ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

ইদানীং সড়ক দুর্ঘটনা ব্যপারটা এতই সাধারন একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে পত্রপত্রিকায় নিয়মিত এ সংক্রান্ত খবর পড়তে পড়তে এক রকমের অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আর প্রকৃতির নিয়মেই যত রকমের সব ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার খবরও আমার আবেগকে তাড়িত করতে পারত না। এই ক্ষেত্রে পুরোদমে আবেগহীন হওয়ার প্রধান কারন হয়তোবা এর নিয়মিত ঘটে যাওয়াই দায়ী। আর একটা সময় মনে হতে লাগল এ্টা একটা সাধারন ব্যপার মাত্র। এটা হর হামেশাই হচ্ছে আর এভাবে হতেই থাকবে আমার তো এখানে মাথা ব্যাথা না দেখালেও চলবে। কিন্তু ঠিক স্বার্থপরের মত কখনো ভাবিনি যেই পরিবারের এই ক্ষতি হয় তাদের ভেতরকার অবস্থা তখন কেমন থাকে। আর এর জন্যই হয়তো বিধাতা আমাকে উপযুক্ত শাস্তি ‍দিয়ে দিয়েছেন। আমার পরিবারের একজন আর আামার জীবনের সব চাইতে কাছের মানুষ অর্থাৎ আমার বড় ভাইটা কদিন আগের সড়ক দুর্ঘটনায় না হারালে হয়তো এমন স্বার্থপরই থাকতে হত আমাকে। তাই আজ হারে হারে বুঝতে পারছি সেই সব লোকদের কষ্ট যারা স্বজন হারিয়েছিল সড়ক দুর্ঘটনায়।

আমার ভাইয়ার সাথে আমার বয়সের পার্থক্য ছিল প্রায় দেড় বসরের। তাই একরকমের বন্ধু বললে ভুল হবে আসলে আমরা একে অপরের পরিপুরকভাবেই বেড়ে উঠছিলাম। সেই ছোট্ট বেলা থেকে কত মারামারি কত ঝগড়া আর কতই না মিলেমিশে আমরা আজকে এই পর্যন্ত এসেছিলাম।কোন কাজও আমাদের একসাথে ছাড়া করা হয়নি। ‍কিন্তু ভাইয়া আগে যদি জানতাম তুই আমাকে না বলেই ওপারটাতে চলে যাবি তবে সত্যিই মন থেকে বলছি তোর আগে আমিই চলে যেতাম। আসলেই যাওয়ার কথা হয়তো আমারি ছিল কিন্তু জোর করেই তুই মনে হয় আগে গেলি। লিখতে ভিশন কষ্ট হচ্ছে তবুও তুই যে আমার কি ছিলি তা সবাইকে জানাব বলেই লিখছি।

ভাইয়া তোর কি মনে আছে ঘটনার বেশ কিছুদিন আগেই তোর কিডনিতে একটা জটিল সমস্যা ধরা পরে? আর এতে বাবা মা আর আমি সহ সবাই যে কতটা চিন্তায় দিনগুলো কাটিয়েছিলাম। এলাকার লোকগুলো পর্যন্ত যারা তোকে দেখতে এসেছিল একবার না কেঁদে যায়নি। সবাই তোর বাচার এক রকমে আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। তবে কেন সেবার না গিয়ে এভাবে না বলে এখন গেলি? শেষে ডাক্তার কি এক আশার বাণী দিয়েছিল মনে আছে? হ্যা সে বলেছিল যে তোকে যদি বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করানো হয় তবে তুই আবার আগের মতই ভাল হতে পারবি। কিন্তু চিকিৎসা খরচটা যে অনেক ছিল আমাদের মত পরিবারের জন্য প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা। এত টাকা কোথায় পাব? শেষে তুই বিছানার পাশে আমাকে ডেকে বললি তোর যেন চিকিৎসা করানো না হয়। সেই সময় আমার মনে হয় সময়টা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শেষে এমন এক বিচিত্র শুখ পাব তা কখনোই ভাবিনি। আশেপাশের লোকগুলো এত ভাল তা আমাদের পরিবারের কারোই জানা ছিলনা। কিভাবে যেন সমাজের প্রায় প্রতিটা মানুষই এগিয়ে আসতে লাগল। আমার বন্ধুরা তাদের ভার্সিটির ক্যাম্পাসে, বাবার অফিসের লোকজন যে যেভাবে পারে, এলাকার ধনীরা তাদের বিত্ত দিয়ে, গরিবেরা তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ দোয়া দিয়ে সাহায্য করতে লাগল। সবারই যেন একটিই উদ্দেশ্য তুই বাঁচবিই। আর এভাবেই তোর বাঁচার আলো যেটা প্রায় নিভু নিভু করছিল সেটা উজ্জল হতে লাগল। এভাবেই একটা সময় তোর চিকিৎসা করানো হল। এইতো মাত্র কদিন আগে (১০দিন) তুই না আমাদের মাঝে ফিরলি। আবার সবকিছুই ঠিকঠাক ভাবেই চলছিল। আব্বা আম্মা আমি সহ পরিবারের সবাই মাঝে এক যুদ্ধ জয়ের হাসি লেগেই ছিল।

