ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

 

মহাজোট সরকারের ক্ষমতায় আসার অন্যতম অঙ্গিকার ছিল ২০১২ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করা। কিন্তু বাস্তবে তারা কতটুকু সফল তা সবাই এখন আচঁ করতে পারছে। সরকারী গোয়েন্দা সংস্থা সরকারকে সর্তক করে দিয়েছে ”যে কোন সময় জনবিস্ফোরণ ঘটতে পারে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে”। এটাতে এই বিষয় স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠেছে যে সরকার বিদ্যুৎখাতকে অত্যন্ত নাজুক ভাবে সমাল দিতে পারছে। এবং এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আগুনে ঘি ঢালবে বি, এন, পি, এটাতে কোন সন্দেহ নেই। সুতরাং সামনে দিনগুলোতে এই বিদ্যুৎকে ইস্যু করেই চলবে রাজনৈতিক কর্মকান্ড। আর সরকার যে বিদ্যুৎ সমস্যা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে তার উৎকৃষ্ট উদাহরন হচ্ছে জ্বালানী উপদেষ্টার কিছুদিন আগের বক্তব্য। আসুন এবার জেনে নেই এই সরকারের এতদিনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়নের/অবনতির খতিয়ান।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরপরই ডজনের ওপরে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানকে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কারখানা নির্মানে কন্ট্রাক দেয় যেটা থেকে আশা করা হচ্ছিল যে ক্রমবর্ধমান চাহিদা নিরসনে ব্যপক ভূমিকা রাখবে। কিন্তু ২০১১-এর আগষ্ট থেকে দেখা যাচ্ছে স্থাপনে সময় সাপেক্ষ হওয়ার জন্য গ্যাস টারবাইনের পরিবর্তে এর বিকল্প হিসেবে কুইক রেন্টাল স্থাপন করাতে হিতে-বিপরীত হয়েছে। এতে এখন দেশকে যে বিশাল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে শুধু তাই নয় বরং এটা আমাদের মত গরিব দেশের জনগনের কাছে গলার কাটা হয়ে দাড়িয়েছে। কিন্তু সরকারী আমলা, নেতা এদের এ নিয়ে কোন মাথা ব্যাথা নেই। কেননা তাদের ব্যাক্তিগত সুবিধা তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে কিভাবে হাতিয়ে নিচ্ছে তা পূর্বের পোস্টে প্রমান সহকারে উপস্থাপন করা হয়েছে। শুধুমাত্র দেশীয় মিডিয়াতে নয় বরং আর্ন্তজাতিক মিডিয়াতেও এটা বলা হয়েছে যে সরকারের ক্ষমতাবান কিছুলোক কুইক রেন্টাল প্রজেক্টকে টাকা মারার উৎস হিসেবে দেখছে। তাই হয়তো যখন সচেতন সমাজ যখন কুইক রেন্টালকে নিয়ে থলের বিড়াল বেড় করার কথা বলছে তাতে জ্বালানী উপদেষ্টার গা জ্বালাপোড়া হচ্ছে। তাই তো আমরা যারা কুইক রেন্টাল এর বিপক্ষে যারা তাদের দেশদ্রোহী বলছেন। এমনকি পি, ডি, বি, পর্যন্ত তাদের গুনগান গাচ্ছে। কুইক রেন্টাল এখন পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে ১০০০ মেঃ ওঃ পর্যন্ত নতুন বিদ্যুৎ যোগ করেছে। এগুলো হেচ্ছে মেঘনা ঘাট ২০০ মেঃ ওঃ, খুলনা ১১৫ মেঃ ওঃ, আশুগঞ্জ (গ্যাস) ৮০ মেঃ ওঃ, ঘোরাশাল ৭৮.৫ মেঃ ওঃ, কেরানীগঞ্জ ১০০ মেঃ ওঃ, আশুগঞ্জ ৫৩ মেঃ ওঃ, নোয়াপারা ৪০ মেঃ ওঃ, আমনুরা ৫০ মেঃ ওঃ, জুলধা ১০০ মেঃ ওঃ, সিদ্ধিরগঞ্জ ১০০ মেঃ ওঃ, কাটাখালি ৫০ মেঃ ওঃ। এখন আসুন যেনে নেই কি করে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালাতে গিয়ে আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে এ খাত। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালাতে দৈনিক গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ কোটি টাকার প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালাতে ২৩ থেকে ২৫ কোটি টাকা লাগে। বাকি টাকা গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে খরচ হয়। বর্তমান সরকারের আমলে তেলভিত্তিক কেন্দ্র নির্মাণের চুক্তির সময় লিটার প্রতি ফার্নেস অয়েলের দাম ছিল ২৬ টাকা ও ডিজেলের ৪৪ টাকা। কিন্তু দুই বছরের ব্যবধানে ফার্নেস অয়েলের দাম দাঁড়িয়েছে ৬০ টাকা এবং ডিজেলের দাম ৬১ টাকা।জ্বালানি তেলে ভর্তুকি কমাতে গত বছর চারবার ডিজেল ও ছয়বার ফার্নেস অয়েলের দাম বাড়ানো হয়। সর্বশেষ গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। সে অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেল ৬১ টাকা, কেরোসিন ৬১ টাকা, পেট্রোল ৯১ টাকা, অকটেন ৯৪ টাকা ও ফার্নেস অয়েল ৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ সমন্ময়ের যে অভাব তা এখানে স্পষ্ট পরিলক্ষিত। আর সমন্ময়ের অভাব অর্থই হলো দেশের টাকা নিজ পকেটে ভরা। অর্থাৎ সরকারের অবস্থা এখন এমন যে এটা পলিথিন ব্যাগে অনেকগুলো ফুটো করে তাতে পানি ভরে যদি কাউকে বলা হয় এর পানি বের হওয়া আটকাতে। সেটা যেমন অসম্ভব তেমনি বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে সরকার এখন নাজেহাল।

