ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

আমাদের দেশের টিভি দর্শকের (যেখানে ডিশ সংযোগ আছে) প্রায় সব দর্শকই বেশির ভাগ সময় জুড়ে হিন্দি এবং ইলিশ চ্যানেলগুলো দেখে বলে আমি মনে করি। আমার পরিবার থেকে শুরু করে আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব, প্রতিবেশী, পরিচিতজনকে বিবেচনায় এনে এই জরিপটা নিজেই করলাম । আমার মনে হয় আপনারা তাতে দ্বিমত পোষণ করবেন না ।

শিশুরা হিন্দি ভাষার কার্টুন গুলো দেখে, পারলে সারা দিন দেখতে চায়, এমনকি অনেক শিশু ভাল হিন্দি বলে। আমাদের মা, খালারা যারা হিন্দি ভাষায় এখনো অভ্যস্ত হতে পারেননি তাদের কাছে প্রিয় জি বাংলার অগ্নিপরীক্ষা, রাশি , কেয়া পাতার নৌকো আরও অনেক সিরিয়াল । যারা হিন্দি ভাষাটা ভাল বোঝেন তাদের জন্য , বড়ে আচ্ছে লাগতে হ্যায় , ইস পেয়ার কো ক্যায়া নাম দু , আফসার বেটিয়া , ইক হাজারো মে মেরি বেহনা হ্যায় সহ আরও অসংখ্য সিরিয়াল । মিরাক্কেল আক্কেল চ্যালেঞ্জার, দাদা গিরি , দিদি নাম্বার ওয়ান সহ নানান কুইজ ভিত্তিক অনুষ্ঠান দেখতে জি বাংলার আশ্রয় নেন । CID , crime petrole অনুষ্ঠান গুলো বাংলাদেশে অনেক জনপ্রিয় । বিভিন্ন রিয়েলিটি শো , যেমন , ইন্ডিয়ান আইডল , সা রে গা মা পা , ডান্স ইন্ডিয়া ডান্স , মাষ্টার শেফ ইন্ডিয়া , বিভিন্ন ট্যালেন্ট হান্ট অনুষ্ঠান গুলোর দর্শকের অভাব নেই । ওদের এ্যাওয়ার্ড প্রোগ্রাম গুলো মানুষ সুযোগ পেলেই দেখে । এই হচ্ছে টি ভি প্রোগ্রাম দেখার হালচাল ।

কথা হচ্ছে মানুষ কেন এসব দেখে ? এর কারণ বিভিন্ন । শেখার আশায় , বিনোদনের আশায় , সময় কাটানোর আশায় মানুষ ঘুরে ফিরে ওদের অনুষ্ঠান গুলোই দেখে । শিশুদের জন্য আমাদের দেশের টিভি চ্যানেল গুলোর তেমন কোন আয়োজন নেই , কিন্তু ভারতে শিশুদের কথা বিবেচনায় রেখে আলাদা চ্যানেল আছে , তাই তাদের শিশুর পাশাপাশি আমাদের শিশুরাও এতে আকৃষ্ট হয়।

ওদের সিরিয়াল গুলোতে একজন মানুষকে তারা একটা চরিত্র করতে দেখে , নিদ্রিষ্ট সময়ে সিরিয়াল শুরু হওয়া , কম বিজ্ঞাপন বিরতি , সপ্তাহে ৫/৬ দিন প্রচার , নানান মেজাজের চরিত্র , সুন্দর সাজ পোশাক, আভিজাত্য , এসব কারনে সিরিয়াল গুলোর প্রতি মানুষ আকৃষ্ট হচ্ছে । যেখানে আমাদের দেশে একজন শিল্পি একসাথে ৫/৬ টি ধারাবাহিক নাটক করে , শুরু কখন হবে তার কোন ঠিক নাই , বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে নাটক প্রদর্শন , ঘুরে ফিরে একই ধরনের চরিত্র , কম বাজেটের কারণে নানান সীমাবদ্ধতা , মানহীন গল্প , পরিচালনা ইত্যাদিকে দায়ী করে মানুষ দেশী চ্যানেল বিমুখ হচ্ছে ।
আমাদের দেশেও রিয়েলিটি শো হয় , কিন্তু এসবের মান নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে ,

