ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

সকাল থেকেই একটানা বৃষ্টি হচ্ছিলো। অঝোর ধারায় বৃষ্টি। অনেক দিন পরে বৃষ্টি হচ্ছে। বিছানায় শুয়ে থাকতেও আর ভাল লাগছে না। অনেকক্ষণ ধরে হুমায়ুন আহমেদের “নীল প্রজাপতি” পড়লাম। এখন এটাও আর ভাল লাগছে না। বারান্দায় এসে বসেছি। এদিকটায় অনেক দিন বসা হয় না। আমার শখের মানিপ্লান্ট গাছটাতেও পানি দেওয়া হয় না। কেমন যেন চুপসে গেছে গাছটা। একটু পানি দেওয়া দরকার। বাইরে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ। হঠাৎ দুটি শালিক এসে বারান্দার গ্রিলে বসলো। একদম ভিজে গেছে অরা। মায়াই লাগছিল দেখে। বাসার সামনের ঐ কদম গাছটাতে অনেক কদম ফুল ফুটেছে। গাছের পাতাগুলো আজ কত সবুজ দেখাচ্ছে। এখন কয়টা বাজে? ঘড়িতে দেখলাম সোয়া তিনটা। শালিক দুটি এখনও বসে আছে। একটু কাছে যেতেই ফুড়ুৎ করে উরে গেল। গ্রিল ধরে বাইরের প্রকৃতি দেখছি। কী অদ্ভুত সুন্দর লাগছে! হঠাৎ দমকা বাতাসে এক পশলা বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিল আমাকে। আশ্চর্য! পুর শরীরটা কেমন যেন কেপে উঠল। অদ্ভুত এক অনুভুতি। এক সময় বৃষ্টি এলেই নেমে পড়তাম আমরা। আমি, অর্ক আর দীপ্ত। তিন জনে ছিলাম খুবই ভাল বন্ধু। অর্ক ছিল লম্বা, একহারা সুঠাম দেহের এক অসাধারণ ছেলে। গায়ের রঙ ছিল বেজায় ফর্সা। মাথা ভর্তি চুল। আর চোখ দুটো ছিল প্রচণ্ড রকমের মায়াবী। ওর চোখের দিকে তাকালেই ও কীভাবে যেন বুঝে যেত আমার মনের কথা। কোন কিছুই ওর কাছে লুকাতে পারতাম না। সব বুঝে ফেলত। সারাক্ষণ হাসি, ঠাট্টা আর গানে মাতিয়ে রাখত আমাদের সবাইকে। আর দীপ্ত ছিল অনেক মজার একটা ছেলে। কথা বলা শুরু হলে আর থামাথামি নেই। কে কি বলল টা সে শুনবে না। আগে নিজের কথাটা বলবে, পরে অন্যর কথা। ওর এই পাগলামি স্বভাবটা দারুন উপভোগ করতাম আমরা। তবে দুজনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় কাটাতাম অর্কর সাথে।

অর্কর নানাবিধ কর্মকাণ্ডের মধ্যে প্রধান ছিল আমার পেছনে দিন ভর লেগে থাকতো। আমাকে বোকা বানিয়ে কী যে মজা পেত তা ঐ জানে। একদিন সকালে ফোন করে আমাকে বলল, “তাড়াতাড়ি বটতলায় এসো। দীপ্ত অজ্ঞান হয়ে গেছে”। বটতলায় আমরা একসাথে আড্ডা দিতাম। দীপ্ত এমনিতেই পাগলামি স্বভাবের ছেলে। কিন্তু ওর এমন খবর পেয়ে খুব ভয় পেয়ে গেলাম। দুশ্চিন্তায় ছুটতে ছুটতে গিয়ে দেখি যে বাঁদর দু’টো এতগুলো ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে খিকখিক করে হাসছে। শরীরটা রাগে জ্বলে যাচ্ছিলো। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে একসঙ্গে বলে উঠল, “হ্যাপি বার্থডে, দুপুরমনি”। আজ আমার জন্মদিন আর আমারই মনে নেই! রাগ পানি হয়ে গেল।

ভার্সিটি জীবনটা ভালই কাটছিল। এরই মাঝে নতুন মাত্রা যোগ হল মায়ের কথায়। আমার দুঃসম্পর্কের এক মামার ছেলে থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। তারই সাথে আমার বিয়ের কথা হচ্ছিলো। আর সেটা নিয়েই সারাক্ষণ জ্বালাত দীপ্ত। আমিও বোধ হয় একটু প্রেমেই পড়ে গিয়েছিলাম। নাম সুমন। অনেক সুন্দর করে কথা বলতো। ওর সেই মধুমাখা কথা বিভর হয়ে শুনতাম। অর্ককে ওর কথা কারনে অকারণে বলতাম। হয়তো বলতেই ভাল লাগত। অর্ককে অবশ্য এ ব্যাপারে অতি উৎসাহী মনে হয়নি কখনও। একদিন পুকুর পারে বসে ওরই গল্প করছিলাম। একদিন কথায় কথায় ওকে বলছিলাম, তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দিলেই তো হয়, এত পড়ে লাভ কি?” তখন অর্ক মজা করে বলল, “মাথায় প্রেমের ভুত ঢুকলে রেজাল্ট খারাপ হয়, তবুও তো মানুষ এক সময় পাস করে। কিন্তু বিয়ের ভুত ঢুকলে, পাস তো দূরে থাক, পড়াশোনাই বন্ধ হয়ে যায়।” কথাটা খুব মনে ধরেছিল। সুমনের কথায় স্বপ্ন দেখতে লাগলাম। সারাটা দিন শুধু ওর কথাই ভাবতাম। অর্ককে আর আগের মত সময় দেয়া হত না।

