ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

শিশুর বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঠিক বৃদ্ধি হল শারীরিক বিকাশ । আর মানসিক বিকাশ হল আচার ব্যবহার, চিন্তা চেতনা,কথা বলা , অনুভূতি ও ভাবের আদান-প্রদানের ক্ষমতা অর্জন । তাই শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ছাড়া শিশু তথা মানুষের পরিপূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়।

এ দেশে পাঁচ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ১৮.৩৫ শতাংশ মানসিক রোগে আক্রান্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ-২০০৯ শীর্ষক এই জরিপ চালিয়েছে। জরিপে জানা যায় , মেয়েশিশুর ১৭.৪৭ শতাংশের তুলনায় ছেলে শিশুদের মধ্যে ১৯.২১ শতাংশের মানসিক রোগের প্রকোপ বেশি এবং শহর ও গ্রামের তথ্যও আলাদাভাবে দেয়া হয়েছে। তাতে জানা যায়, শহরের ১৪.৩১ শতংশের চেয়ে গ্রামের ১৭.৫০ শতাংশ শিশুরা মানসিক রোগে আক্রান্ত হয় । জরিপে আরো জানা যায় দেশের ৩.৮১ শতাংশ শিশু মানসিক প্রতিবন্ধী । মৃগীরোগে আক্রান্ত ২.০২ শতাংশ শিশু ।

আর এই বয়সী শিশুদের ০.৭৮ শতাংশ শিশু মানসিক মাদকাসক্ত। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এর গবেষণা দলের সদস্য হেলাল উদ্দিন আহম্মেদ বলেন,‘বংশগতি (জিন) এর কারণে অনেক মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়। পারিবারিক এবং সামাজিক, পারিপার্শ্বিক কারণে অনেক শিশু মানসিকভাবে অসুস্থ হলে পড়ে। এছাড়া শরীর গঠনের সময় কোন ধরণের বাধা পড়লে পরিণতিতে শিশু মানসিক রোগগ্রস্থ হতে পারে’।
শিশুর মানসিক বিকাশ মূলত মায়ের গর্ভ থেকেই শুরু হয় । তাই গর্ভকালীন সময় থেকে শিশুর মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে । এ সময় মাকে মানসিক চাপমুক্ত এবং হাসিখুশি রাখতে হবে । মা যদি এ সময় পারিবারিক কলহ কিংবা অশান্তিতে থাকে তবে শিশুর মানসিক বিকাশে এর প্রভাব পড়বে ।

গর্ভাবস্হা থেকে প্রথম ৫ বছর শিশুর বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপুর্ণ সময়। জীবনের প্রথম বছরগুলোতে শিশু যা শেখে, যেভাবে শেখে তাই তাদের ভবিষ্যৎ বুদ্ধিমত্তা ,ব্যক্তিত্ব, নৈতিক ও সামাজিক আচরণের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। মানসিক বিকাশ মস্তিষ্কের বিকাশের ওপর নির্ভরশীল। মাতৃগর্ভে থাকা অবস্হায় নিউরন নামক মস্তিষ্কের কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। গর্ভবতী মায়ের সুষম খাবার, শারীরিক এবং মানসিক সুস্হতা গর্ভস্হ শিশুর নিউরনের সুষ্ঠু বৃদ্ধি নিশ্চিত করে। জন্মের পর এ কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি হয় না , তবে পারস্পরিক ক্রিয়ামুলক উদ্দীপনার দ্বারা নিউরনগুলোর মধ্যে সংযোগ ঘটে এবং সেগুলো সক্রিয় হয় । এজন্য শিশু যাতে তার পাঁচটি ইন্দ্রিয় প্রতিদিন বারবার ব্যবহারের সুযোগ পায় তার দিকে যত্মবান হতে হবে।

শিশুর বিকাশ কয়েক পর্যায়ে ঘটে-

প্রথম পর্যায়

জন্মের পর সে পর্যায়ক্রমে উপুড় হয়। হামাগুড়ি দেয়, বসে, দাঁড়ায়, হাঁটে ও দৌঁড়ায়।

দ্বিতীয় পর্যায়

প্রথম দিকে শিশু শুধু মা-বাবাকে চিনতে শেখে, তারপর ধীরে ধীরে পরিবারের অন্যদের চেনে, জানে, সবার সঙ্গে মেশে।