আজ সকাল বেলা বাবা বাসার বিদ্যুৎ বিল জমা করবে বলে বাসা থেকে বের হওয়ার চিন্তা করছিল মাত্র। কিন্তু তোর আর আমার মধ্যে একরকমের যুদ্ধ শেষে তুই কাগজটা নিলি। যুদ্ধের কারন ছিল যে বিদ্যুৎ বিল জমা দিবে তার আজকে আম্মুর সাথে শপিংয়ে যেতে হবেনা। তার বদলে যে হেরেছে সেই যাবে আম্মুর সাথে। ঠিক আছে আমাদের দুই ভাইয়ের একটা অভ্যাস ভাল তা হল কথা দিয়ে একে অপরের কথা রাখা। তাই আমি আমার কথা রাখলাম বিরক্তিকর জিনিস শপিংয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি আর মা বের হওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছিলাম তখনেই পাশের বাসার সাত্তার চাচা বাবাকে আলাদা করে নিয়ে কি যেন বলল। আর মনে হল বাবা তখনই অর্ধ মৃতের মত অবস্থা। কিছুক্ষন পর বাবা তার চিন্তা শক্তি ফিরে পেতেই সবাইকে বলল চলো। কোন প্রশ্ন না করেই ভয়ে ভয়ে আমরাও বাবার পিছু পিছু চলতে লাগলাম। এতটাই শংকিত ছিলাম যে একটা সময় মনে হতে শুরু করল এই পথে আমি অনন্তকাল ধরে হাটছি। কেন যেন পথ শেষ হতে চাইছেনা। হঠাৎ বাবা রাস্তার পাশেই নিয়ে গেলেন । দেখলাম রাস্তায় অনেক মানুষের ভিড়। কিন্তু ভিড় ঠেলে আমাদের যেতে হচ্ছেনা সবাই দেখলাম এমনিতেই যায়গা ছেড়ে দিচ্ছে। ভিড় ঠেলে শেষে যা দেখলাম তা ভোলার মত নয়। রাস্তার পাশে তোর এবড়ো থেবড়ো লাশটা পরে আছে। আর মনে হলো এখানটাতে রক্তের বন্যা বয়ে গেছে। কি একটা বিভৎস অবস্থা সময় যেন খানিকক্ষনের জন্য দ্রুত চলছিল। মা কিছুক্ষন পর পরই মূর্ছা যাচ্ছিল আর আমি যেন কোথায় হারিয়ে গেলাম। অনেকক্ষন বাদে বাবার কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলাম। বাবা কাঁদছিল আর বলছিল, “ খোকা আমার এভাবে কেন গেলি? যাওয়ার কথা ছিল আজ আমার তুই কেন গেলি? এত আশা জাগিয়ে এতদিন পর এত কিছু জয় করে ফিরে এলি আর এখন ছোট্ট সময়ে কাওকে কিছু না বলে এভাবে চলে গেলি?” বাবার কথা শুনে মনে হতে লাগল ভাইয়া তোর তো যাওয়ার কথা ছিলনা। মনে মনে সকাল থেকেই আমি যাব বলেই ঠিক করে রেখেছিলাম। প্রতিদিনই তো ঝগড়াতে আমি জিতি। আজ জিতলে কি এমন হত? নিজের উপর নিজের প্রচন্ড ক্ষোভ হতে লাগল। ভাইয়া আজ তুই কেন এই খেলায় জিতে আমাকে এমন হার হারিয়ে দিলি? এই পরাজয় আমি মানবো না। আর এই রাস্তা তোকে বলি আর কত মানুষের জীবন নিলে তোর এই ক্ষুদা মিটবে? তোর এই ক্ষুদার শেষ কবে? তোর ক্ষুদা যে দিন দিন বাড়ছে এর জন্য দায়ী কারা? উত্তর গুলো আমার এখন আর এই মুহূর্তে দরকার। পারবি দিতে আমাকে?

উপরের ঘটনাটি আংশিক সত্য। আজকে আমার বাসার সামনে এক সড়ক দুর্ঘটনায় এমনি একটি ছেলের তাজা প্রাণ চলে গেছে। আমরা পত্র পত্রিকায় সবসময় সড়ক দুর্ঘটনা নামের খবর পড়তে পড়তে এখন খুব অভ্যস্ত হয়ে পরেছি। কিন্তু কখনো কি এভাবে ভেবে দেখেছি কি দুর্দশাই না ঘটে ভিকটিম পরিবারগুলোর? আজ তাই সাধারন একটি ঘটনা নিজের মত করেই লিখার চেষ্টা করেছি। কতটা সফল হয়েছি তা না হয় আপনাদের হাতেই ছেড়ে দিলাম।

ধন্যবাদ সবাইকে।