ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

হে তরুনী,
হে নারী
আমায় ক্ষমা কর। আমি পুরুষ , আমি যুবক। সভ্যতার চরম উন্নতি হলেও আমি তোমার জন্য নিরাপদ পৃথিবী এখনো গড়তে পারিনি। এই পৃথিবীর ভিতর আর বাইরের জগৎটিতে আমার স্বজাতি কিছু পুরুষ কলুষিত মন নিয়ে হায়েনার বিষদাত দিয়ে তোমার উপর ঝাপিয়ে পড়তে উন্মুখ।তরুনীর প্রতি উগ্র পুরুষ শাসিত এই সমাজেরই নির্মম প্রশ্ন:

রাতে তুমি বের হবে কেন? ও রাতে বের হয়েছে কেন?

হে তরুনী রাতে তুমি বের হতে পারনা । কারন আমারই স্বজাতি কোন পুরুষ হায়েনা, শিকারী কুত্তা তোমার উপর ঝাপিয়ে পড়তে উন্মুখ। কিছু পুরুষের “রাতে তুমি বের হবে কেন”? এই প্রশ্নের ভিতরই লুকায়িত আছে আমার স্বজাতি পুরুষের উগ্র পুরুষতান্ত্রিকতা। তুমি রাতে বের হবেনা কারন আধুনিক সভ্য সমাজের কামুক পুরুষেরা তোমার উপর হামলে পড়ার জন্য দাড়িয়ে আছে , অপেক্ষা করছে প্রতিটি প্রান্তরে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রশ্ন “তুমি ঘর থেকে রাতে কেন বের হবে ?” মানে পুরুষেরা রাতে নির্মম খারাপ হয়ে যায় তোমাকে ক্ষতবিক্ষত করবে বলে। তোমার মাংসপিণ্ডকে দলিত মথিত করবে বলে। যে মাংসল পিন্ড ছুয়ে চুমে চুষে বড় হয় কোন পুরুষ শিশু। তোমার স্তন দুগ্ধ বিনে বাঁচতে পারত না, বেড়ে উঠতে পারত না কোন পুরুষ শিশু। অথচ সেই পুরুষ শিশুটি বড় হয়ে বলছে তোমায় “তুমি রাতে বের হবে কেন?

এই তো সেদিন রাত ২.৩০ টা। তোমার ৩ বছরের শিশুটি হঠাৎ খুবই অসুস্থ হয়ে পড়ে ।শীতের রাতে তুমি ছুটছ হাসপাতালের দিকে । একা একা। কারন রাতের ভয় , কামুক পুরুষদের ভয়ের চেয়েও তোমার সন্তানের জীবন তোমার কাছে অনেক মূল্যবান । তাই তুমি একাকী ছুটছিলে নির্জন রাতের অন্ধকার ভেদ করে প্রিয় সন্তানকে বাচাবে বলে কারন তোমার হাজব্যান্ড ছিল অনেক দুরের কর্মক্ষেত্রে।

কিন্তু আমি নির্মম পুরুষ বলে উঠলাম “এই তরুনী রাতে বের হয় কেন? ”

ঐ তো রসুলবাগের সেই তরুনীটি যে তরুনীটির কোন ভাই নেই।আব্বু মারা গেছে অনেক আগে । সে ছুটছিল রাত বারটায় রাতের বাসে ঢাকা যাবে বলে । কারন পরদিন সকাল ১০ টায় চাকরীর একটা ইন্টাভিউ আছে। আব্বু নেই, ভাই নেই অসহায় এই তরুনীটি টিউশনী করে চলত । আজ সে অনেক কনফিডেন্ট নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছে একটি চাকরীর পরীক্ষায় ঠিকবে আশা করে । আর আমারই কোন স্বজাতি পুরুষ গেয়ে উঠল কোরাস করে “এই তরুনী রাতে বের হয় কেন? ” অমনি রাতের একাকি নির্জন পথে হামলে পড়ে কোন জারজসম কুত্তাপুরুষ তরুনীর আবেগ অনুভূতির বিপরীতে তার ফুটন্ত সুশোভিত যৌবনের উপর। যে শরীরের প্রস্ফুটিত প্রতিটি পল্লব সে সাজিয়ে রেখেছিল তার আরাধ্য প্রেমিকের জন্য। অথচ সে প্রেমিকের স্বজাতি অন্য কোন বর্বর পুরুষ যৌবন আচ্ছাদিত কাপড় নখরাঘাতে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে যোনীপথে ঢুকিয়ে দেয় লোহার রড।

হে ভারতীয় আমানত বোন আমায় ক্ষমা কর।

পলিটেকনিক ইনষ্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা তরুণী বোনটি যে সারাদিন জব করার পর সন্ধায় ক্লাশ করে কোন একটি প্রাইভেট ভার্সিটিতে বড় হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে । কারন অজপাড়া গায়েঁর তিনবার এস.এস.সি ফেল করা তরুণীর মত সন্তান লালন পালনের যোগ্যতাও তার কাছে আছে আবার জাতিকে সার্ভিস দেয়ার ক্ষমতাও তার কাছে আছে। তাই সে ছুটে চলে এক নির্মল স্বপ্ন নিয়ে। অথবা ইন্টার্নি তরুনী ডাক্তার সন্ধায় ফিরে তার আপন নীরে। রাস্তায় দাড়িয়ে থাকা কামুক পুরুষেরা তার স্বপ্ন ফিকে করে দেয়ার জন্য ঘুরে বেড়ায়। রাষ্ট্র , সমাজ, শিক্ষা ব্যবস্থা , পারিবারিক মুল্যবোধ কিছুই দুর করতে পারছেনা এই প্রেমময়ী তরুণীদের শঙ্কা।