গান , নাচ , রান্না, সুন্দরী প্রতিযোগিতা , কৌতুক সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রিয়েলিটি শো হয় । কিন্তু এগুলো কোন ফাঁকে যে হয়ে যায় মানুষ তামন জানতেও পারে না , কারণ যথাযথ ভাবে এর প্রচার হয় না , সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার এই অনুষ্ঠান গুলোতে বিচারক হিসেবে কিছু মানুষকে নির্বাচন করা হয়েছে এবং বর্তমানে একই ধারা অব্যাহত আছে , যাদের এ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা নেই । আমার কথা হল , তারা কি বিচার করবে ? একজন নায়িকা , যার গান কিংবা নাচ সম্পর্কে তেমন কোন শিক্ষা নেই ,হয়ত দু চারটি গান জানে ,আর হাত পা দুলিয়ে অল্প বিস্তর নাচে , সে গান নাচের কি বিচার করবে ?

কেন দেশে কি গুণী কণ্ঠ শিল্পি , নৃত্য শিল্পির আঁকাল পরেছে ? এসব দুর্নীতি , গুণী মানুষদের অসম্মান করা হচ্ছে । এসবের জন্য দর্শক এসব অনুষ্ঠান বয়কট করছে ।

তালাশ, একুশের চোখ, টকশোসহ ভাল অনুষ্ঠান মানুষ ঠিকই দেখে । একটা অনুষ্ঠান শুরু হলে একটু পর পর বিজ্ঞানের বন্যা আর সংবাদের জ্বালায় অনুষ্ঠান দেখা দায় হয়ে পরে । এইতো সে দিন হুমায়ুন আহমেদের ছবি চন্দ্রকথা দেখছিলাম , এত বিজ্ঞানের বন্যা আর সংবাদের ফাঁকে ফাঁকে দেখা দুষ্কর হয়ে গিয়েছিল । বাধ্য হয়ে বাই বাই বলেছি ।

আমাদের দেশে ওদের সিরিয়াল এমন প্রভাব ফেলছে যে খুশী , পাঙ্কুরি , আকশারা নামধারী পোষাক আমাদের অনেক মেয়েদের পছন্দের তালিকায় মোটামোটি শীর্ষ স্থান দখল করে আছে। ঈদ সহ বিভিন্ন উৎসবে দিব্যি এসব পোশাক বিশাল অঙ্ক দিয়ে কিনে খুশি মনে বাড়ি ফিরছে । অথচ আমাদের দেশী পোশাক গুলো সেই তুলনায় দামে অনেক সস্তা এবং সুন্দর । শাড়ির বেলায়ও একই আগ্রাসন । Star movies , HBO সহ অন্যান্য ইংলিশ চ্যানেল গুলোতেই সেই ভারতীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে তাদের দখলে ।

আমাদের দেশীয় চ্যানেল গুলোতে বিভিন্ন সময়ে ভারতীয় শিল্পীদের গান করার আমন্ত্রণ জানানো হয় , সেটা ঈদ সহ বিভিন্ন সময়ে । এমনকি , এ বারের ঈদে আমাদের একটি চ্যানেলে ইন্ডিয়ান অ্যাওয়ার্ড প্রোগ্রাম আইফা এওয়ার্ড প্রচার করা হয়েছে । জানিনা কেন আমরা অকারণে গানকরা , অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করার জন্য ওদের শিল্পীদের টানাটানি করি । আমাদের কয়টা শিল্পী ওদের দেশে লাইভ প্রোগ্রাম করছে ? কেন দেশের টাকা এত সযতনে দিয়ে দিচ্ছি ?

হ্যাঁ ওদের নাটকে , সিনেমায় কিংবা অন্যান্য ক্ষেত্রে এদেশের দু একজন শিল্পী কাজ করছে। কলকাতায় একটি চ্যানেলের নাটকে বাংলাদেশের একটি ছেলে, একটি মেয়ে অভিনয় করলেও নাট্যকার , পরিচালক ও প্রেক্ষাপট সব কলকাতার । সিনেমার বেলায়ও একই ঘটনা ।

বাংলাদেশের চ্যানেল মালিকরা ভারতীয় ক্যাবেল অপারেটরদের মোটা অঙ্কের টাকা দিতে পারছেনা বলে , এদেশের কেনো টিভি চ্যানেল ভারতে দেখানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না । অথচ আমরা টাকা দিয়ে ভারতীয় চ্যানেল দেখছি । আমরা ক্যাবেল অপারেটরদের মাধ্যমে ভারতীয় চ্যানেল মালিকদের প্রতি বছর হাজার কোটি টাকা নামে, পে-চ্যানেলের ফি বাবদ , দিয়েই যাচ্ছি। এই আগ্রাসন আমার কাছে মহামারী মনে হচ্ছে । এথেকে পরিত্রাণের উপায় আমাদেরই খুঁজতে হবে ।

