ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

একসময় ছোট বাচ্চারা যখন ঘুমাতে চাইতোনা, তখন ভয় দেখিয়ে তাদের ঘুম পাড়ানোর কৌশল হিসাবে মা ছড়া বলত, “খোকা ঘুমাল পাড়া জোড়াল, বর্গী এলো দেশে, বুলবুলিতে দান খেয়েছে, খাঁজনা দিবে কিসে…” অথবা কোন রাক্ষস-খোক্কসের গল্প শোনাত । আর সেই অজানা বর্গীকে রাক্ষসের মত কোন প্রানিরুপে কল্পনা করে ভয় পেয়ে বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়ত ।

আর এখন বাংলালিংকের বিজ্ঞাপনের মত করে বলতে হয়, “যুগ পাল্টাইয়া গেছেনা…।” হ্যাঁ, যুগ তো অবশ্যয় পাল্টেছে । এই যুগে গরুর গাড়ির বদলে চলে বাস, ট্রেন, উড়োজাহাজ । লাঙলের জায়গা দখল করেছে পাওয়ার ট্রিলার, ডাংগুলি খেলার বদলে ঘরে বসে কম্পিউটারে খেলা হয় জাম্বি সূটার, এংরি বার্ড প্রভৃতি থ্রিডি গেমস । এই যুগের বাচ্চারা এখন আর ওইসব রাক্ষস-খোক্কস অথবা বর্গীদের ভয় পায়না । তাহলে এখন উপায় ? কি করে অশান্ত বাচ্চাদের ঘুম পাড়ানো যায় ? সমস্যা যেহেতু হয়েছে, সমাধানও নিশ্চয় একটা আছে । এই নিয়ে মায়েদের এত দুশ্চিন্তার কিচ্ছু নেই । সবচেয়ে সহজ একটা সমাধান হল আমাদের দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলসমূহের ছাত্রসংগঠনগুলোর নাম নেওয়া । এইভাবে বলা যেতে পারে, “ সোনামণি এখন ঘুমাও, নইলে ছাত্রলীগ/শিবির/ছাত্রদল আসবে ।”– ব্যাস, হয়ে গেল । শুধু বাচ্চাদের নিয়ন্ত্রণ করাটাই না, বাচ্চার বাবাকেও একই ভয় দেখান যেতে পারে । বলা যেতে পারে, “আজ বাইরে যেওনা, রাজপথ আজ তাদের (ছাত্রলীগ/শিবির/ছাত্রদল) দখলে ।”- ব্যাস, এটাও হয়ে গেল, সারাদিন বউয়ের সাথে বসে টিভিতে স্টার জলসা আর জি-বাংলা দেখবে ।

কিন্তু দরিদ্র দুলাল মিয়ার দশ বছরের বাচ্চা রাব্বিকে হয়তো তার মা নব্য-বর্গীদের কথা বলে সাবধান করতে পারেনি, অথবা ঐ কোমল শিশুর মনে এত হিংস্রতার কথা কখনো কল্পনাতেও আসেনি । যার ফলে বাকৃবি’র ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের মাঝে গুলিবিদ্ধ হয়ে অকালে প্রান হারাতে হল রাব্বিকে । মায়ের নাড়ি ছেঁড়া এই ধনকে পারবে কি ফিরিয়ে দিতে ? অবাল, বৃদ্ধ-বণিতা, যুবা কেউ কি এদের হাত থেকে রক্ষা পাবেনা ? কি অপরাধ ছিল রাব্বির ? কি অপরাধ ছিল বিশ্বজিতের ? তারা তো তাদের টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজিতে ভাগ চায়নি । কেন তাদের খুন করা হল ? জানি, এই প্রশ্নের কোন সুদুত্তর নেই । যেখানে রাষ্ট্রযন্ত্র নিজেই এইসব খুনি, সন্ত্রাসীদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয় সেখানে এইসব প্রশ্ন তোলা অবান্তর ।

এখানেই শেষ না, আরও আছে । আমাদের শিবিরকর্মী ভাইয়েরা রগকাটা পদবী নিয়ে বহাল তবিয়তে তাদের কৌশলী রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে । মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কার নামকরা(!) প্রধান প্রধান যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে কাছা মেরে তারা রাজপথে নেমেছে । পুলিশদেরকেও যেভাবে তারা পেটালো, অন্যসব তো তাদের কাছে পান্তা ভাত । সাবাস ! পূর্বখুনিদের (যুদ্ধাপরাধী) যোগ্য উত্তরসূরি ।
ক্ষমতাশূন্য অবস্থায় বর্তমানে ছাত্রদলকর্মীরা যদিও একটু অসচল । কিন্ত সরকার পরিবর্তনের পর ছাত্রদলকেও আমারা আবার একই রুপে দেখতে পাব । যা পূর্বেও আমরা প্রত্যক্ষ করেছিলাম ।

আফসোস ! ছাত্ররাজনীতির গৌরবউজ্জ্বল আদর্শ, ইতিহাসকে ত্যাগ করে আজ তারা গল্পের ভয় পাওয়া বর্গীদের আধুনিক মাত্রায় সেজেছে । পার্থক্যটা হল গল্পের বর্গীদের কেবল বাচ্চারাই ভয় পেত, আর নব্য-বর্গীদের ভয় পায় দেশের ষোল কোটি মানুষ ।

আমাদের এই দেশে বর্গী আগমন চক্র কবে বন্ধ হবে, কে জানে ! কবে আমরা শান্তিতে সর্বত্র বিরাজ করতে পারব ? বুলবুলি ধান খেলেও খাজনা দেওয়ার আর ভয় থাকবেনা কবে ? কবে আসবে সেই সুদিন ? হয়তো আসবে, হয়তোবা আসবেনা । এই অনিশ্চয়তার মাঝেই আমাদের চলতে হবে, বাঁচার জন্যই শুধু বাঁচা হবে ।