তৃতীয় পর্যায়

শুরুতে কান্নাই হলো শিশুর ভাষা। আস্তে আস্তে সে বাবা, দাদা, মামা-এ ধরনের ছোট ছোট শব্দ বলে। এক সময় গুছিয়ে কথা বলতে শিখে ।

সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কের বৃদ্ধি ও বিকাশ সবচেয়ে দ্রুত হয় মাতৃগর্ভে-যা প্রায় শতকরা আশি ভাগ। আর অবশিষ্ট কুড়ি শতাংশ বৃদ্ধি হয়-জীবনের প্রথম কয়েক বছর পর্যন্ত।

মানসিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার কারন সমুহ ঃ

গর্ভকালীন সময়ে মায়ের অপুষ্টি , বাবা মায়ের মধ্যে কলহ , পারিবারিক নির্যাতন , মাদকাসক্তি , থাইরয়েড ও অন্যান্য হরমোনের আধিক্য ও অভাব ,জন্মগত ত্রুটি , প্রসব কালীন জটিলতা ,শব্দ দূষণ ,ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ ইত্যাদি কারনে শিশুর মানসিক বিকাশ ব্যহত হতে পারে ।

মানসিক বিকাশে ব্যহত হওয়ার লক্ষন সমূহ ঃ ঠিক বয়সে বসতে হাটতে , কথা বলতে না পারা , অস্বাভাবিক আচরন করা ,অমনোযোগী থাকা , নিজের শরীরের ক্ষতি করা , হুট করে উত্তেজিত হওয়া , অতিরিক্ত চুপচাপ কিংবা চঞ্চল হওয়া , আদর গ্রহন না করা , স্কুল পালানো, সম বয়সীদের সাথে মিশতে অনীহা প্রকাশ , বড় বয়সেও বিছানায় প্রস্রাব পায়খানা করা , সারাক্ষন মন খারাপ কিংবা ভয়ে থাকা অথবা যে কোন ধরনের অস্বাভাবিক আচরণ করা ।

শিশুর মানসিক বিকাশে করনীয়

গর্ভ কালীন সময়ে মা যেন অপুষ্টি , রোগ রক্তশূন্যতায় না ভুগে কিংবা কোন মানসিক চাপে না থাকে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে ।
শিশুকে সঙ্গ দিন ,তার সাথে গল্প করুন । একটু বড় হলে গল্পের ছলে বিভিন্ন জিনিস চিনিয়ে দিতে পারেন ।

তাকে তার মত স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে আচরণ করতে দিন । যদি মনে করেন শিশুটি ভুল করছে ,তবে তাকে আন্তরিক ভাবে বোঝান ।কখনই কড়া শাসন করবেন না ।

ভাল কাজের জন্য তাকে ছোট খাট উপহার কিনবা চমকের ব্যবস্থা করুন । এতে করে তার আত্মবিশ্বাস যেমন বাড়বে তেমনি ভাল কাজে অনুপ্রাণিত হবে ।

তাকে পূর্ব শিখন থেকে প্রশ্ন করুন ,তার প্রশ্নের জবাব দিন , কখনও তার প্রশ্নকে এড়িয়ে যাবেন না ।

খাওয়ান,ঘুম পাড়ানো ,কান্না থামানো কিংবা অন্যান্য কাজের জন্য কখনই তাকে ভয় দেখাবেন না ।
তাকে একটু একটু করে আত্মনির্ভরশীল করে তুলুন ।

তাকে বেড়াতে নিয়ে যান ।

তার পছন্দকে গুরুত্ব দিন , দেখবেন সে আত্মবিশ্বাসী হচ্ছে ।

সৃজনশীল কাজের সাথে শিশুর পরিচয় ঘটান ।

তার সাথে খেলা করুন ।
শিশুরা অনুকরন প্রিয় তাই তাদের সামনে এমন সব আচরন করতে হবে ,যা তার মানসিক গঠনে সহায়ক হয় ।
কখনই শিশুর সামনে নেতিবাচক কথা বলবেন না । মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিবেন না ।
শিশু অমনোযোগী হলে কারন অনুসন্ধান করুন,প্রয়জনে ডাঃ এর পরামর্শ নিন ।
তার স্বকীয়তা প্রকাশ করতে দিন । তাকে স্বাধীনতা দিন ।
তাকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ান এবং যথাসময়ে টিকা প্রদান করুন ।
ভাল কাজের অভ্যাস গড়ে তুলুন ।
ছেলে মেয়ে শিশুর মধ্যে পার্থক্য করবেন না , আপনার নেতিবাচক আচরন আপনার কন্যাটির মানসিক বিকাশে বাধা হতে পারে ।
আপনি তাকে অনেক ভালবাসেন , তাকে নিয়ে আপনি গর্বিত এটা তাকে বারবার জানান এবং বলুন সে পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ।

