ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

একথা অনস্বীকার্য যে মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিতরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতদের চেয়ে বেশী চরিত্রবান। তবুও কিছু কথা না বললেই নয়!

ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ আগমনের পরে চলমান সংস্কৃতি থেকে আরবী শব্দগুলোকে অবমূল্যায়নের যে ধারা শুরু হয়েছিল তা আজও চলছে। আরবী শব্দ ও ইসলামী সংস্কৃতি অবমূল্যায়ন করার জন্য সমাজে নেগেটিভ এপ্রোচ তৈরী করা হয় । সমাজ সব সময় তৈরী করা নেগেটিভ এপ্রোচ থেকে বাঁচতে ইচ্ছায় অনিচ্ছায় চেষ্টা করে। আরবীর প্রতি রাষ্ট্র মোড়লদের রক্ত চক্ষু ও নাক সিটকানো থেকে বাঁচতে বর্তমানে যত্রতত্র ইংলিশ নাম দিয়ে প্রতিষ্ঠান গড়তে সচেতন শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর আগ্রহই তার প্রমাণ।

ব্রিটিশ ও ইসলামী আদর্শের বিরোধী চিন্তাধারার কর্মসূচীর প্রথম আঘাত মাদরাসা শব্দটির প্রতি। কারণ- মাদরাসা শব্দটি আরবী । নেগেটিভ এপ্রোচ তৈরীর কারন ৩ টি । ১. আদর্শের সংঘাত ২. রাজনৈতিক দ্বন্ধ ৩.ব্যবসায়িক বা অর্থনৈতিক আধিপত্য।

আমার চিন্তার ক্ষেত্রটি ঐ জায়গায় না। মাদরাসা সংশ্লিষ্টরা কি করতে পারতেন নিজেদের উন্নয়নে???

ক. মাদরাসার ক্যাম্পাস একঘেঁয়ে নিরানন্দকর :

মাদরাসার কর্তা ব্যক্তিরা শুধু বলে চলেছেন আমি ভাল ,আমি ভাল, আমি ভাল। আপনার সম্পর্কে অন্যের মূল্যায়নে আপনি কি শুধু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব খোঁজেন ? তাহলে আপনারা ভূল করে চলেছেন।

আপনারা কি ভেবেছেন নার্সারি হতে কামিল পর্যন্ত একই ক্যাম্পাসে থাকা একজন ছাত্রের জন্য কতটুকু মনোটোনাস, একঘেয়ে ও বিরক্তিকর? মানুষ নতুনত্ব চায় , নতুন পরিবেশে যেতে চায় । নতুনের কাছে যেতে থ্রিল অনুভব করে। অথচ ১৭ বছর এক জায়গায় রাখার মত ব্যাকডেটেড চিন্তা আর কতদিন জারি রাখা হবে???

খ. অনেক কামিল মাদরাসা হওয়াতে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হয়েছে:

মাদরাসা সংশ্লিষ্টরা নিশ্চয় চমকে উঠেছেন এই হেডিং এ! একটি শহরে অনেক গুলো কামিল মাদরাসা না হয়ে বা একটি দেশে শত শত ফাজিল ও কামিল মাদরাসা না হয়ে পুরো দেশে ২০ টি কামিল/ফাজিল মাদরাসা করে দেশের বাছাই করা আলেমদের ঐ জায়গায় টিচার নিয়োগ দিয়ে শিক্ষা দিলে ভাল ইসলামী স্কলার তৈরী হত। ঐ সমস্ত প্রতিষ্ঠান অনেক শিক্ষার্থীর আনাগোনায় মুখরিত থাকত।

শিক্ষার্থীরা বেশী সংখ্যক ছাত্রছাত্রীর সাথে মিশার সুযোগ পেয়ে বেশী কিছু শিখতে পারত ডিবেট ও ডিলিংসের মাধ্যমে। ছাত্র প্রতিনিধিরা বেশী শিক্ষাথীর মাঝে নেতৃত্ব দিয়ে অধিক যোগ্যভাবে দেশের পরবর্তী লিডার হিসেবে বেড়ে উঠতে সক্ষম হতেন।

গ. অমুসলিম না থাকাতে ডিবেট জমে উঠেনি:

মাদরাসাগুলোতে সরকারী নিষেধ না থাকা সত্বেও অমুসলিমদের পড়ার সুযোগ নেই। তাই মাদরাসা গুলোতে ডিবেটের পরিবেশ গড়ে উঠেনি। বিরোধী মত না থাকলে জ্ঞান চর্চা বাঁধাগ্রস্ত হয়। মাথার জ্ঞান কোষগুলো একপেশে হয়ে যায়। পরমতসহিষ্ণুতার থিউরিকে প্র্যাকটিসে আনা যায় না । সকল মতের সাথে মিশার যোগ্যতা কমে গিয়ে অসহিষ্ণু আচরন তৈরী হয় মনের অজান্তে। প্রতিক্রিয়াশীলতা জন্ম নিতে পারে অনিচ্ছাকৃত ভাবে। আলোচনার ভিত্তিতে আদর্শ জাস্টিফায়েড না হওয়ার কারনে মনে গেঁথে যেতে পারে আমার চিন্তা ভাবনাটিই শুধু সঠিক। এতে মনের কোনে ফ্রাকশন মাত্রার ধর্মান্ধতার জন্ম নিতে পারে। যে কোন মুহুর্তে আপনি অসহিঞ্চু উন্মত্ত আচরন করে ফেলতে পারেন ভূলবশত।