এবার আসুন জেনে নেই প্রধানমন্ত্রীর কিছুদিন পর পর উদ্ভোদন করা কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টের বর্তমান অবস্থা।পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, তেলের উচ্চমূল্যের কারণে বর্তমানে উৎপাদনক্ষম তেলভিত্তিক মোট ৩৪ টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে ৮টি বন্ধ রয়েছে। আর ১০টি কেন্দ্রে কম উৎপাদন করা হচ্ছে। সবমিলিয়ে ১৮টি কেন্দ্র থেকে প্রায় ৮০০ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না।

বিদ্যুৎ কেন্দ্র

এ অবস্থায় নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলেও অর্থ সংকটের কারণে তাকে বসিয়ে রাখতে হবে। আর এসব কেন্দ্রের অধিকাংশ ভাড়াভিত্তিক ও বেসরকারি খাতের হওয়ায় সরকার কেন্দ্রগুলো চালু রাখতে না পারলেও চুক্তি অনুয়ায়ী ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ দিয়ে যেতে হবে। ক্যাপাসিটি চার্য মানে হলো প্ল্যান্ট চলুক আর নাই চলুক এর মুল্য দিতেই হবে। এখানে জেনে অবাক হবেন যে বাংলাদেশে স্টীম পাওয়ার প্ল্যান্ট যথেষ্ট রক্ষণাবেক্ষনের অভাবে ১০০০ মেঃওঃ এর উপরে বন্ধ হয়ে পরে আছে যাদের উৎপাদন খরচ ২টাকার কিছু উপরে যেখানে কুইক রেন্টাল এর খরচ ১৫টাকার উপরে। আমার দেখা সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনের ২১০ মেঃওঃ কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্ল্যান্টটি দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় যাবত বন্ধ হয়ে আছে এবং এতে কর্মরত সরকারী কর্মকর্তা, কর্মচারী সবাইকে এতদিন যাবৎ বসিয়ে বসিয়ে রাষ্ট্র কোষাগার থেকে বেতন ভাতা প্রদান করে হচ্ছে। অধিকন্তু এর কোটি কোটি টাকা মুল্যের যন্তপাতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে অবহেলায়।আবার ঘোরাশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২০০মেঃওঃ নষ্ট হওয়ার ২০ মাস পার হলেও সেখানেও সরকারের একই রকমের উদাসীনতা। এর দায় দায়িত্ব কে নিবে? তারা কি বোঝেনা জনগন কষ্ট করে কর পরিশোধ করে? এখানে শুধু দুটির কথাই তুলে ধরা হয়েছে আর যেগুলো বলা হয়নি সেগুলোর অবস্থা একই নাকি আরো খারাপ তা আল্লাহ পাকি ভাল জানেন। হ্যাঁ এটা ঠিক যে গ্যাস সল্পতার জন্য সেগুলোকে চালানো যায়না। কিন্তু যেগুলো নষ্ট সেগুলো ঠিক করতে কি গ্যাস লাগে নাকি তা আমার জানা নেই। গ্যাস লাগুক আর নাই লাগুক এই সম্পদগুলোকে এভাবে নষ্ট করার কোন মানেই হয়না। সুতরাং বিদ্যুৎ খাতকে নিয়ে যে কি পরিমান দুর্নীতি হচ্ছে তা এখন সবাই হয়তো বুঝতে পারছেন।

উপরে যতটা সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি সরকারের ৩ বছরের বিদ্যুৎ নিয়ে উন্নয়নের খতিয়ান।এ থেকে এই বুঝা যায় যে জনগনের রক্ত দিয়ে চলছে কুইক রেন্টাল প্ল্যান্ট। এখন সরকারের কাছে জানতে খুব ইচ্ছে করছে এভাবে আর কত? চোখে আর কতদিন ধুলো ছিটানোর বৃথা চেষ্টা করবেন? আমরা আমজনতা কি কিছুই বুঝিনা? আর বোঝার চেষ্টা করলে গণ্ডমূর্খেরা বলে আমরা যারা কুইক রেন্টাল নিয়ে কথা বলি তারা দেশদ্রোহী। নাকি থলের বিড়াল বের হবে বলেই এত ভয়।

(চলবে)