শিশুর মানসিক বিকাশে বাবা মায়ের ভালবাসার, সান্নিধ্যের কোন বিকল্প নেই । পরিবারে মাকে নির্যাতিত হতে দেখলে শিশু নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে । শিশুর বাবা মায়ের বন্ধুত্তপূর্ণ ও মধুর সম্পর্ক শিশুর মধ্যে পরম সুখ ও নিরাপত্তাবোধ জাগায় । বাবাকেও শিশুর মানসিক বিকাশে ভুমিকা রাখতে হবে ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক গোল টেবিল বৈঠকে মনোবিজ্ঞানী ডাঃ মেহতাব খানম বলেন, “বিদ্যালয়গামী শিশুদের ৯১ শতাংশ এবং শ্রমজীবী শিশুদের ৬০ শতাংশ কর্মস্থলে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।” ইউনিসেফের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
“বাবা-মায়ের তার সন্তানকে চড় মারার অধিকার রয়েছে,” মন্তব্য করে তিনি বলেন, “কিন্তু এটা শিশুদের মনে কীরকম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এটাও বাবা-মাকে বুঝতে পারতে হবে”। ”তাই বাবা-মাকে শিশুদের মনের অবস্থা বুঝে তাদের শাসন করতে হবে।”

শিশু সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের পারিবারিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন মেহতাব খানম বলেন, “এটা শিশুর মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে এবং বাবা -মা সম্পর্কে শিশুদের মনে খারাপ ধারণা সৃষ্টি করে।”
মনোরোগের চিকিৎসা সম্পর্কে তিনি বলেন, “মনোবিজ্ঞানী বা মনো চিকিৎসক একা এ রোগ সারাতে পারবে না এর জন্য দরকার পরিবারের সহযোগিতা।”

বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে ২১ ধরণের মানসিক রোগের সন্ধান মিলেছে। এর মধ্যে আছে বিষন্নতা, অতিচঞ্চলতা, বিছানায় প্রস্রাব করা, অবাধ্যতা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, ভয়, আঙ্গুলচোষা ও দাঁত দিয়ে নখ কাটা ইত্যাদি। তবে দুই ধরণের মানসিক রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি এক হচ্ছে অঙ্গুলচোষা ও দাঁত দিয়ে নখ কাটা। আঙ্গুল চোষা অভ্যাসের কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রাত্যহিক জীবনে শিশু কোন ধরণের চাপের মুখোমুকি হলে মুখে আঙ্গুল দেয়। আবার ঘুমানোর সময় সম্ভবত ঘুম আনার জন্য আঙ্গুল মুখে দেয়া অনেক বাচ্চার স্বভাব। যদিও তিন বছরের পর থেকে স্বাভাবিকভাবে এ প্রবণতা হ্রাস পাবার কথা। যদি ৫-৬ বছর পরও শিশুর মধ্যে এ অভ্যাস থেকে যায় তবে এর পেছনে কোন মানসিক কারণ আছে বলে ধরে নিতে হবে।

বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে প্রায় ৫৬.৫% শিশু অপুষ্টিতে ভোগে এবং প্রায় ১৬.৫% মানুষ মানসিক রোগে ভোগে সেখানে একটি শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশ আশা করা খুব দুরূহ ব্যাপার। শিশুরা জাতির ভবিষ্যত। আপনার সন্তানের মানসিক বিকাশের দায়িত্ব আপনারই ।সুস্বাস্থ্য, সুশিক্ষা, নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও ভালবাসার দিয়ে শিশুকে শারীরিক ও মানসিকভাবে পূর্ণ বিকশিত করে তুলতে হবে । আপনি যদি আপনার সন্তানকে সঠিক ভাবে মানুষ করতে পারেন তবে সেই হবে আগামীর কর্ণধার নয়তো পরিচর্যার অভাবে ,অবহেলায় অযত্নে বড় হওয়া এই শিশুটিই হতে পারে দেশের বোঝা ।

তথ্যসুত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টফোর ডটকম ,আমার দেশ্‌ , জনকণ্ঠ ও অন্যান্য

লিয়া সরকার ।