একদিন ও এসে বলল, নতুন একটা গল্প লিখেছি, দেখতো কেমন হয়েছে? আমি জানি ও খুব ভাল লেখে। গল্পটা পড়ে বুঝলাম ও কারো প্রেমে পরেছে। গল্পের মেয়েটির নাম সেজুতি। অসাধারন একটি গল্প। জিজ্ঞেস করলাম, “মেয়েটি কে?” বলল, “সময় হোক, পরিচয় করিয়ে দেব”। তবে দিন দিন ওকে খুব উদাস লাগছিল। প্রেমে পড়লে এমনি হয়। একদিন আমাকে বলল, “বল তো মানুষের জন্ম হয় কেন? বললাম, “কেন?” মরার জন্য। “আচ্ছা বল তো, মানুষ প্রেম করে কেন?” আমি কিছু বলার আগেই ও নিজেই বিলে উঠল, “ছেঁকা খাওয়ার জন্য”। বলেই হাসতে লাগল। বললাম, “তুমি ছেঁকা খেয়েছ বলে আমিও খাব নাকি?” ও বলল, “দেখা যাক”।

সময়ের স্রোতে জীবন এগোতে থাকে। অনার্স শেষে আমি স্কলারশীপ পেয়ে বাইরে পরার সুযোগ পেয়ে যাই। সেদিন বিকেলে ছিল আমার ফ্লাইট। সবাই এসেছিল আমাকে বিদায় জানাতে। অর্কও এসেছিল। কিন্তু ঠোঁটের কোনায় চিরচেনা সেই হাসি আজ আর নেই। অনেক কষ্ট পাচ্ছে আমি জানি। এক সাথে কয়েকটা বছর কাটিয়েছি আমরা। কত আনন্দ, কত মজা আর অভিমানে দেখতে দেখতে এত গুলো দিন যে কীভাবে কেটে গেছে বুঝতেই পারি নি। আজ আর ও আমার সাথে ফাজলামি করছে না। বলছে না বোকা বানানো কোন কথা। বিদায় বেলা শুধু একটা চিরকুট হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল যে, “প্লেন ছাড়ার আগে খুলবে না।” মাথাটা হাল্ককা নেড়ে এগিয়ে গেলাম প্লেনের দিকে। প্লেন ছাড়ার পর ওর চিরকুটটি খুললাম। যেন ছাপার অক্ষরের মত চিরচেনা অদ্ভুত সুন্দর হাতের লেখা, “জীবনে তোমাকে অনেক বোকা বানিয়েছি। বুঝিনি, তুমি আসলেই এতটা বোকা। সত্যিকারের ভালবাসার মানুষকে কখনও বোঝার চেষ্টাও করলে না। অথচ তোমার মুখ থেকে একটি মাত্র কথা শোনার জন্য এত গুলো বছর কাটিয়ে দিলাম। তবুও বিদায় কালে বলব, যেখানেই থাক ভাল থেকো।” কেন আমি এত দিনেও ওকে বুঝতে পারিনি? কেন আমি ওর চোখের ভাষাটাও বুঝতে পারিনি? ইচ্ছে হচ্ছিলো প্লেন থেকে তখনি নেমে যাই। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ধূসর মেঘপুঞ্জের মধ্যে দিয়ে ছুতে চলেছি অজানা এক দেশে।

হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠল। ঐ বুঝি অদিতি এসেছে। আমার পাঁচ বছরের মেয়ে অদিতি। এই বৃষ্টির মধ্যেই স্কুল থেকে একাই চলে এসেছে। আজ ছ’বছর আমাদের বিয়ে হয়েছে। ফুটফুটে একটা মেয়ে হয়েছে। ওকে নিয়েই আমার যত স্বপ্ন। ওর জন্মের পর নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। অথচ সেই স্বপ্ন এক সময় দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছিল। পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে অর্ককে অনেক খুঁজেছি। ওর দেশের বাড়িতেও খবর নিয়েছি। ওরা নাকি অনেক দিন আগে অন্য কোথাও চলে গেছে। ভার্সিটিতেও খোঁজ নিয়েছি। কেউ বলতে পারে নি ওর কথা। ওর লেখা গল্পও পড়া হয়নি কখনও। কিছু দিন পর সুমনের সাথে আমার বিয়ে হয়ে যায়। মন দিয়ে সংসার শুরু করি। তবু আজও বৃষ্টি হলেই ওর হাস্যজ্বল মুখটা ভেসে ওঠে। আজও হাজার লকের ভিড়ে অর্ককে খুজে ফিরি। হয়তো কালের আবর্তে কোন একদিন ওর সাথে আবার দেখা হবে। হয়তো সেদিন দেখব, অর্কও কাউকে বিয়ে করেছে। কারো বাবা হয়েছে।

মাহমুদুল হাসান লিখন
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়