মধ্যবিত্ত পরিবারের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া যে মেয়েটি সন্ধ্যার পরে টিউশনি করে মাসের খরচ চালায় তার চলাফেরা করাটাকে এই সমাজ নিরাপদ করে না দিয়ে “তুমি রাতে বের হবে কেন?” প্রশ্ন করা বড়ই নির্মম।

বাসা বাড়ির বদ্ধ পরিবেশে বিরক্তিকর একঘেয়েমিতে পেয়ে বসা কোন তরুনী যদি তার স্বামী ভাইয়ের সাথে বাইরে বেড়াতে গিয়ে ফেরত আসার সময় কোন পাষন্ড হায়েনা স্বামী ,বাপ বা ভাইকে বেধেঁ আঘাত করে তাদের থেকে তরুনীকে কেড়ে নিয়ে হিংস্রতার ছলাকলা পুর্ন করে তখন পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে দোষ না দিয়ে পারা যায় না। অথচ তখনোও আমরা পুরুষেরা কোরাস করে গেয়ে উঠি এই নারী রাতে বের হয়েছিল কেন?

অথবা ডা: ইভার কথায় ধরুন যার আবেগ অনুভুতির সাথে মিশেছিল মানব সেবা। আমার স্বজাতি লম্পট খুনী পুরুষ কেড়ে নেয় এই মেধাবী প্রানকে ,তার সাথে সাথে জীবন্ত লাশে পরিনত হয় একটি সভ্যতা।

আমাদের সবার গালে ঘৃনার চপেটাঘাতের বৃষ্টি দাও। হে ইভা , হে আমানত , হে নির্যাতিতা তরুনীরা , মর্গে পড়ে থাকা তোমার গলিত লাশ নির্মম পুরুষতান্ত্রিকতার বর্বর উদাহরন।

ঘরে , কর্মক্ষেত্রে , রাস্তায় কোন জায়গাতে আমদের কিছু পুরুষ তোমাদের জন্য নিরাপদ নয়।

আমাকে ক্ষমা কর
আমাকে ক্ষমা কর
আমাকে ক্ষমা কর
হে তরুনী, হে নারী ।

আর চিৎকার করে বলতে চাই
‘ পাষন্ডদেরকে করাত দিয়ে টুকরো টুকরো করে কেটে শকুনদের খেতে দেয়া হোক অথবা তাদের গোশত পাবলিক টয়লেটে ফেলে দেয়া হোক। এই হোক ধর্ষকদের শেষ বিদায়।

আমি পুরুষ । আমরা পুরুষেরা তোমার জন্য তোমার ঘরকেও নিরাপদ করতে পারিনি। এই তো সেদিন চট্টগ্রামে ইন্টারের বয়সী গৃহ শিক্ষক র্কতৃক নির্যাতিত হয় এক গৃহ বধু।

পুলিশ হেফাজতে ধর্ষিতা ইয়াসমিনের কথা মনে আছে কি?

চট্টগ্রামের আদালত চত্তরে বিচার চাইতে আসা তরুনীকে শ্লীলতাহানীর চেষ্টা করে কোন পুরুষ পুলিশ। তার বিচার কি করতে পেরেছি আমরা?তার বিচার কি করতে পেরেছে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ?

যে সমাজে বিনা অপরাধে ৫ মাসের প্রেগনেন্ট মহিলাকে লিপট থাকা সত্তেও ৮ তলা থেকে হাটিয়ে নিয়ে গিয়ে অস্বাস্থ্যকর থানা ও কোট হাজতে কনকনে শীতের মধ্যে গাদাগাদি করে রেখে রিমান্ড আবেদন করা হয় তখন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের উগ্রমূর্তিটা আর ঢেকে রাখা যায় না। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে যখন প্রেগনেন্ট মহিলার “নিরাপদ মাতৃত্বের ” জন্য শ্লোগানের পসরা বসানো হয় ঠিক তখনই উল্টা পিটে ঘটে চলেছে নারীত্বের চরম অবমাননা।

ঢাকার পতিতালয়গুলো আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজেরই কুরুচির আস্ফালন।

পরিশেষে
নারীপুরুষ পোষাকের ক্ষেত্রে পরস্পরের দুর্বলতাগুলোকে আমলে নিতে হবে। ধারাবাহিক মোটিভেশনের মাধ্যমে পুরুষতান্ত্রিকতাকে নারীর জন্য সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। একদম উগ্র পোষাক যেভাবে কাম্য নয় ঠিক তেমনি পুরো কম্বল পরে চলতে বাধ্য করা ও মোটেভেশনও কাম্য নয়। শালীন হিজাবকে টিটকারী করার মধ্যে পুরুষতান্ত্রিকতা আছে কিনা ভাবতে হবে আমাদেরকে।

ভারতের ধর্ষনের ঘটনাটি পুরো পৃথিবীকে বার্তা প্রেরণ করেছে যে “তোমাদের নারী নীতি” কে আবার রিভিউ করা দরকার। খুজে বের কর আসলে গ্যাপ কোথায়???