ঘ. মাদরাসায় কমার্স নাই :

মাদরাসায় এখনো কমার্স বিভাগ নাই। ইসলাম যেখানে পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা সেখানে মাদরাসা সংশ্লিষ্টরা এখনো কমার্স পড়ানোর চিন্তাভাবনা কেন করতে পারছেন না আমার জানা নেই। সত্যিকার অর্থে টাকা ওয়ালারা রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন ও টাকা দিয়ে বিজ্ঞানীদের নিজেদের কাজে ব্যবহার করেন। কারেন্সির মেকানিজমটা জানার আগ্রহ কি মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের কোন কালেই হবে না???

ঙ. কমিউনিকেটিভ আরবী ও আরবী সফটওয়ার:

বাংলাদেশের ফরেন রেমিটেন্সের বড় সোর্স হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য যার ভাষা আরবী। মাদরাসার শিক্ষাথীরা যদি আরবী স্পিকিং এ অভ্যস্থ হতেন ও আরবী সফটওয়ার ব্যবহার করতে পারতেন , আরবী টাইপ করতে পারতেন তবে আজকের মাদরাসা শিক্ষার উপর জনগন হুমড়ি খেয়ে পড়ত। সমাজ পরিবর্তনের সাথে মাদরাসার নীতি নির্ধারক রাঘব বোয়ালেরা তাল মেলাতে পারলেন না। যদিও মাদরাসা নিয়ে কোন নীতি নির্ধারক আছে কিনা আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। জীবন জগতের প্রয়োজনীয়তা উনারা উপেক্ষা করলেন আর ওয়াজ করলেন পুরো রাত জুড়ে “ফা ইজা খুজিয়াতিস সালাতু ফানতাসিরু ফিল আরদ”।

চ. হুজুর শব্দটি দাসত্বপূর্ন নয় কি? মাওলানা সার্টিফিকেট দেয়ার কোম্পানী কি মাদরাসা গুলো?

হুজুর শব্দটি একটি চরম দাসত্বপূর্ন শব্দ। এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ কারো জানা থাকলে আমাকে জ্ঞান ধার দিয়েন। মাওলানা শব্দটি উপহার দেয়ার কোম্পানী হল মাদরাসাগুলো। আপনি যদি আলিম পাশ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে আরবী সাহিত্য বা ইসলামিক স্টাডিজ হতে অনার্স মাস্টার্স করেন বা ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চিটাগাং থেকে কুরানিক সায়েন্সে অনার্স মাষ্টার্স করেন তবুও আপনি মাওলানা হতে পারবেন না । অধ্যাপক গোলাম আযম বা অধ্যাপক মফিজুর রহমানদের মত ইসলামিক স্কলারগন মাওলানা হতে পারেন নি । অবশ্যই উনাদের কে প্রশ্ন করে দেখিনি যে উনারা মাওলানা হতে চান কি না??? মাওলানা সার্টিফিকেট দেয়ার কোম্পানী কি মাদরাসা গুলো? কই অধ্যাপক উপাধি তো কলেজগুলো দেয়না! তবে কামিল পাশ করলেই মাওলানা হয়ে যাবে কোন যুক্তিতে?

ছ. মাওলানা শব্দের অদ্ভূত অপব্যবহার:

কামিল পাশ করলেই মাওলানা । কেহ এক মাসের মাওলানা আবার কেহ ৪০ বছরের মাওলানা । জুনিয়র মাওলানা , মাওলানা , সিনিয়র মাওলানা , আল্লামা কোন পদ বিভক্তি না থাকাতে জ্ঞান অর্জনের প্রতিযোগিতার পরিবেশ বিঘ্নিত হয়ে জ্ঞানের বন্ধ্যাত্ব তৈরী হয়েছে।

জ. মোটিভেশনাল ইসলাম না হয়ে চাপিয়ে দেয়া ইসলাম:

পোষাক সর্বস্ব ইসলামের চেয়ে বা থিউরিটিক্যালি মুসলিম হওয়ার চাইতে প্র্যাকটিসিং মুসলিম হওয়াটাকে আমি ছাত্রজীবন থেকে ব্রত হিসেবে নিয়েছি। অথচ মাদরাসায় কিছু শিক্ষককে বিজ্ঞান শিক্ষাকে টিটকারি মারতে দেখেছি। দাখিল পাশ বা আলিম পাশ করে ইন্টারে বা অনার্সে ভর্তি হওয়াটা অনেক মাদরাসায় নৈতিক চরিত্রের স্খলন হিসেবে দেখা হয়। শার্ট প্যান্ট পর্দার ফরজিয়াতকে বায়োলেশন না করা সত্ত্বেও চরম আক্রোশের সাথে তাকিয়ে থাকে এক্স মাদরাসা স্টুডেন্টদের দিকে তাদেরই একসময়ের হুজুরেরা। ঢিলে জিনসে পর্দার সমস্যা নাই তবুও জিনসের প্রতি মাওলানারা চরম বিরক্ত। তৎকালীন আলেমদের ফতোয়া অনুসারে ব্রিটিশ আমলে ছিল ইংরেজী শিক্ষা হারাম। আর ব্রিটিশ মুসলমানদের জন্য ইংরেজী শিক্ষাকে কি মনে করত ব্রিটিশ আমলের আলেমেরা তা আল্লাহই জানেন। মাদরাসায় বেতের ব্যবহার বাড়াবাড়ি রকমের। নগন্য সংখ্যক বিত্তশালী পরিবারের ছেলে মেয়ের সাথে অসংখ্য পিছিয়ে পড়া পরিবারের শিক্ষার্থী মাদরাসায় পড়াশুনা করে। তাই একশ্রেনীর হুজুরেরা সাধারণ ঘরের ছেলে মেয়েদের উপর বেত চালিয়ে দেন নির্মম ভাবে। শুধু টিভি দেখার কারনে হাজার হাজার মাদরাসা স্টুডেন্ট তাদের হুজুরদের থেকে নির্মম প্রহারের শিকার হয়েছেন।

ঝ. ইংরেজী-অংক ভীতি , বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ,চাকরী , বিসিএস:

যেটা এই মূহুর্তে মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে জড়িতদের কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে তা হল সংকীর্নমনতা। এটা এমনি এমনি সৃষ্টি হয়নি । ব্রিটিশ শাসনের পূর্বে যারা ছিল শাসক ব্রিটিশ শাসন শুরু হওয়ার পর থেকে তারা হয়ে গেলেন পরাজিত শক্তি। ব্রিটিশদের সাথে যারাই দোস্তি করেছে তারাই এই আলেম উলামাদের রোষানল ও সমালোচনার শিকার হয়েছেন। আমি তাদের ক্ষোভকে সম্মান করছি। কিন্তু পরাজয়ের পর থেকে জীবনের বাস্তবতার সাথে লড়াই করতে করতে তারা হয়ে পড়েছেন হতোদ্যম। ব্রিটিশ শাসন গত হয়ে পাকিস্তান এসেছে , এসেছে বাংলাদেশ কিন্তু কোন শাসকই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান এই আলেম উলামাদের সম্মান করেনি। ভালবেসে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়নি। মাদরাসা শিক্ষার সিলেবাসকে যুগোপযোগী করার জন্য কেহ এগিয়ে আসেনি ত্রান কর্তা হয়ে। কালের পরিক্রমায় মাদরাসা শিক্ষার নেতৃত্ব যাদের হাতে এসে পড়েছে তাদের অনেকের ব্যাকগ্রাউন্ড খুঁজলে দেখা যাবে তারা একসময় ছিলেন এতিম বা গরীব। স্বাভাবিকভাবেই চিন্তার ক্ষেত্রে অনগ্রসর।

কিন্তু আজ সময় ঘুরে দাড়িয়েছে । আলেম উলামারা রাজনৈতিক সচেতন হয়েছেন। শাসন ক্ষমতা ফিরে পেতে তারা উদগ্রীব। অবশ্যই তারা এটা কখনো পারবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত গোড়ামী ও সংকীর্নমনতা দুর করে আধুনিক শিক্ষাকে ও আধুনিকতাকে রপ্ত করতে না পারেন।

এক সময় মাদরাসা সিলেবাসের ইংরেজী ,অংক, বাংলা বই স্কুল কলেজ সিলেবাস থেকে সম্পূর্ন ভিন্ন ছিল। তাই তারা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি , আকর্ষনীয় চাকরী , বিসিএসে কোয়ালিফাই হতে পারতেন না। আর এখন সিলেবাস এক হয়ে যাওয়ার কারনে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ভর্তি পরীক্ষায় তারা প্রথমও হচ্ছেন । সকল প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় তারা অন্যদের বীট করছেন। মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা ঘুরে দাড়িয়েছে। সিলেবাস আধুনিকায়নের পাশাপাশি ট্রেনিংপ্রাপ্ত যোগ্য শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষাদান অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। আর প্রতিযোগিতায় অবতীর্ন হয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে সুযোগ না দেয়ার মত সকল ষড়যন্ত্র রুখে দিতে হবে হাজার কোটি প্রানের শাহাদাতের বিনিময়ে হলেও।