ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ব্লগ সংকলন: সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড

১।
একদিন Sigmund Freud শিষ্যদের সাথে আলাপচারিতার মধ্যে বলে উঠল-আমার ৩০ বছরের গবেষণা বৃথা হয়ে গেল রে…!
কেন গুরু?- জানতে চাইল ফ্রয়েডের শিষ্য জ্যাক লাকা (Jacque Lacan)।
ফ্রয়েড: মেয়েরা যে কি চায়-এটা ভাবতে ভাবতে। (ফ্রয়েড মন নিয়ে কাজ করতো)।
লাকা: আমি জানি গুরু।
ফ্রয়েড: তুই কি জানিস?
লাকা: ওরা যে কি চায়, তা ওরাই জানেনা। কিছু যে চাইতে হয়, তাও ওরা জানেনা।

“কিছু যে চাইতে হয়, তা মেয়েদের জানা নেই।”-এই কথার প্রতিবাদ করেছিল জ্যাক লাকার ‘নারী’ শিষ্য ইরিগেরি (Luce Irigaray)। জবাবে ইরিগেরিকে বের করে দিয়েছিল লাকা। লাকার দাবি, এটাই প্রকৃতি। আর প্রকৃতি নিয়ে তো আর প্রশ্ন তোলা যাবে না।

২।
রুমানা মঞ্জুরের চোখ তার ‘স্বামী’ কানা করে দেয়ার ‘অধিকার’ রাখে- এভাবে ব্যাপারটাকে যথার্থ প্রমাণ করতে কিছু লোক রুমানার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। ব্যাপারটা যেন এমন যে, রুমানার চরিত্র ‘খারাপ’ তাই তার চোখ কানা করে দেয়া ‘জায়েজ’।

আবার সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি খুন হওয়ার সাথে আপনি জড়িত কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে এটিএন বাংলার মালিক মাহফুজুর রহমানের বক্তব্য- তারা (সাগর-রুনি) পরকীয়ার (রুনির পরকীয়া) বলি। রুনি বাসায় মদের আসর বসাতো। সেখানে তার ‘বন্ধুরা’ যেত।

এখানেও রুনির চরিত্র নিয়ে টানাটানি করে খুনকে যথার্থ বলে প্রমাণের চেষ্টা। ব্যাপারটা যেন এ রকম- রুনি ‘পরকীয়া’ করতো; তাই তাদের মৃত্যুর জন্য রুনি ‘দায়ী’। পরকীয়ার শাস্তি তো তাকে পেতেই হবে। এজন্য তাদের মৃত্যু ‘ঠিক’ আছে। এমনকি সাগর কোনো দোষ না করেও অযথা রুনির ‘পরকীয়ার’ জন্য মরতে হলো। তাছাড়া রুনির মদের আসর বসানোটা ‘দোষ’। কিন্তু বন্ধুরা (পুরুষ) সেই আসরে যাওয়াতে দোষ নেই।

৩।
অপরাধীর সাথে অবিচার করাটাও তো অপরাধ। রুনি-রুমানারা যদি ‘দুশ্চরিত্রা’ হয়েও থাকে, তাহলে তাদেরকে খুন করা বা চোখ কানা করে দেয়াটা কি ‘ঠিক’ আছে?

৪।
খুন বা কোনো অপরাধ সংঘটনের আগে এক ধরনের প্লট তৈরি করা হয়। আর খুন বা অপরাধের পরে আরো কিছু প্লট তৈরি করা হয়। পরের প্লটগুলো কখনও নতুন কোনো অপরাধের জন্য সহায়ক প্লট তৈরি করে, কিংবা নতুন অপরাধের পথে বাধার সৃষ্টি করে। তবে সভ্য সমাজ সেটাই, যেখানে কোনো অপরাধের পরের প্লটগুলো নতুন অপরাধের পথে বাধার সৃষ্টি করে।

৫।
মেয়েরা যদি না জানে- কি চাইতে হয়, ফলে বিচিত্র আচরণ করে, কিংবা রুনিরা যদি পরকীয়া করে, কিংবা নারীবাদী হয়, অথবা পুরুষ বিদ্বেষী হয়ে ওঠে, তবে তার সবগুলোর জন্য পুরুষরাই দায়ী। পুরুষরাই তাদের জীবন, ভাবনা, মানস, চেতনা সঙ্কুচিত করে দিয়ে বলেছে, তোমরা Female; কখনো চেয়েছে Feminine হিসেবে; আবার কখনো একটু আগ বাড়িয়ে বানিয়ে দিয়েছে Feminist; কখনোবা বলে দিয়েছে, তোমরা পুরুষবিদ্বেষী। তোমাদের জন্য এই নাও ধরাবাধা পথ, ধরাবাধা পথে পা টিপে চলো। এটাই তোমাদের গণ্ডি। কারণ, আমি পুরুষ যেহেতু শক্তিমান, তাই আমার চাপিয়ে দেয়া ‘জিনিসই’ তুমি।

৬।
যুগে যুগে নারীকে নিষ্পেষিত করতে চাওয়া ফ্রয়েড-লাকা-মাহফুজুর রহমানদের বলতে চাই- পৃথিবীটা বড় বেশি পুরুষ নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু যারা এই নিয়ন্ত্রণকে ‘প্রকৃতি’ বলে চালিয়ে দিতে চায়, যারা এই নিয়ন্ত্রকে ‘ঠিক আছে’ বলে চালিয়ে দিতে চায়, এবং এই চালিয়ে দেয়া পথ ধরে চলতে গিয়ে কোনো নারী ‘পথচ্যুত’ হয়ে গেলেও দোষটা যারা ওই নারীকেই দেয়, তারা সবচেয়ে বড় অসভ্য, বড় ঘৃণ্য। তারা অপরাধী।

– মাসুদ মঞ্জুর
Masud.manzur@gmail.com

***
ফিচার ছবি: ভিডিও থেকে সংগৃহিত