিষ্ঠান বেশ বড় পরিসরে , ফলাও করে মহতী উদ্যোগ নিতে পারে । ফলে আমাদের সকলের তাতে শামিল হবার সুযোগ থাকে

এ রকম মহতী উদ্যোগ নিলে তুমুল বিজ্ঞাপনের দরকার হবে না , আমাদের বোনাসের আশ্বাস দিতে হবে না । আপনাদের নির্ধারিত কল চার্জ আর ভ্যাটেই আমরা কথা বলতে পারব । আমরা এই ভেবে সস্থি পাব , যে আমরা কোন ভাল কাজের সাথে যুক্ত আছি । আমরা খুশি হয়ে কৃতজ্ঞ চিত্তে আপনাদের নেটওয়ার্কে থাকব । সবাই হতে চায় ভাল কাজের গর্বিত অংশীদার ।

হোক না আপনাদের নতুন শ্লোগান –

“ সুন্দর আগামীর জন্য …….ফোন” ।

তথ্যসুত্র – ইন্টারনেট ।

লিয়া সরকার ।