প্রতিটা চ্যানেল যদি নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়ে তাদের অনুষ্ঠানের কথা ভাবে ,

আমাদের প্রখ্যাত লেখক , গুণী শিল্পী , গুণী নির্মাতা , কলাকুশলীর সমন্বয়ে সঠিক নীতিমালার সমন্নয়ে অনুস্থান তৈরি করে

শিশুদের জন্য পৃথক চ্যানেল অনুমোদন

সব বয়সী দর্শকের কথা বিবেচনায় রেখে অনুষ্ঠান নির্মাণ ।

সঠিক সময়ে অনুষ্ঠান প্রচার এবং ছোট বিজ্ঞাপন বিরতি ।

আজে বাজে মানহীন অনুস্ষ্ঠান বাদ দিয়ে ভাল মানের অনুষ্ঠান প্রচার ।

অনুষ্ঠান নির্মাণে নতুনত্ব এনে সৃজনশীলতার পরিচয় দেয়ার চ্যলেঞ্জ গ্রহন করতে হবে । তবেই দর্শকদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে । আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি , দর্শক ফিরে আসতে বাধ্য হবে।

এ বারের ঈদে আমাদের টিভি চ্যানেলে কমপক্ষে ২ শত নাটক ও অন্যান্য অনুষ্ঠান ৬/৭ দিন ব্যাপী প্রচারিত হয়েছে । প্রশ্ন হল কতগুলো নাটক দর্শকেরা দেখেছে ? এবং কতগুলো মান সম্পন্ন ?যদি অনুষ্ঠান নির্মাণ এবং প্রচারের ক্ষেত্রে দর্শকদের কথা বিবেচনায় আনা হতো তবে এ চ্যনেল গুলোর প্রতি আমরা এত বিমুখ হতাম না ।

এবার অল্প কথায় চলচিত্র প্রসঙ্গ

ঘুরে ফিরে আমরা হিন্দি এবং ইংরেজি ছবি দেখি। হুমায়ুন আহমেদের ছবি হলে তো সবাই দেখি। তেমনি আনিসুল হকের রচনায় সরয়ার ফারুকি, গিয়াস উদ্দিন সেলিম , এনামুল হক নির্ঝর , তানভীর মকাম্মেল , প্রয়াত তারেক মাসুদের ছবি সবাই দলে দলে সিনেমা হলে গিয়ে দেখি। তাই সহজেই বলতে পারি , ভাল ছবি হলে চলচিত্রে সুদিন শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র

রিকসাওয়ালা , গার্মেন্টস কর্মীদের কথা ভেবে ছবি বানালে তো চলচিত্রের তো এই হাল হবেই । অনন্ত জলিল বড় বাজেটের , গতানুগতিক ধারার বাইরে ছবি বানাচ্ছেন , এ নিয়ে আমি তেমন কিছু লিখলাম না , শুধু একটি কথাই বলব , সে চলচিত্রের এই খারাপ সময়টাতে বিপ্লব ঘটাচ্ছেন । কোথায় আমরা সাধুবাদ জানাবো , তা না করে তাকে টেনে হিঁচড়ে আটকে রাখতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ছি । কথায় আছে না , বাঙ্গালী কারো ভাল দেখতে পারে না ।

যেখানে আমাদের ছবির বাজেট ২ কোটি টাকা , সেখানে আমাদের নায়ক সাকিব খান কে দিতে হয় ৫০ লাখ টাকারও বেশি । বাকি টাকায় পুরো খরচ । পুরো ব্যাপারটায় সামঞ্জস্য রাখলে ভাল হয় । সিনেমা হল মালিকদের বলছি , হলের পরিবেশ সুন্দর করুন , ভাল সিনেমা হল নির্মাণ করুন ।

আমার মনে হয় বিষয়টিতে আর হেলা ফেলা না করে সরকার সহ সংশ্লিষ্ট মহলের গুরুত্ব দেয়া ভীষণ জরুরী ।

লিয়া সরকার ।