ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

আজ বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া রামু যাচ্ছেন। পাকিস্থানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী জনাবা হিনার সাথে বৈঠক শেষে তিনি চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন। সেই বৈঠকে তিনি হিনা-কে দুই দেশের মধ্যেকার সংস্কৃতির মেল বন্ধন ও অদূর ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যেকার সম্পর্কোন্নয়নে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। কেন তিনি এত আশাবাদী বিজ্ঞজনেরা ধারনা করতে পারলেও আমি পারছিনা। ক্ষমা চাওয়ার প্রসঙ্গে যে হিনা আমাদের অতীত ভুলে ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর নসিয়ত দিয়ে গেলেন, আমাদের জন্ম ইতিহাসকে বেমালুম ভুলে যাবার কথা বললেন প্রকারান্তরে আমাদের রক্তাক্ত অতীতকে অস্বীকার করে গেলেন এহেন দেশের সাথে আমাদের সাংস্কৃতিক মেল বন্ধন ও সম্পর্কের উন্নয়ন কি করে হবে বুঝিনা। তবুও তিনি বিরোধী দলীয় নেত্রী, রাজনীতিতে তাঁর প্রজ্ঞার অভাব নেই। হয়ত দেশের খাতিরে আমার মত অতি আবেগপ্রবণদের রাজনৈতিক বোধ বুদ্ধির ঘাটতি থাকে (!!)।

যে কথা বলছিলাম বিরোধী দলীয় নেত্রী আজ রামু যাচ্ছেন। রাত ১২টার কিছু পরে তিনি চট্টগ্রাম পৌঁছুলেন। চট্টগ্রামের মেয়র এর বাড়ি থেকে পাঠানো গরুর মাংস, মুরগী, খাসির মাংস, দেশী মুরগী, লাক্ষা শুটকি, সবজী, শুটকি ভর্তা সহ বিভিন্ন ভর্তা, স্যুপ (কিছু যদি বাদ পরে ক্ষমা করবেন। আমি সব কয়টি খাবারের নাম এই মুহূর্তে মনে করতে পারছিনা) সহযোগে আহার এবং আবার মেয়র মহোদয়ের বাড়ি থেকেই পাঠানো সকালের খাবার খেয়ে তিনি রামুর উদ্দেশ্যে রওয়ানা করবেন। তাঁর সফরসঙ্গী ৩৫০ জন ও নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ সদস্য মিলে প্রায় ৫০০ জন এই আহার গ্রহন করেন। তাঁর যাত্রা উপলক্ষে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের হারবাং থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত প্রায় ৮৮ কিলোমিটার মহাসড়কে খালেদা জিয়াকে স্বাগত জানিয়ে তোরণ নির্মাণ করা হয়েছে তিন শতাধিক। এতে খরচ হয়েছে অন্তত কোটি টাকা। দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা নিজেদের টাকায় মহাসড়কের চকরিয়া অংশের ১৮ কিলোমিটার জুড়ে দুই শতাধিক তোরণ নির্মাণ করেছেন। আবার চকরিয়া থেকে রামু পর্যন্ত সড়কে তৈরি করা হয়েছে আরও শতাধিক তোরণ।

এত আনন্দ আয়োজনের পর তাঁর কর্মসূচী হোল- তিনি চকরিয়া পৌরসভার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে দলীয় জনসভায় ভাষণ দেবেন। রামুর এবং উখিয়ার ক্ষতিগ্রস্থ বৌদ্ধ মন্দির পরিদর্শন করবেন। এবং এর পর চৌমুহনীর খিজারী আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে অনুষ্ঠিতব্য ‘সম্প্রীতি সমাবেশ’ এ যোগ দেবেন। পরদিন উখিয়ার মরিচ্যা দীপাংকুর বৌদ্ধ বিহার পরিদর্শন করবেন এবং উখিয়া হাইস্কুল মাঠে জনসভায় বক্তব্য রাখবেন। দুপুর ১২টায় তিনি চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে কক্সবাজার ত্যাগ করবেন।

এবার প্রশ্ন হোল, এত আনন্দ আয়োজনের মধ্যে সফর শেষে তিনি গত ২৯ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে হামলা ও অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্থ রামুর ১২টি প্রাচীন বৌদ্ধমন্দির ও ৪০টির বেশি বসতি এবং উখিয়া ও টেকনাফে অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্থ সাতটি মন্দিরসহ আরও কয়েকটি বসতি দেখতে যাবেন, তার জন্যে এত অযাচিত আয়োজনের কি প্রয়োজন ছিল? প্রকৃতই যদি তিনি ঐ নির্যাতিত মানুষগুলোর বেদনাকে অনুভব করতে চাইতেন তাহলে এই আতিশয্যের মাধ্যমে তিনি কি বোঝাতে চেয়েছেন? জনগন তাঁকে পছন্দ করে? যদি তাই হয় তবে মাননীয়া, এত সব আয়োজন, এত ব্যয় কিছুটা বেশীই হলনা?

দ্বিতীয়তঃ তিনি সেই নির্যাতিত মানুষগুলোকে কি বলবেন? বলবেন যে, বাজাদ (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল) ও বাজাই(বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী) মিলে যা করেছে দলের নেতা হিসেবে তিনি তার জন্যে অনুতপ্ত? তিনি ক্ষমা প্রার্থী? এর জন্যে সরকারের বিচার বিভাগের কাছে তিনি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভাবে বিচার দাবী করেন? সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার জন্যে এবং শত বছরের ঐতিহ্যকে ধ্বংস করার জন্যে তাঁর জোটের জড়িত সমস্থ নেতা কর্মীদের এমনকি বাজাইকেও তিনি এই মুহূর্তে যথাক্রমে দল ও জোট থেকে বহিস্কার করলেন এবং তিনি নিজেই তাঁদের আইনের হাতে তুলে দেবেন? নির্যাতিত এই মানুষগুলোকে পিং পং বল বানিয়ে সরকার বনাম বিরোধী দলের চিরাচরিত টেবিল টেনিস খেলা করবেন না বরং সরকারের সাথে হাথে হাথ মিলিয়ে তিনিও অথবা সরকারের অপারগতায় তিনি নিজেই এই মুহূর্ত থেকে তাঁর দলকে সাথে নিয়ে বাংলাদেশকে একটি সর্ব ধর্মের সম্প্রীতির দেশ করে গড়ে তোলার জন্যে কাজ করবেন।
তৃতীয়তঃ অনুষ্ঠিতব্য ‘সম্প্রীতি সমাবেশে’ তিনি নির্যাতিত মানুষগুলোকে বলে আসা এই কথা গুলোই জোড়ের সাথে জনগনের সামনে, সংবাদ মাধ্যমের সামনে তাঁর নেতা কর্মীদেরও বলবেন।
নাকি আমাদের রাজনীতির চিরাচরিত নিয়মে তিনি এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে সরকারের বা সরকার দলের বলে দাবী করবেন? অথবা হিনা-র মত হিনা-র সংস্কৃতিকে সম্মান করে তিনিও ঐ নির্যাতিত মানুষগুলোকে সমস্থ অতীত ভুলে সামনে এগিয়ে যাবার নসিয়ত দেবেন?

তথ্য সূত্রঃ ১। দৈনিক আজাদী ১০ নভেম্বর ২০১২
২। দৈনিক প্রথম আলো ১০ নভেম্বর ২০১২
৩। দৈনিক কালের কণ্ঠ ১০ নভেম্বর ২০১২
৪। দৈনিক জনকণ্ঠ ১০ নভেম্বর ২০১২